পুরনো কলকাতায় বিত্তবানদের নিয়ে একটা চালু কথা আছে যে, এরা বুলবুলির লড়াই, নেশাভাঙ আর ইয়ারদের নিয়ে বারাঙ্গনা বিলাসে সব টাকা উড়িয়ে দিয়েছেন। এ কথা সবটা ঠিক নয়। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, রাজা রাজেন্দ্রনাথ মল্লিক বাহাদুর। পুরনো কলকাতার ইতিহাসে যিনি রাজেন মল্লিক নামেই পরিচিত। তিনি ছিলেন শিল্পরসিক, ভালোবাসতেন বন্যপ্রাণ। এই ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে তিনি যেন অতীত ও বর্তমানকে একসঙ্গে মিলিয়েছেন। মধ্য কলকাতার ৪৬ নম্বর মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মার্বেল প্যালেস জু তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

শুধু বিত্তের প্রদর্শনী নয়, রাজেন্দ্রনাথ মল্লিক ছিলেন যাকে বলে এক সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব। দেশ বিদেশের প্রাচীন শিল্পকলার চর্চা ও শিল্পকর্ম সংগ্রহ করে শুধু অতীতেই বিচরণ করেননি তিনি, বেঁচেছিলেন বর্তমানেও। মার্বেল প্যালেসের ঠিক পাশেই গড়ে তুলেছিলেন একটি বন্যপ্রাণ সংরক্ষণশালা ও পাখিরালয় (Aviary)। তার উদ্দেশ্য ছিল শহরের মানুষজনকে বাংলার প্রাণীবৈচিত্র সম্পর্কে অবহিত করা। রাজেন্দ্রনাথ ভাবতেন, ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে এই আশ্চর্য জু’তে এসে পশুপাখির জীবনধারা চিনতে শিখবে মানুষ, তাদের ভালোবাসবে। কতদিন আগে পশুপাখির সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ গড়ে তোলার এই আধুনিক ভাবনা ভেবেছিলেন তিনি। মার্বেল প্যালেস জু দেশের প্রাচীনতম চিড়িয়াখানা। ১৮৩৫ সালে তৈরি হয়েছিল মার্বেল প্যালেস আর ১৮৫৪ সালে তৈরি হয় মার্বেল প্যালেস জু। সেকেলে বিত্তবানদের প্রাইভেট জু নয়, শুরু থেকেই এই জু’র দরজা ছিল সাধারণ মানুষদের জন্য খোলা। ৫৯৪২ একর জমি জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই জু’তে এখনও টিকিট ছাড়াই প্রবেশ করা যায়।

নিজের এই উদ্যোগকে রাজেন্দ্রনাথ কখনোই স্বার্থপর দৈত্যের বাগান করে তোলেননি। তিনি ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভা। মার্বেল প্যালেসকে শুধুই রুবেনস এর দুষ্প্রাপ্য চিত্রকলা ও দেশ বিদেশ থেকে সংগৃহীত কিউরিও দিয়ে সাজাননি তিনি, সংলগ্ন জু’টিকেও করে তুলেছিলেন বাংলার প্রাণী বৈচিত্রের এক জীবন্ত গ্যালারি। মার্বেল প্যালেস ও তার সংলগ্ন এলাকাটি হয়ে উঠেছিল শিল্পকলা ও বাংলার প্রাণীবৈচিত্রের এক আশ্চর্য প্যাকেজ।
রাজেন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তাঁর এই জু’র মধ্যে দিয়ে শহরের মানুষদের বন্যপ্রাণ সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে, তারাও যে পৃথিবীতে আছে সেকথা জানাতে। Conservation and breeding of endengered species ছিল তাঁর প্রাইভেট জু গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য। এই চিড়িয়াখানাটিও গড়ে উঠেছিল একটু একটু করে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষদের থেকে নানারকম পশুপাখি উপহার পেতেন রাজেন্দ্রনাথ। আবার কিছু সংগ্রহ করেছিলেন তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে। হোয়াইট পিকক ছিল মার্বেল প্যালেস জু’র এক অন্যতম আকর্ষণ। এটা তাঁকে দিয়েছিলেন অযোধ্যার নির্বাসিত নবাব ওয়াজির আলি শাহ। এছাড়াও তিনি আরও পশুপাখি ও দুষ্প্রাপ্য শিল্পসামগ্রী নবাবের কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন।

মার্বেল প্যালেস জু’র আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল, পশুপাখি রাখার ঐতিহ্যবাহী খাঁচা ও এনক্লোজারগুলি। এখন এমন খাঁচা, এনক্লোজার আর কোন জু’তে দেখা যায়না। এসবই তাঁর পশুপাখিদের প্রতি যত্ন ও মনোযোগের প্রমাণ। মার্বেল প্যালেস জু এখন মূলত একটা Aviary । এখানে আছে peacock, toucans, storks, crane, antelope, pelican, নানাধরণের কাকাতুয়া, পাহাড়ি ময়না ইত্যাদি প্রায় ১৯ রকমের পাখি। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে আছে mongoose, civet cat । এছাড়াও আছে antelope, hornbill । মার্বেল প্যালেস জু’তে আপনি দেখবেন শজারু, কাঠবিড়ালি, কচ্ছপ, barking deer, spotted bear আর বানর। একসময় এই জু’র সাথে যুক্ত ছিলেন রতনলাল ব্রহ্মচারীর মত ব্যাঘ্র বিশেষজ্ঞ। তখন এখানে বাঘও ছিল।

কালের যাত্রায় বদলেছে মার্বেল প্যালেস জু’র চেহারা। পরিচালন কাঠামো এখন আর আগের চেহারায় নেই। দেশের সব জু’কেই এখন বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী স্বীকৃত হতে হয়, প্রেসক্রাইবড স্ট্যান্ডার্ড না মানলে জু চালানোর অনুমোদন বাতিল হতে পারে। ১৯৯১ এ চালু হওয়া প্রাইভেট জু অ্যাক্ট অনুযায়ী এখন এধরণের জু’গুলির পরিচালনা ও পরিকাঠামোগত ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয়।
নিছক ভালোবেসে জু গড়েননি রাজেন্দ্রনাথ মল্লিক। তিনি ছিলেন এব্যাপারে রীতিমত পড়াশোনা করা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষ। অরিনথোলজি বা পক্ষীবিজ্ঞানের রীতিমত বিশেষজ্ঞ ছিলেন তিনি। বেলজিয়ামের Antwerp zoological society তাঁকে স্থায়ী সদস্য ও পরামর্শদাতা নিযুক্ত করেছিল। Melbourne zoological society তাঁকে দিয়েছিল সান্মানিক ডিপ্লোমা।

দুঃখের কথা আজকের প্রজন্মের কাছে রাজেন মল্লিক মানে শুধু মার্বেল প্যালেস। পশুপাখিদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা ভুলে গেছে মানুষ। অথচ এই মানুষটির দেওয়া জমিতেই তৈরি হয়েছিল আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রথম বাড়ি ও এনক্লোজার। এর নির্মাণ ব্যয়ও তিনি বহন করেছিলেন। পরে তিনি এটা সরকারকে দান করেন। প্রায় ১২ বছর আগেও আলিপুর চিড়িয়াখানার সামনে বন্যপ্রাণের প্রতি রাজেন মল্লিকের ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে দাড়িয়েছিল ‘মল্লিক হাউস’। এখন সেটি ভেঙে তৈরি হয়েছে চিড়িয়াখানার নতুন বাড়ি ও এনক্লোজার। আলিপুর চিড়িয়াখানায় তাঁর অবদানের স্মৃতিটুকুও আজ আর নেই। শুধু জেগে রয়েছে কংক্রিট জঙ্গলের মধ্যে এক মন ভালো করা জায়গা – মার্বেল প্যালেস জু।