শাস্ত্রে নাকি বিধান আছে মেয়েদের চাষের লাঙল আর নৌকার হাল ধরতে নেই। অভাবের তাড়নায় বাংলার উপকূলের এক গ্রাম্য গৃহবধূ নব্বুইয়ের দশকে জীবন জীবিকার জন্য সেই শাস্ত্রীয় বিধানকে হেলায় তুড়ি মেরে দুঃসাহসকে সম্বল করে এক সিলিন্ডারের যন্ত্রচালিত ডিঙি নৌকা নিয়ে গভীর সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিলেন মাছ শিকার করে পরিবারের সকলের পেটে অন্ন সংস্থানের সন্ধানে। পরে ডিঙি নৌকায় করে প্রতিদিন সমুদ্র থেকে মাছ শিকার ও মাছ নিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা পেশায় পরিণত হয় তাঁর। তিনি পূর্ব মেদিনীপুরের রামনগর-২ ব্লকের উপকূলবর্তী গ্রাম দক্ষিণ পুরুষোত্তমপুরের মীনাক্ষী মান্না। পূর্ব মেদিনীপুরের সমুদ্র উপকূলবর্তী দক্ষিণ পুরুষোত্তমপুরের গ্রামবাসী ও মৎস্যজীবীরা সমুদ্রে মীনাক্ষীর দুঃসাহসিক মাছ ধরার কাজের জন্য তাঁকে ‘সমুদ্র কন্যা’ নাম দিয়েছেন। ভারতীয় উপকূলে আজও একমাত্র দুঃসাহসিক মহিলা মৎস্যজীবী সমুদ্র কন্যা মীনাক্ষী মান্না যিনি যন্ত্রচালিত ডিঙি নৌকা নিয়ে গভীর সমুদ্র থেকে নিয়মিত মাছ শিকার করে আসছেন।
মীনাক্ষী মান্নাই একমাত্র ভারতীয় মহিলা মৎস্যজীবী নব্বুইয়ের দশকে বিশ্বের অন্যতম সামুদ্রিক মৎস্যশিকারের দেশ নরওয়ে ঘুরে এসেছেন সে দেশের মৎস্যজীবী সংগঠনের আমন্ত্রণে। শুধু বিমানে চেপে নরওয়ে যাওয়াই নয়, সেখানকার সাহেব মৎস্যজীবীদের সামনে একজন মহিলা মৎস্যজীবী হিসেবে সমুদ্রে নিজের মাছ শিকারের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছিলেন।

পূর্ব মেদিনীপুরের সমুদ্র উপকূলের এক অতি সাধারণ গ্রাম্য মহিলা কিভাবে একা একা গভীর সমুদ্রে যন্ত্র চালিত নৌকা নিয়ে গিয়ে মাছ শিকার করেন নরওয়ের সাহেব মৎস্যজীবীদের কাছে মীনাক্ষীর সেই গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য নরওয়ের মৎস্যজীবী সংগঠন ভারতের ন্যাশনাল ফিশ ওয়াকার্স ফোরাম বা এনএফএফের মাধ্যমে নব্বুইয়ের দশকে মীনাক্ষীর কাছে নরওয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ পাঠায়। ভারতের মৎস্যজীবীদের সর্বভারতীয় সংগঠন ন্যাশনাল ফিশ ওয়ার্কাস ফোরামের তৎকালীন সভাপতি হরেকৃষ্ণ দেবনাথ নরওয়েতে মীনাক্ষীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেন।
মীনাক্ষীকে নরওয়ে যাওয়ার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন পূর্ব মেদিনীপুরের নিউ জলধা মৎস্যখটি সমবায় সমিতি, কাঁথি মহকুমা খটি মৎস্যজীবী উন্নয়ন সমিতি এমনকী রাজ্যের তৎকালীন মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দ।

শীতের দেশে যাতায়াতের জন্য মৎস্যমন্ত্রী কিরন্ময় নন্দ নিউ জলধা খটির মৎস্যজীবী নেতা লক্ষ্মীনারায়ণ জানাকে সঙ্গে নিয়ে একদিন সাতসকালে মীনাক্ষীর বাড়িতে হাজির হয়ে শীতবস্ত্র কেনার জন্য পনেরো হাজার টাকা আর্থিক সাহায্য হিসেবে তুলে দেন।
নরওয়ের মৎস্যজীবী সংগঠনের আমন্ত্রনে সুদূর নরওয়ের অসলো শহরে গিয়ে সেখানকার সাহেব মৎস্যজীবীদের সামনে মেদিনীপুরের উপকূলের বাংলা আর ওড়িয়া মিশ্রিত আঞ্চলিক ভাষায় অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়ে ছিলেন। একই সঙ্গে জানিয়েছিলেন কিভাবে তার এই পেশায় আসার নেপথ্যে কাহিনী।

মীনাক্ষী মান্নার কথায়, ‘কাঁথি-১ ব্লকের দামোদরপুরে বাবার বাড়িতে থাকার সময়েই ছোট থেকেই ডানপিটে স্বভাবের মীনাক্ষী বিল চষে মাছ ধরা, নৌকা চালানোর মত নানান দস্যিপন্যায় মেতে থাকতেন। আশির দশকে মীনাক্ষী মাইতির সঙ্গে কাঁথি-১ ব্লকের বাটিপুট গ্রামের নির্মল মান্নার বিয়ে হয়। বাবার বাড়িতে যেমন অভাব ছিল শ্বশুর বাড়িতেও তেমনই অভাব আর অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। একদিন অভাবের তাড়নায় শাস্ত্রীয় বিধানকে ছুঁড়ে ফেলে শুধুমাত্র স্বামী নির্মল মান্নার সমর্থন ও সহযোগিতাকে সম্বল করে গভীর সমুদ্রে ডিঙি নৌকায় দুঃসাহসিকভাবে পাড়ি দিয়েছিলেন মাছ শিকার করে পরিবারের অভাব মেটানোর জন্যে। সেই শুরু।

মীনাক্ষীর বলা কথা ন্যাশনাল ফিশ ওয়ার্কাস ফোরামের সভাপতি হরেকৃষ্ণ দেবনাথ ইংরেজিতে তর্জমা করে দোভাষীর কাজ করেছিলেন। মীনাক্ষীর দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতার কথা শুনে বিস্ময়ে “থ” মেরে গিয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম মৎসপ্রধান দেশ নরওয়ের সাহেব মৎস্যজীবীরা। নরওয়ের মৎস্যজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে মীনাক্ষী মান্নাকে সুদূর নরওয়ের অসলো শহরে সংবর্ধিত করা হয়েছিল যা বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। তিন সন্তানের জননী মীনাক্ষীর বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। এই বয়সেও তিনি গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান তবে এক সিলিন্ডারের ইঞ্জিন চালিত ডিঙি নৌকায় নয়, নিজের চার সিলিন্ডারের ফিশিং বোটে তিন ছেলে নন্দন, চন্দন, বিনন্দন আর স্বামী নির্মল মান্নাকে সঙ্গে নিয়েই। মীনাক্ষীর কথায়, তিনদশকের আগে একদিন পরিবারের অভাবের তাড়নায় সমুদ্রকেই আশ্রয় করে সমুদ্রে ডিঙি নৌকা নিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিলাম। সমুদ্র আমাকে ফেরায়নি। সব দিয়েছে। অর্থ, সম্মান, যশ সব কিছু। সরকারি পাট্টার জমির উপর ঝুপড়ি ঘর ছেড়ে নতুন তৈরি পাকা বাড়িতে উঠে এসেছি। তিনবিঘা নিজস্ব জমি কিনেছি এমনকী নিজস্ব ফিশিং বোটও হয়েছে। এখন তিন ছেলে আর স্বামীকে নিয়ে নিজস্ব ফিশিং বোটে করেই সমুদ্রে মাছ ধরতে যাই। একদিন যা কল্পনাও করতে পারতাম না। মাছের মরশুমে সমুদ্রে মাছ শিকার আর বাকি অন্যসময়ে স্বামী, তিন ছেলে, বৌমা আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে দিন কাটান ‘সমুদ্র কন্যা’ মীনাক্ষী মান্না।
এরকম সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবন সংগ্রামের কাহিনী তুলে ধরে প্রতিবেদন উপহার দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। পরবর্তী সময়ে আরও তথ্য সমৃদ্ধ প্রতিবেদন পড়ার অপেক্ষায় থাকবো।