কেওড়াতলা মহাশ্মশানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাপস পালের শেষকৃত্য সম্পন্ন হলো। তার আগে বুধবার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সকালে গল্ফ গ্রিনের বাড়ি থেকে প্রয়াত অভিনেতা-সাংসদের শেষযাত্রা শুরু হয়। টেকনিশিয়ান্স স্টুডিও ঘুরে মরদেহ পৌঁছায় রবীন্দ্র সদনে। সেখানে তাপস পালকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হাজির ছিলেন অসংখ্য গুণমুগ্ধ। রবীন্দ্র সদনে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছিলেন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মা প্রমুখ। রবীন্দ্র সদনে ঢোকার মুখেই থমকে দাঁড়ান শোকাহত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যান তাপসের মরদেহের দিকে, সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তাপসের স্ত্রী নন্দিনী ও কন্যা সোহিনী। তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন, সমবেদনা জানান মুখ্যমন্ত্রী। ভ্রাতৃসম তাপস পালকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির ফলে আমাদের তিনটি অকালমৃত্যু দেখতে হলো। প্রথমে সুলতান আহমেদ, সুলতানের ডেডবডি আমি দেখতে পারিনি। ওঁর পরিবারের কাছেই জেনেছিলাম, চিঠি আর ফোন আসার পর বাথরুমে গিয়ে সেখানেই মারা যান সুলতান। এরপর প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী-র মৃত্যু। এদিন তাপসের মুখের দিকেও তাকাতে পারিনি। রাজনৈতিক কারণে বলছি না, তবে তাপসের মৃত্যু আবার প্রমাণ করল একটা এজেন্সির দ্বারা মানসিকভাবে অত্যাচারিত হয়ে, দুর্বিষহভাবে নিজেকে এমন বিপর্যস্ত করেছিলেন, মানসিকভাবে এতো ক্ষতবিক্ষত ছিলেন যে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত জানতে পারলেন না অপরাধটা কোথায়? তাপসের মতো এক নম্বর ফিল্মস্টার, শুধু বাংলা নয়, দেশে যাঁর এত নাম, তাঁকে ১ বছর ১ মাস জেল খাটতে হয়। অপরাধ কী ছিল? সুদীপদাও তখন ভুবনেশ্বরে তাপসের সঙ্গে ছিলেন। একটা টিকিটের আপগ্রেডেশনের জন্যও সুদীপদাকে জেলে আটকে রেখেছে! সুদীপদার কাছেই জানলাম, তাপস একটা এন্টারটেনমেন্ট চ্যানেলের ডিরেক্টর ছিলেন, মাইনে পেয়েছিলেন। সেজন্যই জেলে রেখে দেওয়া হলো! দুর্দশাগ্রস্ত, আহত, ক্ষতবিক্ষত হয়ে তাপসের অকালে চলে যাওয়া, চলচ্চিত্র জগতে অপূরণীয় ক্ষতি। শিল্পীরা বিভিন্ন সময় প্রোডাকশন হাউসে কাজ করেন, কোম্পানি, চ্যানেলে কাজ করেন। অনেকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবেও কাজ করেন। কিন্তু সেজন্য তাঁদের জীবন এভাবে অকালে ঝরে যাবে, এটা কি ঠিক হচ্ছে? কেন্দ্রীয় সরকারের জঘন্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণমূলক আচরণ, পরিকল্পনা থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না! আইন আইনের পথে চলুক। মার্ডার কেসেও তো তিন মাসে চার্জশিট দিতে হয়। এই কেসগুলি কোন পর্যায়ে তা আমিও জানি না। উপরন্তু দিনের পর দিন লাঞ্ছনা, যন্ত্রণা, গঞ্জনা দিয়ে একেকটা জীবনকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। তাপসও ফুরিয়ে গেল, যাওয়ার কথা তো নয়। তাপসের মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। মৃত্যুকে ঠেকানো যায় না। কিন্তু তার তো সময় আছে। অসময়ে দামি প্রাণগুলো চলে যাচ্ছে। শিল্পীদেরও ভাবতে বলব। শ্রীকান্ত মোহতাকে এক বছরের বেশি আটকে রাখা হয়েছে। ওঁর শরীর ভালো নয়। শুনেছি ওঁর স্ট্রোকও হয়েছে। একজন সাংবাদিককেও আটকে রাখা হয়েছে, উনি একটি কাগজের এডিটর ছিলেন। কেউ অন্যায় করে থাকলে কোর্টে বিচার হোক। বিচারে শাস্তি হলে আপত্তি নেই। কিন্তু এতদিন জেলে বন্দি করে রাখা কী কৌশল? তাপসের মৃত্যুতে আমি মর্মাহত, শোকাহত, দুঃখিত। তাপসকে ‘দাদার কীর্তি’, ‘সাহেব’, ‘গুরুদক্ষিণা’র জন্য বাংলার ঘরে ঘরে সবাই জানে। দাদার কীর্তি অমর কীর্তি হিসেবে বেঁচে থাকবে। রবীন্দ্র সদন থেকে বেরিয়ে তাপসের শেষযাত্রা পৌঁছায় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। সেখানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাপস পালের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, সাংসদ মালা রায় প্রমুখ। তাপস পালের শেষযাত্রায় হাজির ছিলেন হরনাথ চক্রবর্তী, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, সোহম-সহ টলিউডের কলাকুশলীরা।


