দু-দশক আগে এই বাংলায় যখন প্রবল বন্যা হয়েছিল তখনই প্রথম ‘ম্যান মেড বন্যা’র অভিযোগ করেছিলেন মমতা। তৎকালীন বাম সরকারকে দায়ী করে বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন ‘ম্যান মেড’ বন্যা। আসলে মমতা বলতে চেয়েছিলেন সরকার কাজ না করার জন্যই বন্যা।
তারপর একাধিকবার বিরোধী নেত্রী মমতা ‘ম্যান মেড বন্যা’ কথাটি বলেছেন। কখনও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, কখনও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারকে কটাক্ষ করে। তত্ত্ব সেই সরকারের গাফিলতির কারণে বন্যা। কেবলমাত্র বিরোধী নেত্রী হিসাবেই নয়, মুখ্যমন্ত্রী হয়েও মমতা রাজ্যে দু-বার বন্যার কারণকে ‘ম্যান মেড’ বলে অভিযোগ করেছেন। তবে তাঁর আগের নিশানা বদল হয়েছে। ২০১৭ সালের জুলাইতে জলে ভেসেছিল হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর। তখন ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে বন্যা পরিস্থিতিকে ‘ম্যান মেড’ বলেছিলেন মমতা।
সেদিনও মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘বৃষ্টি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু, প্রকৃতির রোষে বন্যা হয়নি। আচমকা ডিভিসি জল ছেড়েছে, তাই বন্যা হয়েছে। প্রায় বছর চারেক পর, এদিনও রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতির জন্য মমতার কাঠগড়ায় সেই ডিভিসি। বুধবার সড়ক পথে রাজ্যের বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার পথেই মুখ্যমন্ত্রীকে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তিনি জানতে চান রাজ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে কিনা। মমতা জবাবে অতিরিক্ত বৃষ্টি হচ্ছে না বলেই জানিয়ে প্লাবন পরিস্থির জন্য কেন্দ্রকে যেমন দায়ী করেন তিনি তেমনি বাংলার এই পরিণতি ‘ম্যান মেড’ বলেন।
অভিযোগের কারণ হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাখ্যা, ‘জলাধারের পলি তোলার কাজ যথেষ্ট হয় না। ফলে মাইথন, পাঞ্চেত-সহ ডিভিসির তিনটি জলাধারের নাব্যতা কমেছে। জলধারণ ক্ষমতাও কমে গিয়েছে। এটা না হলে ২ লক্ষ কিউসেক জল ধরতো সেগুলোতে। কিন্তু এসব না হওয়ায় রাজ্যের সঙ্গে কোনওরকম আলোচনা না করেই ডিভিসি নিজেদের ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত জল ছাড়ছে। প্রতিবার সুরাহার জন্য কেন্দ্রকে চিঠি দিলেও কাজ হয় না। ফলে বর্ষাকালে প্রতি বছর হাজারে হাজারে মানুষ অসুবিধার মধ্যে পড়ছেন।’
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কথপোকথনের প্রেক্ষিতে টুইটারে পিএমও-র তরফে জানানো হয়েছে, “বাঁধ থেকে ছাড়া জলে বাংলায় বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। যা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বন্যা কবলিত এলাকায় সকলে যাতে নিরাপদে থাকেন, তার জন্য প্রার্থনা করছেন প্রধানমন্ত্রী।”

প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহ থেকে রাজ্যজুড়ে মাঝেমধ্যেই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। হাওড়া, হুগলি, পশ্চিম মেদিনীপুর-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী রিপোর্টে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন— হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর, পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল ও হুগলির খানাকুল ইতিমধ্যে জলমগ্ন। এইসব এলাকার কয়েক হাজারে মানুষ স্কুলবাড়ি, ত্রাণ শিবিরে ঠাঁই নিয়েছেন। কোটি কোটি টাকার ফসল ও শস্যহানি হয়েছে। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ পরিষেবা বেহাল। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, এই প্রশ্নের উত্তরে আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, আগামী ২৪ ঘন্টায় কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলোতে বৃষ্টি চলবে। ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। বৃষ্টি হবে উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলাতেও। বৃষ্টির সম্ভবনা রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়াতে। ইতিমধ্যে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণাবর্তের সঙ্গে সক্রিয় হয়েছে মৌসুমী অক্ষরেখা।
এদিকে মুখ্যমন্ত্রী যখন বলছেন, ডিভিসি সরকারকে না জানিয়েই জল ছাড়াতেই রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে৷ এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও তিনি একই অভিযোগ জানিয়েছেন, কিন্তু ডিভিসি মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের যুক্তি, ডিভিসি-র ছাড়া জলের জন্য নয়, একটানা বৃষ্টিপাতের কারণেই দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর আরও অভিযোগ, ডিভিসি-র জলাধারগুলিতে পলি জমে বাঁধের ধারণ ক্ষমতা কমে গিয়েছে৷ এই অভিযোগকে অবশ্য স্বীকার করে নিয়েছে ডিভিসি। কিন্তু তাদের বক্তব্য, তারা ড্রেজিংয়ের প্রস্তাব কেন্দ্রীয় জল কমিশনকে জানিয়েছিলেন, জলাধারের পলি পরিষ্কার করতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে বলে তা খারিজ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় জল কমিশন৷ অন্যদিকে নতুন বাঁধ তৈরি করতে খরচ দশ হাজার কোটি টাকা৷ তাছাড়া ড্রেজিং করে পলি রাখার জন্য চাই বিরাট জমি।
তাহলে এর সমাধান কিভাবে? ডিভিসি-র বক্তব্য অনুযায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি তাদের হাতে নেই, অন্যদিকে তারা মানছেন যে বাঁধগুলির জল যে পথে বেরোয়, ডিভিসি-র সেই সেচ খাল এবং জলাধারের সঙ্গে যুক্ত নদীগুলিতেও পলি জমে জল ধারণ ক্ষমতা কমছে। তারা এই অবস্থায় যতটা সম্ভব জল ধরে রেখেছে কিন্তু গত কয়েকদিনে বৃষ্টি ছাড়াও সর্বাধিক একদিনে ১ লক্ষ ১৪ হাজার কিউসেক জল ছেড়েছে৷ কিন্তু বাঁধ থেকে ছাড়া জলের সঙ্গে বৃষ্টির অতিরিক্ত জল যুক্ত হয়েই বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে৷
ডিভিসির আরও বক্তব্য, ২০৬৪ সাল পর্যন্ত এই জলাধারগুলির কোনও সমস্যা হবে না। ডিভিসির এই দাবিও মানতে নারাজ রাজ্যের সেচ মন্ত্রী সৌমেন মহাপাত্র৷ তাঁর পাল্টা চ্যালেঞ্জ, জল ছাড়ার সময় রাজ্যের দুই আধিকারিককে উপস্থিত থাকার অনুমতি দিক ডিভিসি৷ সৌমেনবাবু এও বলেন, ডিভিসি দিনে ৫০ হাজার কিউসেক করে জল ছাড়ুন৷ কিন্তু সেখানে তারা একদিনে ১ লক্ষ ৫২ হাজার কিউসেক জল ছেড়েছে৷ আসল প্রশ্ন, কেন্দ্র কেন বিপুল খরচের যুক্তি দিয়ে ডিভিসি-র জলাধারগুলির পলি পরিষ্কার করছে না, পলি পরিষ্কারের জন্য খরচ লাভজনক হবে না বলে বছরের পর বছর বাংলার মানুষ বন্যায় ভাসবে?