সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতিতে এই দৃশ্য বিরল বললেও কম বলা হয়। সরকারের প্রকল্পের সুযোগ যাতে সব মানুষ উপভোগ করতে পারে তার জন্য বিরোধী দলের লোকজন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে- এমনটা কল্পনা করাই যেখানে অসম্ভব সেটা বাস্তবায়িত হল এই বাংলার মাটিতে। গত শুক্রবারই সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে একযোগে ভার্চুয়াল মিটিংয়ে যোগ দিয়েছিল তৃণমূল, সিপিএম সহ ১৯টি বিরোধী দল। সেই মিটিঙের পর ২৪ ঘন্টা অতিক্রম হতে না হতেই রাজনৈতিক স্বার্থ ভুলে সর্বার্থেই একতার ছবি ফুটে উঠল বাংলার রাজনীতিতে।
গত শুক্রবার সোনিয়া গান্ধীর ডাকে মিলিত হয়েছিল ১৯টি বিজেপি বিরোধী দল। শনিবারই মেদিনীপুর শহরের কর্ণেলগোলা এলাকায় সিপিএম নেতাদের কাজ কারবার দেখে তাজ্জব বনে গেলেন স্থানীয়দের অনেকেই। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণা অনুযায়ী ১৬ অগাস্ট থেকে শুরু হয়েছে দুয়ারে সরকার ক্যাম্প। প্রসঙ্গত গত বৃহস্পতিবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী এমনটাই জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ১৬ অগাস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুয়ারে সরকার ক্যাম্প হবে। ১৮টি প্রকল্পের সুবিধা পেতে ক্যাম্পে আবেদন করা যাবে। গোটা রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিম মেদিনীপুরেও শুরু হয়েছে দুয়ারে সরকার কর্মসূচি। সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসছেন, ফর্ম তুলছেন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিতে। সেখানে মানুষের সহায়তায় এগিয়ে এসে হেল্প ডেস্ক খুললো স্থানীয় সিপিএম।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী মেদিনীপুর শহরের কর্নেলগোলায় নারায়ণ বিদ্যাভবন বালিকা বিভাগে দুয়ারে সরকারের শিবির খোলা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে ফর্ম পূরণ করতে হবে, ফর্মে কোনও ভুল ভ্রান্তি থাকছে কি না এনিয়ে অনেকেই বেশ আতান্তরে পড়ে যান। সেই উপভোক্তাদের সহায়তায় এগিয়ে এলেন সিপিএম নেতৃত্ব। মানুষের যাতে কোনও রকম অসুবিধা না হয়, সে কারণে সিপিএমের শাখা অফিসের বাইরে ক্যাম্প করেছে। আর তাতে সাধারণ মানুষ এসে সুযোগও নিচ্ছেন। কোনও টাকা পয়সা নেওয়ার ব্যাপার নেই। সাধারণ মানুষের স্বার্থে ফর্ম পূরণ-সহ বিভিন্ন কাজ করে দিচ্ছেন সিপিএম কর্মী, সমর্থকরা।
দুয়ারে সরকার হেল্প ডেস্ক সম্পর্কে সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য সুকুমার আচার্যের বক্তব্য, ‘সরকারে যেই থাকুক না কেন সে যদি জনগণের জন্য কিছু করতে চায়, তা হলে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তাঁর আরও বক্তব্য, ‘সরকারের পাশে দাঁড়ানোটা বড় কথা নয়। আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি।‘ সিপিএমের এই উদ্যোগে এলাকার সাধারণ মানুষ যেমন উপকৃত হয়েছেন তেমনি অবাকও হয়েছেন। তাঁরা বলছেন, ‘সিপিএমের তরফে এটা খুবই ভাল উদ্যোগ। ওনারা সাহায্য করছেন বলে আমাদের ফর্মটা ভর্তি করতেও সুবিধা হচ্ছে। এ ধরনের কাজ হলে তো ভালই হয়। আমরাও চাই এলাকায় সকলের সঙ্গে সকলের এই সুসম্পর্কটা থাকুক’।
একই দৃশ্য দেখা গিয়েছে কাঁকসা পানাগড় বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে। সাধারণত আমরা দেখতে অভ্যস্ত- রাজ্য সরকার যে সব উন্নয়ন মূলক কাজের সিদ্ধান্ত নেয় বিরোধী দল তার ত্রুটি-বিচ্যূতি নিয়ে সরব হয়। কিন্তু পশ্চিম বর্ধমান জেলার কাঁকসা ব্লকে শনিবার দুয়ারে সরকার শিবিরের যে ছবি দেখা গেল তা কেবলমাত্র অন্য রকমই নয় খুবই দুর্লভ। প্রকল্পের সুবিধা নিতে আসা লোকজনদের যাতে কোনও অসুবিধা না হয় সেজন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন বিরোধী দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। লোকজনকে ফর্ম পূরণে সাহায্য করছেন বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা এমন ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না।
কাঁকসা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান তথা সিপিআইএম নেতা শেখ শামসুজ্জোহা বলেন, ‘এখানে প্রচুর মানুষ ফর্ম পূরণ করার জন্য হন্তদন্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ তাই তাঁদের সাহায্য করতেই আমরা এগিয়ে এসেছি৷ আমরা বিরোধী পক্ষের হলেও রাজ্য সরকার কিছু কাজ তো ভাল করে৷ সেই কারণেই সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত৷’ অন্যদিকে সিপিএম নেতাদের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব বলছেন, ‘এখানেই দুয়ারে সরকার সহ লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের স্বার্থকতা৷ সাধারণ মানুষের উৎসাহ দেখে বিরোধী দলের নেতারা বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন’৷
প্রসঙ্গত, শুক্রবার দিনই বীরভূম জেলার দুয়ারে সরকার একটি ক্যাম্পের বাইরে বিজেপি নেতা, কর্মীদেরও লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের ফর্ম পূরণে আবেদনকারীদের সাহায্য করতে দেখা গিয়েছিল৷ পরের দিন দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কুলতলিতেও একই ছবি দেখা যায়৷ কুলতলির জামতলায় দুয়ারে সরকার শিবিরের বাইরে স্থানীয় বিজেপি নেতা উত্তম হালদার ফর্ম ভর্তি করতে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করেছেন বলে জানা গিয়েছে৷ স্থানীয় বিজেপি নেতা উত্তম হালদার বলেন, ‘ফর্ম ভর্তি করতে গিয়ে বেশ কিছু মহিলা বিভ্রান্ত হচ্ছিলেন৷ জনগণকে পরিষেবা দিতেই তো রাজনীতি করি৷ সেই কারণেই ওঁদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসি৷’
প্রসঙ্গত বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন এই প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেন তখন বিজেপির তরফে মমতার এই প্রকল্পকে বলা হয়েছিল ভাঁওতা। কিন্তু প্রকল্প রূপায়ণের ঘোষণার পর দেখা গেল সেই বিজেপিই প্রকল্পের সুবিধা যাতে সাধারণ মানুষ পায় তার সহায়তায় তাঁরাও হাত বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে মমতা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প রূপায়ণ করে মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন। বাংলার শাসন ক্ষমতায় তৃতীয়বার ফিরে এসে তৃণমূল সরকার গঠনের পর সাধারণ মানুষের জন্য প্রকল্প রূপায়ণে উদ্যোগী হয়েছে, তাতে বিরোধীদের সব সমালোচনাই ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। এখন তাঁরা সহযোগিতার হাত না বাড়ালে সাধারণ মানুষই তাদের রাজ্যছাড়া করবেন। ফলে মমতা দুয়ারে সরকার প্রকল্প রূপায়ণে যে মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন, তাতে এগিয়ে আসা ছাড়া বিরোধীদের কোনও বিকল্প পথ নেই।