| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পলাশীর পরের গণহত্যা, লুট বাখান (শেষ পর্ব) : মিল্টন বিশ্বাস

Reporter
ড. মিল্টন বিশ্বাস / ৬৯১ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৩

একাদশ.

১৭৬৯-৭০ সালের মহা-দুর্ভিক্ষ বা গণহত্যা :

সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে এই গণহত্যার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বাংলার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে দুর্ভিক্ষ বিরল নয়, কিন্তু ১৭৬৯-৭০ সনের দুর্ভিক্ষ ছিল এত ব্যাপক, দীর্ঘস্থায়ী, ও ভয়ংকর যে, এর বীভৎসতা পূর্বে বা পরের অন্য কোন জানা দুর্ভিক্ষের সঙ্গে তুলনাহীন লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম। (বাংলার ইতিহাস : ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৪, পৃ ৭১) তিনি আরো জানিয়েছেন, ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রেজা খান প্রথম কোম্পানীকে অবহিত করেন যে, খরার দরুন শষ্যের ফলন অনেক কম। অক্টোবর-নভেম্বর মাসেও কোন বৃষ্টি হয়নি। আমন ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়, অথচ এ ফসলই হচ্ছে অর্থনীতির মেরুদণ্ড। ফসলহানি ও দ্রুত মূল্য বৃদ্ধিতে শঙ্কিত হয়ে সরকার সেনাবাহিনী, ইউরোপীয়ন ও কলকাতার অধিবাসীদের জন্য চাল মজুত করতে শুরু করে। সরকারী মজুত নীতি দেখে ধনীলোক, ব্যবসায়ী, ফটকাবাজ, মজুতদার সবাই যেখানে যা চাল পাওয়া যায় মজুত করতে শুরু করে। ফলে চালের মূল্য দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৭৬৯ সনের গোড়ায় চালের বাজার মূল্য অন্যান্য বৎসরের তুলনায় অনেক বেশি ছিল এবং সে অবস্থায়ই টাকায় চার থেকে পাঁচ মন চাল পাওয়া যেতো। (N. K. Sinha, The Economic History of Bengal, voll II, 1968, p. 49) এর মূল্য বৃদ্ধি পেতে পেতে বৎসরের শেষে এসে দাঁড়ায় টাকায় মাত্র আট থেকে বার সেরে। দুর্ভিক্ষাবস্থায় রায়তের অবস্থা ও রাজস্ব সংগ্রহ পরিস্থিতি সম্পর্কে রেজা খান বলেন: ‘বাংলা ও বিহারের রায়তেরা দুর্ভিক্ষের ফলে এমনি দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, রাজস্বের জন্য চাপ দিলে অর্থের জন্য পুত্রকন্যা বিক্রি করতে বাধ্য হয়। লাঙ্গল, গরু, পুত্র কন্যা বিক্রয় করে রাজস্ব দিতে বাধ্য করালে এ বৎসরের রাজস্ব হয়ত সংগ্রহ করা যাবে, কিন্তু পর বৎসর রায়তদের কর্মক্ষম রাখার জন্য উচিত সুচিন্তিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

উপরি-উক্ত হুশিয়ারি রেজা খান দেন ১৭৬৯ সনের ডিসেম্বর মাসে। (Reza Khan to Governor Cartier, 15 May, 1770 Calender of Persian Correspondence, vol. III, No. 209) ১৭৭০ সনের শুরু থেকে অনাহারে অর্ধাহারে মৃত্যু শুরু হয়। মৃত্যুর মুখেও কোম্পানী রেজা খানকে বাধ্য করে বন্দোবস্ত মাফিক রাজস্ব সংগ্রহ করার জন্য। ১৭৭০ সনের মে মাসে দুর্ভিক্ষের উপর এক মর্মান্তিক রিপোর্ট দেন রেজা খান। তিনি উল্লেখ করেন দেশে পানি নেই, চাল নেই, সব শস্য বাজার থেকে উধাও, ঘরে ঘরে হাহাকার, গ্রাম ছেড়ে ক্ষুধার্ত মানুষ খাদ্যের তালাশে গ্রহণ করছে ভবঘুরে জীবন, মৃত্যু আর মৃত্যু, খরায় চৌচির, ঘর বাড়ীতে আগুন ধরছে ঘন ঘন, পুড়ে যাচ্ছে যা খাবার সম্পদ বাকী আছে তাও। তিনি লিখছেন আগে দৈনিক হাজার হাজার মরেছে, এখন মরছে দৈনিক লক্ষ লক্ষ। জুন মাসের (১৭৭০) ২ তারিখ রেসিডেন্ট বেচার লেখেন : ‘সারাদেশে মৃত্যুর হার হবে প্রতি ষোলজনের মধ্যে ছয় জন’ এবং তিনি বলেন দেশের অনেক জায়গায় ‘সব কিছু খেয়ে শেষ করে এখন মানুষকে মানুষ আক্রমণ করছে ও খাচ্ছে।’ (Becher’s Letter, 2 June 1770, Bengal Secret Consultations, 9 June, 1770) ১২ই জুলাই বেচার মুর্শিদাবাদ শহর ও গ্রামের দুর্ভিক্ষচিত্র তুলে ধরে লেখেন যে মুর্শিদাবাদ শহরে প্রতিদিন পাঁচশত করে লোক মরছে আর গ্রামে মৃত্যুর সংখ্যা বলা নিরর্থক কেননা কে গুণে কে জীবিত, কে মৃত? জুন (১৭৭০) মাসে চালের মূল্য ছিল টাকায় ছয় থেকে সাত সের। জুলাই মাসে বাজার থেকে চাল সম্পূর্ণ উধাও হয়ে যায় কালোবাজারে টাকায় তিন সের দরে যে চাল পাওয়া যায় তা শুধু প্রভাবশালী লোকদের জন্য। মন্বন্তরের আগে স্বাভাবিক অবস্থায় চালের মূল্য ছিল টাকায় চার থেকে ছয় মণ। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক অর্থে বাজার বলতে যা বুঝায় তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। দীর্ঘ খরা ও নিদাঘে বাঁশ বন নল-খাগড়ার ঘরবাড়ি শুষ্ক ও চৌচির হয়ে যেন বারুদে পরিণত হয়। আগুন লেগে ভস্মীভূত হয়। অগণিত বাড়ীঘর, শস্যগোলা, হাট বাজার। ক্ষুধার জ্বালা, আগুনের জ্বালা যেন যথেষ্ট নয়। এর উপর আসে প্রলয়ংকরী মহামারী। এখানে ওখানে সবখানে পড়ে থাকা পঁচা লাশ। বিষাক্ত করে পরিবেশ, প্রাদুর্ভাব হয় দুর্ভিক্ষের মতই অশ্রুতপূর্ব কলেরা আর ম্যালেরিয়ার। নভেম্বর মাসে অবস্থার উন্নতি হয়। ডিসেম্বর মাসে ফসল ফলে, যদিও কম, কিন্তু লোক ছিল আরও কম। বছর শেষ হতে দুর্ভিক্ষেরও হলো শেষ, কিন্তু সমাজদেহে থেকে গেল এর অবিস্মরণীয় ক্ষত।’ (বাংলার ইতিহাস : ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো, পৃ ৬৮)

বারো.

দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় ব্যর্থতা গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত :

ক) দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভূমিকা ও ব্যর্থতা লক্ষ্য করলে এই মন্বন্তরকে গণহত্যা বলার কারণ স্পষ্ট হবে।

দীর্ঘায়িত খরার পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকর্তা রেজা খান কোম্পানিকে অনুরোধ করেন রাজস্ব দাবি কমানো ও তাকাভি ঋণ বৃদ্ধি করার জন্য। কিন্তু কোম্পানির কর্তৃপক্ষ পূর্ববৎ রাজস্ব আদায়ে অটল থাকে। রেজা খানের উপর চাপ দেওয়া হয় কোম্পানির রাজস্ব যেন না কমে তা নিশ্চিত করার জন্য। কোম্পানির বিনিয়োগ ও সরকারি ব্যয়ের জন্য সম্পূর্ণ নির্ভরশীল দেওয়ানির আয়ের উপর; অতএব ক্ষুধায় মমতা দেখালে চলে না, টাকা চাই। দেখা যাচ্ছে দুর্ভিক্ষের ফলে প্রায় এক কোটি লোক মারা যায়, তবু কোম্পানির রাজস্ব সংগৃহীত হয়েছে প্রায় আগের মতই। দুর্ভিক্ষের পূর্ব-বৎসর থেকে পর বৎসর পর্যন্ত সরকারি রাজস্ব সংগ্রহ ছিল- ১৭৬৮-৬৯ সালে দেড় কোটি টাকা, ১৭৬৯-৭০ সালে ১ কোটি ৪০ লাখ এবং ১৭৭১-৭২ সালে দেড় কোটি। পলায়ন, ক্ষুধা ও মৃত্যুর মুখে পতিত মানুষের কাছ থেকে জোর করে রাজস্ব সংগ্রহ করা জুলুমবাজি ছাড়া আর কিছু নয়।

খ) ‘নাযাই-পলাতকা’ প্রথা ছিল নিপীড়নমূলক। গ্রাম থেকে রায়ত পালিয়ে গেলে তার বকেয়া খাজনা নাযাই অর্থাৎ অপলাতক প্রতিবেশীর নিকট থেকে আদায় করার প্রচলিত প্রথার সুযোগ নিয়ে রাজস্ব ঠিকাদারেরা গ্রামের ধনী কৃষকদের শক্তি প্রয়োগ করে অর্থ আদায় করে। খাদ্যশস্যের উচ্চমূল্যের দরুন মজুতদারী ধনী রায়তরা প্রচুর মুনাফা অর্জন করেছিল বটে, কিন্তু সে মুনাফা তারা ভোগ করতে পারেনি। কোম্পানির লোকরা তাদের উপর পলাতক ফি ধার্য করে এবং জোরপূর্বক আদায় করে। ফলে তাদের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার উপকরণ অপহৃত হয়ে যায়।

গ) দুর্ভিক্ষকে উপেক্ষা করে স্বাভাবিক সময়ের মত রাজস্ব আদায়ের মধ্যে ব্রিটিশ জাতির যে বর্বরোচিত পাশবিক নিষ্ঠুরতার পরিচয় মেলে তা মানব ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। দৈনিক হাজার হাজার লোকের মৃত্যুর খবর পেয়েও কলকাতা কাউন্সিল যখন দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার জন্য কোন সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়। ১৭৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুর্শিদাবাদ ও বিভিন্ন জেলায় দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের রিলিফের জন্য কোম্পানি প্রায় পৌনে দুই লক্ষ টাকা অনুমোদন করে। অনুমোদিত ওই টাকার সিংহভাগ চাঁদা হিসেবে আদায় করা হয়েছিল বিভিন্ন ধনাঢ্য পরিবার থেকে।

ঘ) ইংরেজ গোমস্তারা চালের ব্যবসায় একচেটিয়া কর্তৃত্ব স্থাপন করে অন্যায় মুনাফা লুটেছে। মুনাফাখোর কালোবাজারি মজুতদারদের মধ্যে ছিল কোম্পানির অনেক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যে জন্য রেজা খান ইংরেজ গোমস্তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ছিলেন অক্ষম। ইংরেজ গোমস্তাদের দেখাদেখি দেশি ব্যবসায়ীরাও চাল মজুত করতে শুরু করে ও দুর্ভিক্ষে সর্বস্বান্ত রায়তদের কৃষির সরঞ্জামাদি কেনার জন্য সরকার শতকরা সাড়ে বার টাকা হার সুদে তাকাভী ঋণ দেয়ার নীতি গ্রহণ করলেও হলেও ঋণ বিতরণের চিরাচরিত মাধ্যম ছিল জমিদার বা রাজস্ব ইজারাদার। ফলে তাকাভী ঋণের অতি অল্প অংশই কৃষকদের কাছে পৌঁছায়।জমিদার ইজারাদাররা সরকারকে মিথ্যা রিপোর্ট দিয়ে নিজেরাই সে ঋণের টাকা ভোগ করে।

ঙ) পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গ এবং বিহার প্রদেশ ছিল দুর্ভিক্ষের কেন্দ্র-স্থল। পূর্ববঙ্গে দুর্ভিক্ষ না থাকলেও উচ্চ দ্রব্যমূল্য ও অনটন সমস্যা ছিল। তবে পূর্ণিয়া, বিষ্ণুপুর, রাজশাহী প্রভৃতি জেলায় লোকক্ষয় হয় গোটা জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। অন্যান্য উপদ্রুত এলাকায় মৃত্যুসংখ্যা এত ব্যাপক নয়। কৃষি কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি অনাবাদ থাকে এবং সে পতিত জমি জংগলে পরিণত হয়। দুর্ভিক্ষে মৃত্যু এবং পলায়নের ফলে জনসংখ্যা এমন হ্রাস পায় যে সারা দেশ জংগলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। কৃষি-শ্রমশক্তি কৃষি-জমির তুলনায় অনেক কম হওয়ায় জমির মূল্য কমে যায়।কিন্তু যারা স্থায়ী আবাসিক রায়ত তারা পূর্বের হারেই খাজনা দিতে বাধ্য হয়। ফলে অনেক আবাসিক রায়ত নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেয়। গ্রামের সমাজ কাঠামোয় দেখা দেয় বিরাট পরিবর্তন। অনেকেই অস্থায়ী অধিকারবিহীন রায়তে পরিণত হয়। দুর্ভিক্ষের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভূমিতে স্থায়ী অধিকারবিহীন একটি বিরাট পায়কায়স্থ রায়ত শ্রেণির সৃষ্টি হয়।

চ) দুর্ভিক্ষে কৃষি শ্রমশক্তি কমে যাওয়ার বিস্তীর্ণ কৃষিভূমি অনাবাদে পড়ে থাকে। ফলে জমিদারেরা খাজনা থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু জমিদারদের ক্ষতি অনুপাতে সরকার রাজস্বদাবি কমায়নি। ফলে সরকারি রাজস্ব শোধ করতে তাদের ঋণ করতে হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারী জমিদারিগুলোর চাইতে বড় বড় জমিদারিগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয় সবচাইতে বেশি। বর্ধমানের মহারাজা, নাটোরের মহারাজা, নদীয়ার মহারাজা, বিষ্ণুপুরের মহারাজা, বীরভূমের মহারাজা প্রভৃতি অতিকায় জমিদারগণ এত দরিদ্র ও ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে যে থালাবাসন, অলংকার, গবাদী পশু বিক্রয় করে পর্যন্ত তাঁরা ঋণমুক্ত হতে পারেননি। এর প্রতিক্রিয়া পড়ে কৃষির উপর। দরিদ্রের জন্য জমিদারেরা কৃষিঋণ দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে প্রচুর জমি অনাবাদী হয়ে জঙ্গলে পরিণত হয়।

ছ) রেশম ও তাঁত শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের মধ্যে অনাহারে মৃত্যুর হার ছিল সর্বোচ্চ। উভয় শিল্পই শ্রমিকদের অভাবে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। রাজশাহী রেশম শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক ও কারিগরদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক লোক মারা যায় এবং জীবিতেরা এত জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়ে যে তাদের পক্ষে রেশম শিল্প টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে দাঁড়ায়। মৃত্যু ও পলায়নের ফলে তাঁতশিল্পে দক্ষ শ্রমের অভাব দেখা দেয়।

জ) দুর্ভিক্ষের তাণ্ডবলীলায় সামাজিক অনুশাসন ভেঙে যায়, সমাজ বিন্যাসে আসে অভূতপূর্ব পরিবর্তন, সৃষ্টি হয় সরকার, আইন শৃংখলার প্রতি অভক্তি ও অবিশ্বাস। যে ব্যবস্থা মানুষকে বাঁচতে পারে না সে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক। কোম্পানির শোষণ ব্যবস্থা মানুষকে বাঁচার ব্যবস্থা নয়। দুর্ভিক্ষে তাই প্রমাণিত হয়। অতএব এ ব্যবস্থাকে পদদলিত করে, চুরি ডাকাতি দস্যুবৃত্তির আশ্রয় গ্রহণ করে বাঁচতে চেষ্টা করে সমাজের দুঃসাহসিক ব্যক্তিরা। সরকারেএহেন অরাজকতা নিয়ন্ত্রণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।আইন শৃংখলা পুনঃস্থাপনের জন্য প্রেরিত সরকারী সিপাহীরা অনেক সময় নিজেরাই দস্যুদের সহায়তা করে এবং লুটের বখরা নিয়ে ধনী হতে চেষ্টা করে।

ঝ) দুর্ভিক্ষের রাজনৈতিক ফল হলো ১৭৭২ সনে যৌথশাসনের অবসান ঘটিয়ে কোম্পানি দেশের দেওয়ানি শাসন নিজ হাতে গ্রহণ করে।

তেরো.

উপসংহার

নিম্নবর্গীয় ইতিহাসের জনক রণজিৎ গুহ বলেছেন, ‘বাঙালির ঐতিহাসিক প্রতিভা আজও প্রধানত রাজনৈতিক উত্থান পতনের কাহিনি বর্ণনায় সীমাবদ্ধ।’ কিন্তু তিনিও লক্ষ্য করেছেন দেশীয় অর্থনীতি ও সমাজ জাতীয় ইতিহাসের মৌলিক উপাদান। এদিক থেকে রাজনীতি-অর্থনীতি ও সমাজ সবকিছুকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে ‘পলাশীর পরের গণহত্যা, লুট বাখান’ একটি অনন্য প্রকল্প। বাংলা ইতিহাসে নতুন এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হলো। এখন আমাদের দরকার কোম্পানি আমলের সমস্ত দলিলপত্রের অনুপুঙ্খ পাঠ ও বিশ্লেষণ। কোম্পানির সাম্রাজ্যস্বার্থের সংর্কীণ গলিপথে আমরা খুঁজে ফিরব বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের উপকরণ। যেখানে থাকবে মন্বন্তরকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করার সকল প্রমাণপত্র এবং দোষী ব্যক্তিদের স্বরূপ উন্মোচনে আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার সংশ্লেষ।

এই প্রবন্ধটি ২১ এপ্রিল ২০২৩ থিওজফিক্যাল সোসাইটি হলে উপনিবেশ বিরোধী ও কর্পোরেট বিরোধী চর্চা, তৃতীয় মধুমঙ্গল স্মৃতি বক্তৃতায় পঠিত।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম এবং অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev