পয়লা মে—মে দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে গড়ে উঠেছিল ৮ ঘণ্টা কাজের আন্দোলন। আন্তর্জাতিকভাবে এই আন্দোলনকে শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, মর্যাদা ও অধিকার অর্জনের সংগ্রাম হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে।
মে আন্দোলনের এক শতাব্দী-সাত দশক পরে মে দিবসের কোন আবেদনে সাড়া দেবে শ্রমিক শ্রেণি—তা কি ঠিক করা হয়েছে? কারা ঠিক করবেন? বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পরাজয় এবং পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের জয়যাত্রা শ্রমজীবী মানুষকে দিশাহীনতার অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করেছে। তবুও আশার কথা, শ্রমিক সমাজ আজও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে তার নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগের অভাবে। এ যুক্তি যদি মেনেও নিই, তবুও স্বীকার করতে হবে এই পরাজয় অনিবার্য ছিল আন্দোলন ও ব্যবস্থার অতি সরলীকরণের দোষে। এ সব নীতিকথা বাদ দিলেও যে প্রশ্নটি তিরের ফলার মতো আমাদের দিকে তাক করে আছে, সেই প্রশ্নটি হলো—শ্রমজীবী মানুষ কি মানুষের মতো বাঁচতে পারছেন? তাঁদের মর্যাদা ও অধিকার কি তাঁরা আদায় করে নিয়েছেন?
সমাজতন্ত্রের পতন ও বিশ্বায়নের পটভূমিতে শ্রমিক জীবন রুটিরুজি টিকিয়ে রাখার কাজেই ব্যতিব্যস্ত। মনুষ্যত্ব অর্জনের লড়াই স্তিমিত হয়েছে। আজ শ্রমজীবী মানুষের অর্জিত অধিকারগুলি ভূলুণ্ঠিত। নতুন নতুন অধিকার অর্জনের লড়াই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে। কিন্তু আশার কথা, বিশ্বায়িত চরম শোষণের জালে আবদ্ধ থেকেও শ্রমজীবী মানুষের ছটফটানি লক্ষ্য করে বৃহৎ পুঁজির মালিকরা শ্রমিককল্যাণের কিছু কিছু ব্যবস্থা করেছে। ক্রমবর্ধমান অসংগঠিত শ্রমিকদের জন্য চালু হয়েছে নানান কল্যাণমূলক কর্মসূচি।
বিশ্ব প্রবণতার এই দিকটি অস্বীকার করা যাবে না। এই ব্যবস্থাকে বহুজাতিক কর্পোরেট মালিকদের মহানুভবতা বলে মেনে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। দুর্দশাগ্রস্ত অসংগঠিত শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখাটা তাঁদের প্রয়োজন। তাই এই কল্যাণমূলক কর্মসূচি। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে শ্রম-দাসত্ব টিকিয়ে রাখার পাকা ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষকে বোঝানো হচ্ছে, লড়াই, আন্দোলন করে কিছু হবে না। শ্রমিক ঐক্যের প্রয়োজন নেই। নিজের নিজের জায়গায় মুখ বুজে কাজ করো, তোমার মালিক এবং সরকার তোমার প্রতি ‘দয়াশীল’—তাই তোমাদের জন্য তারাই ভাববে। পরিবারের চিকিৎসা, ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা, মৃত্যুর পর আর্থিক সহায়তা-সহ নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যাতে শ্রমিকদের অধিকারবোধ ও দায়িত্ববোধ কমে যায় এবং রাষ্ট্র ও পুঁজিপতিদের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়—তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যে ব্যবস্থার অপর নাম শ্রম-দাসত্ব।
এই শ্রম-দাসত্বের বিরুদ্ধেই মে আন্দোলন। মে দিবসের শহিদরা এর বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে ফাঁসির দড়ি পরেছেন বীরের মতো।
মে দিবসে তাই শ্রম-দাসত্বের বিরুদ্ধে শ্রমিক চেতনাকে জাগ্রত করার দায়িত্ব সর্বাধিক। এই চেতনার মূল কথা হলো, দায়িত্বজ্ঞানহীন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের বদ্ধাবস্থা থেকে নিজেদের মুক্ত করা। দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের পথে অগ্রসর হওয়া। এমন এমন দাবি তুলতে হবে যা যুক্তিযুক্ত এবং শ্রমিক স্বার্থবাহী, সাথে সাথে জনসমর্থনযোগ্য। তথাকথিত ট্রেড ইউনিয়নবাদও শ্রমিকদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। তাঁদের মনুষ্যত্ব বিকাশের পথে প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। দু-ধরনের শ্রম-দাসত্বের অবসানের লক্ষ্যে এগোতে পারলে শ্রমিকজীবন মনুষ্যত্ব অর্জনের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে। মে দিবসের আজকের আবেদন এটাই।
কথায় কথায় ধর্মঘট, কাজ বন্ধ ইত্যাদি সেকেলে ধারণার পরিবর্তে শিল্পকে বাঁচানোও শ্রমিকদের কাজ। বুঝতে হবে পুরোনো প্রযুক্তির আমলে লড়াইয়ের যে কৌশল, তা চলবে না। নতুন প্রযুক্তির সময়ে নতুন কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। শিল্প বাঁচলেই শ্রমিক বাঁচবে। এই দায়িত্বশীলতা থেকেই মর্যাদা ও অধিকারের বিষয়টি নতুনভাবে সামনে আসবে। পেশাদার ট্রেড ইউনিয়নবাদীরা এই প্রশ্নে যে অচলায়তন তৈরি করে রাখে তা ভাঙতে হবে। এই পথেই নব্য ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এগোতে পারে। এটাই মে দিবসের ডাক।
ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিত
মোদী সরকার গড়ে ওঠার পরে পরেই ৩১ জুলাই ২০১৭ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কারখানা আইনের ৫৪টি সংশোধনী গ্রহণ করে। অ্যাপ্রেন্টিস আইন পাল্টানোর কথা বলা হয়। ব্যবসা করার ক্ষেত্রকে সহজ-সরল করার (to ease dong business) প্রস্তাব দেওয়া হয়। রাজস্থান সবার আগে বদল আনে। যা পুরোপুরি শ্রমিক স্বার্থবিরোধী। হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশও এই পথের পথিক।
নমনীয় শ্রম ব্যবস্থায় ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’ অর্থাৎ ‘যখন খুশি কাজে নাও, যখন খুশি বসিয়ে দাও’—এই ব্যবস্থা চালু করতে চায় কেন্দ্রের সরকার। বলা হয়, ৩০০ শ্রমিক আছে এ- রকম কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের জন্য সরকারের অনুমতি লাগবে না। সস্তা শ্রম কিনতে মহিলাদের রাতের শিফটে কাজ করার বিষয়টিও সামনে আসে।
ফ্যাক্টরি অ্যাক্টে পরিবর্তন এনে ওভারটাইমের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে মোদী সরকার। এর ফলে নতুন নিয়োগের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে।
শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নে সংঘবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সংশোধনীতে বলা হয়েছে যে, একটি ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশনের জন্য ১৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ শ্রমিকদের যোগদান নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষানবীশদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি দেওয়া হবে না। ফলে কারখানা মালিকরা শিক্ষানবীশদের সংখ্যা বাড়িয়ে দেবেন এবং মজুরি নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখাবেন।
বার্ষিক রিটার্ন-এর রেজিস্টার রাখার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা ছিল ১৯ জন শ্রমিক আছেন এমন কারখানায়। প্রস্তাব এসেছে সংখ্যাটা বাড়িয়ে ৪০ করে দেওয়ার। এর ফলে ৯০ ভাগ কারখানা নিজের খুশিতে চলতে পারবে। শ্রমিকরা দাসে পরিণত হবে। সংগঠিত শিল্পের বাইরে চলে যাবে। ঠিকা শ্রমিক আইন ১৯৭০-এর ব্যাপক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। মূল উৎপাদনে (Core production) চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ করা যাবে। ফলে স্থায়ী শ্রমিকের সংখ্যা কমবে। সস্তা, অসংগঠিত ও নিরাপত্তাহীন শ্রমিকদের সংখ্যা বাড়বে।
এ সবের মধ্যে দিয়ে ভারতের শ্রমিক শ্রেণির উপর ব্যাপক আক্রমণ নামানো হচ্ছে। শ্রমিকদের উপর যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রক্ষিত হচ্ছে পুঁজির স্বার্থ।
পশ্চিমবঙ্গ
পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের আমলে শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার বিপুল আয়োজন চলছে। সেগুলি হলো—
এক. ন্যূনতম মজুরির রিভিশন করে প্রথম বছরেই শ্রমিকদের আয় বেড়েছে গড়ে ৩৪ শতাংশ (এ জন্য খাদ্যের ক্ষেত্রে ২০০০ ক্যালোরি থেকে ২৭০০ ক্যালোরির বৈজ্ঞানিক দিশা গ্রহণ করা হয়েছে)।
দুই. অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য সমস্ত সুযোগসুবিধা দ্বিগুণ করা হয়েছে। ২০১১ সালের মে মাস পর্যন্ত ২৬ লক্ষ অসংগঠিত শ্রমিক নানা প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন। সেই সংখ্যা আজ প্রায় ১ কোটির কাছাকাছি।
তিন. চা-বাগান শ্রমিকদের মজুরিবৃদ্ধি ঘটেছে অভূতপূর্বভাবে। ৬৭ টাকা থেকে দু-দফায় বৃদ্ধি পেয়ে এখন মজুরি দাঁড়িয়েছে ১৪২ টাকা। এ ছাড়া বন্ধ বাগানের শ্রমিকদের খাদ্য নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও সুযোগসুবিধা বেড়েছে।
চার. ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এবং শ্রম-বিরোধের ক্ষেত্রে ত্রিপাক্ষিক চুক্তির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী দ্বিপাক্ষিক চুক্তির সংখ্যা বিপুলভাবে হ্রাস পেয়েছে।
পাঁচ. এ রাজ্যে সরকার ও সরকারপক্ষীয় ট্রেড ইউনিয়নের উদ্যোগে কথায় কথায় ধর্মঘট, কাজ বন্ধ, ঘেরাও ইত্যাদি মূলত বন্ধ হয়েছে। ফলে মহার্ঘ শ্রমদিবস নষ্টের সংখ্যা শূন্যতে নেমে গেছে। শিল্পে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
ছয়. এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সাত. শিল্প বাঁচাও—শ্রমিক বাঁচাও নীতির মাধ্যমে শিল্প ও শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আট. ইএসআই পরিষেবায় আমূল পরিবর্তন এসেছে।
ফলে, শ্রমজীবী মানুষের জীবনে স্বস্তি এসেছে। মালিকের দাসত্ব ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের দাসত্বের শৃঙ্খল খানিকটা শিথিল হয়েছে। সরকার শ্রমিকমুখী নীতির উপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর সবথেকে বড়ো প্রমাণ সরকারি চা-বাগান, কটন মিল এবং অন্যান্য কারখানা বন্ধ করলেও কর্মরত শ্রমিকরা ছাঁটাই হননি, তাঁরা সরকারি কোনও না কোনও দফতরে কাজ পেয়েছেন।
ডানলপ ও জেসপ মালিককে বেআইনি কাজের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে এবং দুটি কারখানার শ্রমিকদের মাসিক ১০ হাজার টাকা করে জন প্রতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে রাজ্য সরকার।
মে দিবসের প্রাক্কালে তাই শ্রমিকরা শিল্প বাঁচাও—শ্রমিক বাঁচাও ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে ‘চাই মর্যাদা’, ‘চাই অধিকার’—এই স্লোগান তুলে মে দিবসের ঐতিহ্যবাহী মনুষ্যত্বের লড়াইকে এ রাজ্যে শ্রমিক চেতনার মূল বিষয় করে তুলবে। শ্রমিকদরদি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলবে না। গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে চলবে জীবনমান উন্নত করার লড়াই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণ, অত্যাচারের বিরুদ্ধে চলবে লাগাতার দায়িত্বশীল আন্দোলনের দিশায় উদ্ভাসিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে শ্রমিকদের ব্যবহার করার যে অপচেষ্টা তা রুখে দিতে হবে। পাওনাগণ্ডার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের অধিকারে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
মে দিবস পালিত হোক নতুন মানুষ গড়ার শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে।