অষ্টম.
মীর কাসিম (মীর মুহম্মদ কাসিম আলী খান) আমলে লুট :
১৭৬০ সাল থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত বাংলার নবাব ছিলেন মীর কাসিম। তাঁর আমলে ইউরোপীয় ও তাদের দোসর নায়েব গোমস্তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে দেশীয় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, কারিগরগণ তলিয়ে যেতে থাকে। বেআইনীভাবে তারা রায়তের উৎপন্ন দ্রব্য বাজার মূল্যের চারভাগের একভাগ মূল্য দিয়ে জোরজবরদস্তি করে কিনে নেয়, আবার বেচার বেলায় তারা পাঁচ টাকার জিনিস এক টাকার রায়তের উপর গছিয়ে দেয়। বাধা দিলে উৎপীড়নের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। দেশীয়দের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। একচেটিয়াভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে কোম্পানীর কর্মচারী ও তাদের গোমস্তারা। কোম্পানীর কর্মচারীদের প্রাইভেট ব্যবসা ক্ষতিকর ছিল কারণ অন্যায়ভাবে তারা দস্তকের অপব্যবহার করে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করায় সরকার শুল্ক খাতে বিরাট অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতো। বিদেশীরা আভ্যন্তরীণ ব্যবসা করে মুনাফা অর্জন করে তা তারা Bill of Exchange বা পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ইউরোপে পাচার করত। বিদেশে দেশের সম্পদ পাচার অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।’ (সিরাজুল ইসলাম, বাংলার ইতিহাস : ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো ১৭৫৭-১৮৫৭, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৪, পৃ ৫০)
নবাব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আভ্যন্তরীণ ব্যবসায় শুল্ক প্রথা সম্পূর্ণ উঠিয়ে দিতে। এর ফলে দেশী ব্যবসায়ীগণ বিদেশীদের সঙ্গে সমভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম এবং শুল্ক নিয়ে উত্তেজনা প্রশমন হবে বলে আশা করা হয়। কিন্তু মীর কাশিম বিস্মিত হন যখন কোম্পানী তাঁর উপর এ মর্মে চাপ দেয় যে শুল্ক বিলুপ্ত করার একতিয়ার সম্রাটের, নবাবের নয়। কোম্পানী নবাবের উপর চাপ দেয় দেশী ব্যবসায়ীদের উপর শুল্ক প্রচলনের জন্য এবং কোম্পনীর গোমস্তাদের প্রাইভেট ব্যবসা শুল্কমুক্ত রাখার জন্য। এহেন পরিস্থিতিতে মীর কাশিমের জন্য খোলা ছিল দুটি পথ : যুদ্ধ করে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা অথবা কোম্পানীর আজ্ঞাবহ হয়ে নামেমাত্র নবাব থাকা। স্বাধীনচেতা মীর কাশিম যুদ্ধের পথ বেছে নেন এবং পরাজিত হন ১৯৬৩ সালে। মুঙ্গের ও পাটনার চূড়ান্ত লড়াইয়ে (১৭৬৩) নবাব মীর কাশিমকে পরাজিত করে ও পরবৎসর বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌল্লাহ ও দিল্লীর বাদশাহ শাহ্ আলমের সম্মিলিত বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পর্যুদস্ত করে ইংরেজ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী প্রমাণ করে যে, বাংলা তথা সমগ্র উত্তর-ভারতের রাজনীতিতে কোম্পানী একটি অদ্বিতীয় অপরাজেয় শক্তি। রবার্ট ক্লাইভ ১৭৬৫ সনে পুনর্বার বাংলায় আগমন করেন।
এসময় বাংলা বিহার উড়িষ্যার সমস্ত রাজস্ব, সমস্ত ব্যবসা বাণিজ্য হয় ইংরেজের করতলগত। দেশের সম্পদ লুণ্ঠনে কোম্পানীর কর্মচারী ও গোমস্তারা এমন নির্মম পাশবিকতা প্রদর্শন করে, যেখানেই অর্থের আভাস সেখানেই শোষণযন্ত্রের ক্রু এমন শক্তভাবে আঁটে, সাধারণ লোক থেকে আরম্ভ করে নবাব পর্যন্ত সবাইকে সেলামীর নামে এমন অত্যাচার উৎপীড়ন করে যে এদের অভাবনীয় বর্বরতা ভাষায় ব্যক্ত করা কঠিন। ক্লাইভের ভাষায়, ‘বাংলাদেশে ব্রিটিশরা এমনি বর্বর পাশবিকতার পরিচয় দিয়েছে এবং এদের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা এমন চরম যে, ইংরেজের নাম বা চেহারা যেন এদেশের হিন্দু-মুসলমানের নাকে একটি অসহ্য দুর্গন্ধ বিশেষ।’
১৭৭০ সালের মন্বন্তর তথা গণহত্যার পথ প্রস্তুতে এই পশুশক্তির অবদান মূল্যায়ন করা জরুরি।
নবম.
পলাশীর আগে থেকেই নিজামত ও দেওয়ানি— এই শাসনধারা প্রচলিত হয়। নিজামত শাসন অর্থাৎ আইন শৃঙ্খলা, দণ্ড, প্রতিরক্ষা প্রভৃতি কাজ ছিল নবাবের দায়িত্ব আর দেওয়ানি অর্থাৎ রাজস্ব শাসন, ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্প, সম্পত্তি ও অনান্য অধিকারসংক্রান্ত ন্যায়বিচার প্রভৃতি কাজ ছিল দীউয়ানের দায়িত্ব।
নবাব ও দেওয়ান দুজনই সরাসরি নিযুক্ত হতেন সম্রাট কর্তৃক। প্রদেশে যদিও নবাবের পদ প্রাধান্য ছিল তথাপি দেওয়ান কোন ক্রমেই নবাবের অধীন ছিলেন না। নবাবের মতো দেওয়ানকেও সরাসরি জবাবদিহি করতে হতো সম্রাটের কাছে।
মুর্শিদকুলী খান দেওয়ান থেকে নবাব হবার পর (১৭১৭) দেওয়ানি পদ নিজামতের সঙ্গে সংযুক্ত করেন। নবাব সুজাউদ্দীন খানের পর থেকে দেওয়ান নিযুক্ত করা হয়, কিন্তু সে দেওয়ান নিযুক্ত হতো নবাব কর্তৃক এবং দেওয়ানকে নবাবের কাছে জবাবদিহি করতে হতো। রাবর্ট ক্লাইভ কোম্পানীর নামে যে দেওয়ানি লাভ করতে চান তা ছিল গৌরবময় মুঘলযুগের দেওয়ানি। অর্থাৎ সম্রাট নিজে নির্দিষ্ট শর্তে কোম্পানীকে দেওয়ান নিযুক্ত করবেন এবং কোম্পানী জবাবদিহি করবে সম্রাটের কাছে, নবাবের কাছে নয়।
১৭৬৫ সনের মাঝামাঝিতে রবার্ট ক্লাইভ নগদ বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব দানের বিনিময়ে শুধু বাংলা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানি প্রার্থনা করেন এবং সম্রাট শাহ আলম ক্লাইভের প্রস্তাব দু-হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করেন।
ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী দিল্লীর বাদশাহকে বাৎসরিক ২৬ লক্ষ টাকা ও বাংলার নবাবকে ৫৩,৮৬,১৩১ টাকা রাজস্ব দানের বিনিময়ে বাংলা বিহার উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। উক্ত টাকা শোধ করার পর বাকী আয় সবই কোম্পানীর প্রাপ্য এবং সে আয়ের পরিমাণ তখন অর্থাৎ ১৭৬৫ সনে নেট ৩ কোটি টাকা হবে বলে আন্দাজ করা হয়। দেওয়ানি লাভের ফলে কোম্পানী ও নবাবের সঙ্গে ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের চির অবসান ঘটলো। নবাব এখন বস্তুত কোম্পানীর পেনশনার মাত্র। বাদশাও তাই। সমস্ত ক্ষমতা কোম্পানীর হাতে। দেওয়ানির ফলে কোম্পানীর যে আয় হবে তা দিয়ে কোম্পানীর সমস্ত খরচ কুলিয়ে ব্যবসার সমস্ত পুঁজি সংগ্রহ করা সম্ভব হলো।
এভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা কোম্পানীর হাতে ন্যাস্ত হয়। নবাব কোম্পানীর কাছে পুতুল। তাঁর আলাদা কোন সৈন্য নেই, ৫৩ লক্ষ টাকার উপরে কোন আয় নেই, স্বাধীনভাবে চলাফেরার উপায় নেই। এক কথায়, সরকার এখন নামে নবাবের, কিন্তু কার্যত তা কোম্পানীর।
দশম.
সৈয়দ মোহম্মদ রেজা খান :
পারস্যোদ্ভব রেজা খান বৈবাহিক সূত্রে ছিলেন নবাব আলীবর্দী খানের আত্মীয়। কোম্পানীর পক্ষে দেওয়ানি শাসন পরিচালনার জন্য সৈয়দ মোহম্মদ রেজা খানকে ডেপুটি দেওয়ান বা নায়েব দেওয়ান নিযুক্ত করা হয়। নাবালক নবাব নজমুদ্দৌল্লাহর নায়েব নাজিম বা অভিভাবক হিসাবে নিজামত শাসনের ভারও ছিল রেজা খানের উপর ছিল। অর্থাৎ দেওয়ানি শাসন ও নিজামত শাসন উভয়ই এখন রেজা খানের উপর ন্যাস্ত। নবাব ও কোম্পানীর সাধারণ প্রতিনিধি তিনি।
কোম্পানীর প্রতিনিধি হিসেবে রেজা খানের উপর দায়িত্ব অর্পিত হয় মুঘল ব্যবস্থানুসারে রাজস্ব শাসন পরিচালনার জন্য। তবে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি পুরোপুরি স্বাধীন নন। নিজামত শাসনের বেলায় পরোক্ষভাবে এবং দেওয়ানি শাসনের বেলায় প্রত্যক্ষভাবে তিনি কোম্পানী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। সাধারণভাবে এ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দ্বৈতশাসন নামে পরিচালিত।
১৭৬৯ সনে কোম্পানী কর্তৃক জেলায় জেলায় ইংরেজ সুপারভাইজার নিয়োগের পর ক্ষমতা বিন্যাসে দ্বৈততা দেখা দেয়। সুপারভাইজার নিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানী মুঘল শাসন পদ্ধতি ও মুঘল আমলাতন্ত্র সরিয়ে কোম্পানীর শাসন প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং এর ফলে ক্ষমতাকাঠামোয় দেখা দেয় দ্বৈততা। সে দ্বৈততার অবসান হয় ১৭৭২ সনে। কোম্পানী তখন সরাসরি দেওয়ানি শাসন গ্রহণ করে এবং মুঘল আমলাতন্ত্রের বদলে কোম্পানীর আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।
সৈয়দ মোহম্মদ রেজা খানের দৃষ্টি নিম্নবর্গের জীবন :
রেজা খানের দৃষ্টিতে মুঘল মডেল মানে আলীবর্দীয়ান মডেল। রেজা খান মুঘল শাসনের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেন : ‘রায়ত বা কৃষকেরা তখন ধনী ছিল না বটে, তবে সন্তুষ্ট ছিল। জমিদার ও তালুকদারেরা ছিল জনগণের মা-বাপ বন্ধুতুল্য। তাঁরা (জমিদারেরা) শান্তিরক্ষার জন্য পুলিশ মোতায়েন রাখতো এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ দায়ী ছিল। সব জমিতে তখন চাষাবাদ হতো। জনসংখ্যা বৃদ্ধি কৃষিশিল্পের উন্নতির জন্য জমিদার শ্রেণী ছিল সচেষ্ট। জমির উৎপাদনশক্তির উপর নির্ভর করত খাজনার হার।’
বাণিজ্য সম্পর্কে খানের মন্তব্য : ‘কারিগরেরা তখন পণ্য তৈরী করতো স্বেচ্ছায় এবং তাদের নিজেদের স্বার্থে। যে কারও কাছে তারা তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারতো। কেনাবেচা করতো বিনা বাধায়, বিনা হয়রানিতে। ব্যবসায়ী শ্রেণীর লোকেরা ছিল মহাধনী, খরচ করতো বিপুল। দেশের রপ্তানী খাতে আয় হতো বিপুল, সোনারুপায় পুঞ্জীভূত হয়েছে দেশের সম্পদ। সরকার কখনও অবাধ ও সুস্থ ব্যবসা বাণিজ্য শিল্পে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি।’
নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর থেকে ধীর ধীরে মুঘল শাসনকাঠামো ভেঙ্গে পড়তে থাকে। পলাশীর পর শাসন বলতে বুঝায় দুঃশাসন অরাজকতাকেই। এসময় দেশের প্রত্যেকটি উৎপাদনের উপর ইংরেজের একচেটিয়া বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইংরেজ ব্যবসায়ীরা তাদের বাণিয়া ও দালালদের সহায়তায় নিজেরাই সিদ্ধান্ত করে জিনিসের সরবরাহের পরিমাণ ও মূল্য। তাঁতীদের বলপূর্বক বাধ্য করা হয় আগাম গ্রহণ করতে। আগাম নিতে অস্বীকার করলে তাঁতীকে ডেকে এনে গাঁইটে আগাম গুঁজে দিয়ে বেত্রাঘাতে বিদায় করা হয় এবং বলা হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ বস্ত্র নির্দিষ্ট সময়ে দিতে। একবার আগাম গ্রহণ করলে তাঁতীর উপায় নেই অন্য কারও কাছে বাজারমূল্যে বস্ত্র বিক্রয় করার। গোমস্তা তাঁর সরবরাহকৃত বস্ত্রের উপর যে মূল্য ধার্য করে তা বাজারমূল্যের চাইতে শতকরা পনর থেকে চল্লিশভাগ কম। তাঁতীরা যেন পালিয়ে না যায় বা গোপনে অন্যের কাছে বস্ত্র বিক্রয় না করতে পারে সেজন্য তাদের উপর নিয়ত খবরদারী করার জন্য পিয়ন নিযুক্ত করা হয়।
আলীবর্দী খানের আমলে ইউরোপীয়ানদের ব্যবসা ছাড়াই ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এদেশে এসে যে ব্যবসা করতো তার বাৎসরিক পরিমাণ ছিল প্রায় সত্তর লক্ষ টাকা। দেশ ছিল তখন সমৃদ্ধশালী। কিন্তু ১৬৬৫ সাল থেকে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। পুঁজিপতি শ্রেণি অবসরপ্রাপ্ত। হঠাৎ করে সোনা-রুপা আমদানী বন্ধ হয়ে যাবার ফলে মুদ্রা দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যবসায়িক আদান প্রদান প্রায় স্থবির। রাজস্ব সংগ্রহ করা হচ্ছে বল প্রয়োগ করে।
এই প্রবন্ধটি ২১ এপ্রিল ২০২৩ থিওজফিক্যাল সোসাইটি হলে উপনিবেশ বিরোধী ও কর্পোরেট বিরোধী চর্চা, তৃতীয় মধুমঙ্গল স্মৃতি বক্তৃতায় পঠিত।
লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com