মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করোনা মোকাবিলায় এতদিন ধরে যে যে পদক্ষেপ করেছেন তা গোটা দেশে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এবার দৃষ্টান্তমূলক সর্বদল বৈঠক পরিচালনা করে তিনি একশোয় একশো পেলেন।
সোমবার ২৩ মার্চ বিকেল চারটেয় নবান্ন সভাঘরে তিনি সর্বদল বৈঠকে করোনা মোকাবিলায় রাজ্যের নেওয়া পদক্ষেপগুলির কথা জানান। এরপর একে একে সুজন চক্রবর্তী, আবদুল মান্নান, সূর্যকান্ত মিশ্র, প্রদীপ ভট্টাচার্য, জয়প্রকাশ মজুমদার, সায়ন্তন বসু-সহ বিরোধী দলের নেতারা তাঁদের পরামর্শের কথা জানান। প্রত্যেকেই এই সর্বদলীয় বৈঠক ডাকার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানান। সিপিআইএমের সুজনবাবু বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার জনধন অ্যাকাউন্টগুলিতে ৫ হাজার টাকা করে দিক। বিরোধী দলনেতা আবদুল মান্নান বলেন, এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের পাশে আছি। কেন্দ্রীয় সরকার কিট, মেশিন-সহ প্রয়োজনীয় জিনিস দিচ্ছে না বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বিজেপির জয়প্রকাশ মজুমদার করোনা মোকাবিলায় রাজ্য সরকারের কাজের প্রশংসা করলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারকে আপনারাও বলুন এগুলি দিতে। জয়প্রকাশবাবু সম্মত হলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারকে ঋণের টাকা শোধ করতে হয়। মোরাটোরিয়ামের জন্য বলুন। রাজনীতি পরে। বুলবুলের টাকাটা দিলেও অনেক কিছু করতে পারতাম। করোনা মোকাবিলায় কেন্দ্রের রাজ্যগুলিকে আর্থিক প্যাকেজ দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন বাম দলের নেতারা। সবার শেষে অল্প করে তৃণমূল কংগ্রেসকে বলতে বলেন মুখ্যমন্ত্রী। মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, সব কিছুর ব্যবস্থা করে সর্বদল বৈঠক ডাকার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। সকলে মিলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আর্থিক সাহায্য প্রার্থনার পক্ষেও সওয়াল করেন পার্থবাবু। বৈঠকে দেখা যায়, বিরোধীরা যে পরামর্শ দিচ্ছে তা ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা করেছে রাজ্য সরকার।
সিপিআইএমের নেতা ডা. সূর্যকান্ত মিশ্রর সাজেশনগুলিও গুরুত্ব সহকারে শোনেন মুখ্যমন্ত্রী। আবার এক নেতা কাঁশছেন দেখে তিনি বলেন, স্বপনবাবু আপনি চিকিৎসককে দেখিয়ে নিন, সূর্যবাবু এই লক্ষণ ভালো বুঝবেন। সাবধানে থাকুন। সূর্যবাবুর কথায় সায় দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, করোনা আক্রান্তকে দেখে যেন অন্য রোগী না দেখেন কোনও চিকিৎসক। অসংগঠিত শ্রমিকদের চাকরি ও বেতন নিশ্চিত করা, বাজারে কালোবাজারি রোধের মতো বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হয়।
ব্যাঙ্কে ৩১ মার্চ চলতি অর্থবর্ষের শেষ, এই বিষয়টিও ওঠে এদিনের বৈঠকে। এখন কাজ হচ্ছে না অনেক সংস্থায়। তাই এই বিষয়টি যাতে কারও বোঝা হয়ে না দাঁড়ায় সে ব্যাপারে মঙ্গলবার একটি চিঠি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে দেবেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যগুলির আর্থিক প্যাকেজের কথাও বলা হবে।
তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই বাইরে থেকে যাঁরা আসছেন তাঁদের ফ্লাড সেন্টারে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। স্কুল, কলেজগুলি ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। তবে সব বিয়েবাড়ি, কমিউনিটি হল, নতুন কিছু বাড়ি, নেতাজি ইনডোর-বাদে ইনডোর স্টেডিয়াম, পলিটেকনিক, আইটিআই, কর্মতীর্থ যেগুলি খালি আছে তা সরকার নিয়ে রাখবে। পরে স্যানিটাইজ করে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কমিউনিটি স্প্রেড হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সকলে নিয়ম মেনে চলুন।
প্রত্যেকে নিজের আশেপাশে বাইরে থেকে আসা এমন কাউকে দেখলে তাঁকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে বলুন। না শুনলে পুলিশকে জানান। দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো ঘুরবে তা চলবে না। রোগ লুকানোর দরকার নেই। লজ্জা পাবেন না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা মানে এই রোগের আক্রান্ত কেউ অস্পৃশ্য নন।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোয়ারেন্টিনে থাকা মানে তো জেল নয়। সেফ হাউস। আমরা বেড়াতে গিয়েও তো হোম ট্যুরিজমে থাকি। সবার সঙ্গে দেখা হয় বলে আমিও বাড়িতে এখন একা থাকি। মা মারা যাওয়ার পর ভাইয়ের বউরা খাবার দিতে আসতেন, তাঁদের মানা করে দিয়েছে। সংক্রমণ ছড়ানোর সতর্কতা থেকেই এটা করেছি। মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বিশেষজ্ঞরা বলছেন কাগজ আর প্লাস্টিক থেকে করোনা সংক্রামিত হচ্ছে। তাই কিছু জানাতে মেল বা ফোন করে জানান।
ইতিমধ্যেই গণপরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালের কাছে থাকার ব্যবস্থা করতে বলেছেন। জানা গিয়েছে, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজকে ধাপে ধাপে করোনা চিকিৎসার হাসপাতালে পরিণত করা হবে। রোগীদের ধাপে ধাপে অন্যত্র সরিয়ে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চিকিৎসকরা মনে করছেন এতে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা কমবে।