তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর চারমাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের মতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দিল্লি সফর শীতকালীন অধিবেশনের আগে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কোন কোন বিষয়ে কথা হতে পারে মমতা তারও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তার মধ্যে বিএসএফ ইস্যু যে অন্যতম তা বলাই বাহুল্য। সম্প্রতি রাজ্যে বিএসএফের এক্তিয়ার বাড়িয়ে ১৫ থেকে ৫০ কিমি করায় প্রবল আপত্তি জানায় রাজ্য সরকার। সীমান্তে বিএসএফের এক্তিয়ার বৃদ্ধি করা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না বলে জানায় তারা।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি দিল্লিতে বসে নিজের দল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সংগঠনও যে মমতা বাড়িয়ে নিলেন সে কথা বলাই বাহুল্য।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করেই যে এই উদ্যোগ, তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। ত্রিপুরা, গোয়ায় আগেই বড়সড় ছাপ ফেলেছে তৃণমূল। সেখানে একাধিক বিশিষ্ট নেতা যোগ দিয়েছেন তৃণমূলে। এবার বিহারেও নিজের জায়গা পাকা করলো তৃণমূল। এদিন মমতার উপস্থিতিতে তৃণমূলে যোগ দেন প্রাক্তন সাংসদ কীর্তি আজাদ এবং প্রাক্তন জেডিইউ নেতা পবন বর্মা। আজ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন বিজেপি সাংসদ সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। দেখা করে বেরবার পথে সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দেন তিনি ‘প্রথম থেকেই মমতার পাশে’ আছেন। এদিন মমতা স্পষ্ট বলেন, তৃণমূলকে তিনি পাঞ্জাব, হরিয়ানাতেও দেখতে চান। কীর্তি আজাদ এবং অশোক তানওয়ার তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরেই মমতা একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে মমতা প্রধানমন্ত্রীর সামনে রাখা তাঁর দাবিগুলির প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের জানান, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো শক্তিশালী করতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সু-সম্পর্ক জরুরি। তবে বৈঠক থেকে বেরিয়েই প্রথম যে বিষয়টির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন তা রাজ্যের বকেয়া। বিগত কয়েক বছরে রাজ্যে একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। সেই সব ঘূর্ণিঝড়ে রাজ্যের বিপুল ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রের কাছ থেকে সেই বাবদ পর্যাপ্ত অর্থ সাহায্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন প্রকল্প এবং ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিপূরণ নিয়ে বকেয়া হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে মমতা এদিন ৯৬ হাজার কোটি টাকার বেশি দাবি করেছেন। প্রসঙ্গত, অগাস্টের বৈঠকেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বকেয়া মেটানোর দাবি তুলেছিলেন। এছাড়াও রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা পায়, মমতা এদিন প্রধানমন্ত্রীর কাছে সেই টাকা অবিলম্বে মেটানোর দাবি করেছেন।
প্রসঙ্গত, ২০২০-২১ সালের অর্থ বছরে জিএসটি বাবদ বাংলার প্রাপ্য ছিল ২০০০ কোটি টাকা। এছাড়াও আমফান, ইয়াস মোকাবিলায় মোট ৩২ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রের কাছে বকেয়া রয়েছে। পাশাপাশি আবাস যোজনা, সড়ক যোজনা, ন্যাশনাল হেলথ মিশন, জল জীবন মিশন, এ ধরণের বহু প্রকল্পের টাকা কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের বকেয়া রয়েছে। উল্লেখ্য, মুখ্যমন্ত্রী মমতা গত অগাস্ট মাসে করোনার প্রকোপ বেশি এমন ১০টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও যে হিসেব তুলে ধরেছিলেন, প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তা জিএসটির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪১৩৫ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন প্রকল্পে বকেয়া বাবদ প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকার মতো। এছাড়াও মুখ্যমন্ত্রী সেই সময় রাজ্যের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়াতেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে মুখ্যমন্ত্রী মমতার এদিন অন্যান্য দাবিগুলির মধ্যে ছিল রাজ্যকে যাতে আরও বেশি সংখ্যক ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। কেন্দ্র ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যাপারে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয় নি। এদিকে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মতো রাজ্যের সব স্কুল, কলেজ খুলে গিয়েছে। মমতা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, জরুরি ভিত্তিতে এই বয়সের সবাইকে ভ্যাকসিন দেওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া রাজ্যে এখনও বহু মানুষের ভ্যাকসিন দেওয়া বাকি রয়েছে। সেই কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রীরা কাছে তাঁর রাজ্যের জন্য আরও বেশি সংখ্যায় ভ্যাকসিন প্রদানের দাবি করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে মুখ্যমন্ত্রী এদিন রাজ্যের পাটশিল্পের দিকে নজর দেওয়ার দাবিও করেছেন। সারা দেশের মধ্যে বাংলায় চটকলের সংখ্যা সব থেকে বেশি। বাংলার চটকলগুলিকে সক্রিয় রাখা গেলে সারা দেশে চটের ব্যবহার অনেক বাড়ানো যাবে বলে মমতা প্রধানমন্ত্রীকে জানান। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী সচেষ্ট হবেন বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী এদিন প্রধানমন্ত্রীর সামনে ত্রিপুরার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। কিছুদিন ধরে ত্রিপুরার হিংসাত্মক ঘটনার কথা বলে তিনি সে রাজ্যের হিংসা থামাতে প্রধানমন্ত্রীকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানান। উল্লেখ্য, এর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তৃণমূল সাংসদরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন। এদিন মমতাও বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি এও বলেছেন, যেসব ঘটনা ত্রিপুরায় ঘটছে তা কোনও ভাবেই কাম্য নয়। যেকোনও মূল্যে এইসব ঘটনা বন্ধ হওয়া উচিত। মমতা এদিন সাংবাদিকদের জানান, তিনি সায়নী ঘোযের গ্রেফতারির প্রসঙ্গও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী এদিন প্রধানমন্ত্রীকে আগামী বছরে বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনে উপস্থিত থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, শিল্প বাণিজ্যে উন্নতি ছাড়া কোনও রাজ্যের উন্নতি সম্ভব নয়। বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই শিল্প বাণিজ্য সম্মেলনের আয়োজন। সেই সঙ্গে রাজ্যের বকেয়া টাকার প্রসঙ্গে মমতা জানান, প্রধানমন্ত্রী এদিন জানিয়েছেন, তিনি পরিস্থিতি দেখে জানাবেন।