জীবনে প্রথম নির্বাচনি রাজনীতিতে হাতেখড়ি—কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। তা-ও দু-দু-বার আমার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল না; বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গিয়েছিলাম। সহপাঠীরা আমাকে খুব ভালোবাসত। কলেজের নির্বাচনে এটা একটা মস্ত সুবিধা। যে যত বেশি মিশবে এবং সবার সঙ্গে যার ভালো সম্পর্ক—অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীরা তাকেই নির্বাচিত করে। এটা অবশ্য কলেজের একটা ছোট্ট পরিসরের ব্যাপার। কিন্তু পুরসভা, বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচন সম্পূর্ণ অন্য রকম। এক-একটা নির্বাচনি এলাকা ক্রমশই ক্ষুদ্রতর থেকে বৃহত্তর।
বেশ মনে আছে, ১৯৮২ সালের পর থেকে আমি প্রায়ই বিধানসভায় যেতাম। বিধায়করা কীভাবে বক্তৃতা দেন, নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন—সেসবই দর্শক-গ্যালারিতে বসে ভালো করে লক্ষ্য করতাম। কিন্তু সংসদ সম্বন্ধে কোনও ধ্যান-ধারণা, অভিজ্ঞতা কিছুই ছিল না। শুধু শুনতাম, পার্লামেন্টটা ভীষণ বড়ো ব্যাপার, এত বড়ো জায়গা নিয়ে তৈরি যে একেবারে গোলকধাঁধার মতো, একবার ওই চত্বরে পথ চিনে ফিরে আসা দারুণ শক্ত।
আর সাংসদ হওয়ার আগে পার্লামেন্ট বা ‘জনতার দরবার’-কে চাক্ষুষ করার সুযোগ হয়নি কখনও। দিল্লিতে অবশ্য গেছি অনেকবার—তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। যাদবপুরের মানুষ যখন তাঁদের স্নেহাশিস দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করলেন—পার্লামেন্ট যেতে হবে জেনে কী যে ভয় পেয়েছিলাম! যাদবপুরের অগণিত মানুষ, আমার সহকর্মীরা, তখন আনন্দে আত্মহারা, আর আমি যেন ‘জুজুর ভয়ে’ কেমন গুটিয়ে গেছি। যেন অজানা, অচেনা, পথভোলা এক পথিকের মতো কোনও এক পান্থশালায় আমাকে পাঠানো হচ্ছে; কিন্তু সেখান পৌঁছোবো কেমন করে—তাই নিয়ে একটা অজানা আশঙ্কা!
১৯৮৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কংগ্রেসের ১৬ জন লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। দিল্লিতে সবাই গেলাম—একই বিমানে, একসঙ্গে। প্রণবদা তখন অর্থমন্ত্রী, আমাদের দায়িত্ব তাঁরই ওপর। তিনি, তাঁর অফিসের বিশ্বস্ত শ্রী এম কে মুখার্জিকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের দেখভাল করার জন্য। যেহেতু দিল্লিতে আমাদের থাকার কোনও জায়গা ছিল না তাই আমার আর শ্রীমতী ইন্দুমতী ভট্টাচার্যের একসঙ্গে একটা জায়গাতে থাকার ব্যবস্থা হল। পরেরদিন নেতা নির্বাচন।
প্রণবদাই আমাদের নিয়ে গেলেন ‘সেন্ট্রাল হলে’, কোনও অসুবিধা হলো না। এরপর পার্লামেন্টের ‘গোলকধাঁধায়’। প্রথমদিনই মোটামুটি একটু দেখে নিলাম। পরের কয়েকটা দিন রতনদা মানে রতন মুখার্জি এবং ওঁর স্ত্রী মলয়া আমাকে খুবই সাহায্য করেছিলেন। শুরু হলো ‘জনতার দরবারে’ প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। বিধানসভার দর্শকাসন থেকে সংসদে নির্বাচিত সদস্যের চেয়ারে। প্রথমদিকে তো কিছু বুঝতেই পারতাম না। মনে হত—হায় ভগবান! এ কোথায় এলাম? এখানে সাহায্য করার কেউ নেই; পথ চেনানোর বা পথ দেখানোর কেউ নেই। তখন আমি একদম আনকোরাদের দলে।

প্রথম প্রথম আমার ধারণা ছিল, এটা হয়তো বা একটা আদর্শ দেবালয়—যেখানে আওয়াজ ওঠে শুধুই জনস্বার্থে। ভাবতাম সবাই বুঝি এক একজন কেউকেটা। কী গড়গড় করে ইংরেজি বলছেন, সংবিধান আওড়ে যাচ্ছেন, ‘শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম’ নিয়ে যেন জনগণের পরিত্রাতার ভূমিকায় আসর মাত করছেন। আফসোস হত, যদি ওদের মতো হতে পারতাম! নিজেকে বড়ো অসহায়, অবহেলিত মনে হত। মনে বারবারই প্রশ্ন উঠত, দায়িত্বই যদি পেলাম, সে দায়িত্বের মানমর্যাদা রক্ষা করতে পারব তো?
এইভাবে একদিকে চলছিল সংসদকে, সাংসদদের জানা, আইনকানুন লক্ষ্য রাখা, অন্যদিকে নিজেকে ক্রমশ তৈরি করে নেওয়া, অভিজ্ঞতার আলো যেন অন্ধকারের পিচ্ছিল পথ থেকে উত্তরণের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। যাইহোক, মোটামুটি ৭ দিন এইভাবে লক্ষ্য রাখলাম। এখানে একটা কথা বলা দরকার। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে, নতুন সাংসদ নির্বাচিত হয়ে এলে তাঁকে সাহায্য করেন—তাঁর অন্যান্য সহকর্মীরা। নতুন সাংসদের মনে আত্মবিশ্বাস আনতে সাহায্য করেন তাঁরা; আইনকানুন, আদব-কায়দা সবকিছুই শিখিয়ে দেন। ধন্যবাদ তাঁদের। কিন্তু কংগ্রেসে বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যার যার নিজের মতো করে তৈরি হওয়া।

বেশ মনে আছে জীবনে প্রথম প্লেনে চড়ি দেশের কোথাও যাবার জন্য নয়—বিদেশযাত্রার প্রয়োজনে। ১৯৮৩ সালের International Confederation of Trade Union সংক্ষেপে ICFTU-এর সেমিনার উপলক্ষে কুয়ালালামপুর গিয়েছিলাম INTUC-র প্রতিনিধি হিসেবে। সুব্রত মুখার্জি আমার নাম সুপারিশ করেছিলেন। এর আগে দিল্লিতে INTUC-র মহিলা শাখার একটা ট্রেনিং ক্যাম্প হয়েছিল। ৭ দিনের সেই ক্যাম্পে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৫০ জন মহিলা এসেছিলেন। ক্যাম্পের শেষদিন সেখানে এসেছিলেন INTUC-র সর্বভারতীয় সভাপতি শ্রীরামানুজম। ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত শিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ শ্রমিক নেতা। শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে তাঁর অনেক মূল্যবান বইও আছে। তো, তিনি আমাদের একটা প্রশ্ন-উত্তরের ক্লাস নিয়েছিলেন। তাঁর প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে দিয়েছিলাম। ফলে ICFTU-র সেমিনারে তিনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন।
সেই প্রথম প্লেন চড়া। মনকে প্রস্তুত করে নিয়েছিলাম, পাশের যাত্রীকে দেখে সব সহজভাবে শিখে নেব; কিন্তু কাউকে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে, আমি কিছু জানি না। থাই-বিমানে ব্যাঙ্কক পর্যন্ত এসে, ব্যাঙ্কক থেকে ঘণ্টা দুই পর কুয়ালালামপুর যাওয়ার বিমান। কিছুই জানি না, তার ওপর বিদেশে। ভয়ে ভয়ে প্লেন থেকে নামলাম। দেখি একটি মেয়ে কুয়ালালামপুর ফ্লাইটের প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে গিয়ে বলামাত্রই সে আমাকে এবং আরও কিছু লোককে নিয়ে গিয়ে আলাদা জায়গায় বসালো, তারপর ঘণ্টা দুয়েক বাদে কুয়ালালামপুর ফ্লাইটে চাপিয়ে দিল।
কুয়ালালামপুরে পৌঁছে আবার বিপদ। জীবনটাই আমার সংগ্রাম আর সমস্যা লগ্নে, পদে পদে বাধা। আমাকে, উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে কেউ নিতেই আসেনি। রাত তখন প্রায় বারোটা। কী করি ভাবছি, কাউকে কিছু জিজ্ঞাসাও করতে পারছি না। ভরসা একটাই, আমার কাছে যে প্রোগ্রাম লিস্টটা ছিল, তাতে আমাদের থাকার জায়গা লেখা হয়েছিল—‘সাউথ ইস্ট এশিয়া হোটেলে’। এয়ারপোর্টে একটা ট্রাভেলার্স চেক ভাঙালাম। একটা ট্যাক্সি নিয়ে একাই রওনা হলাম হোটেলের দিকে। সাবওয়ে পেরিয়ে একা একা অত রাতে যখন যাচ্ছি, ভাবছি একটা বিরাট ঝুঁকি নিয়ে তো চললাম, এখন যদি কেউ আমাকে মেরে ফেলে! সঙ্গে পাসপোর্টটা দেখে হয়তো তখন, একজন ভারতীয় হিসেবে শনাক্ত করা হবে; আর পাসপোর্টটা খুঁজে না পাওয়া গেলে কেউ জানতেই পারবে না আমার কী হল! যাইহোক, মানসিক শক্তির ওপর বিশ্বাস রেখে শেষ পর্যন্ত হোটেলে গিয়ে উঠলাম। রিসেপশনে যখন খোঁজ নিচ্ছি, উদ্যোক্তারা খবর পেয়ে ছুটে এলেন, কাকুতি-মিনতি করে আমার কাছে ক্ষমা চাইলেন। আসলে সময়টা বুঝতে ওঁদের ভুল হয়েছিল; আমিও আর মনে কোনও খেদ রাখলাম না। পরীক্ষায় যখন উতরেই গেছি তখন আর ভয়টা কীসের?

ঘটনাটার অবতারণা হয়তো এ প্রসঙ্গে—কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু একটার পর একটা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তো জীবনকে ফেলে আসা। খানিকটা এইভাবেই, প্রয়াত নেত্রী ইন্দিরাজির মৃত্যুর পর, ‘জনতার দরবার’ বা সংসদে এসে পৌঁছেছিলাম।
দিন সাতেক চুপচাপ সংসদে বসে থেকে, সব লক্ষ্য করার পর, ঠিক করলাম, ভুল হোক আর সঠিক হোক, আমার নিজের চেষ্টাতেই, জনতার এই দরবারে আমাকে মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে হবে। প্রশ্নোত্তর পর্বে হাত তুললাম, ডাক পেলাম না; পরের দিন আবার হাত তুললাম কোনও পাত্তাই পেলাম না। খুব রাগ হলো। পরের দিন সংসদে ঢুকলাম, ঠিক করেই এসেছিলাম যে, আজ যদি আমাকে না ডাকা হয় তাহলে জোরালো ভাবেই প্রতিবাদ জানাতে হবে। এতে যা হওয়ার হবে। হাত তুললাম, উত্তরে যথারীতি অবজ্ঞা। শেষ পর্যন্ত উঠলাম, বললাম, ‘Hon’ble speaker Sir, everday I am raising my hand, why don’t you allow me to ask a question?’ অধ্যক্ষ, তখন খানিকটা বিহ্বলভাবেই, আমাকে বলার জন্য অনুমতি দিলেন। ‘উদ্বাস্তুদের নিঃশর্ত জমির দলিল’—নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল, তাই নিয়েই প্রশ্ন করলাম। স্পিকার বললেন, ‘আপনি নতুন, তাই নিয়মটা হয়তো ভালোভাবে জানেন না, এ প্রশ্নটা হচ্ছে Enemy Property নিয়ে, কিন্তু এর সঙ্গে আপনার প্রশ্নের কোনও সম্পর্ক নেই’। পাল্টা বললাম, ‘কোনও সম্পর্ক যদি না থাকে তাহলে সংসদীয় রীতিতে ‘Half-an-hour discussion’ বলে যেটা থাকে সেটা কেন দিচ্ছেন না?’ হয়তো সেদিন আবেগ চেপে রাখতে পারিনি, হৃদয় দিয়ে, আন্তরিকভাবে স্পিকারকে অনুরোধ করেছিলাম বলেই তিনি একদম কন্যাস্নেহে আমার অনুরোধ মেনে নিয়েছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গ জয় করে ফেলেছি!
আমার জানা ছিল না যে, আমার অনুরোধ হলো বলেই যে আমি বলার সুযোগ পাব, তা নয়। লোকসভায় প্রশ্নপত্র থেকে শুরু করে সবকিছু ব্যালটে হয়। লটারির মতো অনেকগুলো নাম জমা পড়ে, তার মধ্যে থেকে যার নাম—১ নং-এ উঠবে তিনি আলোচনা শুরু করবেন। ভগবানকে ডাকছি, আর মনে মনে বলছি, যদিও বা দিলে একটা সুযোগ, এখন আর মুখ ফিরিয়ে নিও না! জানি না, অদৃষ্টের লিখনে আমার ভাষা বোঝার ক্ষমতা সেদিন হয়তো ব্যালটেরও হয়েছিল। লটারিতে প্রথম নাম উঠেছিল আমারই। পরবর্তী ইতিহাস তো—বাংলার মানুষের জানা। অনেক তথ্য, তত্ত্ব, চেষ্টা, যুক্তি, তর্ক-বিতর্ক। শেষ পর্যন্ত জয়—মানুষের দাবিরই। তবে সবার ওপরে প্রয়াত নেতা রাজীবজির অকৃপণ সহযোগিতা— যা না থাকলে উদ্বাস্তু মানুষরা কখনওই নিঃশর্তে জমির দলিল পেতেন না।

অনেকে ভাবেন, আমি বুঝি ওপার বাংলার লোক, তাই ওপার বাংলা থেকে আসা উদ্বাস্তু মা-ভাই-বোনদের জন্য আমার দরদ। যদিও ‘এপার-ওপার’ অথবা ‘ঘটি-বাঙাল’ ভেদাভেদ নিয়ে আমি বা আমার পরিবার কখনওই মাথায় ঘামাইনি। দুই বাংলার মানুষই আমাদের কাছে পরম প্রিয়, সমান প্রিয়, আমাদের আত্মার আত্মীয়। আমার জন্ম, কর্ম সবই এপারে, ওপার বাংলায় যাওয়ার সুযোগ এখনও হয়ে ওঠেনি। কিন্তু বিশ্বকবির লেখা জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন অধিনায়ক’ যেমন আমাদের অন্তরের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা, ঠিক তেমনই কবিগুরুর লেখা ওপার বাংলার জাতীয় সংগীত, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটা শুনলেই ভেসে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আর শেখ মুজিবর রহমানের মুখ। তিনি যেন আজও বেঁচে আছেন—বিশ্বের যে কোনও প্রান্তেরই মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামে। তাই ভৌগোলিক গণ্ডির সংকীর্ণ ভেদাভেদ ভুলে—আমাদের একটাই পরিচয় হোক—মানুষ হিসেবে।
হয়তো বড্ড বেশি নিজের ভাবনার কথা বলে ফেলছি। আসলে মনের ভিতর জমে থাকা কথার পাহাড় যেন কলমের ছোঁয়ায় নিজেকে সম্পূর্ণ ছড়িয়ে দিতে চাইছে। এটাকে অস্বীকার করব কী করে?
ফিরে যাই ‘জনতার দরবারে’। জনগণের টাকায় চলে এই দরবার। একেবারে সাজানো গোছানো, পরিপাটি। সংযতভাবে, আইনকানুন মেনে সবাইকে এখানে চলতে হয়। বছরে কমপক্ষে ৪-৫ মাস এই দরবার চলে। তা ছাড়া আছে বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি। এদের সভা। কোনও কোনও কমিটি আবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও সভা করে। সেখানে কমিটির সদস্যদের থাকার এলাহি ব্যবস্থা। পাঁচতারা হোটেল, আনুষঙ্গিক খাওয়া-দাওয়া, ভ্রমণ, সব মিলিয়ে জনতার প্রতিনিধিদের সন্তুষ্ট রাখার ব্যবস্থা।

আমি নিশ্চয়ই একথা বলব না যে, ‘সংসদে’ ক্ষমতার অপব্যবহার হয় সর্বাংশেই। কিছু সাংসদ আছেন, যাঁদের চেহারায় হয়তো জৌলুস নেই, পশ্চিমী কায়দায় তাঁরা ইংরেজি বলেন না। কিন্তু তাঁদের প্রাণ আছে, মানুষের জন্য কথা বলার একটা সৎ চেষ্টা আছে। কিন্তু তাঁরা সুযোগ পান খুব কমই।
বারবারই কেন যেন মনে হয়, সাংসদদের মধ্যে দুটো শ্রেণিবিভাগ আছে। বিশেষ শ্রেণির একদল সাংসদ আছেন, যাঁরা যখন কোনও বিষয়ে বলতে ওঠেন, তাঁদের চোখ স্পিকারের দিকে থাকলেও মূল লক্ষ্য থাকে লোকসভার প্রেস গ্যালারি—যেখানে থাকেন সাংবাদিকরা। যেন ‘পাবলিসিটি’র জন্যই বলা। আর সাধারণ শ্রেণির সাংসদদের ‘গ্ল্যামার’ কম, তাই তাঁদের গুরুত্বও কম, তাঁরা যেন শুধু সই করার জন্য। এঁদের দেখলে খুব খারাপ লাগে। মনে হয় সেই প্রথম শ্রেণি আর দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকদের কথা।
এই সাধারণ শ্রেণির সাংসদরা সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যথেষ্ট গুরুত্ব পান না, ফলে তাঁদের নির্বাচনি এলাকার মানুষ, তাঁদের Ineffective ভাবেন। এবং শুধুমাত্র এই কারণেই ‘জিরো-আওয়ার’ এবং ‘প্রশ্ন-উত্তর পর্ব’ ছাড়া বেশিরভাগ সাংসদই সংসদে থাকেন না। যদিও লোকসভা প্রকৃত অর্থেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু রাজ্যসভায় সাংসদদের সংখ্যা কম থাকায় সেখানে আলোচনার সুযোগ বেশি। লোকসভায়, অনেক সময়, কোনও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাইলেও সময়ের অভাবে তা হয়ে ওঠে না। জানি না, সাধারণ মানুষ এটা বিশ্বাস করবেন কি না।

দু-ধরনের প্রশ্ন সাংসদরা সংসদে অর্থাৎ ভারতবর্ষে গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ ‘জনতার দরবারে’ করতে পারেন। মৌখিক আর লিখিত। মৌখিক প্রশ্নে, মন্ত্রীকে প্রত্যক্ষভাবে জিজ্ঞেস করার সুযোগ থাকে। লিখিত প্রশ্নের উত্তর আসে শুধুমাত্র জবাব আকারে। দু-ধরনের প্রশ্নই লোকসভায় জমা দেওয়ার পর, কোনও কোনও প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হবে তা ঠিক করার জন্য সংসদে একটা বিভাগ আছে; এই বিভাগই ঠিক করে কোনটা মৌখিক বা Starred Question হবে। অনেক সময় দেখা যায় জনস্বার্থে বা সমষ্টিগত কোনও সমস্যার ব্যাপারে প্রশ্ন জমা দিলেও তা Starred Question বা মৌখিক প্রশ্ন হিসেবে আসে না। আবার বহুক্ষেত্রেই অনেক Individual ব্যাপারে বা জনগণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্কশূন্য কিছু প্রশ্ন সংসদে এসেই যায়। এই চিরাচরিত সিস্টেমের বিরুদ্ধে বললে, আমার বিরুদ্ধে ‘প্রিভিলেজ’ হয়ে যাবে। তবে হয় হোক এবং সেটা জনস্বার্থেই। জনতার দরবারও সবকিছুর ঊর্ধ্বে নয় যে ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করলে ‘মহাভারত অশুদ্ধ’ হয়ে যাবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি যে, ‘জনতার দরবার’ চলে জনগণের স্বার্থে এবং জনগণের অর্থে, তাই এর ভুলত্রুটিগুলোও আলোচনা করার অধিকার সাধারণ মানুষের আছে। কথাগুলো স্পষ্ট বলার জন্য ‘জনতার দরবার’-এ আমাকে যদি কোনও কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হয়, জনস্বার্থে তা মেনে নিতে আমি রাজি কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে উদ্ভাসিত কিছু পিচ্ছিল, যা নিষ্ফল পাথরে মাথা ঠুকে কাঁদে, তাকে কখনই নীরবে মাথা পেতে নিতে পারব না। বরঞ্চ গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক যে আপামর জনগণ, যাঁদের কাছে জনতার দরবারের নৈতিক দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি, সেই জনগণের প্রাণের স্পন্দন যাতে তার সঠিক অবয়ব নিয়ে লোকসভায় প্রতিফলিত হতে পারে, সেজন্য সেই জনতার উদ্দেশে মাথা ঠুকে থাকবে বিশ্বকবির গান, আমার প্রাণের গান : ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার তলে, সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে।’ হৃদয়ের আবেগ এবং আন্তরিক সদিচ্ছাটুকু থাকলেই একমাত্র এর সার্থক পরিণতি সম্ভব।
কথায় আছে, ‘ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়।’ কথাটা যে সবসময় মেলে তা তো নয়। কিন্তু তবুও মানুষ আশা করেন কিছু একটা হবে বলে। স্বামী বিবেকানন্দও তাই বলেছেন মানসিক শক্তিকে দৃঢ় করার জন্য : ‘To succeed, you must have tremendous perseverance, tremendous will. “I will drink the ocean, says the persevering soul, ‘at my will, mountains will Crumble up.” Have that sort of energy, that sort of will, work hard and you will reach the goal.’

লোকসভায় নির্বাচিত হওয়ার জন্য, ‘জনতার দরবারে’ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য, যাঁরা নির্বাচনপ্রার্থী হন, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় কোনওরকম স্বার্থত্যাগ, তিতিক্ষা, সততা, আন্তরিকতা ছাড়া কেউ গ্ল্যামারের জোরে, কেউ অর্থের জোরে, কেউ পেশীবলে, আবার কেউ ‘সংগঠনের জোরে’ জনতার দরবারে নিজের নামটাকে সংযোজন করে ফেলেন। নির্বাচনে জেতার পর কিছু সাংসদের লক্ষ্য থাকে একটাই, জনস্বার্থ ভুলে গিয়ে ‘স্বার্থপর দৈত্যের’ মতো, তাঁদের নির্বাচনি তহবিলে অর্থদাতা প্রভুদের চরম বিশ্বস্ত হিসেবে কাজ করে যাওয়া।
আগে অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তি তাঁদের চিন্তা ও কাজের অভিনবত্বে, আন্তরিকতা, মূল্যবোধের অম্লান আলোকে এই জনতার দরবার উদ্ভাসিত করেছেন। এখনও যে নেই—তা নয়, তবে এঁদের সংখ্যা কমে আসছে। তবে মানুষের সচেতনতা বাড়ছে। রাজনৈতিক দলমত বিচার না করে মানুষ এখন বিচার করছেন প্রার্থীর ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতা।
‘জনতার ভোটে নির্বাচিত’ দাবি করে যাঁরা সংসদে আসেন, তাঁদের একাংশ গ্যাসের কুপন আর টেলিফোন কানেকশান, কোটা আর এজেন্সি, ঠান্ডাগাড়ি, ঠান্ডাঘর অথবা কারও এজেন্ট হিসেবে কাজ করে যান। নিশ্চয়ই আর বলার প্রয়োজন নেই যে ইঙ্গিতটা কোথায়। কম্পিউটার-এর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মতো ‘ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের’ জায়গায় এভাবেই চলছে ক্ষমতার একচেটিয়া কেন্দ্রীকরণ। সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ, ভন্ডামি আর নোংরামিতে মূল্যবোধ হচ্ছে শেষ!
(১৯৯৬ সালে ‘জনতার দরবার’ বইতে প্রকাশিত)