হাতে আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরই আলোর উৎসব দীপাবলি। এই আলোর উৎসবে আলোকমালায় সেজে উঠবে গোটা দেশ। একটা সময় আলোকিত করার কাজে ব্যবহৃত হোত মাটির প্রদীপ। আর আজ প্রযুক্তির উন্নতিতে প্রদীপের বাজার দখল করেছে বাহারি রঙবেরঙের দেশী বিদেশী টুনি বাল্ব। বেড়েছে টুনি বাল্বের কদর। আর কদর কমে যাওয়ায় অন্ধকারে মাটির প্রদীপ। টুনিবাল্ব বিক্রেতাদের রমরমা হলেও লাভের মুখ দেখা থেকে বঞ্চিত মৃৎশিল্পীরা। একটা সময় ছিল যখন দীপাবলিতে প্রত্যেক বাড়ি সেজে উঠত মাটির প্রদীপের আলোকমালায়।

গৌড় চন্দ্র পাল তার গোটা পরিবার দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই মাটির কাজের সঙ্গে জড়িত । তবুও তাদের কোনো রকম শিল্পীর পরিচয়পত্র হয়নি বা শিল্পী হিসাবে কোন ধরনের সরকারি সহযোগিতাও পাননি। সাহায্য না পাবার ফলে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে পেটের তাগিদে। তারা জানিয়েছে এখন সারা বছরে এক থেকে দুবার তাদের কাছে সাহায্য আসে সেটার উপর ভরসা করে তাদের সারা বছর চলা প্রায় অসম্ভব। মৃৎশিল্পীদের মধ্যে বয়সে কম এক যুবক জানালেন তারা চেষ্টা করছেন এই জীবিকাকে ধরে রাখতে কিন্তু পেটের দায়ে তা হয়ত আর ধরে রাখা যাবে না। আগে দীপাবলীতে প্রদীপের চাহিদা ছিল প্রচণ্ড আর জনপ্রিয়তাও ছিলো প্রচুর, বর্তমানে নানান ধরনের লাইট বের হয়ে এই প্রদীপের বাজারকে প্রায় নষ্ট করে দিয়েছে।

একটা সময় প্রদীপের আলোতেই ঘুচে যেত অমানিশার অন্ধকার। ঘড়ে ঘড়ে জ্বলত মাটির প্রদীপ। এখন যুগ বদলেছে, উন্নয়ন ঘটেছে প্রযুক্তিতে। বাজারের এসেছে রঙ বেরঙের দেশী বিদেশী টুনি বাল্ব। এখন মানুষ নিজের ঘড় বাড়িকে আলোকিত করতে টুনি বাল্ব ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির বাহারি আলোর চেন দিয়েই আলোকিত করছেন। এই পরিস্থিতিতেও মাটির প্রদীপকে বাঁচিয়ে রাখতে অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। আগে নাওয়া খাওয়া ভুলে লক্ষ লক্ষ প্রদীপ বানাতেন মৃৎশিল্পীরা। আর এখন নিজেদের বংশ পরম্পরায় চলে আসা মাটির প্রদীপের ব্যবসাকে বাঁচিয়ে রাখতেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন মালদা জেলার রতুয়ার মৃৎশিল্পীরা। তারা জানান, আগে তাঁরা এই পুজোর মরসুমে প্রদীপ বানাতেন লক্ষ লক্ষ, আর এখন তা হাজারে এসে ঠেকেছে। আগে প্রদীপ বানিয়ে যে মুনাফা করতেন, এখন আর তা হয় না। মাটির প্রদীপের পুরো বাজারটাই দখল করে নিয়েছে টুনিবাল্ব।

মদন পাল ও রাম নিমাই পাল নামের দুই মৃৎশিল্পী জানান, করোনা তাদের জীবণ পাল্টে দিয়েছে। এর মাঝেই তারা সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছেন। তারা আরোও বলেন, গত বছরের তুলনায় এবছর তাদের ব্যবসা একটু ভালো তবে সঠিক দাম না পাওয়ায় কপালে চিন্তার ভাঁজ পরেছে। তাদের হাতের তৈরী মাটির প্রদীপ মহারাষ্ট্র, দিল্লি, মুম্বাই পারি দেয়। প্রদীপের দাম যদি প্রতি হাজারে ৫০০ থেকে ৬০০ হত তবে চলে যেত কিন্তু তাঁরা পান ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। তাই এখন শুধুই দিন গুনছেন এবং আশা রাখছেন সব ঠিক হয়ে যাবে আর দীপাবলিতে সঠিক দামে প্রদীপ বিক্রি করতে পারবেন। এই রকম বহু বিক্রেতা আছেন যারা সারা বছর ধরে এই কটা দিনের অপেক্ষায় বসে থাকেন, গত বছর থেকেই করোনা আবহে একেবারেই কমে গেছে প্রদীপ বিক্রি, যার কারনে মাথায় হাত পড়ে গেছে প্রদীপ বিক্রেতাদের, এবারে তারা আশা করেছিলেন বাড়বে প্রদীপ বিক্রি কিন্তু এবারও ব্যাবসায়ে মন্দা হবার কারনে তারা ভেবেই পাচ্ছেন না কি হবে তাদের জীবিকার, কি করে চলবে তাদের সংসার। যাও বা প্রদীপ বিক্রি হচ্ছে তাদের নির্দিষ্ট দামই উঠছে না। অন্যান্য জায়গার মত শিলিগুড়িতেও ছেয়ে গেছে নানান ধরনের লাইট তাই প্রদীপের ব্যাবহার কমেছে এমনিতেই। প্রদীপ কিনছেন না তা কিন্তু নয় মানুষ তাদের ব্যাবহারিক পরিবর্তন ঘটিয়েছেন আর যার ফলে মার খাচ্ছি আমরা জানালেন এক বিক্রেতা। আবার অনেকে আশায় আছেন পূজোর আগে ঠিক বিক্রি হবে প্রদীপ, ফিরবে তাদের ভাগ্য মায়ের আর্শীবাদে।