দেশে উন্নতি থমকে রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বহু শিল্প কারখানা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অন্ধকার নেমে এসেছে। তবু বলব, এই পরিস্থিতিতে বাংলা ভালো রয়েছে। বৃহস্পতিবার ৫ ডিসেম্বর ২০১৯ ইনফোকম-এর উদ্বোধন করতে গিয়ে এ কথা বলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রে মোদী সরকারের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি রাজ্যের উন্নয়নের তুলনামূলক পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের ভুল আর্থিক নীতিতেই মন্দার সৃষ্টি হয়েছে সারা দেশে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের বিবিধ এজেন্সির ভয়ে সন্ত্রস্ত দেশের শিল্পমহল। সেই কারণেই ভারতে কেউ নতুন শিল্প গড়তে এগিয়ে আসছেন না। এটাও ভারতীয় অর্থনীতির আর্থিক মন্দার অন্যতম প্রধান কারণ। সম্প্রতি শিল্পপতি রাহুল বাজাজ যে মন্তব্য করেছেন তার প্রেক্ষিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, রাহুল বাজাজের গাট্স (কলজের জোর) আছে। উনি বলতে পেরেছেন। অনেকে বলতে পারেন। আমার মতো উনিও আন্ডার স্ক্যানারে চলে গেছেন। আমরা যারাই একটু বলার চেষ্টা করি, আমাদের আন্ডার স্ক্যানার আনা হয়। কতজন শিল্পপতি কোনও বিচার না পেয়ে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়েছেন সে প্রসঙ্গও তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, শিল্পপতিদের পাসপোর্ট, ভিসার তথ্য দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। শিল্পমহলের বন্ধুরা লগ্নি করতে তৈরি আছেন। কিন্তু প্রত্যেকে এজেন্সির ভয়ে ত্রস্ত। হয় সিবিআই, নয় ইডি, নয়তো এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট! ফলে কেউ ইন্ডাস্ট্রি করতে চাইছেন না। শিল্প শিল্পমহলের মতো চলবে। তাদের হাসতে, বাড়তে ও আকাশ সমান উচ্চতায় পৌঁছতে দেওয়া হোক। কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, কেন আপনারা অযথা হস্তক্ষেপ করছেন? শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জিডিপি-র কী অবস্থা দেখেছেন? অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্গিন ও অন্ধকার। পেঁয়াজের দাম কিলো প্রতি ১৪০ টাকা, অথচ কোনও উদ্বেগ নেই! ভারতে বেকারত্ব আকাশ ছুঁয়েছে। কেউ জানে না ব্যাঙ্কগুলির কী পরিস্থিতি! আমি আমার রাজ্য সরকারের টাকা ব্যাঙ্কে জমা দিচ্ছি। কিন্তু বলা হচ্ছে এক লক্ষ টাকার বেশি আপনি তুলতে পারবেন না। এই পরিস্থিতি আগে কখনও হয়নি। এটা মহামারীর মতো অবস্থা। বাড়িতে টাকা রাখলে নোটবন্দি, আর ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে লুঠবন্দি হয়ে যাবে! কেন্দ্রের বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, রেল, এয়ার ইন্ডিয়া, বিএসএনএল বিক্রি করে দিতে চাইছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিরও সংযুক্তিকরণ করতে চাইছে। জানি না তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে। তবে আমি তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কিত। নাগরিকত্ব বিল এবং এনআরসি ইস্যুতে কেন্দ্রকে ঠুকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কটাক্ষ, দেশে চলছে শুধু বিভাজনের রাজনীতি। বিভাজনের নীতি কখনও ভাল ফল দেয় না। শান্তির জন্য আমরা সকলে কাজ করব। দেশ, মাটি, ধর্ম ও মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করব না।
এই অবস্থাতেও বাংলার অবস্থা ভালো বলে জানিয়ে তার পক্ষে রীতিমতো তথ্য-পরিসংখ্যান দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, দারিদ্র দূরীকরণ, অতি ক্ষুদ্র, ছোটো ও মাঝারি শিল্প এবং স্কিলে বাংলা সারা দেশে এক নম্বরে। বাংলায় ৯০ লক্ষের বেশি এমএসএমই ইউনিট রয়েছে, যেখানে ১ কোটি ৩৬ লক্ষের বেশি মানুষ কাজ করেন। আমরা তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প তালুক গড়তে রাজারহাটে ২০০ একর জমি দিয়েছি। সেখানে ৩,০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হবে। আমাদের রাজ্যে প্রচুর হোটেল রয়েছে। কিন্তু তাতেও জায়গা মেলে না। এতেই বোঝা যায় বাংলা মানেই ব্যবসা। উপস্থিত শিল্পমহলের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, আমি আপনাদের আর্জি জানাচ্ছি, যদি আপনারা লগ্নি করতে চান আমাদের রাজ্যের শিল্পযজ্ঞে সামিল হন। আমাদের জমি ব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে এমএসএমই, পর্যটন, চা পর্যটন, তীর্থ পর্যটন, হোম স্টে নীতি রয়েছে। গত ৭-৮ বছরে আমাদের সরকারের আমলে রাজ্যে বেকারত্ব ৪০ শতাংশ কমেছে। মুখ্যমন্ত্রীর মতে গত কয়েক বছরে শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরাট সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে বাংলায়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তথ্য-প্রযুক্তি যেমন সম্ভাবনা বাড়িয়েছে, তেমনই পরিষেবামূলক শিল্পক্ষেত্র, পর্যটন, বিশেষত চা–শিল্পকে ঘিরে শিল্পায়নের দিক খুলে গিয়েছে। দক্ষ শ্রমিক কর্মচারী রয়েছে আমাদের রাজ্যে। চা–বাগানগুলিকে ঘিরেও পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের যাতায়াতের নিরিখে বাগডোগরা বিমানবন্দরও এক নম্বর হয়ে উঠেছে সারা দেশে। আগামী ১১ ও ১২ ডিসেম্বর শিল্প–বাণিজ্য সম্মেলন শুরু হতে চলেছে দিঘার কনভেনশন সেন্টারে। তা মনে করিয়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এসব দেখেই বোঝা যায় বাংলা ভালোভাবে এগোচ্ছে। আমি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি। কৃষি ও শিল্প দুটোকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে আমাদের রাজ্যে। আমরা কখনওই চাই না ধর্মের ভিত্তিতে দেশকে ভাগ করা হোক। জয় হবেই। আসুন আমরা সবাই একজোট হয়ে এগিয়ে যাই। শিল্পকর্তাদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, আপনারা হতাশ হবেন না। রাজনীতিতে কখনও কখনও এমন সূর্যাস্তের সময় আসে। কিন্তু আপনারা সাহস করে উঠে দাঁড়ান। বাংলা কখনও শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেন না। এদিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করেন ইনফোকমের চেয়ারম্যান ডি ডি পুরকায়স্থ, স্টেট ব্যাঙ্কের এম ডি অরিজিৎ বসু, অমিতাভ রায়, বি এস মিশ্র প্রমুখ। তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প সম্মেলন ‘ইনফোকম’-এর এবারের থিম ‘উইনিং ইন দিস ভিইউসিএ (ভোলাটাইল, আনসার্টেন, কমপ্লেক্স, অ্যামবিগুয়াস— সংক্ষেপে ভুকা) ওয়ার্ল্ড’। অর্থাৎ, অস্থির, অনিশ্চিত, জটিল ও অস্পষ্ট বিশ্বে জয় ছিনিয়ে আনার কৌশল। দেশের বেহাল আর্থিক দশা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে কেন্দ্রকে বিঁধতে সেই ‘ভুকা’-কে ‘ভুখা’য় পরিণত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই হিন্দি শব্দটির মানে ক্ষুধার্ত। এই শব্দের অর্থ গভীর ও স্পর্শকাতর। দেশের অর্থনীতির প্রেক্ষিতেও এই শব্দটি উপযুক্ত। শিল্প, কর্মসংস্থানে, সব ক্ষেত্রেই খরা। আর এ সব চাপা দিতেই ধর্মীয় বিভাজনের নীতিকে হাতিয়ার করা হচ্ছে। ১৮তম ইনফোকমের প্রধান অতিথি মুখ্যমন্ত্রী এ দিন তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজ্যের সাফল্য ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি বলেন, গোটা দেশের আর্থিক পরিস্থিতি প্রায় ‘মহামারী’র জায়গায় পৌঁছেছে। দারিদ্র, বেকারত্ব, পেঁয়াজের দাম, সবই গগনচুম্বী। বর্তমান সময়ের অর্থনীতির সঙ্গে তাই হিন্দি শব্দ, ভুখার মিল খুঁজে পাচ্ছেন তিনি। যখন ছোটো-বড়ো-মাঝারি বা তথ্য-প্রযুক্তি, সব ধরনের শিল্পেই খরা। এমন আগে কখনও হয়নি। তাঁর মতে, গোটা দেশে এখন অনিশ্চয়তার বাতাবরণ। ব্যাঙ্ক বা জীবন বিমা নিগমে টাকা রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা। নির্বাচন এলে রান্নার গ্যাসের দাম কমে, আর তা মিটলে বাড়ে।