উত্তর-পূর্বের রাজ্য মণিপুরে দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে আগুন জ্বলছে। আদিবাসী অধ্যুষিত পাহাড়ি রাজ্যের ইম্ফল উপত্যকায় বসবাসকারি মেইথেই আর উপত্যকার চারিদিক ঘিরে থাকা পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারি কুকিদের মধ্যে জাতিগত সংঘর্ষের জেরে মণিপুর উত্তপ্ত। মণিপুরের বিজেপি সরকার মেইথেই সম্প্রদায়কে তপশিলী আদিবাসী সংরক্ষণের আওতায় আনতে চাওয়ায় সংরক্ষণের বিরোধিতায় নামে কুকি-সহ অন্যান্য আদিবাসী গোষ্ঠী। তাদের আশঙ্কা মেইথেই সম্প্রদায় আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে প্রকৃত আদিবাসীরা জঙ্গলের সাংবিধানিক অধিকার হারাবে, জঙ্গলে ভাগ বসাবে মেইথেই। কারণ, রাজধানী ইম্ফল সংলগ্ন এলাকায় থাকার ফলে মেইথেইরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায়। একইসঙ্গে উপত্যকায় জনঘনত্ব বেশি হওয়ায়, বিধানসভা আসনের সংখ্যাও বেশি। এই অবস্থায় মেইথেই সম্প্রদায়কে উপজাতি হিসাবে স্বীকৃতিদানের উদ্যোগ শুরু হয়েছে বলে আদিবাসীরা জঙ্গলের অধিকার হারানোর ভয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। কার্যত আদিবাসীদের মনে অধিকার হারানোর ভয় সৃষ্টি করেছে কেন্দ্র ও মণিপুরের বিজেপি সরকার।
মণিপুরে জাতিগত সংঘর্ষে অগ্নিসংযোগ, লুট, হিংসায় মানুষের মৃত্যু মিছিলের মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল মেইথেই পুরুষদের হাতে দুই কুকি মহিলাকে নগ্ন করে সকলের সামনে প্যারেড করানো। মে মাসের ওই যৌন নিগ্রহের ঘটনার মর্মান্তিক ভিডিয়ো সম্প্রতি ইন্টারনেটে প্রকাশিত হওয়ায় তোলপাড় হয় গোটা দেশ। একদিকে মে মাস থেকে শুরু হওয়া হিংসায় কমপক্ষে ১৩০ জনের মৃত্যু, আহত চার শতাধিক মানুষ, পাশপাশি পুলিসের অস্ত্রাগার লুঠ, শতাধিক গির্জা এবং এক ডজনেরও বেশি মন্দির ধ্বংস হয়েছে এবং বহু গ্রাম আক্রান্ত হয়েছে। পাশাপাশি হিংসা দমন করতে সেনা, আধাসামরিক বাহিনী এবং পুলিস ব্যর্থ হওয়ায় ৬০,০০০ এরও বেশি মানুষ ঘরছাড়া হতে বাধ্য হয়েছেন। এত কিছুর মধ্যে আবার ভাইরাল হওয়া ভিডিও — একদল যুবক দুটি মহিলাকে যৌন নিগ্রহ করতে করতে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। দেশশুদ্ধ মানুষ লজ্জায়, ঘেন্নায় ছি ছি করেছেন, ক্ষোভে প্রতিবাদ দেখিয়েছেন আর প্রশাসন? তারা যথারীতি নিজেদের দায় এড়িয়ে গিয়েছেন। কিন্তু মণিপুরের লাগাতর দাঙ্গা পরিস্থিতি, পুলিশের থানা বা চৌকি লুঠ, দাঙ্গাকারীর হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র যা নাকি পুলিশের কাছেও নেই এবং ভয়ংকর নারী নির্যাতনের ঘটনা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা-পুলিশ-প্রশাসন নিষ্ক্রিয়, তারা দাঙ্গাকারীদের নিরস্ত্র করতে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়নি।
গত কয়েক বছর ধরে দেশের প্রধানমন্ত্রী মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, আইনি নিরাপত্তা বা সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে যত গলাবাজি করেছেন মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা ততোই নিম্নমুখী। যা নিয়ে রাজনৈতিক-সামাজিক বা কোনও স্তরে প্রশ্ন ওঠেনি, বিরোধী কোনও দলও সেভাবে মুখ খোলেনি। তারা কেবল এই ভেবেই নিজেদের আশ্বস্ত করেছে — বিপুল ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের কাছে আমরা নগণ্যমাত্র, শুধু চেঁচালেই চলে না। অতএব সয়ে যাওয়া ধর্ম, সইয়ে নেওয়ার উপায় বাতলানো কর্ম। এর আগেও তো বুলডোজার চলেছে, দরিদ্র মুসলমানের ঘর ভাঙ্গা হয়েছে, দিল্লিতে দাঙ্গা হয়েছে। মণিপুরে দুই নগ্ন মহিলার ভিডিওটি কিন্তু বেশ অস্থির করে দিয়েছে। দুই নগ্ন মহিলাকে কয়েকজন পুরুষ চিৎকার করতে করতে রাস্তা থেকে নামিয়ে মাঠের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মহিলারা লজ্জা ও ভয়ে নুব্জ হয়ে বারবার অত্যাচারীদের কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার আর্তি জানাচ্ছে। এই ঘটনা গত ৪ মে তারিখের, কাংপকপিতে এই ঘটনার পর অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরেও কার্যত কোনও পদক্ষেপ করেনি মণিপুর পুলিশ। কেবল তাই নয়, নির্যাতিতারা পুলিশকে জানিয়েছিলেন যে তাদের গ্রাম দখল হবে। সেই কারণেই গ্রামের সকলেই পালিয়ে যায়। কিন্তু হানাদারেরা আসার আগে তাঁরা গ্রাম ছেড়ে পালাতে পারেনি। তাই ওই দুই মহিলার সাম্প্রদায়িক শাস্তির বোঝা বেড়ে যায়। নির্যাতিতারা জানান ঘটনাস্থলে চারজন পুলিশ একটি গাড়িতে বসেছিল। ৪ মে ঘটনার পর ১৮ মে স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশ নড়ে বসেনি। তবে ভিডিও ভাইরাল হতেই সারা দেশের সোশ্যাল মিডিয়া ও বিরোধীদের চাপে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয় মণিপুরের পুলিশ।
এদিকে অশান্ত মণিপুরের বিষয়ে মিয়ানমারের ভূমিকা নিয়ে ভারত রীতিমতো অসন্তুষ্ট। বেশ কিছুদিন ধরেই কেন্দ্র বলার চেষ্টা করছে, গত দু-আড়াই বছরে সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারের যে হাজার হাজার নাগরিক মণিপুরে এসেছেন, রাজ্যটিতে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য তাদের একটা বড় ভূমিকা আছে। অথচ ২০২১-এর ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক জুন্টা সরকার ফের ক্ষমতায় আসার পর মিয়ানমারের কাছে ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির পরিমাণ বিপুলভাবে বেড়েছে। অস্ত্র বিক্রির চুক্তি নিয়ে কথা বলতে ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব গত জুলাই মাসের শুরুতে মিয়ানমার সফরও করেছেন। জাতিসঙ্ঘের পরিসংখ্যানও বলছে, ২০২১-এর সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের কাছে ভারতের অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। বিশেষঙ্গদের মত, মণিপুরের অশান্তিতে চীন বা মিয়ানমারের কোনও ভূমিকা নেই। তবে মিয়ানমারে জুন্টার ক্ষমতা দখলের অভিঘাত থাকতে পারে। মিয়ানমারে সেনার হাতে নির্যাতিত যে হাজার হাজার নাগরিক ভারতে পালিয়ে এসেছে তারা মিজোরামে অভ্যর্থনা পেলেও মণিপুরে মেইথেইরা তাদের বিদ্বেষের দৃষ্টিতেই দেখে। দিল্লি থেকে আজ পর্যন্ত তারা শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতিও পায়নি। যেটা হলে মণিপুরের উত্তেজনা হয়ত অনেকটাই কম হতো।