প্রায় সব মানুষের জীবনেই এক বা একাধিক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে, যা সারা জীবনের জন্য খুব যত্নে তার মনে থেকে যায়। কেউ সেই আশ্চর্য ঘটনাকে জীবনের সেরা সম্পদ বলে স্মরণীয় করে রাখেন, কেউ সেই ঘটনাকেই তার জীবনের বাঁক বলে মনে করেন। এমনটাও হতে পারে যে ঘটনাকে তিনি আশ্চর্য বলে ভাবছেন তা আমার আপনার কাছে অতি সাধারণ বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি এসে যায়! সেই ব্যক্তি যদি ওই ঘটনাকে তার জীবনে পরম যত্নে লালন করে রাখেন।
সেরকমই একটি ঘটনার কথা আজ বলতে ইচ্ছে হল ১ মে বলে। আজ থেকে ১০২ বছর আগে উত্তর কলকাতার সিমলাপাড়ার একটি ছেলে; যে কিনা ছিল খুব দুষ্টু, কুস্তির আখড়ায় লড়াইয়ে নামত। সেই ছেলে একদিন সুধাসাগরের তীরে গিয়ে দাঁড়ায়। যৌবনের ভাললাগা সঙ্গীত হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র স্বপ্ন-সাধনা। তারপর সংগীতের ধ্যানে মগ্ন সেই মানুষ গানের ভূবনে জ্বেলে দেন হাজার শিখার সঙ্গীতপ্রদীপ। হ্যাঁ তিনি মান্না দে। ১মে তার ১০২ তম জন্মদিন। মান্না দে-র মুখ থেকে শোনা তাঁর জীবনের জলসাঘরের একাধিক আশ্চর্য ঘটনার দু-একটি ঘটনা দিয়েই স্মরণ করবো প্রবাদপ্রতিম শিল্পীকে।
পেশা সূত্রে বেশ কয়েকবার মান্না দে-র মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ ঘটেছিল। প্রথমবারের কথাই খুব বেশি করে মনে আছে কারণ, সেদিন ছিল ১ মে; তাঁর জন্মদিন। আর নিজের কাছে মান্না দে-র মতো একজন বিরাট ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি হওয়ার আবেগ ও উত্তেজনা। তাঁর সঙ্গে আমার কোনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল না, না থাকারই কথা, কারণ মান্না দে আমাকে কেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেবেন তাছাড়া তিনি যে ওইদিন কলকাতায় তাঁর নিজের বাড়িতে আসছেন সে খবরও আমার কাছে ছিল না। বেলা ১২টা নাগাদ অফিসের ল্যান্ডলাইনে আমার একটা ফোন আসে। তখন আমার মোবাইল ফোন ছিল না। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে একজন জানান যে মান্না দে একটু পরেই এয়ারপোর্টে নামবেন, তিনি সেখান থেকেই আমাকে ফোন করছেন।
আমি সেই ভদ্রলোককে চিনতাম না। আমি তাঁর পরিচয় জানতে চাই, তিনি জানান তিনি ছবি আঁকেন, তিনি নাকি আমাকে চেনেন এবং তিনি আমার অনেক ছবি আঁকিয়ে বন্ধুর নাম বললেন, তাদের সঙ্গে আমাকে দেখেছেন ইত্যাদি। তিনি এও জানান মান্না দে এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি সিমলেপাড়ায় তাঁর নিজের বাড়িতে আসবেন। কিন্তু মান্না দে জন্মদিনে নিজের বাড়িতে আসছেন তিনি তো আমাদের আমন্ত্রণ করেন নি। যাওয়ার পর বাড়ির লোক যদি আমাদের ঢুকতে না দেয়। তিনি শুধু বললেন তেমনটা হবে না। আমাকে উলটে জিঙ্গাসা করলেন বাড়িটা চেনেন তো, দু-ঘন্টা পর চলে আসুন। এরপরই ভদ্রলোক ফোন রেখে দেন।
এরপর রীতি অনুযায়ী আমি চিফ রিপোর্টারকে জানানো মাত্র তিনি বলেন, যাও যাও ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে পড়। মান্না দে-র জন্মদিনের স্টোরি। খুব সুন্দর করে গান, কথা সব তুলে আনবে। এরপরই আমরা মানে আমি, ক্যামেরাম্যান, তখন ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে একজন সহকারি থাকত, এই তিনজন গাড়িতে উঠে বেড়িয়ে পড়ি উত্তর কলকাতার পথে। যেতে যেতে আমার ভিতরে একটা চিন চিনে উত্তেজনা হচ্ছিল। ইতিমধ্যে আমি একটি খুব সাধারণ প্রশ্ন মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম সেটা যদি উনি বলেন তাহলে অন্তত ৫-৬ মিনিট সময় তো লাগবেই, এছাড়া জন্মদিনের স্টোরিও হবে। তাছাড়া আর কিছু ভাবনা সেদিন আর ছিল না।
আমরা যাচ্ছিলাম সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে। এক সময় গিরিশ পার্ক পৌঁছে বিবেকানন্দ রোড ধরলাম। বাড়িটা কি মনে আছে? কলেজ জীবনের এক বন্ধুর ওই পাড়াতেই বাড়ি। সেই আমাকে একবার মান্না দে-র বাড়ি, ছায়া দেবীর বাড়ি দেখিয়েছিল। বিধান সরণি বিবেকানন্দ রোডের মোড়ে এসে জিঙ্গাসা করতেই গলি দেখিয়ে দিল। গাড়িতে যাওয়ার পথ নয়, নেমে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কয়েকবার মান্না দে-র বাড়ি কোনটা জিঙ্গাসা করতে হয়েছিল। পৌঁছে দেখি একটা ছোট ঘরে মান্না দে হারমোনিয়ম বাজিয়ে একমনে গাইছেন, ঘায়েল মনকা পাগল পঞ্ছি/ উড়নে কো বেকারার/ পাঙ্খ হ্যায় কোমল আঁখ হ্যায় ধুন্দালি/ জানা হ্যায় সাগর পার… কলকাতার দুটি অতি পরিচিত দৈনিকের আলোকচিত্রি আমার আগেই হাজির হয়ে ছবি তুলছেন। আর একজন ছবি রঙিন পেনসিল দিয়ে ছবি আঁকছেন। বুঝতে পারলাম উনিই আমায় খবর দিয়েছিলেন। অন্য আর কোনও সাংবাদিক সেদিন ছিল না। আমাদের ক্যামেরা ম্যানও গানের ছবি তুলতে শুরু করে।
গান শেষ হতেই মান্না দে বললেন শঙ্কর জয়কিষাণের কম্পোজিশনগুলির মধ্যে এটি আমার খুব প্রিয়। আমার খুব চেনা গান, আমি একটু খোঁজখবর রাখি জানাতেই বললাম, হ্যাঁ ‘সীমা’ সেই ৫৫ সালের ছবি, বলরাজ সাহানি নুতন, এই গানটি শৈলেন্দ্র-র লেখা। মান্না দে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি? পরিচয় দিতে বললেন, আরে বাবা আপনি তো অনেক খবর রাখেন। ভাল লাগলেও সকলের সামনে একটু লজ্জাই পেয়েছিলেম। এবার আমাকে বাইট নিতে হবে, অর্থাৎ আমদের মাইকে তার কথা রেকর্ড করতে হবে। মান্ন দে-র সামনে মাইক রাখতেই বললেন, প্রশ্ন কঠিন না সোজা? আমি বললাম কোনও প্রশ্ন নয়, শুধু একটা বিষয় আপনার কাছে জানতে চাইব যা আপনার কাছে অনেক আছে, তার থেকে একটা দুটো বললেই হবে।
যথারীতি মান্না দে বললেন সেটা কি জিনিস, আমার কাছে গান ছাড়া কি আর কিছু আছে? আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, আছে, আপনার সুদীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে আপনি বহু আশ্চর্য ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেক ঘটনা হয়তো আজ আর সেভাবে মনে নেই, অনেকগুলি খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছেন, তার থেকে দু-একটা বলুন। হাসতে হাসতে মান্না দে বললেন, খুব একান্ত ব্যক্তিগত ঘটনা তো আমি বলতে পারবো না। আমি বললাম, আমি তেমনটা জানতে চাইছিও না। আপনার সংগীত জীবনের ঘটনা, যা আপনাকে সুখ-দুঃখ-আনন্দ-অভিমান-কিংবা জেদ দিয়েছে। মান্না দে মাথা নাড়তে লাগলেন। অর্থাৎ তিনি বুঝতে পারছেন। কয়েক মুহুর্ত চুপ করে রইলেন চোখ বুজে। বোঝা যাচ্ছিল তিনি খুব গভীর ভাবে ভাবছিলেন। তারপর মান্না দে বললেন, ঠিকই বলেছেন আপনি অনেক ঘটনার মধ্যে বেশ কয়েকটি তো দুঃখ দিলেও শিক্ষা দিয়েছে, আনন্দ দিলেও পরে মন খারাপ হয়েছে আবার এমন দু-একটি ঘটনা যতবার মনে পরেছে ততবারই মনে হয়েছে হয়ত এটা না ঘটলে আমি মান্না দে হতাম না।
এরপর মান্না দে তাঁর জীবনের স্মরণীয় ঘটনার কথা বলতে গিয়ে একটি ঘটনাকে আশ্চর্য এবং তাঁর গায়কীর জন্য অন্যতম কারণ বলেও উল্লেখ করেছিলেন। ঘটনাটি ১৯৫৩-৫৪ সালের। ওই সময় তিনি দ্বিতীয়বার মুম্বাই গিয়েছেন। প্রসঙ্গত; তার আগে ১৯৪২ সালেও তিনি একবার মুম্বাই গিয়েছিলেন কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে-র সঙ্গে। বেশ কয়েক বছর মুম্বাইতে হিন্দি সিনেমা দুনিয়ায় সঙ্গীত পরিচালক তাঁর কাকার সহকারি হিসাবে কাজ করেছিলেন। কিছু গানও গেয়েছিলেন। তবে তখন তিনি প্রবোধচন্দ্র দে। জনপ্রিয়তা এবং প্রতিষ্ঠা স্বত্বেও কৃষ্ণচন্দ্র দে-র অসুস্থতার কারণেই তাঁরা কলকাতা ফিরে আসতে বাধ্য হন।
মুম্বাইতে থাকতে মান্না দের মন পড়ে থাকত কলকাতায়। কিন্তু কলকাতা ফিরে এসে তিনি মুম্বায়ের জন্যই ছটফট করতেন। ফিরে এসে বেশ কয়েক বছর তাঁকে কলকাতাতেই অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু ফের মুম্বাই যাওয়ার সুযোগ পান মান্না দে। এবার কিন্তু একা। এবারও শুরুতে অ্যাসিসট্যান্ট মিউজিক ডিরেকটর। একেবারে শুরুতে হরিপ্রসন্ন দাস। তারপর একে একে ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ, শ্যামসুন্দর, অনিল বিশ্বাস, শচীন দেববর্মন, সি রামচন্দ্র প্রমুখ সঙ্গীত পরিচালকের সহকারী হিসাবে কাজ করেছেন। এবার তিনি উঠেছেন নন্দ মজুমদারে বাড়িতে। তিনি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের জ্যাঠতুতো দাদা, ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। মান্না দে-র গানের ভীষণ ভক্ত ছিলেন।
একদিন মান্না দে মুম্বাই রেডিও-তে গান গেয়ে বেরিয়েছেন। আচমকাই একজন বয়স্ক মানুষ তাঁর মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। মান্না দে থমকে দাড়ালেন। একেবারেই অচেনা মানুষ। মান্না দে জিঙ্গাসা করলেন, কিছু বললবেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ বলবো বলেই তো রাস্তা আটকে দাঁড়ালাম। মান্না দে মনে মনে বিরক্ত হলেও বয়স্ক মানুষ বলে সেটা প্রকাশ করলেন না। তিনি সরাসরি জানতে চাইলেন, আপনি এখন কোনদিকে যাবেন? মান্না দে এবার আরও বিরক্ত হলেন, কিন্তু সংযত হয়েই বললেন, আমি যেদিকেই যাই আপনার জেনে কি কোনও উপকার হবে? বয়স্ক মানুষটি এবার প্রশ্ন করলেন আপনার বাড়ি কোথায়?
মান্না দে বিরক্ত হলেও বুঝলেন এই মানুষটি আন্তরিকভাবেই কিছু জানতে চাইছেন। যে কারণে ওখানে দাড়িয়ে মান্না দে ওই বয়স্ক মানুষটির একটার পর একটা প্রশ্নের উরত্তর দিয়ে গেলেন। এরপরে তিনি বলেন উনি যদি মান্না দে-র সঙ্গে ফেরেন তাতে আপত্তি আছে কি না। মান্না দে বোঝেন বয়স্ক মানুষটি আসলে গাড়িতে লিফট চাইছেন। মান্না দে রাজি হয়ে যান। তিনি কোথায় কতদূর যাবেন জানতে চাইলে বয়স্ক মানুষটি জানান; তিনি মান্না দে-র বাড়ির দিকেই যাবেন।
গাড়িতে উঠে দু-এক কথার পরেই বয়স্ক মানুষটি মান্না দে-কে সরাসরি বলেন, তিনি অনেকবার মান্না দের গান শুনেছেন। গান শুনে তিনি বুঝেছেন মান্না দে আরও ভাল করে গান গাইতে চান। এসব কথা শুনতে একজন তরুণ গায়কের ভাল লাগবেই। কিন্তু তিনি মান্না দে-কে অবাক করে দিয়ে বললেন, আমি তোমাকে গান শেখাবো। সেই মুহুর্তে মান্না দে বহু কষ্টে নিজের ধৈর্যকে সংযত করেন। তবে মনে মনে বলতে থাকেন, তুমি কে হে বাপু আমাকে গান শেখানোর। আমি মান্না দে, কলকাতা থেকে আরব সাগরের পারে এসে সঙ্গীতের কাজ করছি। আমার কাকা আমার গুরু কৃষ্ণচন্দ্র দে, এছাড়া গান শিখেছি দবীর খাঁ, আমন আলী খাঁর মতো ওস্তাদদের কাছে।
মান্না দে এরপর জিঙ্গাসা করেন, মহাশয়ের নাম জানতে পারি? তিনি উত্তরে বলেন, আমি আবদুল রহমান খাঁ, সুরেশকুমার নামে আমি মুম্বাই দ রেডিওতে লাইট ক্লাসিকাল গান গাই। মান্না দে তাঁর নাম শুনে গাড়িতে বসেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। যে গুরুর কাছে শত অনুরোধের পরও নাড়া বাধা যায় না, তিনি কিনা নিজে এসে মান্না দে-কে গান শেখাতে চাইছেন।
মুম্বাইতে অনেক দিন মান্ন দে আবদুল রহমান খাঁর কাছে তালিম নিয়েছিলেন। মান্না দে জানান, তিনি যে বেসিক সং কিংবা ফিল্মি সঙে শাস্ত্রীয় সংগীতের যে কোনও কারুকাজে সচ্ছন্দ তার কারণ পাতিয়ালা ঘরানার আবদুল রহমান খাঁয়ের তালিম।
অসাধারণ।
Excelent.
অসাধারণ অভিঙ্গতা।
যেমন অভিঙ্গতা তেমনি তার বর্ননা।
অপূর্ব
বাহ্ । খুব ভালো লাগল। ওই বাড়িতে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ১৯৯২ সালে। কথাও হয়েছিল। পরে ওঁর
সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলাম।