‘আবার একটা সার্কাস জমানোর চেষ্টা হচ্ছে মরিচঝাঁপি নিয়ে।’ – মধুময় পাল
১৯৪৭ উত্তর ইতিহাসে সর্বাধিক আসন পাওয়ার পরে, ভারতীয় জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং জেলা কমিটিতে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ছাড়িয়ে তীব্র মূষলপর্ব শুরু হয়েছে। এক নেতা নেতাকে মারছেন, জেলা কার্যালয়ে বিক্ষুব্ধরা তালা ঝুলিয়ে দিচ্ছেন; কুৎসা করে পোস্টার পাল্টা পোস্টার, ফ্লেক্সে রাজ্য ছয়লাপ; রাজ্য, জেলা কমিটিতে স্থান না পাওয়া নেতাদের উদ্যোগে পিকনিক রাজনীতি চলছে রাজ্যজুড়ে; রাজ্য কমিটিতে সামাল সামাল রব। সার্বিক এই ক্ষোভ থেকে বাঁচতে, ভারতের সব থেকে ধনী দলের রাঝ্য কমিটির থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ভরসা বাম আমলে কলঙ্কিত মরিচঝাঁপি। মাঝ সমুদ্রে জাহাজডুবির পর ডুবন্ত সেনা যেমন হাতের সামনে খড়কুটো যা পায় সে সব ধরে বাঁচতে চায়, সেই দশা বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের নেতাদের। তাদের খড়কুটো মরিচঝাঁপি দিবস। ২০২২-এর আগে কবে তারা ৩১ জানুয়ারি মরিচঝাঁপি দিবস পালন করেছেন বোধহয় দলের নেতাদেরও ঠিক মনে নেই। তবুও মরিয়া বিজেপি নেতারা রাজ্য বিজেপিতে চলতে থাকা তুমুল মুষলপর্ব আর নমঃশূদ্রদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন না করার অভিযোগ থেকে বাঁচতে নিকুম্ভিলা যজ্ঞ অর্থাৎ মরিচঝাঁপি দিবস পালনের উদ্যম নিয়েছেন।

বিজেপির মূষলপর্ব
রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ গুজরাট এবং মহারাষ্ট্রে আদিবাসী, নমশূদ্রদের নিয়ে যে পরীক্ষানীরিক্ষা শুরু করেছিল, তার ফলে সংঘের রাজনৈতিক দল বিজেপিতে এখন ব্রাহ্মণ-বানিয়ারা তুলনামূলকভাবে কোণঠাসা, প্রধানমন্ত্রী হলেন নমঃশূদ্র। উত্তর প্রদেশের মমো নেতা কল্যাণ সিংহ মুখ্যমন্ত্রী হন। আদতে নমঃশূদ্রদের হাত দিয়ে সংঘ তার ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং ইসলামোফোবিক এজেন্ডাগুলো যেমন দলিত দমন, মুসলমান হত্যা, মসজিদ ধ্বংস ইত্যাদি সফল করিয়ে নিচ্ছে। নমঃশূদ্রদের শম্বুক হত্যাকারী রামের উপাসক বানিয়েছেন সঙ্ঘীরা। সংঘীদের প্রিয় লব্জ মেরুকরণের পরীক্ষা অনেকটাই সফল। সেই পরীক্ষা আর নিরীক্ষার ওপর ভর দিয়ে বাংলায় নমঃশূদ্র, মতুয়া ভোট দখল করে বিজেপি আশাতীত সংখ্যার লোকসভার আসন জিতেছে ২০১৯এর নির্বাচনে। কলকাতায় বিদ্যাসাগরকাণ্ডের ফলে সেই ধাক্কা তৃণমূল কিছুটা সামলাতে পেরেছে, না হলে তাদের লোকসভার তরী জলাঞ্জলী যেতে সময় লাগত না। বাঙলা থেকে দুই অঙ্কের আসন পেয়েও একজনও পূর্ণমন্ত্রী পায় নি বিজেপির বাঙলা ব্রিগেড। তারপরেও ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে ৮০টার কাছাকাছি আসন পায়। এই সাফল্যের একটা বড় কারন মতুয়া এবং অন্যান্য নমঃশূদ্র ভোটের বড় অংশ বিজেপিতে যাওয়া।

পর পর দুটি নির্বাচনে দলকে চরম সাফল্য এনে দেওয়া সত্ত্বেও বিজেপির মতুয়া নেতাদের বঞ্চিত করা হল। তাদের সব থেকে বড় মাথাব্যথা সিএএ-এর আইনের বিধি/রুল তৈরিতে কেন্দ্রিয় বিজেপি নেতাদের তীব্র অনাগ্রহ। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি কর্মীদের ২০০ আসনের খোয়াব দেখানো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিজেপির মতুয়া নেতৃত্বেকে করোনা দোহাই দিয়ে আশা দিয়েছিলেন নির্বাচনের পরে ফেব্রুয়ারি নাগাদ রুল ফ্রেম হয়ে যাওয়ার। নির্বাচনের পরে মতুয়া নেতৃত্বের প্রশ্ন ছিল করোনার মধ্যে যদি তিনটে কৃষি বিল তৈরি হয়ে তার রুল ফ্রেম হয়ে যেতে পারে, এবং কৃষক আন্দোলনের চাপে সেই তিনটে বিল উঠেও যেতে পারে, তাহলে মতুয়া স্বার্থবাহী সিএএ-এর বিলের বয়স এক বছরের বেশি হওয়া সত্ত্বেও রুল ফ্রেম করতে কোথায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে? বিজেপির কেন্দ্রিয় নেতৃত্ব করোনার বাহানা ছাড়া প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেন নি; তারা জানতেন সমস্যাটা সত্যি সত্যি আইনেই লুকিয়ে আছে; ফলে নির্বাচনের আগে অমিত শাহের বেশ কয়েকটা প্রচার সমাবেশ বাতিল করতে হয়েছে। দল একে রুটিন সুরক্ষার সমস্যা বললেও এটা যে মতুয়া ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, সেটা বলাই বাহুল্য। বিধানসভা ভোটের আগে মতুয়াদের এই উদ্বেগ আন্দাজ করে এবং সেই ক্ষোভ সামাল দিতে না পেরে উদ্ভ্রান্ত প্রাক্তিন বিজেপির বাঙলা প্রধান দিলীপ ঘোষ সক্ষোভে বলেছিলেন বিজেপির মতুয়া ভোট প্রয়োজন নেই। এই বিবৃতির ফল কিছুটা বিধানসভা নির্বাচনে পড়েছিল সন্দেহ নেই।
মতুয়ারা খুবই সংগঠিত ধর্মীয় গোষ্ঠী। বহুকাল ধরে তারা রাজনীতিতে আছেন। একদা পি এন ঠাকুর নিরপেক্ষ সাংসদও ছিলেন। নাগরিকত্বের দাবিতে তারা বহুকাল লড়ছেন। তার ফল সাম্প্রতিক সিএএ আইন। বিজেপির সিএএ রূপায়ণ আশ্বাসের চক্করে মতুয়া সঙ্গঠনে শক্তিশালী তৃণমূল গোষ্ঠী ক্রমশ প্রান্তিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়; সেই স্থান দখল নেয় বিজেপি নেতারা। কিন্তু যত দিন যেতে থাকে মতুয়ারা বুঝতে পারেন কেন্দ্রে একজন মতুয়া মন্ত্রী পেলেও তাদের মূল দাবি সিএএ রুল ফ্রেম করা থেকে পিছলে যেতে চাইছে কেন্দ্রিয় সরকার, ফলে বিজেপিও। যে আইন হয়েছে, সেই আইনে আদৌ কোটি মতুয়া তো দূরস্থান কয়েকশ মতুয়াকে অমিত শাহের মন্ত্রক আদৌ নাগরিকত্ব দিতে পারবে কীনা সে বিষয়ে তারা যথেষ্ট চিন্তিত। ভূমিস্তরে থাকা মতুয়ারা বুঝতে পারছেন তাদের সামনে নাগরিকত্বের আশ্বাস ঝুলিয়ে নেতারা ভোট দেওয়া-নেওয়ার, মন্ত্রীত্ব পাওয়ার খেলা খেলছেন। তৃণমূলস্তরের মতুয়ারা সমস্যা বুঝতে পেরে, সমস্যা সমাধানে চাপ দেওয়া শুরু করেছেন মাঝারি নেতাদের। মতুয়া ধর্মীয় থাকবন্দীর মাঝারিস্তরের বিজেপিপন্থী নেতারা চাপ সামলাতে না পেরে তারা চাপ দিতে শুরু করেছেন মতুয়া শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা মন্ত্রী এবং অন্যান্যদেরকে।

বিজেপির হাতে সবেধন নীলমণি বাহানা করোনা — বিজেপি জানে রুলস ফ্রেম হলেই আতান্তরে পড়বে তারা। কারন অমিত শাহ পার্লামেন্টে ক্রনোলজি বোঝানোর দিনে যে আইন পাস করেন, সেই আইনে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুকে নাগরিকত্ব দেওয়া মুশকিল। তাছাড়া আইন যা হয়েছে, সেই আইন কার্যকর করতে বিধি যদি আদৌ কোনও দিন তৈরিও হয়, সেটা মতুয়াদের পক্ষে আদৌ যাবে কী না, এ তথ্যও প্রবল ধোঁয়াশায়ভরা। বিজেপি আর বিজেপিপন্থী মতুয়াদের ওপর সমর্থকদের নিরন্তর চাপ বাড়ছে। উদ্বেগ নিরসনে বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপি নেতৃত্ব পাঁচ সঙ্ঘী নেতাকে বাংলায় প্যারাশুটিং করে এনেছিলেন। তারা যথাসাধ্য ভোট বৈতরণী উৎরে আবার দিল্লিমুখী হয়েছেন।
বিধানসভায় ৮০-র কাছাকাছি আসন জেতা বঙ্গ বিজেপিকে কেন্দ্রীয় বিজেপির উপহার হল ভোটে জেতানো রাজ্য প্রধানকে ছেঁটে ফেলে নতুন রাজ্য প্রধান মনোনীত করে নিয়ে আসা। তিনিও পূর্বসূরীর সময়ের নমো সমস্যা সমাধানের ইঙ্গিতবাহী একটা পরিকল্পনা মাথায় রেখে এমন নতুন রাজ্য এবং জেলা কমিটি তৈরি করলেন সেখানে মতুয়াদের ঝেঁটিয়ে বিদেয় দেওয়া হল। সিএএ রূপায়নের শর্তে বঙ্গ বিজেপিকে দু-দুবার ভোট বৈতরণী পার করিয়ে দেওয়া বিজেপির মতুয়া নেতারা কেন্দ্রীয় মতুয়া মন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রত্যাঘাত করলেন। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রূপান্তরিত হল মুষলপর্বে। গোদের ওপর বিষফোঁড়া গজাল পুরোনো নেতাদের রাজ্য কমিটি থেকে বহিষ্কার করায়। নতুন রাজ্য কমিটির বহিষ্কৃত বিক্ষুব্ধ নেতারা, বিক্ষুব্ধ মতুয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে জুড়লেন। রাজ্য বিজেপিতে দলীয় কোন্দল নামক মূষলপর্ব সামলানোয় অনভিজ্ঞ নতুন রাজ্য সম্পাদকের সামাল সামাল অবস্থা। তো এই অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্যে হাতে গরম ইস্যু দরকার। বাংলার মানুষ ধর্মীয় ভেদ খুব একটা খায় না সেটা বুঝেগিয়েছিলেন নেতারা। তাই নতুন কমিটির বুদ্ধিমান নেতারা বিজেপির রাজ্য এসসি মোর্চাকে ঠাণ্ডাঘর থেকে ডেকে তুলে সমস্যা সমাধানে আশু নতুন পথ চাইলেন।

বিজেপির নিকুম্ভিলা যজ্ঞ
দলের এসসি মোর্চার নিদান ছিল নিকুম্ভিলা দেবীর যজ্ঞ করা। তারা এই পরিকল্পনায় দক্ষিণ ২৪ পরগণার কুমিরমারিতে মরিচঝাঁপি দিবস পালনের ব্যবস্থা করলেন। তাদের ধারণা হল এই এক ইস্যু লাঠিতেই দুই সাপ মরবে, প্রথমত মাথা গরম মতুয়াদের মরিচঝাঁপি ইস্যুতে কিছুটা হলেও ঠাণ্ডা করা যাবে আর নতুন একটা ইস্যু নিয়ে বাজার গরম করা যাবে।
অথচ মরিচঝাঁপিতে যে সব ঘটনা ঘটেছিল তা নিয়ে দলের রাজ্য প্রধান তো দূরস্থান, রাজ্য এসসি মোর্চাকে খুব একটা সরব হতে দেখা যায় নি। রাজ্য সরকার কেন বাম আমলের এই গণহত্যাকাণ্ডের কোনও সুরাহা করছেন না, কেন বাম আমলের অপ্রকাশিত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করছেন না, এই দাবিতে যখন প্রবন্ধ লেখক এবং আরও কয়েকজন একটি গোষ্ঠী তৈরি করে ২০১৬তে, ২০১৭য়, ২০১৮য় নিয়মিত আন্দোলন করেছে, সে সময় মরিচঝাঁপির দাবি নিয়ে একজনও বিজেপি নেতার টিকি ছিল না; তারা যেমন আদৌ মরিচঝাঁপিতে কী ঘটেছিল সেটা জানেন কি না সন্দেহ, আর মরিচঝাঁপির কোন কোন দাবিতে মরিচঝাঁপিতে খুন, অত্যাচারিত হওয়া উদ্বাস্তুদের উত্তরপ্রজন্ম আন্দোলন করছেন, সেটাও জানেন কী না বলা মুশকিল।

আজ বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যে যখন মূষলপর্ব চলছে, ২০০ আসনের খোয়াব দেখানো দিল্লিতে বসা অসহায় শ্রীকৃষ্ণ প্রধানমন্ত্রী তার দলের বাঙলা কমিটির মারামারির সঙ্গে দেখছেন, কীভাবে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মত নিকুম্ভিলা দেবীর যজ্ঞগৃহে মরিচঝাঁপি ইস্যুকে খুঁড়ে বার করার উদ্যম নিচ্ছেন তার দলের উদ্ভ্রান্ত নেতারা। এই ইস্যু খুব বেশিদিন টানার মত সাংগঠনিক, তাত্ত্বিক জোর এবং ইচ্ছা আদৌ বিজেপির আছে কী না সন্দেহ। প্রখ্যাত মরিচঝাঁপি গবেষক সাংবাদিক মধুময় পাল তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন ‘আবার একটা সার্কাস জমানোর চেষ্টা হচ্ছে মরিচঝাঁপি নিয়ে।’
আমরা যারা এই গণহত্যাগুলোর বিহিত চাই তাদের পক্ষে বাংলার প্রধান বিরোধীপক্ষের এই সার্কাস দেখা আর সরকারি দলের উদাসীনতা দেখা ছাড়া আর কীই বা আছে।