‘ব্যাটারে হুই হাড়টা পিলচু বুড়ার, খালি যতন করে রাখিস। হারাতা গুহা থিকে, চাই চম্পা থিকে, শির দেশ — শিখর দেশ থিকে, দামিনিকো থিকে হাজার উৎখাতের চিহ্ন বটেক’ — আবহমান কালের এই উৎখাতের চিহ্ন নিয়ে নির্মিত গল্প মানব চক্রবর্তীর উৎখাতের আবহমানতায় ‘পিলচু বুড়োর হাড়’। এ এক রক্তমাখা গল্পগাথা। অনুভবঋদ্ধ গল্প লেখেন মানব চক্রবর্তী, তার সাথে যুক্ত হয় তাঁর অভিজ্ঞ মনন এবং বলিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ। তাঁর গল্প এককথা বলতে গিয়ে অনেক কথাই বলে। শিল্পসৌকর্যে মন্ডিত গল্পভাষার এইটি এক অনিবার্য কারুকাজ।
‘উচ্ছেদ’ বা ‘উৎখাত’ শব্দটি ‘না পাওয়া’ মানুষের জীবনসম্পৃক্ত। মাথার ওপর থেকে বারবার ছাদ কেড়ে নেওয়ার ঘটনাটি তাদের জীবন অভিজ্ঞতা। এই আছে এই নেই এর দোলাচলতার মধ্যেই তাদের জন্ম, মৃত্যু, বেঁচে থাকা। এমনি ভিটে খোয়ানো মানুষদের নিয়ে গল্পটির সূচনা এইভাবে — ‘অনেকগুলি গরুর গাড়ি। কোনটার ছই আছে, কোনটার নেই, এমন যে পরপর পিছু পিছু লম্বাটে সরলরেখা সদৃশ চলন, সেও একপ্রকারের জীবনই বলা যায়।’
মাথার ওপর থেকে ফের চলে গেছে ছাদ, মহিলা শিশু বৃদ্ধ যুবকদের নিয়ে মানুষের এই বহতা মিছিলের মুখখানি ‘শববাহকদের মৌনস্তব্ধ মুখের সঙ্গে মানানসই।”
শুষ্ক ঠোঁট, জ্যোতিহীন চোখ, দৃষ্টিতে অতলান্ত শূন্যতা নিয়ে চলেছে যেসব মানুষেরা তাদের পথের শেষ কোথায় তারা কি জানে? দিনের শেষে যদি খোলা জগৎ তাদের সামনে মেলে ধরে কোন উষর প্রান্তর অথবা ঝোপজঙ্গল তাহলে সেখানেই হবে তাদের রাত্রিবাস।
নামকেশিয়াতে কারখানা হবে, সোনালি ধানের ক্ষেতে চিমনি ওগলাবে ধোঁয়া। হিজল, মতাকুড়ি, ফটকাই ঝোপের ছায়াশীতল গভীরতা ভেদ করে উঠবে ছ’তলা ন’ তলা অফিস। নামকেশিয়ায় বসবাসকারী সাঁওতালেরা সরকারি নোটিশ পেয়েছিল আগেই। এরপর শুধু ভয় ত্রাস। সেই ভয়তরাসে মরল গাঁওবুড়ো, বয়স পেরোনো গল্পকথার বুড়ি গরম বুড়ি। নতুন গাঁওবুড়ো হল রাবণ হেমব্রম। ক্রোধে দুঃখে হতাশায় রুখে উঠেছিল রাবণ হেমব্রম। ভেতরটা যতই রুখে উঠুক, বাইরে থেকে জোর না পাওয়ায় কিছুই করা হল না শেষ অবধি। দেখা গেল টাঙ্গিতে নেই জোর, ধনুকের জ্যা-তে নেই টান। বঞ্চনার ইতিহাস যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে অনেক অনুভূতিই মরে যায় তো! তখন শুধু বাঁচতে হবে বলে বেঁচে থাকা।
দিনের শেষে, ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে দলপতি রাবণ হাঁক দেয়, ‘হেই হো মর্দোয়া ই ঠেনেই রোখ লাগাও হে আর এগুনো নাই আজ, ই ঠেনেই রাত্রিবাস’।
সত্যিই সামনে ‘টিলাটিব্বার মাঠ’। অন্তত একটি রাতের জন্যে এ মাঠটিকে গ্রাম বানিয়ে তোলা যায়। একটি রাতের জন্য উৎখাত হওয়া মানুষগুলোর চলা থামে, পোকামাকড়, হাওয়া বাতাসের নানা প্রাকৃতিক আওয়াজের মাঝে উঁচু নীচু প্রান্তরের এককোণে চলে রাতের আহারের প্রস্তুতি। বাচ্চাকাচ্চাগুলো পিপাসায় কাতর হয়ে জুড়ে দেয় কান্না — ‘জল চাই জলবিনে কি চলে?’ এই মাঠে জল নেই। কান্না থামে না। একটি শিশুর কান্না থেকে অপর শিশুর কান্না জুড়ে দিয়ে এক ‘অখন্ড কান্না’ যেন আবহমান কালের পিপাসার্ত শিশুদের কান্নার ইতিহাসেরই দ্যোতনা নিয়ে আসে। বাপের ‘নুনানুনি’ জলের জন্যে কাঁদে, বাপের কাছে এমন অসহায়ত্ব আর কি হতে পারে! তাছাড়া দলপতি হয়েও তো রাবণ রক্ষাকর্তা হিসেবে পুরোপুরি ব্যর্থই রয়ে যায়। শিশুদের মুখে একফোঁটা জল দিতে না পারার ব্যর্থতায় ক্ষেপে ওঠে রাবণ — ‘একরাত জল বিনা কি মানুষ মরে যায় হে, থুক অমন জনমে, হেঁ … ‘
ক্ষেপে গিয়ে এমন কথা বললেও সে তো জানে একরাত কেন, সময়বিশেষে এক দন্ডও জলবিনে কাটানো কতখানি দুঃসহ হতে পারে। তবু মানুষ লাচার হলে যা যা বাস্তবে ঘটতে পারে তাই ঘোষণা করে সে —’হুঁ অত যদি পিয়াস লাগে তো হিসুই বা মাটিতে ফেলস কেন, সরাতে জমা কর, টুকদু থিতু হলে তবে খা গা.. হারামি…’
প্রয়োজনে বর্জ্যও গ্রহণযোগ্য এ অতি রূঢ় সত্যি হলেও যদি সত্যিই এই রূঢ় সত্যই আঁধার রাতের সত্যি হয়ে দাঁড়ায় সেই ভয়েই হয়ত হঠাৎ করেই চুপ হয়ে যায় কান্না। টিলাটিব্বার মাঠ জুড়ে এখন বিরাজ করে এক অখন্ড নৈঃশব্দ। এই নৈঃশব্দও যেন শ্মশানযাত্রীর নীরবতা… অখন্ড… মহাশূন্যে মিশে যাওয়া। কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালে তারা। আগুন ও নিকষ আঁধারের মাঝে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে বীরত্বময় অতীত… তাঁদের সুকঠিন সংগ্রামের কাহিনি — ‘শাঁই শাঁই তির ছুটলেক, টাঙ্গির কোপে ফৌজিদের মুন্ডু গুলান ভুঁয়ে লুটলেক — সিদো কানহ নামি আলেন আকাশ থিকে…’ আগুন জ্বলে ওঠা কি ছিল স্বপ্ন? আর এই নিকষ আঁধারই বাস্তব? নির্দয় বাস্তবের মার এমনি পরাক্রমী?
ভোরের আলোয় উচ্ছেদ হওয়া মানুষের দল গো — যান, হাড়িকলসি, বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে যখন ফের অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে তখন প্রায়শই দেখতে পাওয়া ছবিটি পথচারীদের কাছে কোন প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিতে পারে না, সেজন্য রাস্তায় দিখু ছোঁড়া ছই থেকে মুখ বাড়ানো যুবতীর মুখ দেখে কদর্য ইশারা করে। সাঁঝ হয়ে যাবার মুখে তারা কাছিমের খোলের মত উঁচু এক মাঠে পৌঁছয়। জোরালো স্বরে রাবণ বলে — ‘দেখ হে, ইহো কত উচা জাঙাল… মন লিছে ই ঠিনেই ডেরা বান্ধি…’
মিছিলটির চোখে স্বপ্নিল মায়া জড়ানো ছবি — ‘ডেরা’ ‘আশ্রয়’ আহা! মাথার ওপর ছাদ, আহারে ছাদের নিচে বেঁচে থাকা। এই খোলা আকাশের নিচে মাঠ… এই উদোম মাঠ কারও বাপের নয়ত, ডেরা বান্ধা চলে বটে। এই কথাটিই চেঁচিয়ে বলে মোড়ল রাবণ — ‘এই উদোম মাঠ, কারও বাপের লিখা হয় না — খাম্বা গাড়লেই আর মানুষ রইলেই তা মানুষের… ‘
হয়ত বারবারই বসতি গড়তে গিয়ে এমনি সহজ প্রতীতি ব্যক্ত করেছে রাবণেরা, তবু বারবার লোপাট হয়ে যায় বসতি। ডেরা বাঁধার কথা তো ঘোষণা করল দলপতি, কিন্তু জল কোথায়? জল বিনে কি বাঁচা যায়? এই সার সত্যটি জানলেও রাবণ বিজ্ঞজনের ঢঙে ঘোষণা করে — জল কুথায় নাই হে? সব ঠেনেই আছে। কুথাও গভীর নামুতে একটা কুয়া খুদতে ক’দিন লাগে হে… যদি হাতে হাতে কোদালি গাঁইতি চলে!’ বয়স হয়েছে রাবণের তবু এখন অদ্ভুত জেদ বাসা বেঁধেছে বুড়ো শরীরে, সর্দার বলে কথা।
শাবল গাঁইতি চলে, একহাতের সাথে দশহাত। চেতান মুর্মু, জগত মারান্ডি, ঘুতন টুডু সবার চোখেই ‘ডেরা বান্ধা’র স্বপ্ন। মেয়েরা এগিয়ে আসে মাটি সরাতে। অন্ধ সংস্কারের নিগড়ে বাঁধা মাটির গন্ধমাখা মানুষ টলটলে সুশীতল জলের স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎ থেমে যায়। প্রায় একসাথেই স্থবির হয়ে যায় এতগুলি পরিশ্রমী হাত। মাটির নীচে কঙ্কাল যে! নরকঙ্কাল। ‘বাপরি, আর লয়, ইঠিনে জল নাই, হুই কঙ্কালের ভূতে রক্ত চুষি খাবে গো…’
জগত তেড়ে গেল রাবণের দিকে, ‘তুমার লেগ্যে, তুমার লেগ্যে যত ভেরান্তি’
সবগুলি মুখের ক্ষণিকের জন্য জ্বলে ওঠা উদ্ভাস নিভে ছাই। মানুষগুলোর দাঁড়িয়ে থাকার ঢঙে পরাজয়ের ছবি। হায় রে, গেল সব, ঘর গেল, ভিটে গেল, খোলা আকাশের নীচে অশুভ ছায়ার আক্রমণে তারা কি আর বাঁচে! গভীর চিন্তাক্লিষ্ট রাবণ মানুষগুলোকে দেখে। দেখতে দেখতে ক্রোধ চাপে দেহে। আসে জেদ, দৃঢ় প্রত্যয় এসে বাসা বাঁধে দেহে। পরাজয়ের ন্যুব্জ চেহারাকে ভাঙচুর করে দিয়ে নেমে পড়ে আধখোঁড়া কুয়োয়। ভয়ে আঁতকে ওঠে চেতান, জগতেরা। ‘মোড়ল মরবে ইবার লিয্যাস। হাত পা না জানি লুলা হইয়ে যায় রে… ই তল্লাট ছাড়ি গেলেই তো হয়। অত কেনে জিদাজিদি’…
শুধু অচঞ্চল রাবণ।
‘কঙ্কাল… কঙ্কাল ছুঁয়ো না… হাতে কুঠো হবেক… দম ঘুইট্যে যাবেক…’
এমনি সাবধানবাণীর মাঝেও রাবণের কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। সিঁটিয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে থেকে উঁকি মারে রাবণের ছোট ছেলে মারসাল, ‘কীসের কঙ্কাল বাপ?’
রাবণের দৃঢ় প্রত্যয়ী জবাব, ‘মানুষের’।
সরবে ঘোষণা করে,’ ইঠিনে মানুষ ছিল, মানুষ। তবে ইঠিনে জলও আছে লিয্যাস।’
সবাই চুপ। রাবণ ফের ঘোষণা করে, ‘ভয় কীসের? ভিটা গেল, ঘর গেল, আর কি যাবেক রে? ইবারে ফিরত নিবার পালা হে’
কথাগুলো মানুষগুলোকে ক্ষণকালের জন্য চুপ করিয়ে দিলেও কিন্তু ভয়ভীতিকে ঝট করে হটিয়ে দিতে পারে না। অশুভ ছায়ার প্রতীক সেই ‘বোঙ্গাকোরা’, তারই প্রভাব এখানে, সুতরাং ফের পথ চলাটাই শ্রেয়। এমনি খুচরো কথা চালাচালির মাঝে কিন্তু রাবণ পুনরায় তার অটল সংকল্পই ঘোষণা করে, ‘না, ইঠিনেই রইব, ইঠিনে বসতি ছিল কোনদিন’।
সযত্নে সে কঙ্কাল তুলে মাটিতে শুইয়ে দেয়। ক্ষ্যাপার মত মারতে থাকে কোদাল গাঁইতির কোপ, মনে হয় একাই যেন স্বচ্ছ জলের ধারা তুলে আনবে ধরিত্রীর অন্তঃস্থল থেকে। হাতের পেশিগুলো উঠছে ফুলে, চোখদুটো গনগনে, মনে হয় হাতের এক একটা কোপ পড়ছে আদিম জনগোষ্ঠীর অন্ধ সংস্কারের ওপর, এক একটা কোপ পড়ছে দুনিয়ার তাবৎ অবিচারের ওপর। রাবণের স্ত্রী বুধনি বুড়ো রাবণের অদম্য মনোবল দেখে মাটি তুলে ফেলতে শুরু করে। হয়ত উভয়ের যৌথ সংকল্প ও আপ্রাণ প্রয়াস ধীরে ধীরে ‘বোঙ্গাকোরা’র ভয়ের আধিপত্যে ফাটল ধরাতে শুরু করে। ছোট ছেলে মারসাল কঙ্কালটিকে দেখে। হ্যাঁ, ভয়ের আধিপত্যময় বিরাট জগত তাদের জনগোষ্ঠীতে দীর্ঘস্থায়ী আস্তানা গেড়ে আছে। অথচ মনের কোণে জড়ো হয়ে থাকা ভয় এবং চোখের সামনে পড়ে থাকা ভয়ের বস্তুটি দেখেও ভয়ের উদ্রেক না হওয়া এ-ও একধরণের আবিষ্কার বটে। ছুঁয়ে দেখার সাধ হয় তার কঙ্কালটিকে। হ্যাঁ, হাত পা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে সে, যেন খেলনা। চেতানের চোখ পড়তেই চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ছুঁস না, ছুঁস না। বিপদ হবে।’
রাবণ কপালের ঘাম মুছে বলে, ‘কীসের বিপদ রে? মরা মানুষের কঙ্কাল কি জাগ্যে উঠতে পারে? ইঃ যদি পারত তবে সে আরেক বিত্তান্ত… ঐ কঙ্কাল তবে জলের কথা কইত… সুখদুঃখের কথা… একটা গেরাম কীভাবে ধ্বংস হয় তার কথা… ‘
ভয় কেটে গিয়ে কোদাল গাঁইতির কোপ পড়ছে ঝপাঝপ।
কুয়োর ভেতর থেকে চিৎকার ভেসে আসে জল জল। ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে তৃষাহরা জলের কলকল ধ্বনি। বাঁজা মাঠে ওঠে আনন্দের ঝড়। পাখিরা গাছ থেকে গাছে ওড়ে ডানার ঝটপটানির আওয়াজ তুলে। কঙ্কালের হাড় দিয়ে মাদল বাজায় মারশাল। দ্রিমি দ্রিমি ধিতাং ধিতাং… আকাশে তখন গোলগাল চাঁদ। অপরূপ সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। হ্যাঁ, এই হাড় তাদের পূর্বপুরুষ পিলচু বুড়োর হাড় বটে, উৎখাতের চিহ্ন বহনকারী ভিটে হারানো মানুষের হাড়। ‘বাঁজা মাঠে নতুন গেরাম হয়, ফিরে কারখানা লেগ্যে গেরাম শ্মশান হয়… শুধু হুই পিলচু বুড়া বাঁইচ্যে থাকে… উটো হাড় লয় রে ব্যাটা, উ আমাদের জিয়ন কাঠি বটেক…’
গ্রাম ভাঙ্গে শহর বসে। সোনালি ধানের ক্ষেতে চিমনি ধোঁয়া ওগলায়, ফের অবহেলায় পড়ে থাকা বাঁজা মাঠে গ্রামপত্তন হয়। এমনি নিরন্তর ভাঙ্গাগড়ার মাঝে উৎখাত হওয়া মানুষের মিছিল আশ্রয় হারায়, ফের ঠাঁই পড়ে। প্রায় গুহাযুগ থেকে এই সভ্যযুগ পর্যন্ত এক অপরিবর্তনীয় উচ্ছেদের ইতিহাসের মাঝে বেঁচে থাকে পিলচু বুড়োর হাড়… ভিটে হারানো মানুষের বেঁচে ওঠার সঞ্জীবনী মন্ত্র।
বিজয়া দেব, পূর্বাচল রোড নর্থ, কলকাতা।