করোনা সংক্রমণ আগের থেকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু এবারও একুশে জুলাই হবে ভার্চুয়াল। এই নিয়ে দ্বিতীয় বার ভার্চুয়াল জমায়েত। তবে এবারের একুশ অন্য বছরগুলির তুলনায় যথেষ্ট আলাদা।
এবছর শহীদ দিবস ২৭ বছরে পা রাখতে চলেছে। প্রতিবছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মতলায় শহিদ তর্পণ করে একুশে জুলাই পালন করেন। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপে শহীদ দিবস ভার্চুয়াল পালন করতে হয়েছিল। ২০২১-এ বাংলা বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের বিশাল জয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন বিজয় উৎসব পালন করা হবে একুশের ২১ জুলাই। কিন্তু করোনার সংক্রমণ এখনও আমাদের তাড়া করছে। তাই এবছরও শহীদ দিবস ভার্চুয়ালি পালনের ঘোষণা করেন, তৃণমূলের রাজ্যসভার মুখ্য সচেতক সুখেন্দুশেখর রায়। তিনি বলেন, কোভিড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্বেও এবারেও ২১শে জুলাই শহীদ দিবসের কর্মসূচী ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে করা হবে। ঐদিন বেলা ২টায় দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তব্য রাখবেন। তাঁর বক্তৃতার অভিমুখ এবারে বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ হবে। কারণ, সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচন বাঙালি জাতির কাছে ধর্মযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। একদিকে বহিরাগত বর্গীদের হিংস্র আগ্রাসন, পাশাপাশি সমস্ত কেন্দ্রীয় শক্তির যুথবদ্ধ আক্রমণ এবং কোনও কোনও সাংবিধানিক সংস্থার চরম অতি সক্রিয়তা এবং ক্ষেত্রবিশেষে উৎকট পক্ষপাতিত্ব বা নিস্পৃহতা বাংলার সামাজিক পরিবেশকে দুর্বিসহ করে তোলে। সম্মিলিতভাবে বাংলার জাগ্রত জনগণ বুক চিতিয়ে লড়াই করে বিজয়ের নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন। আগামীদিনে কোন পথে এগোবে তার নতুন দিশার খোঁজে কোটি কোটি বাঙালি মমতা ব্যানার্জির বক্তব্য শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন । ঐদিন দেশ-বিদেশের বাঙালীদের চোখ থাকবে টিভির পর্দায়। দলের পক্ষে পশ্চিমবাংলার সমস্ত ব্লকে, রাজধানী দিল্লী, ত্রিপুরার আগরতলা, ধর্মনগর, উত্তরপ্রদেশ ও দেশের অন্যন্য জায়গায় কর্মীরা এল.ই.ডি.টিভির মাধ্যমে দিদির বক্তৃতা একযোগে প্রচার করবে।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনে জয় হাসিল করার পর এবার প্রথম একুশে জুলাই। ভার্চুয়াল হলেও তার রাজনৈতিক তাৎপর্য কিছুমাত্র কম নয়। এর পাশাপাশি ভার্চুয়াল আয়োজন ও বিন্যাসেও দেওয়া হয়েছে গুরুত্ব। এক সপ্তাহ বাকি থাকতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়েছে নানা টিজার। দলনেত্রী ইতিমধ্যেই বার্তা রেখেছেন। তিনি জানিয়েছেন, “কোভিড পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এবার ২১শে জুলাই ভার্চুয়াল করা হবে। কারণ ডাক দিলে লাখো মানুষের জমায়েত হয়ে যাবে। রাজ্যে করোনা পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এবারের ২১ শে জুলাই ভার্চুয়ালই হবে। প্রতি বুথে বুথে কর্মীরা থাকবেন। প্রকাশ করা হবে জাগো বাংলার নব সংস্করণ।”
২৭ বছরে পা রাখা একুশে জুলাই রাজনীতিগতভাবেও তাৎপর্যপূর্ণময়। কারণ বাংলা দখলে হ্যাট্রিকের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্য এবার দিল্লির মসনদ থেকে নরেন্দ্র মোদিকে উৎখাত করা। সেই লক্ষ্যে তৃণমূল নেতৃত্ব এবার ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচিকে জাতীয় স্তরে নিয়ে যেতে চাইছে। কেবল বাংলা নয়, এবার ২১শে জুলাইয়ের কর্মসূচি দিল্লিতেও পালন করা হবে। সাউথ অ্যাভিনিউতে দলের পার্টি অফিসের বাইরে পালিত হবে তৃণমূলের শহিদ দিবস। লোকসভা ও রাজ্যসভার সকল দলীয় সাংসদরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। পরিকল্পনা রয়েছে, দিল্লির বুকেই জায়ান্ট স্ক্রিন লাগিয়ে সেখানে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বক্তব্য শোনানো হতে পারে। আসল লক্ষ্য, ২০২৪-কে মাথায় রেখে মমতার কথা দিল্লিতে পৌঁছে দেওয়া। তবে, শুধু দিল্লি নয়, আরও বেশ কয়েকটি রাজ্যেও ২১শে জুলাই পালিত হবে বলে জানা গিয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৩ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন প্রদেশ যুব কংগ্রেস ‘নো আইডেন্টিটি, নো ভোট’ এই স্লোগানকে হাতিয়ার করে রাইটার্স অভিযান করেছিল। সেদিনের অভিযানে বামফ্রন্ট সরকারের পুলিশের গুলিতে ১৩ জন তরতাজা যুবক প্রাণ হারিয়েছিলেন। শহিদের স্মৃতি রক্ষার্থে ১৯৯৪ সাল থেকে শুরু হয় একুশে জুলাইয়ের জনসমাবেশ। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল ২০১৩ সাল। ওই বছরটি বাদে প্রতি বছরই পালিত হয়ে আসছে এই সমাবেশ। উল্লেখ্য, একুশের শহিদ স্মরণে মঞ্চ কখনও হয়ে উঠেছে বাম জমানা অবসানের সংকল্প মঞ্চ, আবার কখনও বা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা। ২০১১-এর পর থেকে শহিদের স্মৃতি জড়ানো এই মঞ্চেই হয়েছে তৃণমূলের বিজয় সমাবেশ। আবার এই মঞ্চ থেকেই কেন্দ্রে বিকল্প সরকার গড়তে দিল্লি চলোর ডাক দিয়েছিলেন মমতা। যদিও সেই ডাক কার্যকরি হয়নি। তবে এবছরটি অন্য সব বছরের থেকে আলাদা।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর তৃণমূল ২০২৪-কে পাখির চোখ করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক নেতৃত্বে বিজেপির বাংলা দখলের সমস্ত তোরজোড় থেমে গিয়েছে। একদিকে নারদ কাণ্ডে একাধিক নেতা, মন্ত্রীর নাম জড়িয়ে যাওয়া অন্যদিকে গেরুয়া ঝড়ে তৃণমূল দলের বাংলায় থাকাটাই কার্যত প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল৷ সেখান থেকে ২১৩টি আসনে জয়৷ এর সিংহভাগ কৃতিত্বই যে নেত্রীর প্রাপ্য, তা মানছেন বিরোধী শিবিরও৷ এবার বাংলার বিধানসভা ভোটে প্রধানমন্ত্রী থেকেশুরু করে গোটা কেন্দ্রীয় সরকারই বাংলায় হামলে পড়েছিল। কিন্তু বাংলার মানুষ আস্থা রেখেছেন দিদিতেই৷ আজ দেশের প্রায় সবকটি অবিজেপি সরকার আস্থা রাখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর।
রাজ্যে টানা তৃতীয়বার তৃণমূল সরকার গঠনের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী লক্ষ্য ২০২৪-এ দিল্লির মসনদ। সেই লক্ষ্যে তিনি একুশের ভার্চুয়াল ভাষণ থেকে দলকে দিশা দেখাবেন। সেই লক্ষ্যেই মাস্টারস্ট্রোক— একুশে জুলাইকে দিল্লি নিয়ে যাওয়া। একুশে জুলাইয়ের শহিদ দিবস পালন এবার বাংলার পাশাপাশি দিল্লিতেও। সেই মতো সমস্ত আন্দোলন, কর্মসূচি ও অভিযান সাজাচ্ছে তৃণমূল। তারই ফলশ্রুতি একুশে জুলাইকে প্রথমবার দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একুশে জুলাই ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মেই দুপুর দুটোয় ভাষণ দেবেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখনও রাজ্যের কয়েকটি আসনে বিধানসভা উপনির্বাচন রয়েছে। বাকি রয়েছে একাধিক পুরসভা নির্বাচন। বিরোধী দল রাজ্যে আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়াতে নানা কৌশল নিচ্ছে৷ এই পরিস্থিতিতে দলনেত্রীর ২১ জুলাই তাঁর রাজনৈতিক ভাষণে কি দিশা দেখান তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে দল।
একদিকে নিজের দলের নেতা কর্মীদের বার্তা। অন্যদিকে বিরোধীদের নানা অভিযোগ ও সমালোচনার জবাব। দলনেত্রীর ভাষণে এই দুইয়ের জবাব ছাড়াও একুশের মঞ্চ থেকে ২০২৪-এ দিল্লি দখলের দিশাও দেখাতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বার্তা দিল্লি তথা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ছড়িয়ে দিতেই তৃণমূল পরিকল্পনা নিয়েছে। কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপির শাসনে থাকা রাজ্যেও থাবা বসাতে মরিয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।