| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পলাশীর পরের গণহত্যা, লুট বাখান (দ্বিতীয় পর্ব) : মিল্টন বিশ্বাস

Reporter
ড. মিল্টন বিশ্বাস / ৪৪৯ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৩

দুই.

২০০৩ সালে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত বাংলাপিডিয়া ৪র্থ খণ্ডের ‘দুর্ভিক্ষ’ ভুক্তিতে লেখা হয়েছে— ‘‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামক দুর্ভিক্ষ ঘটেছিল বাংলা সন ১১৭৬-এ (১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে)। তখন ছিল আঠারো শতকের চরম অর্থনৈতিক মন্দার বছর। সে বছর অত্যধিক বৃষ্টিপাত ও বন্যার গ্রাস থেকে কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারে নি। তদুপরি ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা এবং খাদ্যবাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের ফলে অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। অথচ ব্রিটিশরাজের কোম্পানি শাসকরা পুরো বিষয়টিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে দাবি করে। কিন্তু ভিন্ন সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে, ১৭৬৮ সনে আদায়কৃত রাজস্ব ১৫.২১ মিয়িলন রুপির চেয়ে ১৭৭১ সনের আদায়কৃত রাজস্বের পরিমাণ ৫,২২,০০০ রুপি বেশি ছিল, অথচ এর আগের বছরেই ঘটে যায় দুর্ভিক্ষ। এভাবে, কোম্পানি শাসনের সহযোগিতায়, খাদ্যশস্যের বাজার থেকে মুনাফা লুট এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার কারণে জনমানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছে। পরিণতিতে মারাত্মক দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকাগুলি হয়ে পড়ে জনশূন্য। জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ, প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যায়। কৃষি উৎপাদন আর রাজস্ব আদায় অনুরূপহারে কমে যায়।’’ (পৃ ৩৮২)

মহা-দুর্ভিক্ষের মৃত্যু যে গণহত্যায় রূপান্তরিত হয়েছিল তা এই উদ্ধৃতি স্পষ্ট।

তিন.

পরিবর্তিত রাজনৈতিক দৃশ্যপটে দেশের যে অর্থনৈতিক সংকটের সূচনা হয়েছিল তার বিবরণ এরকম — ‘‘সুবাহ বাংলায় ব্রিটিশ প্রভুত্ব বিস্তারের পর ভূমি ব্যবস্থাপনার পরবর্তী কাঠামোগত পরিবর্তন সূচিত হয়। পলাশী (১৭৫৭) ও বক্সারে (১৭৬৪) ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিজয়ের সাথে সাথে একদিকে নবাবদের আধিপত্যের অবসান হয়, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে। নতুন নবাব মীর জাফর আলী খান তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পূর্বতন নবাব কর্তৃক কলকাতা অবরোধকালীন কোম্পানির ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানে অসমর্থ হওয়ায় ১৭৫৮ সালের প্রারম্ভে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি ও ঢাকার কয়েকটি জমিদারির রাজস্ব আয় কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এত বিস্তৃত এলাকার খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা ইংরেজদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার মতো এমন একটি অস্বাভাবিক ঘটনা দেশের নিগূঢ় অর্থনৈতিক সংকটেরই পরিচায়ক। এ ব্যবস্থা ছিল গভীর তাৎপর্যবহ, কারণ তা কোম্পানির নিকট দেশের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ চলে চাওয়ার পথ সুগম করে। ১৭৬০ সালে মীর জাফর কোম্পানির নির্দেশে নিতান্ত অনিচ্ছায় উমিচাঁদকে বর্ধমানের দীউয়ান-নিযুক্ত করেন, যা একজন মুখ্য জমিদারের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের ব্যাপারে প্রথাগত ক্ষমতার সঙ্কোচন ঘটায়। মীর জাফরের দেউলিয়া সরকার কোম্পানির সকল দাবি পূর্ণ করতে অপারগ হওয়ায় কোম্পানি দেশের উপশাসকের পরবর্তী সম্ভাব্য প্রার্থী মীর কাশিমের সাথে একটি সমঝোতায় আসে। ১৭৬০ সালে সুবাহর নিয়মিত রাজস্বব্যবস্থার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বাংলার রাজস্ব আয়ের এক-তৃতীয়াংশ অর্জনকারী বর্ধমান, চট্টগ্রাম ও মেদিনীপুরের জায়গীরদারি কোম্পানির হাতে অর্পণ করা হয়। অবশেষে, ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট সম্রাট শাহ আলম বার্ষিক মাত্র ছাব্বিশ লক্ষ টাকার বিনিময়ে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দীউয়ানি ক্ষমতা কোম্পানিকে অর্পণ করে তাকে সমগ্র এলাকার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করেন। ফলে নবাবদের সাথে জমিদারদের অংশীদারিত্বের সম্পর্ক শেষ হয়ে এক নতুন ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠল। পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় সুবাহ প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকিতে নিযুক্ত সুবাহদার বা নওয়াব, দীউয়ান-ই-সুবাহ এবং অন্যান্য রাজকীয় প্রতিনিধিরা চুক্তিবদ্ধ রাজস্ব আদায়কারী ছিলেন না। মুর্শিদকুলী খান কর্তৃক আঞ্চলিক অর্ধ-স্বাধীন ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে রাজনৈতিক অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন সাধিত হলেও জমিদার শ্রেণী রাজ্যের খাজনা আদায়ের ঠিকাদার হিসেবে রায়ত ও সরকারের মধ্যবর্তী লভ্যাংশ আদায় করে নিত। কিন্তু বর্ধমান, চট্টগ্রাম ও মেদিনীপুরের ক্ষমতা হস্তান্তর ও সুবাহর প্রতিরক্ষার ভার গ্রহণের পাশাপাশি নবাবকে এক নির্দিষ্ট হারে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে দীউয়ানি ক্ষমতা কোম্পানির হাতে ন্যস্ত হওয়ার কারণে জমিদারগণ এতকাল রায়ত ও সরকারের মাঝে যে কাজ করত তা কোম্পানির হাতে চলে গেল। ফলে রাজস্ব-ইজারাদারের অবস্থান বদলে গেল কোম্পানির খেয়ালখুশির উপর নির্ভরশীল নিম্নতর ইজারাদার হিসেবে। এর পর থেকে সম্রাটকে নির্ধারিত হারে অর্থ প্রদানের বিনিময়ে এ এলাকার সকল সুযোগ কোম্পানির ভোগদখলে চলে যায়।’’ (সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৯৩, পৃ ৩০)

স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লুটের রাজত্ব কায়েম করার জন্য সকল পথের ঠিকানা ও মালিকানা লাভ করেছে। ফলে লুট আখ্যানের প্রাথমিক প্রতিপাদ্যে কোম্পানির আচরণের একটু পরিচয় দেওয়া দরকার।

চার.

রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, মধ্যযুগ (কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ ১৩৫-১৩৭)গ্রন্থে লিখেছেন — ‘‘ইংরেজ কর্মচারিগণের ব্যবহারে তাঁহার (নবাব মীর কাশিমের) প্রজাগণেরও দুর্দশার সীমা ছিল না। কোম্পানীর মোহরাঙ্কিত ‘দস্তক’ দেখাইয়া কোম্পানীর কর্মচারীরাও দেশের সর্বত্র জলপথে ও স্থলপথে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করিতেন। ইহাতে একদিকে রাজকোষের ক্ষতি হইত, অন্যদিকে দেশীয় বণিকগণকে শুল্ক দিতে হইত বলিয়া তাহারা ইংরেজ বণিকদের সহিত প্রতিযোগিতায় অসমর্থ হইয়া ব্যবসায়-বাণিজ্য ছাড়িয়া দিতে বাধ্য হইত। বিলাতের কর্তৃপক্ষ বারংবার এইরূপ বেআইনী কার্যের তীব্র নিন্দা করা সত্ত্বেও ইংরেজ কর্মচারীরা ইহা হইতে নিবৃত্ত হয় নাই। কারণ এখানকার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরাও এই প্রকার বাণিজ্যে লিপ্ত ছিল। তাছাড়া গভর্নর ও কাউনসিলের সদস্যগণের প্রচুর উৎকোচ গ্রহণের ফলে অবৈধভাবে অর্থ সঞ্চয় করা কেহই দূষণীয় মনে করিত না।

শুল্কের ব্যাপার ছাড়াও কোম্পানীর কর্মচারীরা নবাবের প্রজার উপর নানা রকম উৎপীড়ন করিত। ঢাকার কর্মচারীরা ব্যক্তিগত আক্রোশ বশতঃ শ্রীহট্টে একদল সিপাহী পাঠাইয়া সেখানকার একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে বধ করিয়াছিলেন এবং স্থানীয় জমিদারকে জোর করিয়া ধরিয়া লইয়া গিয়া বন্দী করিয়াছিলেন। এইরূপ অত্যাচারের ফলে প্রজাগণ অনেক সময় গ্রাম ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিতে বাধ্য হইত। ইংরেজের সঙ্গে কলহ বা যুদ্ধের আশঙ্কায় অত্যাচারী ইংরেজ কর্মচারীকে নিজে দণ্ড না দিয়া প্রজাদের দুরবস্থা সম্বন্ধে মীর কাশিম গভর্নরের নিকট পুনঃ পুনঃ আবেদন করেন। ১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দের ২৬শে মার্চ তারিখের চিঠির মর্ম এই — ‘‘কলিকাতা, কাশিমবাজার, পাটনা, ঢাকা প্রভৃতি সকল কুঠির ইংরেজ অধ্যক্ষ তাঁহাদের গোমস্তা ও অন্যান্য কর্মচারীসহ খাজনা আদায়কারী, জমিদার, তালুকদার প্রভৃতির মতন ব্যবহার করেন-আমার কর্মচারীদের কোন আমলই দেন না। প্রতি জিলা ও পরগনায়, প্রতি গঞ্জে, গ্রামে কোম্পানীর গোমস্তা ও অন্যান্য কর্মচারিগণ তেল, মাছ, খড়, বাঁশ, ধান, চাউল, সুপারি এবং অন্যান্য দ্রব্যের ব্যবসা করে, এবং তাহারা কোম্পানীর দস্তক দেখাইয়া কোম্পানীর মতই সকল সুযোগ-সুবিধা আদায় করে।” অন্যান্য পত্রে নবাব লেখেন যে ‘‘তাহারা বহু নূতন কুঠি নির্মাণ করিয়া ব্যবসা উপলক্ষে প্রজাদের উপর বহু অত্যাচার করে। তাহারা জোর করিয়া সিকি দামে দ্রব্য কেনে এবং আমার প্রজা ও ব্যবসায়ীদের উপর নানা অত্যাচার করে। কোম্পানীর দস্তক দেখাইয়া তাহারা শুল্ক দেয় না এবং ইহাতে আমার পঁচিশ লক্ষ টাকা লোকসান হয়। ইহার ফলে দেশের ব্যবসায়ীরা ও বহু প্রজা সর্বস্বান্ত হইয়া দেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছে।’’

কয়েকজন ইংরেজও এইরূপ অত্যাচারের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। বাখরগঞ্জ হইতে সার্জেন্ট ব্রেগো ১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দের ২৬শে মে গভর্নর ভ্যানসিটার্টকে যে পত্র লেখেন তাহার মর্ম এই — ‘‘এই স্থানটি বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। কিন্তু নিম্নলিখিত কারণে এ স্থানের ব্যবস্থা একেবারে নষ্ট হইয়া গিয়াছে। একজন ইংরেজ বেচাকেনার জন্য একজন গোমস্তা পাঠাইলেন। সে অমনি প্রত্যেক লোককে তাহার দ্রব্য কিনিতে অথবা তাহার নিকট তাহাদের দ্রব্য বেচিতে বলে, যদি কেহ অস্বীকার করে বা অশক্ত হয় তবে তৎক্ষণাৎ তাহাকে বেত্রাঘাত অথবা কয়েদ করা হয়। যে সমস্ত দ্রব্যের ব্যবসায় তাহারা নিজেরা চালায় সেই সব দ্রব্য আর কেহ কেনাবেচা করিতে পারিবে না, করিলে তাহাকে শাস্তি দেওয়া হয়। ন্যায্য দামের চেয়ে জিনিসের দাম তাহারা অনেক কম করিয়া ধরে এবং অনেক সময় তাহাও দেয় না। যদি আমি এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করি, অমনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। এইরূপে বাঙালী গোমস্তাদের অত্যাচারে প্রতিদিন বহু লোক শহর ছাড়িয়া পলাইতেছে। পূর্বে সরকারী কাছারীতে বিচার হইত কিন্তু এখন প্রতি গোমস্তাই বিচারক এবং তাহার বাড়ীই কাছারী। তাহারা জমিদারদেরও দণ্ডবিধান করে এবং মিথ্যা অভিযোগ করিয়া তাহাদের নিকট হইতে টাকা আদায় করে।’’

১৭৬২ খ্রীষ্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল ওয়ারেন হেষ্টিংস এইসব অত্যাচারের কাহিনী গভর্নরকে জানান। তিনি বলেন যে, ‘‘কেবল কোম্পানীর গোমস্তা ও সিপাহী নহে, অন্য লোকও সিপাহীর পোষাক পরিয়া বা গোমস্তা বলিয়া পরিচয় দিয়া সর্বত্র লোকের উপর যথেচ্ছ অত্যাচার করে। আমাদের আগে একদল সিপাহী যাইতেছিল, তাহাদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে অনেকে আমার নিকট অভিযোগ করিয়াছে। আমাদের আসার সংবাদে শহর ও সরাই হইতে লোকেরা পলাইয়াছে-দোকানীরা দোকান বন্ধ করিয়া সরিয়া পড়িয়াছে।’’

২৬শে মের পত্রে হেষ্টিংস লেখেন — ‘‘সর্বত্র নবাবের কর্তৃত্ব প্রকাশ্যে অস্বীকৃত ও অপমানিত; নবাবের কর্মচারীরা কারারুদ্ধ; নবাবের দুর্গ আমাদের সিপাহী দ্বারা আক্রান্ত।”

গভর্নর ভ্যানসিটার্ট লিখিয়াছেন — ‘‘আমি গোপনে অত্যাচারী ইংরেজ কর্মচারীদের সাবধান করিয়াছি; কিন্তু অত্যাচারের কোন উপশম না হওয়ায় বোর্ডের সভায় ইহা পেশ করিয়াছি। অথচ বোর্ডের সদস্যরা এ বিষয়ে কোন মনোযোগই দিলেন না। কারণ, তাঁহাদের বিশ্বাস নবাব আমাদের সঙ্গে কলহ করার জন্যই এই সব মিথ্যা সংবাদ রটাইতেছেন। নবাবের অভিযোগ বিশ্বাস করি বলিয়া তাঁহারা আমাকে গালি দেন ও শত্রু বলিয়া মনে করেন। যদিও প্রতিদিন অভিযোগের সংখ্যা বাড়িয়াই চলিতেছে, তথাপি প্রতিকার তো দূরের কথা, ইহার একটির সম্বন্ধেও কোন তদন্ত হয় নাই।’’

নবাবের প্রধান অভিযোগ ছিল ইংরেজদের বে-আইনী ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে। বাদশাহের ফরমান অনুসারে যে সকল দ্রব্য এদেশে জাহাজে আমদানী হয় অথবা এদেশ হইতে জাহাজে রপ্তানী হয়, কেবল সেই সকল দ্রব্যই কোম্পানী বেচাকেনা করিতে পারিবেন এবং কোম্পানীর মোহরাঙ্কিত ‘দস্তক’ দেখাইলে তাহার উপর কোন শুল্ক ধার্য হইবে না। কিন্তু কেবল কোম্পানী নয়, তাহাদের ইংরেজ কর্মচারীরাও অন্য সকল দ্রব্য — লবণ, সুপারি, তামাক প্রভৃতি- বাংলাদেশের মধ্যেই বেচাকেনা করিত এবং কোম্পানীর দস্তক দেখাইয়া কেহই শুল্ক দিত না। লবণের গোলা হইতে সর্বত্র দেশী ব্যাপারীদের সরাইয়া ইংরেজরা প্রায় একচেটিয়া বাণিজ্য করিত এবং ইহাতে নবাবের প্রভূত লোকসান হইত। এতদ্ব্যতীত ইংরেজ বণিকের সহিত নবাবের কর্মচারীদের বিবাদ উপস্থিত হইলে ইংরেজরাই তাহার বিচার করিত। নবাব বা তাঁহার কর্মচারীদিগকে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ করিতে দিত না। সুতরাং যাহারা কোন অপরাধ করিত সেই অপরাধের বিচারের ভারও তাহাদের উপরেই ছিল।” গভর্নর ভ্যানসিটার্ট নবাবের অভিযোগগুলি ন্যায়সঙ্গত মনে করিয়াছিলেন বলিয়াই হউক অথবা মীর কাশিমের নিকট হইতে বহু অর্থ পাইয়াছিলেন বলিয়াই হউক নবাবের পক্ষ লইয়া কাউনসিলের ইংরেজ সদ্যদের সহিত অনেক লড়িয়াছিলেন এবং কিছু কিছু কৃতকার্যও হইয়াছিলেন। রামনারায়ণকে ইংরেজ গভর্নমেন্ট বরাবর নবাবের বিরুদ্ধে আশ্রয় দিয়াছিলেন কিন্তু নবাবের চিঠিতে উল্লিখিত ১৬ই জুনের ঘটনার দুইদিন পরে কলিকাতার কমিটি রামনারায়ণকে পদচ্যুত করে এবং কর্নেল কূট ও মেজর কারনাককে পাটনা হইতে স্থানান্তরিত করে। অগস্ট মাসে পাটনায় নূতন নায়েব-সুবাদার নিযুক্ত করার ব্যবস্থা হয় এবং সেপ্টেম্বর মাসে ভ্যানসিটার্টের আদেশে রামনারায়ণকে নবাবের হস্তে অর্পণ করা হয়। নবাব তাঁহার নিকট হইতে যতদূর সম্ভব টাকা আদায় করিয়া অবশেষে তাহাকে হত্যা করেন। কেবলমাত্র ইংরেজের অনুগ্রহের আশায় বা ভরসায় যাহারা স্বীয় প্রভুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিলেন, তাঁহাদের অদৃষ্টে যে কত নিগ্রহ ও দুঃখভোগ ছিল, মীরজাফর, মীর কাশিম, রামনারায়ণ প্রভৃতি তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’’ (পৃ ১৩৫-১৩৭)

সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচারী ইংরেজ কর্মচারীদের পীড়ন ও শোষণ যে ধীরে ধীরে বাংলার জনজীবনকে শান্তি ও স্বস্তিময় স্বাভাবিক অবস্থা থেকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির দিকে নিক্ষেপ করেছিল তা উপরের উদ্ধৃতিতে পরিষ্কার।উল্লেখ্য, পলাশীর পর থেকে কোম্পানি ইউরোপ থেকে সোনা-রুপার আকারে পুঁজি আনা প্রায় বন্ধ করে দেয়। তখন থেকে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজির মোটা অংশ মুর্শিদাবাদের মসনদে নবাবি উঠানো বসানোর রাজনীতি থেকে আদায় করা হয়। কিন্তু দস্যুবৃত্তি কোন স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না। পুঁজি জোগানোর কোন স্থায়ী উপায় বের করা দরকার ছিল। ক্লাইভ এর উপায় বের করেন বাংলা বিহার উড়িষ্যার দীউয়ানী লাভ করে।

এই প্রবন্ধটি ২১ এপ্রিল ২০২৩ থিওজফিক্যাল সোসাইটি হলে উপনিবেশ বিরোধী ও কর্পোরেট বিরোধী চর্চা, তৃতীয় মধুমঙ্গল স্মৃতি বক্তৃতায় পঠিত।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev