১৯৬৭ সালের ১ মে। ঠিক দু-মাস আগেই পশ্চিমবঙ্গে তখন ক্ষমতায় এসেছিল প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার। মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়, উপ-মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, শ্রমমন্ত্রী ছিলেন এসইউসিআই নেতা সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন ভোর থেকেই বিভিন্ন কলকারখানার গেটে গান বেজে উঠে, ‘শ্রমিক দিয়াছে আজি সাড়া/ উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস…’। সেই প্রথম মে দিবসে পশ্চিমবঙ্গে ছুটি শুরু হলো। ৫০ বছর পর আজ পরিবেশটাই পালটে গেছে। এর কারণ, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বেশ কিছু জনবিরোধী কাজকর্ম।
ফিরে আসা যাক মে দিবসের কথায়। শ্রমিকদের কাজের ঘণ্টা কমানোর দাবিতে ১৮৬০-৬৫ সালে যখন আন্দোলন শুরু হয় তখন অনেকেই বলেছিলেন, এর যৌক্তিকতা কোথায়। এতে তো শোষণ বন্ধ হবে না। কার্ল মার্কস ক্যাপিটাল গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে ৭৪ পাতার একট অধ্যায়ে শ্রম ঘণ্টা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। সেখানে মার্কস বলেছিলেন, কাজের ঘণ্টা কমাতে পারলে শোষণ বন্ধ হবে না, এটা ঠিক। আবার একজন শ্রমিককে ১২-১৪-১৬ ঘণ্টা খাটিয়ে একজন মালিক যে উদ্বৃত্ত মূল্য (সারপ্লাস ভ্যালু) শুষে নিতে পারে তা কিছুটা কমানো যায়। এই পর্যায়ে সেটা কম কথা নয়, এবং সেটা দরকারও। কমানো যে যায় সেটা ওই ক্যাপিটাল গ্রন্থে মার্কস অঙ্ক করে দেখিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে মার্কসের ২০০ বছর পূর্তি। সেই সময় মে দিবসের দিনে মার্কসের ওই কথাগুলোও মনে রাখা দরকার।
কিন্তু মে দিবসের ইতিহাসটা সংক্ষেপে জানা দরকার। একটা সময় ছিল যখন কলকারখানার শ্রমিকদের দিনে গড়ে প্রায় ১২-১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা আর সপ্তাহে ৬ দিন মালিকরা খাটিয়ে নিতো। বিপরীতে মজুরি মিলতো নগণ্য, শ্রমিকরা খুবই কষ্টকর জীবন যাপন করতেন, ক্ষেত্রবিশেষে তা দাসবৃত্তির পর্যায়ে পড়ত। এর বিরুদ্ধে শ্রমিকরা সংগঠিত হতে থাকেন। ভাবনার কথা হলো, যে আমেরিকায় কমিউনিস্টদের খুঁজে পাওয়া যায় না, সেই দেশেই ‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম ও ৮ ঘণ্টা বিনোদন’-এর দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়। আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবারের নেতৃত্বে শ্রমিকরা সংগঠিত হন। ১৮৮৬ সালের ১ মে তাঁরা সভা করেন। আবার সে বছরের ৪ মে সভা করেন শিকাগোর হে মার্কেটে। এই সভায় কোনও এক ষড়যন্ত্রকারী পুলিশ ভ্যানের দিকে বোমা ছোড়ে। পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস চালায়, গ্রেফতার করে। সেই গ্রেফতারের পর একতরফা বিচার হয়। বিচারের পর চার জন শ্রমিক নেতার ফাঁসির আদেশ হয়। এই ৪ জন হলেন অ্যালবার্ট পার্সনস, ফিসার, অ্যাঙ্গেলস, স্পাইস। রক্তাক্ত হয় শ্রমিক আন্দোলন। ফাঁসির মঞ্চে আরোহণের পূর্বে আগস্ট স্পিজ বলেছিলেন, ‘আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে’। ১৮৯০ সাল থেকে পয়লা মে পৃথিবীর সব দেশের শ্রমিকরা শ্রমিক দিবস পালন করছেন।
তবে পরবর্তীকালে গবেষণা করে জানা গেছে, শিকাগোর ঘটনার আগেই ভারতে ৮ ঘণ্টার শ্রমদিবসের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। ১৮৬২ সালে লিলুয়ায় সদ্য গজিয়ে ওঠা রেল শ্রমিকরা ওই দাবিতে আন্দোলন করেন। তার কিছুদিন পরেই একই দাবিতে গাড়োয়ান ধর্মঘট হয়। কিন্তু শিকাগোর ঘটনা পৃথিবীতে ইতিহাস তৈরি করে দিয়েছে। এর ফলে সব দেশেই আইন হয়ে গেছে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করালে ওভারটাইম দিতে হবে। এখন সব দেশের শ্রমিকরা যে সুবিধাটা ভোগ করেন তার জন্য ওই চার জন শহিদকে স্মরণ করা যে দরকার তা-ও অনেকে ভুলে যান। এটা ঠিক, একশো-দেড়শো বছর আগে একজন শ্রমিককে দিনে ১৪-১৫ ঘণ্টা খাটিয়ে যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করা যেতো এখন আধুনিক মেশিনে ৮ ঘণ্টাতেই তার বেশি উৎপাদন হচ্ছে। এখন সব কিছুতেই মেশিন।
‘পথের সাথী’ কবিতার বইতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন,
‘’যা চলেছে অতীতে/ তাই আজ ভবিষ্যতেও/ ব্যতিক্রমী শুধু একটি মেশিন/ হয়তো কম্পিউটার, হয়তো মোবাইল/ অথবা ‘মিল’টা চলে গেছে ট্রেডে/ না আছে বাসন মাজা, না আছে কাপড় কাচা/ সবটাই আজ মেশিনে মাজা/ হাঁড়ি, কড়াই, উনুন/ সবটাই আজ চলে গেছে/ মাইক্রোওভেন আর প্রেসার কুকারে’’। যন্ত্রসভ্যতা ভুলিয়ে দিতে চাইছে মে দিবসের ইতিহাসকে। কিন্তু আমরা ভুলবো না।