শেষ ১৬-র ম্যাচ। আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল। সারা বাড়ির এবং পাড়ার যাঁরা বাড়িতে খেলা দেখতে এসেছিলেন, তাঁরা সবাই সেদিন ব্রাজিলের হয়ে গলা ফাটাচ্ছিলেন। একা আমি শুকনো মুখে চুপ করে কোণায় বসেছিলাম। সালটা ১৯৯০, স্কুলের মাঝামাঝি। সেদিন সন্ধেয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা— বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল মুখোমুখি। ব্রাজিলের টিম ভয়াবহ। প্রথমত, ব্রাজিলের নাকি গোলকিপারের দরকারই ছিল না। গোল পোস্টের নীচে তাফারেলকে রাখা হত নেহাত নিয়মরক্ষার জন্য। এর পর তো জিয়রজিনহো, ব্র্যাঙ্কো, দুঙ্গা, মুলার, ভালদো, কারেকা ইত্যাদি আরও কত দিকপাল হাহা হোহোর দল। উল্টো দিকে এক এবং একমাত্র মারাদোনা। চার বছর আগে ৮-৯ বছরের এক বালক এবং কয়েকশো কোটির মন জিতে নেওয়া জাদুকর। এবার ওই টিম যেন আরও কিছুটা নড়বড়ে। প্রথম ম্যাচেই নবাগত ক্যামেরুনের কাছে হেরে কোনওক্রমে নক আউট পর্যায়ে উঠেছে। স্টার গোলকিপার পম্পিদু চোট পাওয়ায় টিমে এসেছেন গাইকোচিও। বারের নীচে গাইকোচিওর দক্ষতা আর মাঝমাঠে মারাদোনার বাঁ পায়ের ভেলকি যে ধারে আর ভারে অনেক এগিয়ে থাকা ব্রাজিলের কাছে কোনও বাধাই নয় সেটা আমার অবুঝ মন কিছুতেই বুঝতে চাইছিল না। অঘটন তো আজও ঘটে …
খেলা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই খেলার পরিণতি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। দুই টিম মিলিয়ে ২১ জন খেলোয়াড়ের জমায়েত আর্জেন্টিনার বক্সে। পারলে গোলকিপার তাফারেলও এসে যোগ দেন। এর ওপর মারাদোনাও যেন তেমন ছন্দে নেই। আর্জেন্টিনার নড়বড়ে ডিফেন্সের ওপর ব্রাজিলীয় দিকপালদের আক্রমণ বার বার আছড়ে পড়ছিল। কারেকার গোটা কয়েক শট বারে লেগে ফিরে এলো। ঘরে তীব্র চিৎকার, কান পাতা দায়। সদ্য পৈতে হয়েছে। মনে মনে প্রাণপণে গায়ত্রী মন্ত্র জপতে জপতে প্রার্থনা করছিলাম কোনও রকমে ফুল টাইম পার করে দাও ভগবান, বাকিটা গাইকোচিও বুঝে নেবে। ৮০ মিনিট ওই ভাবেই কাটল। অবস্থার একটুও উন্নতি হল না। ক্রমাগত ঘোল খেতে থাকা আর্জেন্টিনা যে একটাও গোল খেল না, এটাই অনেক।

হঠাৎ … হঠাৎ ঝটাপটির মধ্যে মারাদোনার পায়ে বল। তীব্র গতিতে, সম্ভবত উসাইন বোল্টকে হারিয়ে দেওয়া গতিতে তিনি উড়ে গেলেন ব্রাজিলের গোলের দিকে। এক এক করে কেটে গেলেন আলেমাও, দুঙ্গা … আরও তিন জন। অন্য পাশ দিয়ে সবার নজর এড়িয়ে একই গতিতে উঠছিল সোনালি রঙের লম্বা চুলওয়ালা এক ছোকরা। মারাদোনাকে ব্রাজিলের প্লেয়াররা যখন প্রায় ধরে ফেলেছেন, সেই সময় গতি অনেক কমিয়ে হঠাৎই বলটা ওপাশের ওই অনামী ছোকরার দিকে বাড়িয়ে দিলেন তিনি। কমেন্টেটর চিৎকার করে উঠলেন, ক্যানিজিয়া ক্যানিজিয়া …
মাঠের মধ্যে ব্রাজিলের ১১ জন খেলোয়াড়, স্টেডিয়ামের ৬০ হাজার দর্শক আর আমাদের বাড়িতে টিভির সামনে বসে থাকা ১৫-২০ জন লোককে একেবারে চুপ করিয়ে দিয়ে তাফারেলের পাশ দিয়ে বলটা গোলে ঠেলে দিলেন ক্লদিও ক্যানিজিয়া। পায়ের নীচে পড়ে মার খাওয়া মানুষটা যখন উঠে দাঁড়িয়ে পাল্টা মার দেয়, তার কী অনুভূতি হয় সেটা সেদিনই প্রথম বুঝেছিলাম। যদিও কয়েক দিন পর ফের একই অভিজ্ঞতার স্বাদ দিয়ে জীবন্ত ঈশ্বর বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, একই অসম্ভব বার বার ঘটাতে পারেন বলেই তিনি মারাদোনা।
সেমি ফাইনালে দেখা ইতালির মজবুত টিমের সঙ্গে। বাকি কারও কথা বলব না। ইতালির গোল কিপার ওয়াল্টার জেঙ্গা ওই বিশ্বকাপে একটাও গোল হজম করেননি। এই ম্যাচেও যে করবেন, এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। পরিসংখ্যান বলছে, ৫২০ মিনিট গোল না খাওয়া জেঙ্গা বিশ্বকাপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলি। স্কুলে বুক ঠুকে বলে এসেছিলাম, ৫২০ মিনিট গোল খায়নি তো কী হবে? ৫২১তম মিনিটে খেয়ে ফেলবে। স্কুল পড়ুয়ার সেই অহঙ্কার সম্ভবত শুনে ফেলেছিলেন ঈশ্বর। মুচকি হেসে বলেওছিলেন ‘তথাস্তু’।
বলতে ভুলে গেছি ইতালির টিমে ছিলেন ওই বিশ্বকাপের টপ স্কোরার সুযোগ সন্ধানী সালভাতোর স্কিলাচি।
খেলা শুরুর ২০ মিনিটের মধ্যেই ইতালি এগিয়ে গিয়েছিল স্কিলাচির গোলে। সেদিন কিন্তু একটুও টেনশন ছিল না। মন বলছিল একটা ভুল করলেই ইতালীয় ডিফেন্স খান খান হয়ে যাবে ঐশ্বরিক শিল্পে। তার জন্য অবশ্য প্রায় ৭০ মিনিট অপেক্ষা করতে হল।
কর্নার পেল আর্জেন্টিনা। কিক করতে এলেন ভগবান নিজে। এয়ারোডাইনামিক্সের যাবতীয় সূত্র কাজে লাগিয়ে একটা শট। ইতালির বিখ্যাত ডিফেন্স চিরে বাঁক নিয়ে যেখানে পড়ল, তার ঠিক নিচেই – হ্যাঁ আগের ম্যাচের মেঘনাদ ক্যানিজিয়া। কেউ কেউ পরে বলেছিল, ক্যানিজিয়া মাথা না ঠেকালেও ওটা নাকি গোলই হত। লখিন্দরের বাসরঘরেও ফুটো ছিল, জেঙ্গার ডিফেন্স কোন ছার। ১-১ এর খেলা গড়াল পেনাল্টি পর্যন্ত। ইতালির দুই দিকপাল বারেসি আর দোনাদুনি পেনাল্টি মিস করলেন। ভগবানের শটেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়।
গলা চিরে গিয়েছিল। দু দিন আওয়াজ বেরোয়নি। কী করব, মারাদোনার হয়ে গলা ফাটানোর দায়িত্ব আমিই নিয়েছিলাম যে!