বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝে এক দাঁড়িয়ে শহিদবেদি। আজও সেখানে কান পাতলে শোনা যায় স্বাধীনতা আন্দোলনে রামনগর থানার বেলবনি গ্রামের স্বদেশপ্রেমের গৌরবময় আখ্যান। ১৯৪২ সালে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাকে সারা দেশের সঙ্গে কাঁথি মহকুমাও আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল। ৪২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর কাঁথি থানার মহিষাগোটে স্বদেশী জমায়েতে পুলিশের গুলি চালনায় শহিদ হয়েছিলেন ছ’জন। শহিদ ছ’জনের মধ্যে দুজন ছিলেন রামনগর থানার দক্ষিণ শীতলা গ্রামের সর্বেশ্বর প্রামাণিক ও ঘোল গ্রামের রমাপ্রসাদ জানা। এই দুই শহিদের স্মৃতি তর্পণ এবং পরবর্তী কর্মসূচি রূপায়ণে ‘সমর’ পরিষদের সর্বাধিনায়ক বলাইলাল দাস মহাপাত্রের নেতৃত্বে ২৭ সেপ্টেম্বর রামনগর থানার বেলবনি গ্রামে এক সত্যাগ্রহ শিবির শুরু হয়।
ব্রিটিশ পুলিশ রাতের অন্ধকারে এলে স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। শঙ্খ ধ্বনির মাধ্যমে বিদ্যুৎগতিতে আশেপাশের গ্রামে সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই কাতারে কাতারে মানুষ বেলবনি শিবিরে ছুটে আসেন। মানুষের ভিড় দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পুলিশ প্রথমে লাঠি চালাতে শুরু করে।জনতাও পুলিশের সঙ্গে পালটা হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়ে। এবার আরও ভীত হয়ে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে।পুলিশের গুলিতে ভজহরি রাউত (বেলবনি), চন্দ্রমোহন দাস (বেলবনি),হেমন্ত কুমার দাস(কাদুয়া),ভীমচরণ দাস মহাপাত্র (লালপুর),চৈতন্য বেরা (মাধবপুর), বৈষ্ণবচরণ জানা (লালপুর) শিবপ্রসাদ ভূঁইয়া (কলাপুঞ্জা), বংশীধর কর(কাদুয়া), রজনীকান্ত ঘোষ((সোনাকনিয়া) ও চন্দ্রমোহন জানা(ঘোল) ঘটনাস্থলেই মারা যান। আহত হন অনেকে।

এরপর বেলবনি গ্রাম জুড়ে শুরু হয় পুলিশের নির্মম তান্ডব। একান্নটি বাড়িতে লুঠতরাজ চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যায় ডান্ডাবেলবনি,কলাপুঞ্জা,সোনামুই ও উত্তর মুকুন্দপুরের অসংখ্য ঘরবাড়ি। আবালবৃদ্ধবনিতার সর্বস্ব হারানোর হাহাকারে পুঞ্জীভূত হতে থাকে ব্রিটিশ রাজত্বের প্রতি চরম ঘৃণা। যা পরবর্তীকালে দেশের স্বাধীনতার পথ তরান্বিত করে। মহিষাগোট ও বেলবনি গ্রামের এই দুটি ঘটনাকে মহাত্মা গান্ধী স্বয়ং স্বাধীনতা আন্দোলনের ‘বীরোচিত ‘ ও ‘গৌরবময়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। স্বাধীনতা লাভের পর অবশ্য হারিয়ে যেতে বসেছে বেলবনি গ্রামের স্বদেশপ্রেম আর স্বাধীনতার জন্য জীবনমরণ পণ করা সংগ্রামের ইতিহাস।
রামনগর থানার জনগনের শৌর্য বীর্য, সাহস,স্বদেশপ্রেম আর আত্মোৎসর্গের অত্যুজ্জ্বল কীর্তির নির্মম সাক্ষী হিসেব ধু ধু বালিয়াড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে এলাকাবাসীর তৈরি শহিদ বেদি।

বছরের একটা দিন শুধুমাত্র পনেরো আগষ্ট প্রাণ ফিরে পায় বেলবনি শহিদ জেগে উঠে স্থানীয় বটতলা আনন্দময়ী হাইস্কুল ও ডান্ডা বেলবনি শহিদ স্মৃতি সংঘ ও পাঠাগারের কল্যানে। স্বাধীনতা দিবসের দিন বটতলা আনন্দময়ী হাইস্কুলের পড়ুয়া ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা শোভাযাত্রা করে এসে শহিদ বেদিতে মাল্যদান করেন। শহিদ বেদির পাশে শহিদ স্মৃতি সংঘ সামিয়ানা খাটিয়ে অনুষ্ঠান মঞ্চে স্কুলের পড়ুয়া ও শিক্ষক-শিক্ষিকারা স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের পাশাপাশি বেলবনি গ্রামের শহিদের প্রতি স্মৃতি তর্পণ সারেন। বটতলা আনন্দময়ী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হৃষিকেশ দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা আন্দোলনে রামনগরের বিশেষ করে বেলবনির গৌরবোচিত ভূমিকা তুলে ধরার দরকার। এর জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রয়োজন।
কিন্তু প্রশাসনের কোন মাথাব্যাথা আছে বলে তো মনে হয়না।” রামনগর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক অখিল গিরি জানান, বাম জমানায় স্বাধীনতা আন্দোলনে রামনগরের বেলবনি শহিদ বেদি উপেক্ষিত হয়েই পড়েছিল। বাম জমানার শেষে তৃণমূল সরকার রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরেই রাজ্য সরকার বেলবনি শহিদ স্মৃতিমঞ্চের উন্নয়ন কল্পে কুড়ি লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে। সেই টাকায় শহিদ মঞ্চের মাঠের পাশে একটি মিনি অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে। “বিধায়ক অখিল গিরি আরও বলেন, — শহিদ বেদি লাগোয়া তিন একর জায়গায় আগামীদিনে একটি পার্ক ও স্থানীয় এলাকার ছেলেমেয়েদের জন্য একটি সুন্দর ফুটবল খেলার মাঠ রামনগরের অসামান্য স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলার চিন্তাভাবনাও রয়েছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা পুলক বড়পন্ডা বলেন, স্বাধীনতার বহু বছর পর স্থানীয় মানুষজনদের প্রচেষ্টায় বিস্তীর্ণ তিন একর জায়গা জুড়ে শহিদস্থলে একটি শহিদ বেদি তৈরি হয়। দীর্ঘদিন পরে স্থানীয় বিধায়কের উদ্যোগে একটি মিনি অডিটোরিয়াম তৈরি হলেও সেটি বর্তমানে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।” স্থানীয় কাদুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান ও ডান্ডা বেলবনি শহিদ স্মৃতি সংঘ ও পাঠাগারের সম্পাদক অমিয়রঞ্জন মাইতি বলেন, “বেলবনি শহিদ বেদি ও শহিদ স্থলকে ঘিরে একটি সংগ্রহশালা তৈরি হোক। স্থানীয়দের এই দাবি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে দৌড়াদৌড়ি করেও কোন লাভ হয়নি।”
পুরনো ইতিহাস তুলে ধরার আপনার প্রচেষ্টা কে অসংখ্য অভিনন্দন জানাই।