‘আট থেকে আশি, দুঃখ ভুলে হাসি।’ এটাই সত্য যে মানুষ হাসতে ভালোবাসে। তাইতো গোটা পৃথিবী জুড়ে দীর্ঘকাল ধরে লেখা হয়ে আসছে হাসির গল্প, উপন্যাস, ছড়া, কবিতা, হাসির সিনেমা। হাস্যরস নামক প্রাচীন ব্রহ্মাস্ত্রটির প্রয়োগ কিন্তু সকল অভিনেতা করায়ত্ত করতে পারেন না।
বাংলার নাটকের শুরুতে প্রহসনের ব্যাপারটি বেশি চলতো। এইধরনের নাটকে রামনারায়ন তর্করত্ন ছিলেন প্রসিদ্ধ। এরপর মধুসূদন দত্তের ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’; দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’, ‘জামাই বারিক’; অমৃতলাল বসুর ‘তাজ্জব ব্যাপার’ রবীন্দ্রনাথ মৈত্রের ‘মানময়ী গার্লস্ স্কুল’, প্রমথনাথ বিশীর ‘মৌচাকে ঢিল’ …বাংলা নাট্য সাহিত্যে কমেডি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

শৈশবে কমেডিয়ান বলতে প্রথমেই যাঁর নাম মনে আসে, তিনি হলেন গোপাল ভাণ্ডারী৷ ‘ভাঁড়ামি’-র জন্যই তাঁকে ভাঁড় বলে ডাকা হত৷
কালপরম্পরায় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত তাঁর গল্প শুনে হাসেনি এমন গোমড়ামুখো বাঙালীর দেখা পেতে গেলে খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতো ঘটনা ঘটবে। রসপ্রিয় বাঙালির মৌখিক ঐতিহ্যের যথাযোগ্য প্রতিনিধি। লোকমুখে পল্লবিত তাঁর গল্পগুলোতে চমৎকার হাসির রেখা আছে বটে, তবে ওই হাসির নেপথ্যে গুপ্তঘাতকের মতো রয়েছে মিছরির ছুরিও—এক সামন্ততান্ত্রিক সমাজকে সমালোচনার মাধ্যমে কেটে উদোম করে দেয় সেই ছুরি। আছে লোকশিক্ষা, নীতিশিক্ষা ও মোটাদাগে সমাজসংস্কারের ব্যাপার-স্যাপার।
আমাদের প্রিয় হাস্য কৌতুক অভিনেতা অনেকেই আছেন যেমন- রবি ঘোষ, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, চিন্ময় রায়, অনুপকুমার, তুলসী চক্রবর্তী আরো অনেককেই। যাদের অভিনয় এখনো বাঙালির ড্রয়িং রুমের মূল আকর্ষণ। সিনেমার পাশাপাশি তাঁরা মঞ্চেও চটজলদি কমেডি করেছেন।

কমেডির মূল সূত্র সময়ের পরিমাপ প্রমাণ করছিলেন অনুপকুমার ‘পলাতক’ সিনেমায় অসাধারণ অভিনয় করে। এরপর বসন্তবিলাপ, দাদার কীর্তি, মৌচাক …ছবিগুলোতে একটি বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় করেন যা শুধু হাস্যরসের স্বাদই দেয়নি বরং চিত্তাকর্ষক এবং গভীর অর্থ ফেলেছেন দর্শক হৃদয়ে।
তাঁর চরিত্র পরিবেশনায় কমেডি-ট্রাজেডির সঠিক মিশেল স্বাদ বাড়িয়ে ছিলো সিনেমার।
তপন সিনহার ‘গল্প হলেও সত্যি’ দেখে কেউ বলবেন না ধনঞ্জয় একজন সাদামাটা বেঁটেখাটো লোক, সিনেমার নায়ক। চাকররূপী রবি ঘোষের দুর্দান্ত সিরিয়াস-কমেডি অভিনয় যার মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছিলেন একটা ভাঙা সংসার জুড়ে যাওয়ার বার্তা।

এমনটাই ছিলেন রবি ঘোষ। এই চেহারা নিয়েই দিনের পর দিন মিনার্ভা থিয়েটার ভরিয়েছিলেন দর্শকে। আজো দক্ষ কৌতুক অভিনেতা হিসেবে স্থান দখল করে রেখেছেন দর্শক হৃদয়ে। নাটক, থিয়েটার, ছোটপর্দা কিংবা বড়পর্দা সব জায়গাতেই কৌতুকাভিনয়ে মাতিয়ে রেখেছিলেন সকলকে।
‘মাসিমা মালপো খামু’ এই বিখ্যাত সংলাপ মনে করিয়ে দেয় সহজ-সরল, ছাপোষা আদ্যন্ত বাঙালিয়ানায় ভরপুর দক্ষ কমেডিয়ান ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা। বাংলা ছবির মহাকাশে ‘বাঙাল ভাষা’ ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে পদার্পণ করেন এই শিল্পী।
‘সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ‘ভানু পেলো লটারী’, ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট’,’ জয় মা কালি বোর্ডিং’ …..সিনেমার ডায়ালগ দর্শকদের অনেক দুঃখ ভুলিয়ে দিয়ে নিয়ে আসতো মুখে হাসির রেখা।
ভানু ছবিতে দ্রুত হেটে যাচ্ছে – এটা দেখলেই আজো পেট মোচর দিয়ে হাসি বেড়িয়ে আসে। এমন সব এক্সপ্রেশনেই পর্দায় বাজিমাত করেছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।

উৎপল দত্ত বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্য জগতে প্রথাগত খলনায়ক থেকে কৌতুক অভিনেতা হিসাবে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ সিনেমায় রায় সাহেব, ‘হীরক রাজার দেশে’ হীরক রাজার ভূমিকায় বা ‘গোলমাল ‘ সিনেমায় ভবানী বাবুর ভূমিকায় ইত্যাদি যে কোন বাংলা থেকে হিন্দি সিনেমায় সবকিছুতেই অনায়াসে অসাধারণ কমেডি রোলে মুগ্ধ করেছিলেন দর্শককে। ১৯৮০, ১৯৮২এবং ১৯৮৭ সালে কৌতুক চরিত্রে” ফিল্ম ফেয়ার ফর বেস্ট কমেডিয়ান ” বিভাগে সেরা অভিনেতা হিসেবে বিজয়ী হন।
‘শুধু তুমি নয় অবলাকান্ত, অনেকেরই বলার সময় খেয়াল থাকে না’— কিন্তু সত্যিটা হলো অবলাকান্তের খেয়াল রেখেছে দর্শক মন থেকে। সন্তোষ দত্ত যাঁকে অভিনয় করতে গেলে কোনোদিন চটুল, লঘু সংলাপ ব্যবহার করতে হয়নি। নির্মল হাস্যরসে ভরপুর ছিলো তাঁর অভিনয়। ইতিহাস তৈরি করেছিলেন জটায়ুর চরিত্রে অভিনয় করে যার বিকল্প এখন অবধি কেউ করতে পারেননি।।

মূলত কমিক ভূমিকায় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তী। বিস্ময়ভরা বিস্ফোরিত চোখ দুটি চরিত্রে তাঁর নিখুঁত অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতো। ভাঁড়ামো নেই, ন্যাকামো নেই, ছদ্ম গাম্ভীর্য নেই, তিনি যা অভিনয় করতেন তা সবটাই ছিল ন্যাচারাল।
‘ভূতের ভবিষ্যত’ সিনেমায় হাতকাটা কার্তিকের চরিত্রে শ্বাশত চট্টোপাধ্যায় রীতিমতো আলোড়ন ফেলেছেন কমেডিয়ান রোলে। এখন খরাজ মুখোপাধ্যায় বা কাঞ্চন মল্লিকের মতো অভিনেতাদের কমিক টাইমিংয়ে মজেন দর্শকরা।

বর্তমানে দেশজুড়ে স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ানদের যেমন বুদ্ধিজীবী মনে করা হয়, তেমনটা খাটে না অভিনেতাদের ক্ষেত্রে।
অধুনা সমাজে স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানদের প্রাসঙ্গিকতা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমার আপনার মতো বিধিনিষেধ বেষ্টিত আম আদমির সঙ্গে এদের একটা পার্থক্য আছে। না বলা কঠিন কতগুলো অনায়াসে শব্দের জিলিপিতে মুড়ে পরিবেশন করতে পারেন এঁরা।
স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানরা দর্শকের সামনে সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে কৌতুক উপস্থাপন করেন। কৌতুকের মধ্যে থাকে গভীর ইঙ্গিত এবং তা হয় অশ্লীলতামুক্ত, হাস্যরসাত্মক এবং বুদ্ধিদীপ্ত। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, কৌতুকে থাকে দারুণ সব চিন্তার খোরাক।

শহরে কমেডিতে চর্চিত নাম মীর আফসার আলি। মীরের ভাষায় ‘কলকাতায় অনেকেই স্ট্যান্ড-আপ কমেডি করছেন। কিন্তু মুম্বই বা দিল্লিতে সুযোগ অনেক বেশি। মানে যত বড় পুকুর, তত ভালো সাঁতার শেখার সুযোগ। আসলে স্ট্যান্ড-আপ কমেডিতে যৌনতা, ধর্ম আর রাজনীতি নির্ভর হলে জমে বেশি। সেখানেই একটা লাগাম টানার প্রসঙ্গ ওঠে বাংলা টেলিভিশনে। তাই টেলিভিশনের চেয়েও ইদানীং স্ট্যান্ড-আপ কমেডি জমছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ছোটবেলায় পড়েছিলাম, ‘অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে/ তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিবাদের রাস্তা খুঁজে নিতে হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই দাপটের যুগে ফাঁক খুঁজে নেওয়া খুব কঠিন ও নয়। ভার্চুয়াল সেই জানলা দিয়েই আমাদের জীবনে আগমন এই স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানদের।
নিত্যদিনের জটিলতায় জীবন যখন নাভিশ্বাস তোলে, পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হাসির খোরাক পাওয়া খুব জরুরী। সেই অসাধ্য সাধনের কাজটি করেন বাংলার এই কৌতুক অভিনেতারা। তাই প্রাণ ভরে হাসুন। হাসতে হলে বত্রিশটি দাঁত ও সম্ভব হলে আলজিবটাও দেখানো চাই।
Bhalo bhalo. Khubi bhalo
ভালো লাগলো❤️