আমি উপকূল মেদিনীপুর অঞ্চলের যজমানি বামুন পরিবারের সন্তান। আমার বেড়ে ওঠা মামা বাড়িতে। মামাবাড়ির উপাধি পঞ্চাধ্যায়ী অর্থাৎ যারা পঞ্চম বেদ অর্থাৎ নাট্যবেদ অধ্যয়ন করে। মায়ের মামাবাড়ির উপাধি চেনা – মিশ্র। মা চাকরি করতেন দূরদেশে; বাবা থাকতেন কলকাতায়। মামাবাড়ির গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শ্রেণীতে কয়েক ধাপ পড়েছি। মামাবাড়িতে আমার ছোটবেলা যাপন বাল-বিধবা দিদিমার তত্ত্বাবধানে। আমায় নিয়ে নিরামিশাষী বাল বিধবা দিদা আলাদা থাকতেন। সমুদ্রের লাগোয়া অঞ্চল হওয়ায় ব্যাপক গরমে ছোটবেলা কাটিয়েছি – তাই পান্তা ছিল ছোটবেলার খাদ্য সঙ্গী। এছাড়াও পান্তা উপকূলীয় খাদ্য কৃষ্টির অত্যাবশ্যক অনুপান। টক ভাতের প্রতি তীব্র আকর্ষণ আজও যায় নি।

মায়ের মামাবাড়ির ছিল আমার মামাবাড়ির পাশে। একান্নবর্তী পরিবার, অন্তত ৩০টা পাত পড়ত রোজ। মুনিষ চাকর আলাদা। বিশাল দুটো হাঁড়িতে রোজ ভাত হত। দুপুরে খাওয়াদাওয়াপর্ব শেষে ভাতের হাঁড়ির থেকেও বড় পান্তা হাঁড়িতে ঢেঁকি ছাঁটা লাল-লাল চালের ভাত ফেলা হত। ভাত জলে গেঁজে টক পান্তা তৈরি হত। টকস্যটক পান্তা জাতিধর্মনির্বিশেষে প্রত্যেকের সেব্য ছিল। সঙ্গে অনুপান থাকত মাছভাজা, চিংড়ি ভাজা, আলুসেদ্ধ, নানান তরকারি ইত্যাদি – আর কিছু না পাওয়া গেলে নুন, কাঁচা লঙ্কা আর পেঁয়াজ। মুনিষেরা প্রায় সারা দিনই পান্তা খেতেন। মাঠেও। ভাত পচা জলের নাম ছিল তনি; টক তনি আরও গেঁজে গেলে নাম হত কাঞ্জি। সেটা আলাদা করে তোলা থাকত শিকেয়। চালা থেকে ঝুলত। তনি খাওয়া হত দুপুরবেলা বাড়ি ফেরার পর উপকূলীয় গরম কাটানোর জন্যে নুন লেবু সহযোগে। আজও টক টক ভাত গুলে সাদা-লাল হয়ে যাওয়া জলে ডোবা পান্তা আমার ব্যাপক প্রিয়। ছোট আকারের গুঁড়ি পেঁয়াজ – আমরা বলতাম মড়ি পেঁয়াজ, ভাজা লংকা আর আলুসেদ্ধ, আর নুন। ব্যাস। ভেজানো চালটা ছড়ছড়ে হলে – অর্থাৎ জলটা তখনো টক না হলে গন্ধরাজ লেবু আবশ্যক। কাঁজিতেও লেবু দেওয়া হত। গরমে পান্তা আর কাঁজির বিকল্প নেই। উপকূলীয়র অচাকুরিজীবি পান্তা খাওয়া মধ্যবিত্তর সিয়েস্তা আবশ্যিক ছিল।

পান্তার সংগে ইলিশ অনুপান নিয়ে সার্বিকভাবে উড়ে বাউন বাড়িতে আলাদা আদিখ্যেতা ছিল বলে মনে পড়ছে না। এমনকী শুধু ইলিশ রান্না নিয়েও খুব একটা মাতামাতি দেখি নি। নদী, খাঁড়ির খাল, পুকুর, সমুদ্রের মাছের এত বৈচিত্র ছিল যে আলাদা করে ইলিশিয় আদিখ্যেতার প্রয়োজন হয় নি। গ্রামের কেউ মাছ ধরে খটি থেকে ফিরে এলে – তার আশেপাশে বাড়িতে প্রচুর মাছ বেঁটে দেওয়া হত। মায়ের মামা বা আমার মামা পালাগান করতেন। খটি অর্থাৎ সমুদ্রের মাছ ধরার ভেড়িতে গান গাইতে গেলে প্রচুর মাছ আসত। তাজপুরে খুব গিয়েছি।
মা মেদিনীপুর ছেড়ে ২৪ পরগণার নুরপুরের কাছে মাস্টারি করতে এসেছিলেন। তিনি শনি-রবিবারে ফেরার সময় একদুবার ইলিশ এনেছেন গেঁয়োখালি থেকে। একবারতো বর্ষায় দুখানা ২ কিলো ওজনের ইলিশ এনেছিলেন কলাপাতায় মুড়ে। বাবা তখন কলকাতায় শিক্ষক। আমার/মায়ের কলকাতা গমন শুরু হয়ে গিয়েছে। কলকাতা ভদ্রবিত্ত সমাজের ইলিশ আদিখ্যেতার আঁচ লাগেনি আমাদের পরিবারে। পান্তা-ইলিশ জুড়ি তখনও খুব একটা জনপ্রিয় হয় নি।

আমরা বামুন। পান্তার সঙ্গে শুঁটকি হত না। জলধা বা তাজপুর ইত্যাদি খটিতে মামা দল নিয়ে শীতলামঙ্গল পালা গাইতে যেতেন। বেশ কয়েকবার আমিও সঙ্গী হয়েছি। সেখানে খাওয়াটা জমাটি হত। সঙ্গে মাছ আসত বাড়িতে। দিদা আমার এক রাতান্ধ কাকা, যিনি আজ নিরুদ্দেশ তার জন্যে গুঁড়ি গুগলি ঝিনুকের মাংস রান্না করে দিতেন। উনি নিরামিশাষী ছিলেন, কিন্তু আমাদের খেতে বাধা থাকত না।
কলকাতায় একদা থোড় বড়ি আড্ডা নামে আড্ডাখানা ছিল, সেখানে সারা দিন পান্তা পাওয়া যেত। আমি আজও শুধু গ্রীষ্মে নয় সারা বছরই টক পান্তার জব্বর অনুগামী।