চৈতন্যদেবের প্রয়াণের পর ৪৯০টি সৌরবর্ষ আমরা অতিক্রম করেছি। প্রায় অর্ধ-সহস্রাব্দকাল শ্রীচৈতন্যের অনুরাগী, জীবনীকার, ভক্তগণ, গবেষক— এমনকি সমালোচকেরা তাঁকে নিয়ে চর্চা করে চলেছেন। কিন্তু পরিপূর্ণ তৃপ্তি মিলেছে কী? প্রশ্ন সেটাই— তাঁকে আমরা কতটা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি? নাকি বলা ভালো চৈতন্যদেবকে অবতার রূপে পেয়েই আমরা বেশি সন্তুষ্ট। ভগবান চৈতন্যের প্রতিই আমরা অধিক আগ্রহী। আমাদের অবচেতন মন আসলে মানুষ চৈতন্যের অনুসন্ধান করতে চায়-ই না। এ-ভুল আমাদের ইচ্ছাকৃত। জগন্নাথ মিশ্র ও শচীমাতার সন্তান নিমাই আজ শুধু নদিয়া জনপদেই সীমায়িত নন, আসলে চৈতন্যেরও বিশ্বায়ন ঘটেছে। অতি সম্প্রতিও নয়, সেটিও প্রায় কয়েক দশক আগেই। তবে সেই বিশ্বায়ন ‘মানুষ চৈতন্যের’ নয়, ‘চৈতন্য মহাপ্রভুর’।
২০২৩ সালে দোল পূর্ণিমার (ফাল্গুনী পূর্ণিমা) নির্ধারিত দিন ৭ মার্চ (মঙ্গলবার)। ফিবছর নবদ্বীপ-মায়াপুরকে ভরকেন্দ্র করে নদিয়া জেলা দোল পূর্ণিমায় মেতে ওঠে। চৈতন্যদেবের আবির্ভাব তিথি বলে কথা! এ বছর সেই দোল পূর্ণিমার ঠিক একদিন আগে কৃষ্ণনগরের সাংস্কৃতিক সংস্থা ‘মুক্তধারা’ মানুষ চৈতন্যের অনুসন্ধানে ব্রতী হল। ‘মুক্তধারা’-র ৪৫তম আলোচনাসত্র বসেছিল ৫ মার্চ ২০২৩ (রবিবার), যেখানে আলোচনার বিষয় ছিল ‘মানুষ চৈতন্যের সন্ধানে’। আলোচক ছিলেন চৈতন্যধাম নবদ্বীপ নিবাসী বরিষ্ঠ সাংবাদিক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। কৃষ্ণনগর পৌরসভার দ্বিজেন্দ্র মঞ্চে ‘মুক্তধারা’-র ৪৫তম আলোচনাসত্রের আয়োজন করা হয়েছিল। ‘মুক্তধারা’ আয়োজিত রবিবাসরীয় সান্ধ্যকালীন এই আলোচনা শুনতে বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন। সভাকক্ষ পরিপূর্ণ ছিল আগ্রহী দর্শক-শ্রোতৃমণ্ডলীতে। শুধু সদরশহর নয়, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষেরা এসেছিলেন আলোচনা শুনতে।

নদিয়া জেলায় বসন্তের আগমন চৈতন্যের কারণেই একটু বিশেষ। শ্রীচৈতন্যের ৫৩৮তম জন্মতিথির প্রাক্কালে মুক্তধারার এহেন আয়োজন দর্শক-শ্রোতা বন্ধুদের কাছে বেশ উপভোগ্য হয়। ‘মুক্তধারা’-র প্রথাগত ধারা অনুসরণ করে ৪৫তম আলোচনাসত্রের শুরুতেও একটি উদ্বোধন সংগীত পরিবেশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “তাই তোমার আনন্দ আমার পর, তুমি তাই এসেছ নীচে। আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর, তোমার প্রেম হত যে মিছে” —গানটি উদ্বোধন সংগীতের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। উদ্বোধন সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সংঘমিত্রা সরকার ও শুভময় সরকার। সমগ্র অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন বিশিষ্ট কবি রামকৃষ্ণ দে। ‘মুক্তধারা’-র অভিভাবকস্বরূপ বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব অশোককুমার ভাদুড়ী গত সপ্তাহে প্রয়াত হন। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ (শনিবার) ভোরে কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অশোককুমার ভাদুড়ীর প্রয়াণে মুক্তধারা পরিবার গভীর শোকাহত। ‘মুক্তধারা’-র পক্ষ থেকে এদিন আলোচনাসত্রের শুরুতে নাট্যপ্রাণ অশোককুমার ভাদুড়ীকে স্মরণ করে কিছুক্ষণের নীরবতা পালন করা হয়।

মানুষ চৈতন্যের খোঁজে এদিন আলোচক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অনুসন্ধানগুলি খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেন। চৈতন্যদেবকে আমরা দেবতা সাজিয়ে রেখেছি, হয়তো ইচ্ছা করেই মানুষ চৈতন্যকে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে— এ বিষয়টিকে সামনে রেখে আলোচক বক্তব্য শুরু করেন। নিমাইয়ের জন্ম বৃত্তান্ত থেকে শুরু করে অগ্রজ বিশ্বরূপের প্রস্থান, নিমাইয়ের বাল্যকালের লীলা, পারিবারিক বৃত্তান্ত, বিবাহ পর্যায় (লক্ষ্মীপ্রিয়া ও বিষ্ণুপ্রিয়া), শ্রীহট্ট গমন, সন্ন্যাস গ্রহণ, কাজী দলন, গম্ভীরা পর্ব, নীলাচলে গমন প্রভৃতি বহুবিধ বিষয় এদিনের আলোচনায় উঠে আসে। আলোচকের সুনিপুণ ব্যাখ্যাক্রমে চৈতন্যদেবের জীবনকালের (১৪৮৬-১৫৩৩খ্রি.) ঘটনাগুলি যেন শ্রোতাদের মানসচক্ষে ভেসে ওঠে। চৈতন্যের জীবনীকারদের প্রসঙ্গ তুলে ধরতেও আলোচক ভোলেননি। বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গিতে তিনি চৈতন্য-জীবনীগুলি নিয়ে আলোচনা করেন। চৈতন্য-পরিকরদের বিশেষ অনুরোধে প্রায় চৈতন্য সমকালে রচিত কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-র কথা বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে আসে।

নবদ্বীপ একদা ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে পরিচিত ছিল। উল্লেখ্য, সম্প্রতি নদিয়া জেলার নবদ্বীপ শহরকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ‘হেরিটেজ টাউন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হাজার বছরের পুরোনো জনপদ এহেন নবদ্বীপে চৈতন্য সমকালের নিদর্শন নেই বললেই চলে। চৈতন্যের আবির্ভাব ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে (১৪৮৬ খ্রি.)। কিন্তু এখন অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যায় যে, নবদ্বীপে ১৫০-২০০ বছরের অধিক পুরনো চৈতন্য মূর্তি বা মন্দিরের দেখা মেলা দুস্কর। সে দিক থেকে একমাত্র ব্যতিক্রম হল— বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী সেবিত মহাপ্রভুর পাঁচশো বছরের বেশি প্রাচীন বিগ্রহটি, যেটি নবদ্বীপের মহাপ্রভুবাড়ির গর্ভগৃহে বেদিতে রূপোর সিংহাসনে বিরাজমান। জানা যায় যে, মহাপ্রভুর জীবিতকালেই বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী বংশীবদন ঠাকুরের সহায়তায় মহাপ্রভুর দারুময় বিগ্রহটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। মহাপ্রভুর জন্মভিটায় এর পূজার্চনা হত। কিন্তু ভয়ঙ্কর বন্যায় সেই ভিটা ধ্বংস হলে মালঞ্চপাড়ায় এই বিগ্রহটি আনা হয়। পরবর্তীতে তোতারামদাস বাবাজী মহারাজের উদ্যোগে বর্তমান মহাপ্রভু পাড়ায় এই বিগ্রহটি স্থাপিত হয়। বিগ্রহটি নিমকাঠে তৈরী, যার পাদপীঠে ১৪৩৫ শক ও বংশীবদন নাম খোদাই করা রয়েছে। আরেকটি বিগ্রহের কথাও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়। মণিপুর-রাজ ভাগ্যচন্দ্র নদিয়া-রাজের সহায়তায় মহাপ্রভুর একটি বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ‘অনুমহাপ্রভু’ নামে পরিচিত। এই মূর্তিটি ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে কাঁঠাল কাঠ দিয়ে নির্মিত হয়। কথিত আছে রাজপরিবারের ইষ্টদেবতা শ্রীগোবিন্দ স্বপ্নে রাজকন্যা বিম্বাবতীকে এই মূর্তি নির্মাণ করার ও পুজো করার অনুমতি দিয়েছিলেন। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে মণিপুর-রাজের বংশধরেরা এখানে এক স্বর্ণচূড় একরত্ন মন্দির নির্মাণ করেন ও বংশপরম্পরায় অনুমহাপ্রভুর সেবাপূজার ব্যবস্থা করেন।

মুক্তধারার ৪৫তম আলোচনাসত্রে এভাবেই বিভিন্ন আঙ্গিকে চৈতন্য জীবনী ও সমকালকে ধরার চেষ্টা করা হয়। আলোচক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় মানুষ চৈতন্যের খোঁজে যেন এক আঞ্চলিক ইতিহাসেরও অবতারণা করেন। চৈতন্যতীর্থ মন্দিরময় নবদ্বীপের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিবর্তনের প্রসঙ্গও উত্থাপিত হয়। চৈতন্য পরবর্তী ৫৮টি গৌণ ধর্মের উত্থান ও সংগঠনের কথাও এদিনের আলোচনার অঙ্গীভূত ছিল। মানুষ চৈতন্যের কথা বলতে গিয়ে আলোচক এভাবেই উৎসব পর্যটনের নগর নবদ্বীপ ও মায়াপুর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দর্শক-শ্রোতা বন্ধুরা খুব মন দিয়ে মুক্তধারার সমগ্র অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। মুক্তধারার আহ্বায়ক সম্পদনারায়ণ ধর, তপনকুমার ভট্টাচার্য এবং দীপাঞ্জন দে দর্শক-শ্রোতা বন্ধুদের এহেন প্রতিক্রিয়ার জন্য সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং আগামীদিনেও সকলকে পাশে থাকতে অনুরোধ করেন। একটি বিষয় না বললেই নয়— ২০২৩ সালে বসন্তের আগমনে মুক্তধারার এই আলোচনাসত্র কৃষ্ণনগরকে নতুন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করলো, যা সহজে ভোলার নয়।
লেখক: আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।
অনেক আশা নিয়ে লেখাটি পড়লাম ‘মানুষ চৈতন্য ‘কে পাবো। কিন্তু আন্যান্য বিষয়ে আলোকপাত হলেও মানুষ কে তেমন ভাবে পেলাম না। শুরু তে বলাও হলো, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ওনাকে ভগবান তৈরি করে বাণিজ্য করছে, স্বাভাবিক ভাবেই ভাবছিলাম মানুষ কে পাবো। হয়তো সল্প পরিসরে অন্যান্য কথায়, স্থানাভাবে মানুষ কে পাওয়া গেল না।
আলোচক সেদিন এক প্রাঞ্জল নিরলস ব্যাখ্যায় মানুষ চৈতন্যের সুন্দর উপস্থাপনা করেন, যা উপস্থিত শ্রোতা দর্শকদের বেশ ভালো লাগে। আর এই লেখাটি সেদিনের আলোচনার একটি প্রতিবেদন মাত্র। এর মধ্যে মানুষ চৈতন্যকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করবেন না। বিষয়টি অনেক গভীর। তবুও পরিবেদনের মধ্যে কোনো অসম্পূর্ণতা পাওয়া গেলে তার দায় অবশ্যই প্রতিবেদকের।
খুব সুন্দর উপস্থাপনা
ধন্যবাদ।
খুব সুন্দর প্রতিবেদন। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল মাননীয় বক্তা শ্রী দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রী চৈতন্যের সমকালীন নবদ্বীপের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা, বিদ্যাচর্চা, তথা নিমাই পন্ডিতের পড়াশোনা, অধ্যাপনা, তুমুল জনপ্রিয়তা, সামাজিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা, প্রেম-বিবাহ-সংসার এবং পরবর্তী জীবনে বিস্তৃত পরিসরে ধর্মান্দোলন, তার ফলশ্রুতি ইত্যাদি সমস্ত বিষয়ের চিত্রল ও বিশ্লেষণী আলোচনা করেছেন, এমনকি তাঁর তিরোধানের পর মূল বৈষ্ণবাদর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অতগুলো লোকায়ত ধর্মশাখা কেন জন্ম নিল তাও বাদ রাখেন নি। তখন আক্ষেপ হয় সামনে বসে সে মনোজ্ঞ আলোচনা শোনার সৌভাগ্যবঞ্চিত হওয়ার জন্য। এই আক্ষেপ জাগিয়ে পাঠককে সরাসরি আলোচনার অঙ্গনে নিয়ে আসার চেষ্টাটিই এ প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য। সে লক্ষ্যে প্রতিবেদক যে সর্বতোসফল তার সাক্ষ্য পাচ্ছি নিজের ভিতরে। এছাড়া সমগ্র আলোচনার একটি রূপরেখাও জলছবির মতো ভেসে উঠেছে তোমার লেখার গুণে। ধন্যবাদ, দীপাঞ্জন।