গ্রামীণ অর্থনীতিতে অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে গাঁদা। গাঁদা কেবল দু-হাত ভরে পুষ্পাঞ্জলি দেবার জন্য নয়। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণেও প্রয়োজন গাঁদার। তাই গাঁদাফুল চাষ করে আর্থিক মুনাফা ঘরে তুলতে পারেন চাষিরা। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এখন গাঁদাফুলের চাষ হচ্ছে। বিভিন্ন জাতের গাঁদার চাহিদা বাড়ছে। রাজ্যের গাঁদাফুল যাচ্ছে বিদেশেও। কদর বাড়ছে। বাজারে এর দামও আছে। এই চাষে চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে সরকারিভাবে। এগিয়ে এসেছে সরকারও। প্রসঙ্গত, এ রাজ্যে কৃষি অর্থনীতিতে গাঁদাফুল চাষের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বাড়িতে বাড়িতে অনেক মানুষই সৌন্দর্য ও শখের জন্য চাষ করেন। আবার কেউ কেউ বাড়িতে নিত্য পুজোর জন্য চাষ করতে ভোলেন না। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে এই ফুলের চাষ হচ্ছে। রপ্তানি হচ্ছে, আর্থিকভাবে চাষিরা শক্তপোক্ত হচ্ছেন।

তাই সরকারও এগিয়ে এসেছে চাষিদের বিভিন্নভাবে সহায়তা দানে। গোলাপ, রজনীগন্ধা, জবা, গ্লাডিওলাস-এর পাশাপাশি বাজারে গাঁদার চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। এখন দেশের বিভিন্ন রাজ্য ছাড়াও, প্রতিবেশী দেশেও গাঁদার কদর বেড়েছে, রপ্তানি হচ্ছে গাঁদা। তাই দিনকে দিন এর ক্রমশ চাহিদা বাড়ছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে গাঁদার চাষও হচ্ছে। হিমঘরে এই ফুল সংরক্ষণও করা হচ্ছে। তাছাড়া শুকনো গাঁদাফুলও কাজে লাগানো হচ্ছে। পোলট্রি ও গোখাদ্যেও শুকনো গাঁদাফুল ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই শুকনো গাঁদাতে আছে রাইবোফ্ল্যাভিন (ভিটামিন বি-২) যা পশুখাদ্যের পুষ্টিগুণ বাড়ায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। এছাড়া জৈবিক পদ্ধতিতে জমিতে নিমাটোড নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কৃষি বিশেষজ্ঞরা গাঁদাফুল চাষের পরামর্শ দিচ্ছেন।
এ রাজ্যে — মূলত পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, হাওড়া, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ইত্যাদি জেলায় গাঁদা ফুলের চাষ হচ্ছে। তবে অন্যান্য জেলাতেও চাষিদের মধ্যে গাঁদা চাষের আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একটাই উদ্দেশ্য আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খোঁজা। প্রধানত তিন রকমের গাঁদার বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে এ রাজ্যে। প্রথমত আফ্রিকান বা হলুদ গাঁদা। এর আবার বিভিন্ন প্রজাতি আছে। যেমন গোল্ড কয়েন, গোল্ডেন ইয়ালো, সানসেট-জায়েন্ট ইত্যাদি। আর দেশি জাতগুলো হল — পুসা, বাসন্তী, ভাঙর ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, ফ্রেঞ্চ বা রক্তগাঁদা। এরও বিভিন্ন প্রজাতি আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল — জিপসি, রেড চেরী, বলেরো, হানিকম্ব, স্টার ডাস্ট ইত্যাদি। তৃতীয়ত, হাইব্রিড গাঁদা। এর প্রজাতি গুলি হল — ইনকা, বিউটি, রয়াল ইত্যাদি।

বিশেষজ্ঞদের মতে এই ফুলের চাষ করতে গেলে কিছু পদ্ধতি মেনে চলতেই হবে। তবেই ভাল ও গুণগত মানের ফুল উৎপন্ন হবে। মনে রাখতে হবে সাধারণত খুব গরমের সময় এই ফুল চাষ করা যাবে না। তবে গরম বাদ দিয়ে বছরের সব সময় চাষ করা যেতে পারে। উঁচু ও উপযুক্ত জল নিকাশি জমিতে গাঁদা চাষ করতে হবে। কারণ গাঁদাগাছ জমা জল একদম সহ্য করতে পারে না। এবার যেটা লক্ষ্য রাখতে হবে তা হল মাটিতে জৈব সার বেশি থাকলে ফুলের গুণগত মান বৃদ্ধি পায়। ফুল অনেকদিন ধরে সতেজ থাকে এবং ফুলও পাওয়া যায় বেশিদিন ধরে। জৈব সারের সঙ্গে অ্যাজোটোব্যাক্টর মিশিয়ে প্রয়োগ করলে ভাল উৎপাদন সম্ভব হবে। রাসায়নিক সার হিসেবে নাইট্রোজেন, ফসফেট ও পটাশের পরিমাণ ১৭৫ : ১০০ : ১০০ কেজি প্রতি হেক্টরে প্রয়োগ করতে হবে।
উল্লেখ্য, জুলাই থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে চারা তৈরি করতে হবে। বীজ থেকে বা ডালকলম বা কাটিং থেকে চারা তৈরি করা যায়। বীজ থেকে গাঁদা চাষের জন্য বিঘা প্রতি ২০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন। আর যেটা মনে রাখতে হবে তা হল — গাছে বেশি সংখ্যায় ফুল আনার জন্য গাছের ডগা কেটে দিতে হবে। তার ফলে গাছের ডালপালার সংখ্যা বাড়বে। এতে ফুল হবে বেশি। যখন গাছে কুঁড়ি আসবে, সেসময় নিয়মিত সেচ দিতে হবে। জমিতে রসের টান পড়লেই ফুল উৎপাদনে মার খাবে। সেই সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে রোগপোকার আক্রমণ। এ জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই উন্নত গুণমানের ফুল উৎপাদন সম্ভব হবে। যার ফলস্বরূপ দেশি-বিদেশি বাজারে কদর বাড়বে। লাভবান হবেন চাষিরা, শক্তপোক্ত হবে আর্থিক শিরদাঁড়া।