মাতৃসাধক ও কবি রামপ্রসাদ কয়েক শত বৎসর পূর্বে গেয়েছিলেন—
‘কে জানে কালী কেমন।
ষড়দর্শনে না পায় দরশন’।
বস্তুত মাতৃতত্ত্ব তথা কালীতত্ত্ব অতীব দুরূহ একটি বিষয়, যা নিয়ে কিছু লেখাটাই শক্ত। এর কারণ বলি আবার সেই রামপ্রসাদের ভাষায়—কালী ব্রহ্ম জেনে মর্ম ধর্মাধর্ম সব ছেড়েছি।—মনে হয়, মাতৃসাধক রামপ্রসাদ উপলব্ধির অতি গভীরে প্রবেশ করে যে কথাখানি বলেছেন তা মাতৃতত্ত্বের প্রতিই স্পষ্ট ইঙ্গিত করে। মনে রাখতে হবে, কালীই শক্তি আবার কালীই জগন্মাতা। সে অর্থে আমরা সবাই শাক্ত মায়েরই সন্তান।
রামপ্রসাদ যে কথা গানে বলেছেন, সে কথাই বহু যুগ পরে বলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস—ব্রহ্ম ও শক্তি অভেদ। তাই যিনি ব্রহ্ম জেনেছেন, তিনি কালী বা শক্তি জেনেছেন, যিনি কালী বা শক্তি জেনেছেন, তিনি ব্রহ্ম জেনেছেন। দুয়ের মধ্যে যে কোনও পার্থক্য নেই। এদিকে আবার শ্রুতিতে আছে—ব্রহ্মবেদো ব্রহ্মৈব ভবতি। শ্রীরামকৃষ্ণ সে কথা বলেছেন অনবদ্য ভাষায়—নুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিয়ে সমুদ্রে নেমে নিজেই গলেগেল। তাই তো রামপ্রসাদও বললেন, যিনি কালীকেই ব্রহ্ম জানলেন—তিনি ধর্মাধর্মের অতীত হলেন। ব্রহ্মবস্তু তথা মাতৃতত্ত্ব, যাঁর উপলব্ধিতে ধরা দিয়েছে, সেই আত্মজ্ঞের কাছে ধর্ম যেন জলের দাগের মতোই মুছে গিয়েছে। এ অবশ্য সব শেষের কথা।
২
আলোচনার পারিপাট্য রক্ষার্থে প্রথমেই ‘তত্ত্ব’ কথাটি নিয়ে নাড়াচাড়া করা যাক। ‘তৎ’ সর্বনামের সঙ্গে ‘ত্ত্ব’ প্রত্যয়-যোগে ‘তত্ত্ব’ কথাটি নিষ্পন্ন হয়। ভাব বা স্বরূপ বোঝাতেই ‘ত্ত্ব’ প্রত্যয়ের ব্যবহার। প্রকৃত কথা হলো, যেটি যার স্বরূপ সেটিই তার তত্ত্ব। যেমন মনুষ্যত্বই হলো মানুষের স্বরূপ, জড়ত্বই হলো জড়ের স্বরূপ ইত্যাদি। তেমনই ব্রহ্ম বা শক্তির স্বরূপই তাঁর তত্ত্ব যদিচ সে স্বরূপ উপলব্ধি করতে হয়, বলে বোঝানো যায় না অন্তত সদর্থকভাবে (positive way)। তাই তো বাদুড়বাগানে বিদ্যাসাগরের গৃহে সমুপস্থিত শ্রীরামকৃষ্ণ সহজ ও সরল ভাষায় বলেছিলেন—ব্রহ্ম অনুচ্চিষ্ট অর্থাৎ কিনা মুখে বলা যায় না। প্রকৃত কথা হলো, দার্শনিকগণ বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তত্ত্বালোচনা করতে পারেন বড়োজোর, কিন্তু তত্ত্বের উপলব্ধি করতে পারেন সাধক। তাই অনায়াসে বলা যায়, দর্শনের যেখানে শেষ, সেখানে ধর্মের শুরু। আর যিনি তত্ত্বোপলব্ধি করেছেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত ধর্মেরও অতীত হয়েছেন।।
রামপ্রসাদের গানে বলা হয়েছে—
কে জানে কালী কেমন
ষড়্দর্শনে না পায় দরশন।।
ষড়দর্শনের কথাই যখন উঠল, তখন তত্ত্বালোচনায় ষড়্দর্শনের ভূমিকা সামান্য ছুঁয়ে যাওয়া যাক। ভারতীয় দর্শনে প্রধান নয়টি দর্শন হলো— চার্বাক, বৌদ্ধ, জৈন, ন্যায়-বৈশেষিক, সাংখ্য-যোগ এবং মীমাংসা-বেদান্ত। উপযুক্ত নয়টির মধ্যে প্রথম তিনটি নাস্তিক দর্শন যেখানে বেদের স্বীকৃতি নেই এবং পরের ছয়টি দর্শন হলো আস্তিক দর্শন যেখানে বেদ বা শ্রুতি সত্য বলে আদৃত। প্রকৃতপক্ষে এই যে ন্যায়-বৈশেষিকাদি ছয়টি দর্শন, এগুলিই ষড়্দর্শন হিসাবে পরিচিত। রামপ্রসাদও তাঁর গানে এই ষড়্দর্শনের কথাই বলেছেন। ষ্পষ্টতই ষড়্দর্শন নিয়ে আলোচনা করবার স্থান এ নিবন্ধ নয়। আলোচনার পারিপাট্য রক্ষার স্বার্থে অবশ্য বেদান্ত দর্শনের কথা সংক্ষেপে কিছু বলতে হবে। সেখানেও অবশ্য একটি কথা বলা আছে। শঙ্কর, রামানুজ, মধ্বাচার্য, বল্লভাচার্য প্রমুখ সকলেই বৈদান্তিক দার্শনিক হলেও আলোচ্য ক্ষেত্রে শুধুমাত্র শঙ্করকৃত অদ্বৈতবেদান্তকেই ধরতে হবে। অতি প্রাচীন কাল থেকে অদ্যাবধি, বিশেষত শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ প্রমুখ মহাত্মার আবির্ভাবের পরে, বেদান্তদর্শনের পরাকাষ্ঠা হিসাবে শংকরকৃত বেদান্তদর্শনই লোকমধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এ প্রসিদ্ধিও অহেতুক নয়। বেদান্তদর্শনের প্রস্থানত্রয় তথা তিনটি স্তম্ভ হলো উপনিষদ (শ্রুতিপ্রস্থান), শ্রীমদ্ভাগবদ গীতা (স্মৃতিপ্রস্থান) এবং বাদায়নকৃত ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্তসূত্র (ন্যায়প্রস্থান)। কঠ, কেন, প্রশ্ন প্রভৃতি উপনিষদ, গীতা এবং ব্রহ্মসূত্রের উপর আচার্য শঙ্কর যে অপূর্ব ভাষ্য রচনা করেছেন, সেই শারীরিক ভাষ্যই হলো অদ্বৈতবেদান্তদর্শনের মূল গ্রন্থ। এ ছাড়াও শঙ্কর ‘বিবেকচূড়ামণি’, ‘মোহমুদ্গার’প্রভৃতি গ্রন্থে অত্যন্ত দার্শনিক মনীষার সঙ্গে অদ্বয় তত্ত্বই সিদ্ধ করেছেন। শ্রুতি বা বেদে আছে— ‘একং সৎ বিপ্রাঃ বহুধা বদন্তি’, ‘নেহ নানাস্তি কিঞ্চন’— ইত্যাদি বাক্য। এ সমস্ত বাক্যকেও প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করে আচার্য শঙ্কর দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন— তত্ত্ব এক বই দুই নয়। সৎ-চিৎ-আনন্দস্বরূপ নির্গুণ নির্বিকার ব্রহ্মবস্তুই হলো অদ্বয় তত্ত্ব বা পারমার্থিক সত্য। অনাদি অজ্ঞান বা অবিদ্যাবশত অনাদিকাল ধরে জীব সেই অদ্বয় তত্ত্বের স্থলে বিচিত্র জড়াত্মক জগৎ দেখে আসছে। ব্রহ্মবস্তুই হলেন অধিষ্ঠান যাতে জগৎ অধ্যস্ত হচ্ছে, যেমন ভ্রমস্থলে রজ্জুরূপ অধিষ্ঠানে সর্প অধ্যস্ত হচ্ছে। রজ্জু ব্যবহারিক সত্য (empirically real) হলেও সর্পটি প্রাতিভাসিক সৎ অর্থাৎ কেবলমাত্র প্রতিভাসকালেই সত্য। তারপর যে জানে— এটা রজ্জু, তার সর্পজ্ঞানও হয় না, সর্পভয়ও থাকে না। অদ্বৈতী বলেন যে, ঠিক তেমনইভাবে যে ব্রহ্মবস্তুকে উপলব্ধি করে, সে জানে জগৎ মিথ্যা বা মায়ামাত্র। তখন অবশ্যই তার সংসারবন্ধন ঘুচে যায়, জলের দাগের মতো মুছে যায় সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ, ধর্মাধর্ম— সমস্ত কিছুই। যাবতীয় সুখ-দুঃখের পারে গিয়ে যাবতীয় দ্বন্দ্বের অতীত হয়ে সে লাভ করে পরম শান্তি তথা আনন্দ (Bliss)। এখানে একটা মস্ত বড়ো কথা বলা প্রয়োজন।

অদ্বৈতমতে তত্ত্ব এক এবং অদ্বয়। সেই তত্ত্ব ব্রহ্মবস্তু। কিন্তু ব্রহ্মবস্তু কিছু দূরের বস্তু নয়। শ্রুতিতে আছে— অয়মাত্মা ব্রহ্ম। ব্রহ্মবস্তু হলেন সর্বজীবেরই অন্তরাত্মা। ব্রহ্মে ও জীবাত্মাতে কোনও ভেদ নেই, কোনও পার্থক্য নেই। তাই তো শ্রীরামকৃষ্ণ এ যুগে কথাটা ব্যক্ত করেছেন অতি সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায়— জীব শিব, নর নারায়ণ। অনাদি অজ্ঞানবশে জীব নিজেকে শিবস্বরূপ বলে, ব্রহ্ম বলে জানে না। তার তথাকথিত সংসারবন্ধন ঘোচে না। জীব আত্মোপলব্ধি করতে পারলে অবিদ্যা বা অজ্ঞান যাবে ঘুচে। জীব নিজেকে ব্রহ্ম জেনে সমস্ত শোকের দুঃখের অতীত হবে। শ্রুতিতে তথা উপনিষদে তাই স্পষ্ট বলা হয়েছে— তরতি শোকম্ আত্মবিৎ।।
৩
এবার প্রসঙ্গান্তরে আসি। প্রশ্ন হতেই পারে যে, ব্রহ্ম তথা আত্মবস্তু তো নির্গুণ নির্বিকার তত্ত্ব। কেন অনাদিকাল ধরে আমরা সেই ব্রহ্ম বা আত্মবস্তুতে অনাত্মস্বরূপ জগৎ দেখছি? এ কথার উত্তরেই অদ্বৈতী বলেন—মায়াং তু প্রকৃতিং বিদ্যৎ মায়িনং তু মহেশ্বরম্।—আত্মাতে অনাত্মদর্শনের (দৃষ্টান্তস্থলে রজ্জুতে সর্পদর্শনের) মূলে আছে অবিদ্যা বা অজ্ঞান। এ জগৎ সেই অবিদ্যারই কার্য বা পরিণাম। রজ্জুকে যখন সর্প বলে ভুল করছি, তখন অবশ্যই রজ্জু সর্পে পরিণত (transformed) হচ্ছে না, বরং তা সর্প হিসাবে প্রতীত হচ্ছে। এই প্রতীতি যে মিথ্যাজ্ঞান তা বলাই বাহুল্য। এ হেন মিথ্যাজ্ঞানের মূলে আছে অজ্ঞান তথা অবিদ্যা বা মায়া। অগ্নি থেকে তার দাহিকা শক্তিতে যেমন পৃথক করা যায় না। প্রণিধানযোগ্য কথাটি হলো অবিদ্যা বা মায়াই ব্রহ্মের শক্তি। এই শক্তিতেই অনাদিকাল ধরে জীব নিজেকে শিব জানছে না, নর নিজেকে নারায়ণ জ্ঞান করছে না। প্রকৃতপক্ষে এই মায়াশক্তিই হলেন দেবী কালিকা, আবার এই কালীই তারা, দুর্গা—সমস্ত কিছু। ভ্রান্তিরূপে তিনি সর্বভূতে আছেন।— চণ্ডীতে তাই বলে—
যা দেবী সর্বভূতেষু ভ্রান্তিরূপেণ সংসস্থিতা
নমস্তস্মৈ নমস্তস্মৈ নমস্তস্মৈ নমো নমঃ।।
এখানে ভ্রান্তি বলতে যে অবিদ্যা বা মায়াকেই বোঝানো হয়েছে, সে কথা সুধী পাঠককে বলে বোঝাতে হবে না। যাই হোক, নিবন্ধের এ পর্বে অবিদ্যা বা মায়াশক্তির কথাই বলা আবশ্যক। প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে, অজ্ঞান বা অবিদ্যা বলতে কিন্তু জ্ঞান বা বিদ্যার অভাব সূচীত হয় না। ‘ভাবরূপম্ অজ্ঞানম্’—এরূপ বাক্যে স্পষ্টই বলে দেওয়া হয়েছে যে অজ্ঞান তথা অবিদ্যা ভাবরূপ।
এখন বক্তব্য হলো, ভাবরূপ অবিদ্যা বা মায়ার দুটি কার্য— আবরণ ও বিক্ষেপ। অবিদ্যা তার আবরণী শক্তির সাহায্যে সত্যকে অর্থাৎ অধিষ্ঠান (ব্রহ্ম)-কে জানতে দিচ্ছে না। সেই সঙ্গে অবিদ্যা বা মায়া তার বিক্ষেপণী শক্তির সাহায্যে তাঁর স্থলে মিথ্যা জগতের (অনাত্মা) বিক্ষেপ করছে। অবিদ্যাবশত যেমন দৃষ্টান্তস্থলে কেউ রজ্জুকে জানছে না আর তার স্থলে সর্প জানছে ও ভীত হচ্ছে।
অদ্বৈতী এবার বলেন যে, এই অবিদ্যা বা মায়া হলো অঘটনঘটনপটীয়সী যাকে যুক্তি দিয়ে বোঝা যাবে না অথচ অস্বীকারও করা যাবে না। অবিদ্যা বা মায়া তাই জাদুর সঙ্গে তুলনীয়। তবে এ কথাও সত্য যে জাদুকরই সত্য, জাদু নয়। ঠিক তেমনই ব্রহ্ম বা আত্মাই সত্য, অবিদ্যা বা মায়া নয়। এই অবিদ্যা বা মায়াই হলেন দেবী মহামায়া, মা কালী। মা যে আমাদের অঘটনঘটনপটীয়সী। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেন, আত্মজ্ঞানের অসি দিয়ে মহামায়া মাকেও কেটে ফেলতে হবে। যিনি ভক্ত তিনি মহামায়ার কাছেই প্রার্থনা করবেন ব্রহ্মবস্তু বা আত্মবস্তুকে উপলব্ধি করবার সুযোগ পেতে। শ্রীরামকৃষ্ণ উপমা দিয়ে বলেছেন, রামচন্দ্র চলেছেন আগে, লক্ষ্মণ পশ্চাতে আর মধ্যে চলেছেন সীতা। সীতার জন্য রামচন্দ্ররূপ পূর্ণ ব্রহ্মকে দেখতে পাচ্ছেন না লক্ষ্মণ। দেখতে হলে তাঁকে সীতার কাছে প্রার্থনা করতে হবে। মায়া সরে দাঁড়ালে তবেই হবে আত্মসাক্ষাৎকার তথা ব্রহ্মানুভূতি। তাই তো মহামায়ার কাছে মুমুক্ষু সাধক অবিরত প্রার্থনা করেন, যাতে তাঁর কৃপাকটাক্ষে খুলে যায় মুক্তির দ্বার।
৪
পূর্বেই বলেছি, মা আমাদের অঘটনঘটনপটীয়সী। তাঁর শক্তিতে তিলার্ধ সময়ে যা কিছু ঘটে যেতে পারে; এমন কিছু ঘটে যেতে পারে যা ছিল কল্পনাতীত। সাধক কবি এ জন্যই বলেছেন—
পঙ্কে বদ্ধ করো করী
পঙ্গুরে লঙ্ঘাও গিরি।
সাধক রামপ্রসাদও গেয়েছেন—
আয় মন বেড়াতে যাবি
কালীকল্পতরুমূলে চারি ফল কুড়ায়ে পাবি।—
এখানে চারি ফল বলতে ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষকে বোঝানো হচ্ছে। বস্তুত মায়ের হাতেই সব কিছু, তিনি কৃপা করলে মোক্ষ বা মুক্তিরূপ পরম পুরুষার্থ লাভ হয়। কেন?
‘অমন রতন পড়ে আছে
চিন্তামণির নাছ্দুয়ারে।’—
মহামায়ার শক্তিতেই সব হয়। তাই মাতৃভক্ত সাধক তাঁর কাছেই প্রার্থনা করেন। স্বদেশে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের ক্রন্দনে বিচলিত হয়ে তাই তো রামপ্রসাদও প্রার্থনা করেছিলেন—
‘অন্ন দে, অন্ন দে গো অন্নদা।’
পূর্বেও উল্লিখিত হয়েছে যে, নির্গুণ নির্বিকার ব্রহ্ম হলেন ভ্রমের অধিষ্ঠান। রজ্জুতে অধ্যস্ত সর্পের দ্বারা রজ্জু যেমন তিলমাত্র প্রভাবিত হয় না, তেমনই নির্গুণ নির্বিকার ব্রহ্মবস্তু অধ্যস্ত জগতের দ্বারা কোনওভাবেই প্রভাবিত হন না। তাই ব্রহ্মবস্তু প্রার্থনা শোনেন না, পূরণও করেন না। জীবের প্রার্থনা শোনেন এবং কৃপা করেন মহামায়া জগন্মাতা যাঁকে বলি কালী কিম্বা দুর্গা।

কিন্তু সে যাই হোক, রামপ্রসাদের গানেরই পুনরুল্লেখ করতে হয়— কে জানে কালী কেমন! মা যদি কৃপা করে তাঁর সন্তানকে স্বরূপ চিনিয়ে না দেন, তবে সাধ্য কী জীব তাঁকে জানে! মহামায়ার শক্তিতেই সব কিছু হচ্ছে। শ্রুতিতেও বলা হয়েছে, তাঁরই শক্তিতে সূর্য কিরণ দিচ্ছে, সমীরণ বয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি। দেবাসুরের যুদ্ধে দেবতারা যখন জয়ী হলেন, তখন তাঁদের অহঙ্কার হলো তাঁরা নিজেদের শক্তিতেই জয়ী হলেন। কিন্তু শ্রীশ্রীচণ্ডীতে আছে যে, দেবী মহামায়া তাঁদের সে ভ্রান্তি ঘুচিয়ে দিলেন। বস্তুত তাঁরই শক্তিতে সব কিছু ঘটছে, সব কিছু চলছে।
দেবী যে অঘটনঘটনপটীয়সী মায়াশক্তি তার কিছু দৃষ্টান্ত দিয়ে এ নিবন্ধ শেষ করব। কথিত আছে যে, স্বয়ং শঙ্করাচার্য নাকি প্রথম দিকে শক্তি মানতেন না। মহামায়ার মায়ায় কাশীতে মণিকর্ণিকা ঘাটে এর পরে একদিন শঙ্কর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এতটাই অসুস্থ যে হাত বাড়িয়ে জলটুকু পর্যন্ত নিতে পারছেন না। এমনি সময়ে তিনি জনৈকা রমণীকে অনুরোধ করলেন তাঁকে একটু জল দিতে। রমণীর প্রশ্নের উত্তরে এও জানালেন, জল নেবার মতো শক্তি তাঁর নেই। সেই রমণী ছিলেন স্বয়ং মহামায়া। ‘শঙ্কর, তুমি না শক্তি মানো না!’—এই বলে দেবী নিমেষে অন্তর্ধান করলেন। বিহ্বল হলেন শঙ্করাচার্যও। পরে ভক্তিবিহ্বল চিত্তে সুললিত সংস্কৃত ভাষায় শঙ্কর মাতৃবন্দনাও করেছেন।
পরবর্তী ঘটনাটি অবশ্য বহু যুগ পরের ঘটনা। কাশীতে তখন অবস্থান করছেন শ্রীরামকৃষ্ণ-বর্ণিত ‘সচল ভৈরব’ তৈলঙ্গস্বামী। যোগীবরের সঙ্গে সেদিন সাক্ষাৎ করতে এসেছেন দিগ্বিজয়ী এক বীর। উদ্ধত ভঙ্গিতে তিনি বলে চলেছেন তাঁর গৌরবের নানা কাহিনি। স্বামীজি ধৈর্য ধরে তাঁর কথা শুনতে শুনতে শেষ পর্যন্ত তাঁর অহঙ্কার চূর্ণ করে দেবার মানসে সম্মুখস্থ কিছু ঘাস তাঁকে তুলতে বললেন। অবাক হলেন দিগ্বিজয়ী বীর। স্বামীজির এ কী পরিহাস তাঁর সঙ্গে! কিন্তু বিস্ময়ের কথা! স্বামীজির অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়ে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন তিনি। তৈলঙ্গস্বামী তখন তাঁকে বললেন, তাঁর শক্তি ও বীরত্বের মূল হলেন মহামায়ার শক্তি। সেই শক্তিতেই তিনি শক্তিমান। এই হলো তাঁর বীরত্বের আসল পরিচয়।
অঘটনঘটনপটীয়সী মায়ার আরও একটি কাহিনি এবার শোনা যাক। রামকৃষ্ণ মিশনের সাধুরা শঙ্কর প্রবর্তিত দশনামী সম্প্রদায়ের মধ্যে পুরী সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। তোতা পুরীজি ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্বৈতসাধনার গুরু। তিনি নির্গুণ নির্বিকার ব্রহ্মবস্তু স্বীকার করলেও মায়া মানতেন না। তাই দক্ষিণেশ্বরে মা কালীর মন্দিরেও যেতেন না। কিন্তু এক বিচিত্র ঘটনার মধ্যে দিয়ে তাঁকে কালী মানতে হলো। যে কোনও কারণেই হোক, পেটের সমস্যায় ভুগে ভুগে তিনি একবার গঙ্গাতে শরীরত্যাগের সংকল্প করে বসলেন। এগিয়ে গেলেন ভরা গঙ্গায়। কিন্তু এ কী! যত নামছেন, গঙ্গার জল তত সরে যাচ্ছে। মাঝগঙ্গায় গিয়েও যখন ডোবা হলো না, তিনি নিতান্ত বিস্মিত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘এ কেয়া দৈবী মায়া।’ পাড়ে দাঁড়িয়ে সকৌতুকে ঘটনাটি দেখছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। আনন্দে হেসে উঠলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মন্দিরে গিয়ে মাকে প্রণাম করে নিজের সাধনস্থানে ফিরে এলেন তোতা পুরীজি।
সবশেষে আরও একটি কথা। দক্ষিণেশ্বরে নিজের ঘরে বসে শ্রীরামকৃষ্ণ একবার শ্রীশ্রীমা সারদামণিকে একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, মন্দিরের মা, গর্ভধারিণী মা চন্দ্রমণি এবং সারদামণি—সকলকেই তিনি তত্ত্বত অভিন্ন জানেন। শ্রীশ্রীচণ্ডীতেও আছে—স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলা জগৎসু। এর সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র, শ্রীঅরবিন্দ যুক্ত করেছেন দেশমাতৃকাকে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ স্বদেশকে মা বলে সম্বোধন করে গেয়েছেন—
‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!’
তাই কালীভক্ত রামপ্রসাদ থেকে শুরু করে দেশনায়ক দেশভক্ত সুভাষচন্দ্র—সকলেই মাতৃভক্ত। অদ্বৈতী বিবেকানন্দও জীবনের শেষ লগ্নে মাতৃভাবে বিভোর হয়েছিলেন—সর্বক্ষণ শুধু ‘মা’ আর ‘মা’।