ঠিক একশো পঁয়ষট্টি বছর আগে আজকের দিনে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রি (বিএনআই) এর চৌত্রিশ তম রেজিমেন্টের একজন সিপাহী মঙ্গল পান্ডে, অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সুচনা করেছিলেন।
দিনটি ছিল ২৯ শে মার্চ, ১৮৫৭। রবিবারের বিকেল। ব্যারাকপুরের প্যারেড ময়দানে সেদিনের ভিড় যেন অন্যদিনের থেকে একটু অন্যরকম। চারদিকে যেন একটা চাপা গুঞ্জন। বাতাসে একটা বিপদের গন্ধ যেন ভেসে আসছে। সিপাহীদের মধ্যে কেউ এসেছে খালি হাতে, কেউ বন্দুক নিয়ে। সৈনিকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু কেন এই অসময় জমায়েত? আরও কিছুক্ষন আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। এর মধ্যে আমরা একটু পিছিয়ে যাই। যুদ্ধের প্রধান মারণাস্ত্র বন্দুক তখনও আধুনিক হয়ে ওঠে নি। বারুদ ঠাসতে তখনও বেশ কসরত করতে হয়। এই সময় ইংরেজের হাতে আসে নতুন আবিস্কৃত বুলেট Enfield P53। বেশ মসৃন সহজেই ভরা যায়। শুরু হল তার ব্যবহারের ট্রায়াল। গন্ডগোলের সুত্রপাত এখান থেকেই।
জানা গেল দু-ধর্মেরই নিষিদ্ধ জন্তুর চর্বি এতে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছুদিন থেকেই ভারতীয় সৈনিকদের মধ্যে অসন্তোষের চাপা আগুন ধিক ধিক করে জ্বলছিল।

অন্য যায়গা থেকে গোরা সৈন্য এনে অসম্মত সৈনিকদের আলাদা করে রাখা হয়েছিল। তাদের আনুগত্যর প্রতি এ ছিল এক চরম অপমান। তাদের মনে ঘুরে ফিরে আসছিল ফিরিঙ্গির পায়ের তলায় আর কতদিন তাদের থাকতে হবে! ওরা আমাদের দেশ লুটেপুটে নিয়ে যাচ্ছে আর আমরা মরছি অনাহারে। এবার ওরা আমাদের ধর্মেও হাত দিয়েছে। আমাদের ধর্ম ও বিপন্ন, আমরা জাতিভ্রষ্ট হতে চলেছি। কিন্তু বহু জাতি ভিত্তিক সেনা বাহিনীর কেউই সাহস করে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসতে পারছিল না। সেই পলতে তে আগুন দেওয়ার কাজটি মঙ্গল পান্ডে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। ২৯ শে মার্চ, ১৮৫৭-র বিকেলবেলা। জ্বলল সেই আগুন। দুংখের বিষয় সেদিন তিনি তার সঙ্গীদের বিদ্রোহের ডাক দিলেও কেউ তার সঙ্গী হয়নি। নৈতিক সহযোগী হয়েই রয়ে গিয়েছিলেন। ধীরস্থির প্রকৃতির নিজের স্বভাবের গুণে সকলের কাছে দারুণ জনপ্রিয় প্রতিদিনের দেখা মঙ্গল পান্ডে সেদিন এক নতুন রুপ নিয়ে দেখা দিয়েছিলেন।
অসম যুদ্ধের ফল যা হওয়ার ছিল তাই হল। বাঁধা দিতে আসা দুই ইংরেজ অফিসার কে হত্যা করে অসম যুদ্ধে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা সফল হয়নি। ধোঁয়া, বারুদ আর অগুনের মধ্যে আহত রক্তাক্ত মঙ্গল পান্ডে বন্দী হলেন। তাকে সুস্থ করে বসল বিচার সভা বা বিচারের প্রহসন। এই রকম বিপদজনক ইংরেজের শত্রুতে যত তাড়াতাড়ি নিকেশ করা যায় ততই মঙ্গল। তাই নির্ধারিত দিনের দশ দিন আগে, ১৮৫৭ সালের ৮ এপ্রিল, প্রকাশ্যে মঙ্গল পাণ্ডের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরে ইংরেজ অফিসারদের আদেশ অমান্য করে মঙ্গল পান্ডেকে নিরশ্র না করার জন্যে ২১ এপ্রিল জমাদার ঈশ্বরী প্রসাদকেও ফাঁসিতে ঝোলান হয়। মঙ্গল পান্ডের বীরত্বপূর্ণ আত্মদান বিফলে যায়নি। এ ঘটনা সারা ভারতবর্ষের সিপাইদের মধ্যে এক প্রবল সাড়া জাগিয়েছিল। ভারতীয় সিপাইরা সংঘবদ্ধভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেনাব্যারাক আক্রমণ করে সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিল। জ্বলে উঠেছিল মীরাট, দিল্লি, এলাহাবাদ, অযোধ্যা, কানপুর, ঝাঁসী, বারানসী, লখনউ। দিল্লীর তখতে বসলেন বাহাদুর শা। শুরু হলো ১৮৫৭ র মহাবিদ্রোহ।