শতবর্ষের আলোও সবার মুখে পড়ে না। তেমনই উপেক্ষিত কথাসাহিত্যিক শক্তিপদ রাজগুরু। রূপালি জগতের আলোয় তাঁকে উপেক্ষা করেছে। তিনি বেঁচেছিলেন সুদীর্ঘকাল, ৯২ বছর (১ ফেব্রুয়ারি ১৯২২—১২ জুন ২০১৪)। প্রথম গল্প ‘আবর্তন’ ছাপা হয়েছিল ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৪২-এর মহালয়ার দিনে। সাগরময় ঘোষের উৎসাহ পেয়ে লেখার জগতে প্রাণিত হয়েছিলেন। বুক এম্পোরিয়াম থেকে বেরিয়েছিল তাঁর প্রথম বই তথা উপন্যাস ‘দিনগুলি মোর’ (১৯৪৫)। সেই সময়ের জনপ্রিয় সিনেমা পত্রিকা ‘উল্টোরথ’-এ ১৯৫৬-তে বেরয় বড়গল্প ‘চেনামুখ’। সেটি পড়ে অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবী দীনেন গুপ্তকে দিয়েছিলেন। আর তাঁর মাধ্যামেই গল্পটি পৌঁছায় ঋত্বিক ঘটকের কাছে। তাঁর কথায় গল্পকার ‘চেনামুখ’কে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ করে দেন। সেই ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় ১৯৬০-এ সেটি বাংলা চলচ্চিত্রে ইতিহাস সৃষ্টি করে। এজন্য লেখকের নামও সময়ান্তরে মেঘের আড়ালে থাকা তারার মতো আলোকিত হওয়ার অবকাশ পেল। তারপর একের পর এক তাঁর লেখা থেকে বাংলা-সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় সিনেমা তৈরি হয়েছে এবং জনপ্রিয়তাও লাভ করেছে। ‘অমানুষ’ (১৯৭৫), ‘আনন্দ আশ্রম’ (১৯৭৭) ‘বারসাত কি এক রাত’ (১৯৮১), ‘অনুসন্ধান’ (১৯৮১), ‘অন্যায় অবিচার’ (১৯৮৫) প্রভৃতি সিনেমা তার পরিচায়ক। এরকম বিভিন্ন ভাষায় তাঁর লেখা থেকে চল্লিশটি সিনেমা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দুটি উপন্যাস ‘তবু বিহঙ্গ’ (১৯৬০), ‘কেহ ফেরে নাই’ (১৯৬০)-এর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। তাঁর প্রায় শদেড়েক বই প্রকাশিত হয়েছে। সুদীর্ঘ সময়, সুযোগের বিপুল সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি পেয়েও তিনি বাংলার জনমানসে উপেক্ষিত থেকে গিয়েছেন। সেখানে জীবিতকালেই বিস্মৃত হয়েছিলেন শক্তিপদ রাজগুরু। সিনেমার দৌলতেও তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রত্যাশিত ভাবে নিজেকে ছড়াতে পারেননি। অথচ শুধুমাত্র ‘মেঘে ঢাকা তারা’র জন্যই বাঙালিনন্দিত ঔপন্যাসিক হতে পারতেন। সেক্ষেত্রে বাঙালিমানসে তাঁর প্রত্যাশিত স্বীকৃতি ও সম্মান কিছুই মেলেনি। সেখানে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ তার সমার্থক হয়ে উঠেছে। ঋত্বিক-সুপ্রিয়ার পরিচিতির আড়ালে থেকে গিয়েছেন তিনি। এ সম্পর্কে শক্তিপদ রাজগুরু তাঁর সাক্ষাৎকারে অকপটে জানিয়েছেন (‘বইয়ের দেশ’, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০০৬) : ‘জানি না কেন এমন হল, এবং একটা কথা, ইট ইজ অন দি রেকর্ড, আপনি লিখে রাখুন, সিনেমাটির পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমাকে একটি কার্ডও পাঠানো হয়নি। ঋত্বিক বেঁচে থাকলে এমনটা হত না। ও আমাকে যে সম্মানটুকু দিয়েছে, যা ওর থেকে আমি পেয়েছি, ওর অনুগামীরা কী দিল না দিল, সে কথা আর মনে করতে চাই না। ‘মেঘে ঢাকা তারা’র টাকা আমি পাইনি। রাইট রিভার ব্যাক করে গেছে। তবু আমি ঋত্বিকের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। ….’
শক্তিপদ রাজগুরু বাংলা সাহিত্যে আত্মনিয়োগ করে সিনেমায় জড়িয়ে পড়েন। সিনেমা বিষয়ক পত্রিকা ‘উল্টোরথ’ আট বছর সম্পাদনা করেছেন। পরে ‘সিনেমাজগৎ’ পত্রিকাটির সম্পাদনায় সামিল হয়েছেন, সিনেমার কাজে মুম্বই গিয়ে থেকেছেন, বিদেশেও পাড়ি দিয়েছেন সিনেমার দৌলতে। অন্যদিকে বাংলা সিনেমায় জোয়ার আনার ক্ষেত্রেও তিনি স্মরণীয়। সেদিক থেকে শক্তিপদ’র সিনেমার রঙিন আলো তাঁর সাহিত্যিক বিভূতিকে শুষে নিয়েছে। যে-কারণে তাঁর সাহিত্যে বিনোদনী পাঠের দৃষ্টিই তার প্রতি মননশীল অন্তর্দৃষ্টিকে বিমুখ করে তুলেছে। এতে তাঁর সাহিত্যচর্চা বাংলা সাহিত্যের সমালোচকদের কাছে উপেক্ষিত হয়েছে। তাঁর প্রতি উদাসীনতা নিয়ে তিনি নিজেও সচেতন ছিলেন। অথচ তা নিয়ে তাঁর কোনোরকম উচ্চবাচ্য ছিল না। অকপটে সেই সাক্ষাৎকারে বলেছেন : ‘পুরস্কার নিয়ে জিজ্ঞেস করবেন না। হ্যাঁ, দু’-চারটি পুরস্কার আমি পেয়েছি, কিশোর ভারতী পুরস্কার, বিভূতিভূষণ পুরস্কার, শৈলজানন্দ… সরকারি পুরস্কার-টুরস্কার যাঁরা দিয়ে থাকেন, তাঁদের আমি চিনি না, তাঁরাই বা আমাকে চিনতে যাবেন কেন! তাছাড়া হয়তো পুরস্কারের মতো আমি কিছুই লিখিনি, তাই দেননি।’ সেই ‘চেনামুখ’-এর মানুষটিই সময়ান্তরে অচেনা হয়ে পড়েন। অথচ তা নিয়ে তাঁর তীব্র অভিমান তাঁকে সৃষ্টিশীলতা থেকে বিরত করতে পারেনি। আজীবন নীরবে নিভৃত্বে সাহিত্যচর্চা করে গিয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর নিঃসঙ্গতাবোধই তাঁকে সাহিত্যচর্চায় নিবিড় করে তুলেছিল। দেশভাগে ছিন্নমূল মানুষের শরিক না হয়েও তিনি লিখেছিলেন ‘চেনামুখ’ ত্তথা ‘মেঘে ঢাকা তারা’র মতো দেশভাগের ফলে উদ্বাস্তু জীবনের করুণ কাহিনি।
আসলে তিনিও স্বদেশ হারানোর চেতনা কৈশোরেই লাভ করেন। জন্মেছিলেন বাঁকুড়ার গোপবাঁধি গ্রামে। সেখানে তাঁর সাতপুরুষের বাস। আর বেড়ে ওঠেন মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রাম পাঁচথুপিতে। সেখানে তাঁর বাবা পোস্টমাস্টার ছিলেন। আকস্মিকভাবে বাবার বদলি হওয়ায় সেই পাঁচথুপি থেকে ১২ বছর বয়সী শক্তিপদ স্বদেশত্যাগের চেতনায় নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন। এজন্য বাবার অকালমৃত্যুতে পরিবারের দায়িত্ব নিতে গিয়ে শেষে পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফে চাকরিতে জিপিওতে জয়েন করে কলকাতাতে আবার স্বদেশবিচ্ছেদের নিঃসঙ্গতাবোধে উদবাস্তুদের শরিক হয়ে ওঠেন। তাঁর কথায় : ‘কলকাতায় আমি তো ছিন্নমূলের মতোই ছিলাম। বৈষ্ণব মেলা, রাঢ পরিমণ্ডল, পাঁচতোপি ছেড়ে চলে এসেছি। তখন উদ্বাস্তু, শরণার্থী এসব কথা কেউ কানে শোনেনি। নিজের দেশেই উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম আমি। ওপার থেকে আসা মানুষজনের দুঃখ তাই আমায় নাড়া দিত। উদ্বাস্তুর ঢল নেমেছিল কলকাতায়। আমি ওদের কলোনিতে গিয়ে ঘুরতাম, থাকতাম। আমার মনে আছে, ওদের কথা লেখার জন্য দুর্গাপুর, গোপালপুরের কাছে যে আট হাজার ট্রানজিট ক্যাম্প ছিল, সেখানে গিয়ে দশ দিন ছিলাম। সুপারিনটেনডেন্ট আমায় বলেছিলেন, আপনি কি ক্ষেপে গেছেন নাকি। আমি কোনও কথা শুনিনি।…’ তারই সোনালি ফসল ‘চেনামুখ’ থেকে ‘মেঘে ঢাকা তারা’। অথচ তারপরে শক্তিপদ’র লেখনী গতি লাভ করলেও সাহিত্যমহলে উপেক্ষিত হয়ে থেকেছেন।
শক্তিপদ উপন্যাসই লিখেছেন শ’খানেক। তার মধ্যে দেশভাগোত্তর উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে তাঁর লেখা উপন্যাসগুলিও সমালোচকের দরবারে উপেক্ষিত থেকেছে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দিনগুলি মোর’ থেকে ‘চেনামুখ’-এর মধ্যেই শুধু নয়, অসংখ্য উপন্যাসেই উদ্বাস্তু জীবনের করুণ পরিণতি নানাভাবে উঠে এসেছে। শক্তিপদ স্বকীয় চেতনার আলোয় দেশভাগের ফলে ছিন্নমূল মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম তীব্র আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছে। তাঁর নিষ্ঠা ও সততা জীবনাভিজ্ঞতার পরশে সেগুলি নতুন মাত্রা লাভ করে। সেখানে তাঁর বিস্তার রাঢ় অঞ্চল থেকে সুন্দরবন, দণ্ডকারণ্য থেকে মরিচঝাঁপি। ‘তবু বিহঙ্গ’, ‘নয়া বসত’, ‘অধিকার’, ‘দণ্ডক থেকে মরিচঝাঁপি’ তাঁর অনন্য ফসল।
শরৎ-সাহিত্যকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠা, বিভূতিভূষণের প্রকৃতিপ্রেমে আত্মলীন হওয়া শক্তিপদই তারাশঙ্করের রাজ্যে নিজেকে বিস্তার করেছিলেন। তারাশঙ্করের ‘কবি’ পড়েই চেনা জগতের অচেনা পরশ লাভ করে লেখার জগতে নিবিড়ভাবে ভিড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর সংবেদী চেতনায় গ্রামবাংলার জনপদগুলি প্রাণ ফিরে পায়। ‘বাসাংসি জির্ণানি’, ‘রূপান্তর’ প্রভৃতি লেখায় তাঁর নিজের গ্রামের কথাও উঠে আসে। অন্যদিকে তাঁর সাহিত্যসাধনায় ফাঁক বা ফাঁকির অবকাশ ছিল না। আসানসোলের কয়লাখনিতে আটকে পড়া শ্রমিকদের কথা লেখার জন্য লাইফ বন্ড দিয়ে খনিগহবরে প্রবেশ করেছিলেন। আর তুলে এনেছিলেন ‘কেহ ফেরে নাই’-এর মতো আকাঁড়া হীরের টুকরো। এতসব সত্বেও শক্তিপদ রাজগুরু বাংলা সাহিত্যে নিজেই উদ্বাস্তু হয়ে রইলেন। অন্যদিকে সিনেমার লেখক হিসাবেও ‘মেঘে ঢাকা তারা’র মতো থেকে গেলেন অনালোকিত।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।