শহরে ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবিহত রোগের দাপট উত্তরোত্তর বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত। সম্প্রতি ‘টক টু মেয়র’ অনুষ্ঠানে অনেকেই মশাবাহিত রোগ নিয়ে মেয়র ফিরহাদ হাকিমের কাছে ফোন করে অভিযোগ জানিয়েছেন। শহরে এই রোগ প্রতিরোধের জন্য পৌর পরিষেবা দেওয়া ব্যাতিত জনগণকে সচেতন করতে আজ সকাল ১০টায় ‘জয় হিন্দ ভবন’-এর সামনে থেকে পদযাত্রা শুরু করেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। এই পদযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন কাউন্সিলর, পৌর চিকিৎসক, পৌর স্বাস্থ্যকর্মী ও পৌর আধিকারীকগণ।
পুরসভা সূত্রের খবর, গত তিন মাসে ডেঙ্গুর সঙ্গে ম্যালেরিয়া সংক্রমণের হার বেশ খানিকটা বেড়েছে শহরে। রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কলকাতা পুর এলাকার ১২ নম্বর বরোর ১০৬ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গি আক্রান্তের হার সর্বাধিক।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন দক্ষিণে ডেঙ্গি ও উত্তরে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বেশি। উত্তর কলকাতার বহু মানুষ রাতে রাস্তাতেই ঘুমোন। শুধু ফুটপাতবাসী নয়, ভিনরাজ্য থেকে মুটে-মজুরের কাজে এরাজ্যে আসেন অনেকেই। সারাদিন কাজের পর রাস্তাতেই তাঁরা শুয়ে পড়েন। মশারি ছাড়াই ঘুমোন। এর জন্যই মশাবাহিত রোগে এরা সহজেই আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। কিন্তু তাঁরা সঠিক ভাবে চিকিৎসা করাচ্ছেন না বা রক্ত পরীক্ষা করাচ্ছেন না। এর ফলে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ও অসর্কতা থেকে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে ফুটপাতবাসীদের মশারি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মোট ২০ হাজার মশারি দেবে স্বাস্থ্য দপ্তর। পুরসভার ভেক্টর কন্ট্রোল দপ্তর থেকে ডেঙ্গির ওপর একটি সমীক্ষা করা হয়েছে। সমীক্ষা অনুযায়ী যে মশা ডেঙ্গি ছড়ায়, উত্তর কলকাতার চেয়ে দক্ষিণ কলকাতায় তার উপস্থিতি বেশি। এই বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত, শুধুমাত্র দক্ষিণ কলকাতায় ৮০ শতাংশ মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন। যেখানে উত্তর কলকাতায় ২১ শতাংশ মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন।
পুর আধিকারিকদের একাংশের মত, মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গি কিংবা ম্যালেরিয়া রুখতে সচেতনতা একমাত্র হাতিয়ার। পুরকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতন করছেন। এধরনের সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের সঙ্গে নাগরিকদের সহযোগিতা জরুরি। কিন্তু এই রকম হচ্ছে কি? বালিগঞ্জের একটি অভিজাত পাড়া। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবিতে সেখানে বসানো হয়েছিল ডাস্টবিন। পুরসভার বক্তব্য, মূলত পথ চলতি মানুষদের সুবিধার্থে এই ডাস্টবিন বসানো হয়। সাধারণ মানুষের অভিযোগ ঠিকমতো ব্যবহারের অভাবে ডাস্টবিনটি ভ্যাটের মতো হয়ে উঠেছে। আবাসিকরা পুরসভার জঞ্জাল পরিস্কারের গাড়িতে আর ময়লা ফেলেন না। গৃহস্থালির জঞ্জাল ওই বিনটিতে ফেলেন। এই রকম উদাহরণ একটি বা দুটি নয়। কলকাতা পৌরসংস্থার জঞ্জাল সাফাই বিভাগের আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, এমন সমস্যায় নিত্য জেরবার হতে হচ্ছে তাঁদের। তাই বর্তমানে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এবার থেকে আবাসিক (রেসিডেন্সিয়াল) অঞ্চলে ডাস্টবিন দেওয়া হবে না। পুরনো বিনগুলিও একে একে তুলে নেওয়া হবে। পাশাপাশি, যাঁরা রাস্তায় জঞ্জাল ফেলবেন, হাতেনাতে ধরা পড়লে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা ‘স্পটফাইন’ করা হবে। শুধুমাত্র বাণিজ্যিক (কমার্শিয়াল) জোনে রাস্তার ধারে ডাস্টবিন রাখা হবে। সম্প্রতি মেয়র পারিষদ বৈঠকে এমনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জঞ্জাল অপসারণ বিভাগের মেয়র পারিষদ দেবব্রত মজুমদার জানিয়েছেন, ‘যেখানে প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি জঞ্জাল সংগ্রহ করা হয়, সেই এলাকায় আমরা ডাস্টবিন রাখব না। কারণ, সেই ডাস্টবিনকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী জায়গাতেও জঞ্জাল ফেলে সেখানে ভ্যাটের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন থেকে কেউ রাস্তাঘাটে ময়লা ফেললে আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেব। জরিমানাও করা হবে।’

প্রসঙ্গত, শহরজুড়ে এমন আবাসিক এলাকায় ১২ হাজার ৬০০টি ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল। মূলত রাস্তায় পথচলতি মানুষ যাতে জঞ্জাল না ফেলে — তাই এই ব্যবস্থা। কিন্তু নাগরিক উদাসীনতায় সেগুলি হয়ে উঠেছে ভ্যাটের মতো। যদিও নির্দিষ্ট সময় অন্তর পৌর কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জঞ্জাল সংগ্রহ করে আনেন। একটা অংশের নাগরিক বরাবর সেই গাড়িতে ময়লা ফেলেন না। পরে বাড়ির সামনে বা পাড়ায় রাখা ডাস্টবিনে ময়লা ফেলে আসেন। ফলে জায়গাটি ভ্যাটের মতো হয়ে যাচ্ছে। সেগুলি পরিষ্কার করতে দেরি হলে আবার অভিযোগও চলে আসছে। যাঁরা জঞ্জাল ফেলছেন, তাঁরাই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভিযোগ তুলছেন। তাই কলকাতা পৌরসংস্থা বার বার প্রচার করছে জঞ্জাল পৃথকীকরণ করে নির্দিষ্ট গাড়িতে ফেলতে।