রাজ্য সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক নির্বাচিত হলেন মহ. সেলিম। রাজ্যের সবথেকে বড় বাম দলটির এই সিদ্ধান্ত এক ঝলক খোলা বাতাসের মতোই রাজ্যবাসীকে নাড়া দিয়েছে। ১৯৬৪ সালে সিপিআই থেকে আলাদা হয়ে যে কমিউনিস্ট দল গড়ে উঠেছিল, তার প্রায় ছয় দশকের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হয়ে থাকতে পারে। অন্তত তেমন সম্ভাবনায় অনেকেই নতুন করে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন সিপিআইএম-এর ব্যাপারে।
সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্মেলন শেষ হলো বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ ২০২২। এবারের রাজ্য সম্মেলন নিয়ে নানা কারণে এ রাজ্যে উৎসাহ ঔৎসুক্য সৃষ্টি হয়েছিল। কারণগুলোও অজানা নয়। স্বাধীনতার পর থেকে নানা ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে কমিউনিস্ট দলকে। নানা আক্রমণ, তীব্র ভুলবোঝাবুঝি, রাজনৈতিক ভাবে বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক সংকটের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্টরা গিয়েছে। আবার সাফল্যও এসেছে অভাবনীয় ভাবে। কিন্তু কখনও যুক্ত সিপিআই বা পরবর্তীতে সিপিআইএম-কে এমন বেকায়দায পড়তে হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সিপিআইএম-এর কোনো আসন নেই, বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্টের সমর্থন সাড়ে পাঁচ শতাংশে নেমেছে, এ যেন কল্পনাই করা যায় না। এখান থেকে কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে সিপিআইএম, এই প্রশ্ন রাজনীতি সচেতন সব মানুষকেই ভাবায়। এখানেই এবারের রাজ্য সম্মেলন নিয়ে বাড়তি গুরুত্ব।

সেলিমকে আমি সাড়ে চার দশক ধরে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। অনেক আগেকার একটা কথা মনে পড়ে। সেটা গত শতকের সত্তর দশকের শেষ ভাগ। রাজ্যে সবে এসেছে বাম সরকার। নেতৃত্বে সিপিআইএম। ছাত্র-যুবদের মধ্যে যারা পার্টি সদস্য, তাঁদের নিয়ে একটা সভার কথা স্মরণে আসছে। দলীয় সেই সভায় আমি ছিলাম, আরও বেশ কয়েকজন ছাত্র-যুব নেতারা ছিলেন, ছিলেন সেলিমও। তখনও বোঝা যায়নি, বামফ্রন্ট সরকার অত দীর্ঘদিন চলবে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পথ কেটে এগোতে হচ্ছিল। তা, সেই সভায় ছাত্র-যুবদের কাজকর্ম নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা হচ্ছিল, পার্টি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ছিলেন বিমান বসু। আমরা অনেকেই কথা বলছিলাম, সেলিমও বলেছিলেন। সভা শেষে পার্টি অফিসে বিমানদা বলেছিলেন, আজকের সভার সবথেকে ভালো বক্তা কে? বলেই তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, সেলিমের কথাই তাঁর সবথেক ভালো লেগেছে।
তখনও হয়তো আনুষ্ঠানিক ভাবে আমি বা সেলিম, কেউই দলের সর্বক্ষণের কর্মী হইনি। যদিও সর্বক্ষণের কর্মীদের মতোই কাজ করতাম। পরে এই শতকের একেবারে গোড়ার দিকে আমি দল চেড়ে দেই, কিন্তু সেই সময়েও সেলিম সম্পর্কে আমার আগ্রহ অটুট ছিল। সেলিমকে দেখতাম, অল্প বয়সেও ধীর স্থির, মুখে হাসি লেগেই থাকত। ছাত্র-যুব আন্দোলনের সময় থেকেই ওঁর সুন্দর রসবোধের পরিচয় পেয়েছি বারবার। কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্নে সবসময় দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছে। দীর্ঘদিন দলের যুব সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংসদে কাটিয়েছেন অনেক বছর। আবার কয়েক বছর মন্ত্রীও থেকেছেন রাজ্যে। সব ভোটেই যে সেলিম জিতেছেন, তা কিন্তু নয়, হেরেছেনও। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে লড়তে পিছুপা হননি। ২০২১ সালে চণ্ডীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে লড়েছিলেন। সেই কঠিন লড়াইয়ের প্রচারে সেলিমের সঙ্গে সাংবাদিক হিসেবে দিন-দুয়েক ছিলাম। দেখেছি অক্লান্ত পরিশ্রম করতে। একদিন, রাত তখন বারোটা-সাড়ে বারোটা হবে, প্রচার শেষে ওই এলাকার সিপিআইএম অফিসে পৌঁছনো গেল। আমরা চলে আসব, তখনও দেখলাম সেলিম তরুণ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছেন, পরের দিনের পরিকল্পনা করছেন। চললাম, বলে আমি বেরিয়ে পড়লাম, সেলিমের সভা তখনও চলছে।

১৯৭৮-১৯৭৯ — এসএফআই-এর নেতা, মৌলানা আজাদ কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক
১৯৯১-২০০১ — ডিওয়াইএফআই-এর সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক
১৯৯০-২০০১ — দু’টি টার্মে রাজ্যসভার সদস্য
২০০১-২০০৪ — এন্টালি কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে বিধানসভার সদস্য, রাজ্যের মন্ত্রী
২০০৪-২০০৯ — উত্তর কলকাতা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে লোকসভার সদস্য, লোকসভায় সিপিআইএম-এর ডেপুটি লিডার
২০১৪-২০১৯ — রায়গঞ্জ কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে লোকসভার সদস্য
২০১৫ থেকে এখন পর্যন্ত – সিপিআইএম-এর পলিটব্যুরো সদস্য
১৭ মার্চ ২০২২ — সিপিআইএম-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত
সাংগঠনিক পরিকল্পনায় সেলিম যেমন দড়, বক্তৃতায়ও তেমনই প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয়। আমাদের বাসস্থান অঞ্চলে প্রয়াত কমিউনিস্ট নেতা রবীন মুখোপাধ্যায়ের স্মরণে প্রতি বছর সভা, দরিদ্র মানুষকে নানা সামগ্রী বিতরণ ইত্যাদি হতো। হতো বলছি একারণে, করোনাকালে বছর দুয়েক সেটা হয়নি। সম্ভবত ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীনবাবুর স্মরণ সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন সেলিম, আমিও ওই সভায় ছিলাম। তখন সবে দ্বিতীয় বারের জন্য কেন্দ্রে মোদি সরকার এসেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ক্রমশ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ঘাড়ে চেপে বসেছে, দেশ সম্পর্কে এতদিনের ধারণাটাই বদলে যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়েই সেদিন কথা বলছিলেন সেলিম। এত মনোগ্রাহী হয়েছিল তাঁর বক্তৃতা, যে আমি কী বলেছিলাম, সেটাই ভুলে গিয়েছি, সেদিনের সভার কথা মনে হলে ওঁর বক্তৃতার কয়েকটি অংশই মনে পড়ে। সেলিম সেদিন এ দেশের সংখ্যালঘুদের অসহায়ত্ব নিয়ে মর্মস্পর্শী বক্তৃতা করেছিলেন।

অনেকেই সিপিআইএম বা জাতীয় কংগ্রেসের ব্যর্থতাকে কয়েকজন নেতার অপদার্থতা বলে দাগিয়ে দিয়ে ক্ষান্ত হতে চান। তাঁদের এটাই বলা যায়, ইতিহাসে তথা দলীয় সাফল্য ব্যর্থতায় ব্যক্তির ভূমিকা অবশ্যই আছে, কোনো ব্যক্তিকে বা ব্যক্তিদের সামনে রেখেই ইতিহাসের নানা ঘটনা আম জনতার সামনে আসে। তবে ব্যক্তির ভূমিকা গৌণ, ক্ষুদ্র। সময়, সংগঠন আর অসংখ্য মানুষই সচেতন অথবা অচেতন পথে ইতিহাস গড়ে চলেন। অভিজ্ঞতার নানা আঁকা-বাঁকা পথে মানুষের উত্তরণ বা অবনমন হয়, হয়েই চলে। এ দেশে কমিউনিস্ট দলের ছোটো হয়ে যাওয়ার পিছনেও সেসব কথা পুরোপুরি সত্য। আজ যখন দুনিয়া জুড়ে দক্ষিণপন্থার দাপাদাপি, যখন সাতদিনে মানুষের মতামত তৈরি করে দিচ্ছে প্রচার মাধ্যম, যখন রোটি-কাপড়া-মকানের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে মন্দির-মসজিদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, তখন সাময়িক ভাবে বামেদের পিছিয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয় মোটেই। এর পাশাপাশি রয়েছে এ রাজ্যে ৩৪ বছর শাসনের অ্যান্টি ইনকাম্বেন্সি ফ্যাক্টর। এসবের সঙ্গে নীতি বিসর্জন না দিয়ে লড়াটা — বলা যত সহজ, করা তত সোজা নয়। সেসব বিশ্লেষণে না গিয়ে রাহুল গান্ধি বা সূর্য মিশ্রকে দোষ দিয়ে দিলে কলমচির লেখার কাজটা সহজ হয়ে যায় বটে, সত্যটা চাপা পড়েই থাকে।
তবু ব্যাক্তির ভূমিকা থাকে। এবারের রাজ্য সম্মেলনের পাওনা এটাই, হাতে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে যোগ্যতমকেই বাছা গেছে। সব সময়েই সিপিআইএম-এ তেমনটা হয়েছে, তা হয়তো নয়। এবারে হয়েছে। কে সম্পাদক হবেন, তা নিয়ে চর্চাও হচ্ছিল কিছুটা। অনেকে ভাবছিলেন, পলিটব্যুরো সদস্য হলেও একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাকে রাজ্য সম্পাদক করবে কি সিপিআইএম? দল সে সাহসটা দেখিয়েছে, নেতাও ঠিকঠাক — অতএব আশা করা যাক।
সেলিম দা World Federation Democratic Youth এর Asia Pasicific এর Convenor হয়েছিলেন। সাফল্যের সাথে সেই দায়িত্ব পালন করছেন।
শক্তি রায়চৌধুরীর দেওয়া তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ।