গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বিকানের-গুয়াহাটি এক্সপ্রেস ট্রেনটি জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির দোমহনী জংশনের ওভারব্রীজ এলাকায় অন্তত পাঁচটি কামরা লাইনচ্যুত হয়। রেল সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, লাইনে ফাটল থাকার কারণেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনার পর থেকেই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রেলযাত্রীদের মুখে মুখে একটি প্রশ্নই ঘুরে বেড়াচ্ছে, রেল কতৃপক্ষ এত উদাসীন কেন?
রেল আমাদের পরিবহণ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র। রাস্তা কাছাকাছি হোক কিম্বা দূরের— যে কোনও ক্ষেত্রে কম খরচে যাতায়াতের জন্য ভারতীয় রেলের কোনও বিকল্প নেই। প্রতিদিন ২ কোটিরও বেশি মানুষ রেল পথে যাতায়াত করে। রেল কেবল যাত্রী নয়, পণ্য পরিবহণেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে রেল রোজ প্রায় ৩০ লক্ষ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করে। এই হিসাব থেকে বোঝা যায় রেল আমাদের দেশের অর্থনীতির একটা বিরাট স্তম্ভ। রেল পণ্য এবং যাত্রী পরিবহণ মারফত দেশের অর্থভাণ্ডারে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব জোগান দেয়। তাছাড়া কর্মসংস্থানের দিক থেকেও রেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তা স্বত্বেও রেলে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে বারংবার প্রশ্ন ওঠে। প্রায় প্রত্যেক বছর নিয়ম করে রেলের ভাড়া বাড়ে কিন্তু সেই তুলনায় পরিষেবার মানের উন্নতি ঘটে না। একজন চালককে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা কাজ করানো হয়, নতুন কর্মী নিয়োগ হয় না। তার মানে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তার অভাবটা থেকেই গিয়েছে। যে কারণে সাধারণ মানুষ বিকানের-গুয়াহাটি এক্সপ্রেসের ঘটনার পর প্রশ্ন তুলেছে কেন সাধারন যাত্রিদের নিরাপত্তা নিয়ে রেল ছিনিমিনি খেলছে।
এদেশে ব্রিটিশ শাসনের সবচেয়ে বড় অবদান হল রেল। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ রেল পরিবহণের একটি হল ভারতীয় রেল। সত্তর বছর আগে ব্রিটিশরা যে রেল ব্যবস্থাটাকে ভারতীয়দের হাতে ছেড়ে দিয়ে গিয়েছে এতদিনে তার যে উন্নতি হওয়া উচিত ছিল তার কাছাকাছি কেন পৌঁছানো গেল না? সবচেয়ে লজ্জাজনক অবস্থা হল চীন, রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান প্রভৃতির সঙ্গে ভারতীয় রেলের মধ্যে পার্থক্যটা প্রকট হয়ে ওঠে পরিষেবার মান, নিয়মানুবর্তিতা আর নিরাপত্তার প্রশ্নে। ভারতীয় রেল কখনও ট্রেন লাইনচ্যুত হচ্ছে তো কখনও দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটছে। তাছাড়া ট্রেনে ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ড, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই, চুরি, গুন্ডামি, যাত্রীকে মাদক খাইয়ে হাতসাফাই, সংরক্ষিত কামরায় সাধারণ যাত্রী এমনকী বিনা টিকিটের যাত্রীদের দৌরাত্ম্য লেগেই আছে। ভারতীয় রেলে যাত্রীরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন। আর্থিক সংগতি থাকলে বেশিরভাগ মানুষই ট্রেনে দীর্ঘযাত্রা এড়িয়ে বিমান কিংবা সড়ক পথে যাতায়াত করতেন।

বিকানের-গুয়াহাটি এক্সপ্রেসের ঘটনা কেবল ভারতীয় রেল নয় আরও একবার নরেন্দ্র মোদীর সরকারের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নিয়ে বিরাট বড় প্রশ্ন তুলে দিল। প্রশ্ন ওঠার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। যেখানে ভারতের মতো দেশে সাধারণ রেল যাত্রীদের নিরাপত্তা, রেলট্র্যাকের রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্ব পায় না, তার বদলে ১ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে বুলেট ট্রেন চালানোর প্রকল্প অগ্রাধিকার পায়। সেখানে মোদী সরকারের জনবিরোধী নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষ স্পষ্ট প্রশ্ন তুলছে। এটা তো বিষদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে না যে গুজরাট নির্বাচনে যাতে বিজেপি ফের ক্ষমতায় ফিরতে পারে সেই কারণেই বুলেট ট্রেন। যদিও মোদীর স্বপ্নের প্রজেক্ট আহমেদাবাদ-মুম্বই বুলেট ট্রেন প্রকল্প এখনও জমি জটে আটকে রয়েছে। গুজরাটে জমি সমস্যা মিটলেও মহারাষ্ট্রে তা মেটেনি।
অন্যদিকে রেল সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ কমছে। রেলের সুরক্ষা নিয়ে ২০১২ সালে কাকোদগার কমিটি সুপারিশ করেছিল। কিন্তু কাকোদগার কমিটির সুপারিশ মানা হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, রেলের সেফটি অথরিটি তৈরি হচ্ছে না কেন? যেখানে রেল সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, সেখানে কোন হিসাবে বুলেট ট্রেন চালাতে চাইছে। ভারতীয় রেল ৬৬ হাজার কিমি পথে রেল চালানো নিরাপত্তা যেখানে নিশ্চিত করতে পারছে না সেখানে ডেডিকেটেড ফেট করিডোর তৈরি করতে চাইছে কিসের ভিত্তিতে। কোনটা আগে সুরক্ষা না বুলেট ট্রেন?
মোদী সরকারের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট। যা নিয়ে ন্যাজে গোবরে অবস্থা স্বয়ং মোদীজী থেকে বিজেপির সর্বত্র। এই সরকার সাধারণ মানুষের স্বার্থ নিয়ে ভাবে না- এই অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে গোড়া থেকেই ছিল এবং আছে। উত্তরপ্রদেশের একের পর এক দলিত মন্ত্রী যে গেরুয়া শিবিরের সঙ্গ ছাড়ছেন তা থেকেও বিজেপির দুরাবস্থা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। ময়নাগুড়ির রেল দুর্ঘটনা আরও একবার প্রমান করে দিল মোদী সরকার সাধারন মানুষের বাঁচা মরা নিয়ে চিন্তিত নন মোটেও, তাদের একমাত্র চিন্তা আদানিদের স্বার্খরক্ষা। যার নিরাপত্তার জন্য হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিশেষ বিমান কেনা হয়, ২৪ কোটি টাকা খরচ করে বিশেষ মার্সিডিজ আসে, আর যাই হোক তাঁর মুখে কি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা মানায়?
সোজা কথা মোদীরাজ্য গুজরাটে ভোটে জিততে বুলেট ট্রেন প্রকল্প আর বাকি রাজ্যের জন্য কাঁচকলা। কিন্তু ভারতীয় রেল বিগত ৭০ বছরে কোনও
যাত্রী সুরক্ষা দিতে পারেনি। ব্রিটিশরা ভারতীয় রেলকে যে অবস্থায় ছেড়ে গেছিল তার থেকে এক ইঞ্চি উন্নত হয়নি। এর জন্য ভারতীয় চোর-জোচ্চর
মন্ত্রীসভার অবদান স্মরণযোগ্য।