“আমার বন্ধু নীরদ আমার সঙ্গে মেসেই থাকে। দুজনেরই অবস্থা সমান। কলকাতা থেকে বেরুনো হয়নি কোথাও অনেকদিন। রেলে কোথায় যাওয়া যায় বেশ ভেবেচিন্তে দেখলুম। দূরে কোথাও যাওয়া চলবে না, তত পয়সা নেই হাতে। সুতরাং আমি পরামর্শ দিলাম, মার্টিনের ছোট রেলে চলো কোথাও যাওয়া যাক। সে বেশ নতুন জিনিস হবে এখন। হাওড়া ময়দান স্টেশন থেকে ছোট লাইনে চেপে আমরা জাঙ্গিপাড়া, কৃষ্ণনগরে রওনা হলুম।”
অভিযাত্রিক গ্রন্থে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মার্টিন রেলে চড়ার যে বর্ণনা দিয়েছেন, ন্যারোগেজ লাইনের সেই মার্টিন রেলের সূচনা হয়েছিল মার্টিন এন্ড কোম্পানির টমাস অ্যাকুইনাস মার্টিন আর তৎকালীন প্রখ্যাত বাঙালী শিল্পোদ্যোগী রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জীর হাত ধরে। জন্ম নিয়েছিল মার্টিন লাইট রেলওয়েজ্, যাত্রীদের মুখে মুখে যা পরিচিত হয়েছিল মার্টিন রেল নামে। পরবর্তীকালে রাজেন্দ্রনাথের পুত্র বীরেন্দ্রনাথ মুখার্জী মার্টিন রেলের আরো সম্প্রসারণ করেছিলেন। প্রায় সাত দশকব্যাপী আয়ুষ্কালে মার্টিন রেল স্পর্শ করেছিল বাঙালীর মন। তার চিহ্ন রয়ে গেছে সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, ছড়ায়, মুখে মুখে চলে আসা কৌতুক কাহিনীতে।

ভারতে তখন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানী রেল পরিবহন শুরু করেছে। তাই মার্টিন কোম্পানী বেছে নিয়েছিল বাংলার সেই সব অঞ্চল, যেখানে রেল পরিসেবা নেই। ১৮৯৭ সালে মার্টিন রেল প্রথম চলেছিল হাওড়া ও হুগলী জেলায়, হাওড়া-আমতা শাখা ও হাওড়া-শিয়াখালা শাখাতে। বিভূতিভূষণ জাঙ্গিপাড়া যাওয়ার জন্য যে গাড়িতে চেপেছিলেন, সেটি ছিল হাওড়া-আমতা লাইনের একটি উপশাখার ট্রেন।
ছোট ছোট ছয়-সাত কামরার মার্টিন রেলের চলার এক অলস গতিমন্থরতা ছিল, যা তৎকালীন বাঙালী জীবনের অলস-মন্থর জীবনযাত্রার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে গিয়েছিল। শিবরাম চক্রবর্তীর লেখায় তার পরিচয় আছে — “হাওড়া-আমতার গাড়ি চলতে চলতে থামে, থামতে থামতে চলে, যখন যেমন খেয়াল— এই তার চিরকালের রেওয়াজ, এই নিয়ে তার যাত্রীরা কোনদিন মাথা ঘামায় না।” মার্টিন রেলের মন্থর গতি নিয়ে অনেক কৌতুকগল্প একসময়ে মুখে মুখে ঘুরত। অতিরঞ্জনের রঙ মেশানো থাকলেও এই সব ‘গপ্পে’ মার্টিন রেলের চলার গতির একটা আভাস পাওয়া যায়। যেমন, জলতেষ্টা পেলে চেনাজানা কোন বাড়ির কাছে চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে গিয়ে জল-বাতাসা খেয়ে নাকি আবার ট্রেনে উঠে পড়া যেত। এই ট্রেনের গায়ে নাকি কেউ কেউ ঘুঁটে দিয়ে দিত। ট্রেনটি যখন ফিরে আসত, ততক্ষণে ঘুঁটে শুকিয়ে যেত। তবে, মার্টিন রেলে প্রত্যহ পাতিহাল থেকে প্রচুর পরিমাণে ঘুঁটে পরিবহণ হতো। মার্টিন রেলের চলার পথও ছিল বিচিত্র। কারো বাড়ির সদর ছুঁয়ে, কারো গোয়ালঘর, কারো রান্নাঘরের পাশ ঘেঁসে, কারো পুকুরধার দিয়ে একান্ত চেনা পরিচিতের মতো মার্টিন রেল বাঙালীর অন্দরমহল ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলত, যেন সকলের খোঁজখবর নিয়ে যেত। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের “বনভোজনের ব্যাপার” গল্পে প্যালারামের বয়ানে — “পিঁ করে বাঁশি বাজল, নড়ে উঠল মার্টিনের রেল। তারপর ধ্বস ধ্বস, ভোঁস ভোঁস করে এর রান্নাঘর, ওর ভাঁড়ারঘরের পাশ দিয়ে গাড়ি চলল।”

১৯১৪ সালে মার্টিন রেল যাত্রারম্ভ করেছিল বারাসাত থেকে বসিরহাট। ১৯০৫ সালে বেলগাছিয়া থেকেও একটি শাখাপথ খোলা হয়েছিল। বেলগাছিয়া ট্রাম ডিপোর সামনে সেই টার্মিনাল স্টেশনটির নাম ছিল শ্যামবাজার। এই লাইনটি পাতিপুকুর, বাগুইহাটি, রাজারহাট হয়ে বসিরহাট, হাসনাবাদ অবধি চলে গিয়েছিল। এই পথেই টেনিদারা গিয়েছিল বনভোজন করতে। প্যালারামের ভাষায় — “পরদিন সকালে শ্যামবাজার ইস্টিশনে পৌঁছে দেখি, টেনিদা, ক্যাবলা আর হাবুল এর মধ্যেই মার্টিনের রেলগাড়িতে চেপে বসে আছে”। যদিও প্যালারাম বনভোজনের জায়গাটার নাম আমাদের কাছে চেপে গেছে, তবে টেনিদা বলেছিল বাগুইহাটি ছাড়িয়ে আরো চারটে ইস্টিশন্। সেই হিসেবমতো ওরা নেমেছিল শিবতলা স্টেশনে। বাগুইহাটির কাছে “রেলপুকুর”, যেখানে থেমে ড্রাইভার কয়লার ইঞ্জিনের জন্য জল তুলত, এখনো সেই ট্রেনপথের স্মৃতিকে ধরে রেখেছে।
হাওড়া-হুগলী, বারাসাত-বসিরহাট এর গ্রামজীবনকে নাগরিক জীবনের সংস্পর্শে এনে দিয়েছিল মার্টিন রেল, যার প্রভাব গ্রাম সমাজে পড়েছিল। চাষের ফসল, দুধ, মাছ ইত্যাদি শহরে বিপণনের সুযোগের সঙ্গে সঙ্গে কর্ম ও শিক্ষার সুযোগ সুবিধা বেড়ে গিয়েছিল। হাওড়া-আমতা শাখা থেকে মার্টিন রেল আঁটপুর যাওয়ার পর থেকেই ওখানে টেরাকোটার জন্য বিখ্যাত রাধাগোবিন্দজিউর মন্দিরে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। ঐ রেলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে গিয়েছিল। এটি মার্টিন রেলের প্রভাবের একটি ছোট কিন্তু উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।

ট্রেন সফরের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ফেরিওয়ালার হাঁকাহাঁকি মার্টিন রেলেও ছিল। তাদের মধ্যে হাওড়া হুগলীর মার্টিন রেলযাত্রীদের কাছে বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিল ডোমজুড়ের কালীপদ দে’র মাথার যন্ত্রণার জন্য ‘আশ্চর্য মলম’। আর বিখ্যাত ছিল মাজু গ্রামের খই-চুর, যার স্বাদ মার্টিন রেলের দৌলতেই নগর কলকাতা পেয়েছিল। অনেক যাত্রী ট্রেন থেকে খই-চুর কিনে বাড়ি নিয়ে যেতেন। ট্রেনে ফেরি হত আমতার পান্তুয়া, ডোমজুড়ের তেলেভাজা, জগৎবল্লভপুরের পান।
গ্রামজীবনের অন্দরমহল ছুঁয়ে যেতে যেতে কখন যেন বাঙালীর মনের অন্তরমহলেও প্রবেশ করেছিল মার্টিন রেল। তৈরী হয়েছিল বিচিত্র সব ছড়া। যেমন, — উঁচিয়ে শাড়ি, মার্টিন গাড়ি, /কন্যে চলে ভাতার বাড়ি।
হাঁটাপথে, বা গোরুর গাড়ির ঝাঁকুনিতে বা পাল্কীর দুলকি চালে নয়, অন্তঃপুরের মেয়েদের খুব সুবিধা হয়েছিল মার্টিন রেলে চেপে স্বামীগৃহে যেতে। অনুমান করা যেতেই পারে, গোঁসা করে বাপের বাড়ি চলে আসাটাও সহজ হয়ে গিয়েছিল মার্টিন রেলের দৌলতে।

আরেকটি ছড়া একসময়ে প্রচলিত ছিল, — “ভোলানাথ কবিরাজের বাড়ি, / দুর্গাদাস সিংহের ঘড়ি, / মার্টিন কোম্পানীর গাড়ি, / পাঁচু বাদুড়ির বালা, / যে না বিশ্বাস করে, সে শালা।”
উল্লেখ্য, এই ছড়ায় উল্লিখিত সবকটি চরিত্রই বাস্তবে ছিলেন, যাদের সঙ্গে স্থান পেয়েছে মার্টিন রেল।
সাহিত্যে মার্টিন রেলের প্রসঙ্গ বারেবারেই এসেছে। হাওড়া-আমতা ট্রেন নিয়ে শিবরাম চক্রবর্তীর একটি আস্ত গল্প আছে, যার নাম “হাওড়া আমতা রেললাইন দুর্ঘটনা”। বিষ্ণু দে’র ‘ছড়ানো এই জীবন’-এ পাওয়া যায় মার্টিন রেলের উল্লেখ। কেবল সাহিত্য নয়, মার্টিন রেলের ছায়া ও ছবি দেখা যায় ছায়াছবির পর্দাতেও। যেমন, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ১৯৫৭ সালের ছায়াছবি ‘আমি বড়ো হব’। দীনেন গুপ্ত’র ‘নতুন পাতা’তেও চিত্রায়িত মার্টিন রেলের পাতিহাল স্টেশন। আর, ‘ধন্যি মেয়ে’ খ্যাত বাংলার ফুটবলের থীম সঙ “সব খেলার সেরা বাঙালীর এই ফুটবল” চিত্রায়িত হয়েছিল মার্টিন রেলের কামরায়।

কালক্রমে পরিবহনে বিবর্তনের দ্রুত গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে ক্রমে ক্রমে প্রাসঙ্গকিতা ও উপযোগিতা হারিয়ে ফেলল মন্থর গতির মার্টিন রেল। ব্রডগেজ রেললাইন সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতগতির ট্রেনের সংখ্যা বেড়ে গেল। সড়ক ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় বিভিন্ন বাসরুট খুলে যেতে লাগল। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার অবনতির কারণে মার্টিন রেলে বিনা টিকিটের যাত্রীসংখ্যা বেড়ে যেতে লাগল।
দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর চলার পর ১৯৫৫ সালে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বারাসাত-বসিরহাট শাখা-পথটি, পয়লা জুলাইয়ের সেই দিন বহু মানুষ রেল লাইনের ধারে সমবেত হয়েছিলেন শেষ ট্রেনকে শেষ বিদায় জানাতে।এক কিশোর মনের আবেগ প্রকাশ করেছিল ট্রেনের শেষ বগিটিতে খড়ি দিয়ে লিখে ‘শেষ ট্রেন’। আর হাওড়ার দুটি পথেই মার্টিন রেলের চাকা অচল হলো ১৯৭১ সালে। গ্রামজীবনের অন্দরমহল ছুঁয়ে চলা মার্টিন রেলের স্থান হলো আলো-আঁধারি-ঘেরা আবছায়া স্মৃতির মিউজিয়মের অন্দরমহলে।
তথ্যঋণ : মার্টিন রেলের ইতিবৃত্ত : প্রদীপরঞ্জন রীত, আনন্দবাজার পত্রিকা ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, হাওড়া জেলার লোকউৎসব : তারাপদ সাঁতরা, ইতিহাসে দেগঙ্গা : দিলীপ কুমার মৈতে, অভিযাত্রিক : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী রচনাবলী
অনন্য স্মৃতি, অমূল্য অভিজ্ঞতা!
মে স্মৃতি ভোলার নয়।
আমার স্মৃতিচারণায় থাকবে এই ট্রেনের অভিজ্ঞতা।