বেঙ্গালুরুতে ১৭ ও ১৮ জুলাই বিরোধীদের সম্মিলিত সভা এবং পাটনার বৈঠক থেকে জন্ম নেওয়া নতুন জোট ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভলেপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স (Indian National Developmental Inclusive Alliance) বা ‘ইন্ডিয়া’র লক্ষ্য, ২৪-এর লোকসভায় বিজেপিকে কেন্দ্র থেকে হটানো। সেই লক্ষ্যেই লোকসভার দশ মাস আগে ২৬টি বিরোধী দলের গঠিত জোট দাবি করছে ‘ইন্ডিয়া’র কাছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ‘এনডিএ’ জোট পরাজিত হবে। জোটে রয়েছে কংগ্রেস, এমনকি বামপন্থীরাও, পাশাপাশি এ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস, উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টি, বিহারের জনতা দল ইউনাইটেড, রাষ্ট্রীয় জনতা দল, দিল্লির আম আদমি পার্টি, মহারাষ্ট্রের এনসিপি-র মতো আঞ্চলিক দল৷ যদিও এই জোটে থাকা অনেক দলের মধ্যেই বিশেষ বনিবনা নেই, তা স্বত্বেও জোটের নেতাদের একসঙ্গে মণিপুর ইস্যুতে সংসদের ভিতরে ও বাইরে প্রতিবাদে সামিল হতে দেখা গিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করে লোকসভার চলতি বাদল অধিবেশন অচল করেছে, ‘ইন্ডিয়া’র প্রতিনিধিরা মণিপুর সফরে গিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে একসঙ্গে দরবার করেছেন তবুও জোট নিয়ে চর্চায় এই জোট আদৌ সফল হবে কিনা, লোকসভা নির্বাচনে এর কতটা প্রভাব পড়বে, জোটের ফর্মুলা অনুযায়ী একের বিরুদ্ধে এক লড়াই হলে বিজেপি কতটা সমস্যায় পড়বে, এই সব প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, যে কারণে জোটের আগেই জল্পনা ছিল যে আপ, কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল, শিবসেনা একসঙ্গে হবে কী করে? একই ভাবে শিবসেনা আর কংগ্রেস নিয়েও প্রশ্ন ছিল, সেই প্রশ্ন আপ-কংগ্রেস নিয়েও এবং সিপিএম-তৃণমূল নিয়েও প্রশ্ন ছিল। কিন্তু বেঙ্গালুরু বৈঠকে আপ, শরদ পাওয়ার, ডি কে শিবকুমার সবাই হাজির ছিলেন, রাহুল আর সোনিয়ার মাঝখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বসে জোটের নামও ঠিক হয়ে গেল। সেই নাম নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কটাক্ষ করতে ছাড়েন নি। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের মতো সংগঠনের সঙ্গে তুলনা করেছেন, তাহলে কি বিরোধীদের সঙ্ঘবদ্ধ চেহারা দেখে বিজেপি উদ্বিগ্ন বোধ করছে? তাতো হওয়ার কথা নয়, প্রায় এক দশক ভারতের রাজনীতি মোদীতেই আচ্ছন্ন৷ লোকসভার পর বিধানসভাগুলিতেও বিজেপি জয় পেয়েছে৷ যদিও জোরালো ভাবে বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন ওঠার পর থেকে চাপ ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে উঠছে। সম্প্রতি কর্নাটকে ভোটে কংগ্রেসের বিপুল জয়ে গেরুয়া শিবির যথেষ্ট চিন্তায়৷ এ বছরের শেষে পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন৷ রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ের দিকে নজর রয়েছে৷ এখানে কংগ্রেস জিতলে বিজেপির উপর চাপ আরো বাড়বে৷ স্বভাবতই ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের মুখে বিজেপি চাপে রয়েছে৷
যদিও জোটেও চাপানউতোর আছে। একাধিক রাজ্যে জোটের শরিকরা যুযুধান৷ ফলে একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দেওয়ার যে অঙ্ক তা কি বের করে আনা খুব সহজ হবে? এ রাজ্যে তৃণমূলের সঙ্গে সিপিএমের যে বোঝাপড়া হবে না, সেকথা সিপিএম সাধারণ সম্পাদক আগেই বলে রেখেছেন, কংগ্রেস কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিষয়টি চেপে গেলেও এ রাজ্যের নেতৃত্ব তৃণমূলের বিরুদ্ধে একেবারে খড়্গহস্ত৷ তৃণমূল অবশ্য জাতীয় ও রাজ্য পরিস্থিতিকে আলাদা করে দেখছে৷ তাদের বক্তব্য, রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে লড়াই হবে ঠিকই, কিন্তু কেন্দ্রীয় স্তরে সবাই বিজেপি সরকারকে হটাতে ঐক্যবদ্ধ৷ রাজ্য ও কেন্দ্রের রাজনীতি আলাদা, সেটা গুলিয়ে ফেললে চলবে না৷ গণতন্ত্র এবং সংবিধান বাঁচানোর বৃহত্তর স্বার্থে এটা জরুরি৷ অন্যদিকে, বাম-কংগ্রেস বিজেপি ও তৃণমূলকে কিন্তু প্রতিপক্ষই মনে করছে৷ তবে বাম-কংগ্রেস উভয়ই মনে করে বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরাতেই হবে৷ এই রকম এক সংঘাত রয়েই গিয়েছে, যেখান থেকে প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি ‘ইন্ডিয়া’র বিজেপি হটানোর্ ঐক্যবদ্ধ জোট গোড়াতেই মার খাবে?
রাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের মতে, এ রাজ্যে যেমন বাম-কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের লড়াই, কেরলে একই ভাবে বাম ও কংগ্রেস মুখোমুখি, দিল্লিতে ও পঞ্জাবেও তেমনই কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির লড়াই৷ কিন্তু মনে রাখা দরকার, ২০২৪-এর লোকসভা ভোটটা কেন্দ্রে সরকার নির্বাচনের ভোট৷ যদি বিজেপি বিরোধিতার লক্ষ্যে সবাই এক থাকে তাহলে রাজ্যের পরিস্থিতি বাধা হবে না৷ কারও কারও মত, কেন্দ্রের বিরোধিতায় যদি হাতে বড় ইস্যু পাওয়া যায় এবং বিরোধী দলগুলির নেতৃত্ব পাশাপাশি থাকে তাহলে বিজেপিকে হারানো সম্ভব। এ বিষয়ে তাঁরা ১৯৭৭ এবং ১৯৮৯ সালের কথা সামনে আনেন। সেই দুটি লোকসভা নির্বাচনে বিরোধী জোটের কাছে পরাজিত হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধী এবং রাজীব গান্ধীর সরকার। জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার কারণেই সেবার বিরোধী জোট এক হয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে হারাতে পেরেছিল। অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছিল বোফর্স কেলেঙ্কারি। সেবারও ভিপি সিংয়ের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এক হয়ে রাজীব গান্ধীর সরকারকে পরাজিত করতে পেরেছিল। এবারও বেকারি, মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি মণিপুর কাণ্ড বিজেপিকে বিপাকে ফেলতে পারে।