সোমনাথ পাঁজা
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনও দিবস পালন করা হয়। বাংলায় তথা কলকাতায় প্রত্যেক বছর যথাযোগ্য মর্যাদায় মে দিবস পালিত হয়। কিন্তু বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে যে, মে দিবস পালন করার যৌক্তিকতা বা প্রাসঙ্গিকতা আদৌ আছে কি? বহু সংস্থায় এখন বাড়তি সময় কাজ করলে উপরি পাওনা জোটে। সেটা করতে আপত্তি নেই অনেকেরই। অনেক ক্ষেত্রে বড়ো কর্পোরেট অফিসে একেক জন কর্মচারী এত টাকা মাইনে পান যে, তিনি ক-ঘণ্টা কাজ করছেন এ নিয়ে ভাবতেই চান না। এঁদের একটা সহজ দর্শন আছে। সেটা হলো, ওয়ার্ক হার্ড, পার্টি হার্ডার। অর্থাৎ টেনে কাজ করো। তার পর হাতে ভালো টাকা পেলে হইহই করে সে টাকা খরচ করো এবং আনন্দ কিনে নাও। আবার এমনও আছে, ১০-১২ ঘণ্টা ডিউটি করেও তাঁদের শ্রমের মূল্যায়ন হয় না। আমাদের দেশের বামপন্থীরা এখন তো ক্রমশ পিছু হটতে হটতে সাইনবোর্ডের পরিসরের দিকেই হাঁটছেন। এ সবের মধ্যেও কেন তাহলে মে দিবস পালন? আসলে মে দিবস পালনের সঙ্গে সভ্যতার ভিত্তিমূলে মানুষের শ্রম বিষয়টির অবদানের প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। আজকে নয়া উদারবাদী পুঁজির যুগে শ্রমের মূল্যায়ন কীভাবে হবে, এই প্রশ্নটা কিন্তু অমীমাংসিত। অথচ এখনও তৃতীয় বিশ্ব-সহ পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থানের অধিকার থেকে বঞ্চিত। আজ তাঁদের কাছে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সামিল হওয়ার ডাক দিতে পারে মে দিবস। মে দিবসের ঐতিহ্য তাঁদের শেখাতে পারে, কীভাবে মানুষ অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রাণ দিতেও পিছপা হন না। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যবস্থায় নানা পরিবর্তন এলেও মে দিবস কখনই অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এবার মে দিবসের ইতিহাস ফিরে দেখা যাক।

বেশ কিছু দেশে মে দিবসকে লেবার ডে হিসেবে পালন করা হয়। এদিনটি সরকারিভাবে ছুটির দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রমদিনের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকের ওপর গুলি চালানো হলে ১১ জন শহীদ হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় এইদিন পালিত হয় না। এ ছাড়া এইদিনে আরও কিছু ঘটনা রয়েছে যা আঞ্চলিক ভাবে হয়তো পালিত হয়। পূর্বে শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রম করতে হত, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আর সপ্তাহে ৬ দিন। বিপরীতে মজুরি মিলতো নগণ্য, শ্রমিকরা খুবই কষ্টকর জীবনযাপন করতো, ক্ষেত্রবিশেষে তা দাসবৃত্তির পর্যায়ে পড়ত। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন, এবং তাঁদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য তাঁরা সময় বেঁধে দেয় ১৮৮৬ সালের ১লা মে। কিন্তু কারখানা মালিকগণ এ দাবি মেনে নিলেন না। ৪ঠা মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট নামক এক বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশে জড়ো হন। তাঁরা ১৮৭২ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করেছিলেন। আগস্ট স্পিজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। পুলিশবাহিনী তৎক্ষনাৎ শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহিদ হন। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পিজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুইস লিং নামে একজন একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্য একজনের পনেরো বছরের কারাদন্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহণের পূর্বে আগস্ট স্পিজ বলেছিলেন, “আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে”। ২৬ জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্নর অভিযুক্ত আট জনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা করেন, এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনওই প্রকাশ পায়নি।
শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার’ দাবি অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। আর পয়লা মে দিনটি শ্রমিকদের দাবি আদায়ের দিন হিসেবে পৃথিবীব্যাপী আজও পালিত হয়।