আধুনিক যুগে জঞ্জাল শুধু ফেলে দেওয়ার জিনিস নয়। বর্জ্য হয়ে উঠছে সম্পদ। কলকাতা পুরসভা পচনশীল বর্জ্য থেকে সার, অপচনশীল ও প্লাস্টিকজাত জঞ্জালের পুনর্নবীকরণ ইউনিট করছে। বায়ো গ্যাস, অপ্রচলিত বিদ্যুৎ তৈরির পথে হাঁটছে। এবার শৌচ-বর্জ্যকেও ‘সম্পদ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চলেছে পুরসভা। এর থেকে তৈরি হবে সার।
মহানগরের নিকাশি ব্যবস্থা আগের থেকে অনেক উন্নত হয়ে গিয়েছে৷ তবে এখনও কমবেশি ৪০ শতাংশ বাড়িতে নেই সোয়ারেজ লাইন। সেই সমস্ত পরিবারের একমাত্র ভরসা হল সেই সেপটিক ট্যাঙ্ক । আর সেই ট্যাঙ্ক ভর্তি হয়ে গেলে পরিষ্কারের জন্য চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে শহরবাসীর৷ কর্পোরেশনের ছোট গাড়িগুলি কবে এসে পরিষ্কার করবে, সেদিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়৷

আবার মল থেকে যাতে দূষণ ও গন্ধ না-ছড়ায়, সেই জন্য গাড়িগুলি ধাপায় নিয়ে গিয়ে দফায় দফায় পরিশোধন করে তারপর সার তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়৷ এবার শীঘ্রই সেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হতে চলেছে৷
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের দুটি অত্যাধুনিক গাড়ির উদ্বোধন করলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। ১৮ জুন এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মেয়র পারিষদ দেবব্রত মজুমদার, সন্দীপন সাহা সহ একাধিক কাউন্সিলর ও আধিকারিকরা। কলকাতা পুরসভার মূল ভবনের সামনে চ্যাপলিন স্কোয়ার থেকে গাড়ি দুটির উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনের পর মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানান, ‘আমরা দুটি অত্যাধুনিক গাড়ি কিনলাম। গাড়িগুলি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে কাজ করবে। এই গাড়িতে নাইট সয়েল সংগ্রহ করে ট্রিটমেন্ট করা হবে। অনেক বস্তিতে রাস্তা সরু হবার কারণে এই কাজ করার জন্য গাড়ি ঢুকতে সমস্যা হতো। এই গাড়িতে থাকা পাইপের দৈর্ঘ্য ৩৬০ ফুট হবার কারণে সেই সমস্যার সমাধান হবে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই গাড়ির দ্বারা আমরা স্যাকশন জেটেরও কাজ করতে পারব। আপাতত দুটি গাড়ি ট্রায়ালের কাজ করবে। আগামী দিনে প্রয়োজন হলে আমরা আরও বেশি সংখ্যক গাড়ি কিনব।’

পুরসভা সূত্রে খবর, বস্তি এলাকার সরু রাস্তায় সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করার সমস্যা মেটাতে এই গাড়ি কার্যকর হবে। গাড়ি দুটি তৈরি হয়েছে ডেনমার্কের প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এগুলি পুরোপুরি পরিবেশ-বান্ধব। গাড়িগুলির নাম ‘অনসাইট স্লাজ ডিওয়াটারিং ভেহিকল’। গাড়ি কেনা ও এ কাজের জন্য ধাপায় ইউনিট তৈরি মিলিয়ে মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৯ কোটি টাকা। কেন কেনা হলো এই গাড়ি? পুরসভার কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জানা যাচ্ছে, শহরে বহু বাড়ির শৌচালয়ের সঙ্গে নিকাশি নালার সংযোগ নেই। বর্তমানে বহু জায়গাতেই বাড়ি বা পুরনো বহুতলে সেপটিক ট্যাঙ্ক রয়ে গিয়েছে। এত দিন এই ট্যাঙ্ক থেকে সেচপুলের মাধ্যমে ট্যাঙ্কে করে শৌচ-বর্জ্য তোলা হতো। তা পরিশোধনের ব্যবস্থা ছিল না। এখন রিমোটে চালিত এই গাড়িগুলির মাধ্যমে শৌচ-বর্জ্য তোলা এবং পরিশোধন দুই কাজই হবে। গাড়িগুলি পাইপের মাধ্যমে সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে শৌচ-বর্জ্য সংগ্রহ করবে। একবারে ১০ থেকে ১২টি বাড়ির শৌচ-বর্জ্য সংগ্রহ করতে পারবে গাড়িগুলি। পাইপের দৈর্ঘ্য ১২০ মিটার বা ৩৬০ ফুট। ফলে সরু গলিতে গাড়ি ঢোকার যে সমস্যা ছিল তা এখন আর থাকবে না। গাড়ির মধ্যেই কঠিন ও তরল শৌচ-বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা থাকছে। তারপর তরল শৌচ-বর্জ্য গাড়িতেই পরিস্রুত হবে এবং তারপর তা ম্যানহোলে ফেলা হবে। আর কঠিন শৌচ-বর্জ্য দিয়ে তৈরি হবে সার। পর্যায়ক্রমে পুরো কলকাতায় ঘুরে বেড়াবে এগুলি। কলকাতার সমস্ত বোরো এলাকায় সেপটিক ট্যাঙ্ক রয়েছে এমন বাড়ির সংখ্যা হল ৪ লক্ষ ৭৪ হাজার ২৮৬টি৷ এই মুহূর্তে কর্পোরেশনের কাছে ৫ টি সেসপুল এম্পটিয়ার গাড়ি রয়েছে৷ এগুলির মধ্যে ২টি ৪ হাজার লিটারের ক্ষমতা সম্পন্ন এবং ৩টি ৫00 লিটারের ক্ষমতা সম্পন্ন। তবে শহরের প্রয়োজন অনুসারে তা পর্যাপ্ত ছিল না। এখন এই গাড়িগুলি আসতে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।