যশোরের বিদ্যানন্দকাটি গ্রামের বসু পরিবারের কথা সতীশচন্দ্র মিত্রের দুই খণ্ডে লেখা ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’-এ লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁদের পূর্বপুরুষের বাস ছিল চব্বিশ পরগনা জেলার বাগাণ্ডা অঞ্চলে। সেখান থেকে কাজের সূত্রে তারা রানাঘাটের পালচৌধুরিদের জমিদারিতে এসেছিলেন। তারপরে ঘটেছে অনেক বিষয়। যাইহোক, ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে এই বংশের রাসবিহারী বসু, প্রসন্নকুমার বসু, নরেন্দ্রকুমার বসু ও বীরেন্দ্রকুমার বসুর উল্লেখ রয়েছে। উমাকান্ত বসুর (১৮১২-১৮৫২ খ্রি.) জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন প্রসন্নকুমার বসু, আর তৃতীয় পুত্র ছিলেন এই স্মৃতিকথার লেখক মন্মথকুমার বসু (১৮৪৮-১৯২৪ খ্রি.)। সেই অর্থে মন্মথকুমার বসু স্বনামধন্য ছিলেন না হয়তো, কিন্তু তাঁর কর্মজীবন, ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা, পরিবারের কথা, যা তিনি লিখে গিয়েছেন নিজের স্মৃতিকথায়, সেগুলি যুগের নিরিখে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
মন্মথকুমার বসুর এই স্মৃতিকথায় উনিশ শতক ও বিংশ শতকের প্রথম ভাগের বাংলাদেশের আংশিক চিত্র প্রতিভাত হয়। স্মৃতিকথার গুরুত্ব বোধহয় এখানেই। সমকালীন সমাজ, পরিবার, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতির খণ্ডচিত্র যেমন এখানে ধরা পড়েছে, তেমনি কয়েকজন উল্লেখনীয় ব্যক্তিবর্গের প্রসঙ্গও মন্মথকুমার বসুর এই স্মৃতিকথায় চলে এসেছে। যেমন ঐতিহাসিক-প্রশাসক রমেশচন্দ্র দত্ত, বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, তাঁর মাতা জগত্তারিণী দেবী (যাঁর নামাঙ্কিত স্বর্ণপদক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কৃতী শিক্ষার্থীদের দেওয়ার প্রচলন রয়েছে) প্রমুখের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তাঁদের সম্পর্কিত কিছু অপ্রকাশিত ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা (মন্মথকুমার বসুর) পড়ার আগ্রহ থেকেও বইটি সংগ্রহ করা যায়। একজন অনুসন্ধানী পাঠক এহেন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চাইবেন না নিশ্চয়।
এই স্মৃতিকথার আরেকটি আকর্ষণ নিহিত রয়েছে আঞ্চলিক ইতিহাস-চর্চায়। পেশাগত সূত্রে মন্মথকুমার বসু বাংলা তথা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়েছেন। তাঁর স্মৃতিকথায় সেই সকল জায়গার কথা, সেখানকার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা, সেখানকার সমাজ-সংস্কৃতির কথা, ব্যক্তিবর্গের কথা উঠে এসেছে। সংক্ষেপে তাঁর কর্মজীবনের এক ঝলক দেওয়া যাক। ১৮৭৭ সালের ১ মে মন্মথকুমার বসুর সাব-ডেপুটি কালেক্টরের চাকরি পাকা হয়। ১৮৮২ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি কর্মসূত্রে সাতক্ষীরাতে ছিলেন। তারপর ১৮৮২ সালের জুলাই মাসে পাটনাতে স্পেশাল রোড সেস রিভ্যালুয়েশন ডেপুটি কালেক্টর (Special Road Cess Revaluation Deputy Collector) হয়ে বদলি হয়ে যান। তিনি ১৮৮৪ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সেই পদে বহাল থাকেন। তারপর অফিসিয়েটিং ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট (Officiating Deputy Magistrate) হয়ে তিনি বাঁকিপুরে এক মাস ছিলেন। তারপর ৯ মে বদলি হয়ে গয়াতে চলে যান। সেখানে তিনি টানা দুই বছর (মে, ১৮৮৪ সাল থেকে মে, ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত) ছিলেন। এরপর তিনি বদলি হয়ে আসেন কৃষ্ণনগরে। এখানে ১৮৮৭ সালের ১ জুলাই তাঁর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি পাকা হয়। উল্লেখ্য, নেটিভ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষাতে প্রথম হওয়ার তেরো বছর পরে তাঁর এই পদপ্রাপ্তি হয়। প্রায় এক বছর কৃষ্ণনগরে থাকার পর ১৮৮৮ সালের ৬ জানুয়ারি তিনি বীরভূমে বদলি হয়ে যান। সেখানে তিনি ১৮৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ছিলেন। এরপর ১৮৯২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮৯৩ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ছিলেন বনগ্রামে (এস.ডি.ও.)। ১৮৯৩ সালের ২৭ জুলাই থেকে ১৮৯৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ছিলেন বর্ধমানে। উল্লেখ্য, ১৮৯৫ সালের ২ আগস্ট থেকে তিন মাস তিনি ছুটি নিয়েছিলেন। তারপর ১৮৯৫ সালের ১১ নভেম্বর কুমিল্লায় বদলি হয়ে যান। ১৮৯৮ সালের ১৮ জুন পর্যন্ত তিনি সেখানে ছিলেন। তারপর আবার দুই মাস ছুটিতে থেকে ১৮৯৮ সালের ২৬ আগস্ট ঢাকায় বদলি হয়ে যান। সেখান থেকে যশোহরে যান ১৮৯৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। সেখান থেকে বগুড়ায় বদলি হয়ে যান ১৯০২ সালের ২১ আগস্ট। আর ১৯০৪ সালের ১৬ জুন তিনি অবসর গ্রহণ করেন। এই দীর্ঘ ও বহু বিচিত্র কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং তারপর অবসর গ্রহণের পর তাঁর জীবনচর্যার এক বর্ণময় চিত্র এই স্মৃতিকথায় ধরা রয়েছে।

তাঁর স্মৃতিকথার পর্বগুলি এভাবে উন্মোচিত হয়েছে— এ পক্ষের জন্মবৃত্তান্ত, শৈশব, দুর্গোৎসব, সংযুক্ত পরিবার, স্ত্রীশিক্ষা, বিধবা, রোগ চিকিৎসা, গ্রাম্য নীতি, বিদেশ যাত্রা, কলিকাতা, রাধিকাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, পাঠ্যাবস্থা, বিদ্যাভূষণ, অক্ষমতা, দলাদলি, বহুবিবাহ, ব্রাহ্মণভোজন, সাতক্ষীরার জমিদার, সাতক্ষীরা, ভাগ্য পরিবর্তন, বাঁকিপুর, রাজগৃহ, গয়া, বুদ্ধগয়া, টিকারির রাজ, কৃষ্ণনগর, বীরভূম, সিউড়ি, উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ম্যাজিস্ট্রেট কক্সহেড, উমেশচন্দ্র বটব্যাল, এক কৃপন, মাংসাহারে লোভ, বনগ্রাম (১৮৯২—৯৩), বর্ধমান, রমেশচন্দ্র দত্ত, একটি গোপবালিকা, নির্বুদ্ধি ও সাহস, কৌলিন্য, ইংগলস সাহেব (ম্যাজিস্ট্রেট), ভূমি দখল, বর্ধমান নগর, অবসর, শ্যামাচরণ মৈত্রেয়, কুমিল্লা, গুরুদেব, তন্ত্র, ফলিত জ্যোতিষ, শশধর তর্কচূড়ামণি, কুসংস্কার, পুত্রের বিবাহ, মি.এফ.এইচ. স্ক্রিন, ঢাকা, যশোহর, গরু কাটার মোকদ্দমা, বগুড়া, কৃষ্ণনগর, পুরী, বিদ্যানন্দকাটি স্কুল, তীর্থ পর্যটন, একটি অবান্তর গল্প— লোকনাথ মিত্র এবং বঙ্গমাতার দেহচ্ছেদ। এরপরে রয়েছে গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশটি। সেটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে মন্মথকুমার বসুর পুত্র বীরেন্দ্রকুমার বসু তাঁর সম্পাদনায় এই স্মৃতিকথার প্রথম সংস্করণ প্রকাশের পশ্চাতে কিছু আলোচনা করেছেন। মনে রাখতে হবে প্রথম সংস্করণ প্রকাশের সালটি ছিল ১৯৪৮, ভারত সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে। আজ থেকে সাতাত্তর বছর আগের কথা। লেখনী থেকে তাই বিংশ শতকের স্বাদ আস্বাদন করা যায়। গ্রন্থের এই অংশটিও সে কারণে বিশেষ তাৎপর্যবাহী। মন্মথকুমার বসুর একটি প্রতিকৃতি গ্রন্থটিতে মুদ্রিত হয়েছে, পাশাপাশি সমকালীন আরও পাঁচজন ব্যক্তির চিত্রে গ্রন্থটি সমৃদ্ধ হয়েছে। তাঁরা হলেন— জগত্তারিণী দেবী, রাসবিহারী বসু, গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, প্রসন্নকুমার বসু এবং বসন্তকুমারী বসু। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র গ্রন্থটিতে রয়েছে যেখানে রয়েছেন সপরিবার মন্মথকুমার বসু।
মন্মথকুমার বসু তাঁর এই স্মৃতিকথাটি ১৯১৫ সালে লিখেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। এই গ্রন্থের প্রথম সংস্করণটি বসু পরিবারের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর জন্মশতবর্ষে— অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে। মন্মথকুমার বসু ১৯২৪ সালে প্রয়াত হন। তাঁর প্রয়াণের পর রেখে যাওয়া কাগজপত্রের মধ্যে থেকে তাঁর এই স্মৃতিকথার সম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপিটি পরিবার কর্তৃক উদ্ধার হয়। তারপর মন্মথকুমার বসুর তৃতীয় পুত্র বীরেন্দ্রকুমার বসু পিতার স্মৃতিকথার পাণ্ডুলিপিটি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। প্রথম সংস্করণ প্রকাশের পর দীর্ঘদিন বইটি লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল। ২০২৪ সালে মন্মথকুমার বসুর প্রয়াণের শতবর্ষে এসে আবার পারিবারিক উদ্যোগেই গ্রন্থটি পুনর্মুদ্রিত হয়। প্রকাশনার দায়িত্ব নেয় লোকসেবা শিবির প্রকাশন, কলকাতা। পরিবারের পক্ষ থেকে সাংবাদিক প্রবীরকুমার বসু ‘লেখকের প্রয়াণের শতবর্ষে নিবেদন’ অংশে বর্তমান সময়ে এই স্মৃতিকথার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেছেন এবং এর মধ্যে দিয়ে তিনি গ্রন্থের একটি মুখবন্ধও রচনা করে দিয়েছেন, যা পাঠকদের গ্রন্থের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুটা আভাস দেয়।
লেখক: অধ্যাপক, চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়, নদিয়া।