কিশোরবেলায় বাবার সঙ্গে আলবোলা টানতেন। হিন্দু কলেজের দুই ছাত্র বন্ধুর বাড়িতে এসে দেখেন বাবা আলবোলায় টান দিয়ে ছেলের দিকে নলটা এগিয়ে দিলে ছেলেটি সুখ টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছেন। বিস্মিত দুই ছাত্র বন্ধুর কাছে সে সম্পর্কে জানতে চাইলে সেতো তাঁর বন্ধুদের আরও অবাক করে দিয়ে বলেন, তাঁর বাবার সেকেলে নিয়মনীতি একেবারেই পছন্দ নয়, আর তাইতো তাঁরা একসঙ্গে বসে মদ্যপানও করেন। সেই ছেলেই আবার আঠেরো বছর বয়সে প্রথম প্রেমে পড়েন কোনও এক বিধবা মহিলার। রমণী, নয়তো বিবাহিত নারীর সঙ্গে। বন্ধুকে চিঠিতে লেখেন, তমলুকে এসে তাঁর ছোটখাটো প্রেমের একটি অভিজ্ঞতা হয়েছে। “সুতরাং বুঝতেই পাচ্ছো, বিবাগী এবং সন্ন্যাসী থেকে রাতারাতি একটা লম্পটে পরিণত হয়েছি’’। আবার তাঁরই মৃত্যুর পর সৎকারের অভাবে পড়ে থাকা দেহে পচন ধরে। সমাহিত করার জন্য কলকাতার খ্রিস্টান সমাজ মাত্র ছয় ফুট জায়গা ছেড়ে দিতে প্রবল আপত্তি জানায়। বিশপের অনুমতি ছাড়াই তাঁর কবর খোঁড়ার সময় ভক্ত ও বন্ধুবান্ধব মিলে এক হাজার মানুষ উপস্থিত হলেও, একদিন শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় নিজের গ্রন্থ উৎসর্গ করে যাঁদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিখ্যাত করেছিলেন, সেই ভিড়ে ছিলেন না তাঁদের একজনও। এই হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত!
আজ থেকে ১৬৪ বছর আগের কথা, তখনও রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়নি, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় প্রথম পাঁচটি সর্গ নিয়ে। রামকে কোনোরকম শ্রদ্ধা-ভক্তি-গুরুত্ব না দিয়ে বরং রাবণকে অনেক আপন করে নতুন এক ভাবনা-ভাষা-ছন্দ-ভঙ্গিমায় রাম কাহিনিকে যেভাবে তিনি সামনে আনলেন তাতে বোঝাই গেল, বাংলা ভাষা পেয়ে গিয়েছে তার শ্রেষ্ঠ কবিকে। পণ্ডিতরা ধন্য ধন্য করলেন, তুলনা টানলেন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর সঙ্গে। কালীপ্রসন্ন সিংহের নেতৃত্বে ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’ তাঁকে রুপোর সুদৃশ্য পানপাত্র উপহার দিয়ে সংবর্ধনা দিল। অনেক পণ্ডিত আবার তীব্র নিন্দা করতে শুরু করলেন। যেমন জগবন্ধ ভদ্র ‘ছুছুন্দরী কাব্য’ লিখলেন, যা আসলে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র প্যারডি, মধুসূদনের কাব্যের ভাবভঙ্গিকে ব্যাঙ্গবিদ্রুপ।
রবীন্দ্রনাথও তরুণ বয়সে মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, “আজকাল যাঁহারা মহাকবি হইতে প্রতিজ্ঞা করিয়া মহাকাব্য লেখেন তাঁহারা… রাশি রাশি খটমট শব্দ সংগ্রহ করিয়া একটা যুদ্ধের আয়োজন করিতে পারিলেই মহাকাব্য লিখিতে প্রবৃত্ত হন। …মেঘনাদবধের রাবণে অমরতা নাই, রামে অমরতা নাই, লক্ষ্মণে অমরতা নাই, এমন কি ইন্দ্রজিতেও অমরতা নাই। মেঘনাদবধ কাব্য-এর কোন পাত্র আমাদের সুখদুঃখের সহচর হইতে পারেন না, আমাদের কার্য্যের প্রবর্ত্তক নিবর্ত্তক হইতে পারেন না”। উল্লেখ্য, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, মধুসূদন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বসে অনেকদিন ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র অংশবিশেষ পাঠ করে শুনিয়েছিলেন। তখন এই মহাকাব্য লেখা চলছে, প্রকাশিত হয়নি। মধুসূদন ঠাকুরবাড়ি যেতেন তাঁর বিশেষ বন্ধু সারদাপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় (রবীন্দ্রনাথের বড়দিদি সৌদামিনী দেবীর স্বামী)-র সূত্রে।
অন্যদিকে বিবেকানন্দ ছিলেন মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র একজন গুণগ্রাহী পাঠক। দত্তকুলোদ্ভব হয়েও মধুসূদন হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তা নিয়ে বিবেকানন্দের যেমন কোনও অসুবিধে ছিল না, বরং বিধর্মী কবির কাব্যের নায়ক রাবণ এবং ইন্দ্রজিৎ আর অপ্রধান চরিত্র রাম ও লক্ষ্মণ- এতে ‘মেঘনাদ কাব্য’-র প্রতি স্বামী বিবেকানন্দের পক্ষপাত ছিল, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র যে কোনও অংশ তিনি অনর্গল পাঠ করতে ভালবাসতেন। এতে কেবলমাত্র তাঁর উদার মহাত্মার পরিচয়ই মেলে না, তরুণ রবীন্দ্রনাথ ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র অন্তর্গত রাজনীতি বুঝতে পারেন নি কারণ, অধিকাংশ বাঙালির মতো রবীন্দ্রনাথেরও এই নতুন রামকথার ভাবনা ও অমিত্রাক্ষর ছন্দ ‘রাশি রাশি খটমট শব্দ সংগ্রহ’ মনে হয়েছিল। কিন্তু উনিশ শতকের ওই হিন্দু সন্ন্যাসী ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-র সাহিত্য-রাজনীতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।
একদিন শিষ্য শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে বিবেকানন্দের ‘মেঘনাদবধ কাব্য নিয়ে আলোচনার সময় শরৎ মন্তব্য করলেন, মাইকেলের নাকি শব্দের আড়ম্বর পছন্দ। এতে বিবেকানন্দ বিরক্ত হয়ে বলেন, “তোদের দেশে কেউ একটা কিছু নূতন করলেই, তোরা তাকে তাড়া করিস। আগে ভাল করে দেখ্, লোকটা কী বলছে, তা না, আগেকার মতো হল না, অমনি দেশের লোকে তার পিছু লাগল। এই ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বাঙলা ভাষার মুকুটমণি। মাইকেল নতুন ছন্দে, ওজস্বিনী ভাষায় যে কাব্য লিখে গিয়েছেন, তা বোঝার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নেই। সেই কাব্য এখনও হিমালয়ের মতো অটল। তার নিন্দুকরা সময়ের স্রোতে বিলীন”। এই কথাগুলি বলে বিবেকানন্দ শরৎকে বেলুড় মঠের গ্রন্থাগার থেকে ‘মেঘ্নাদবধ কাব্য’ বইটি আনতে বললেন। বই এলে শরৎকে বললেন: “পড়্ দিকি”। কিছুটা পড়ার পরই থামিয়ে দিলেন। তিনি নিজে পড়তে লাগলেন। শরচ্চন্দ্র লিখেছেন, “স্বামীজি পড়িতে লাগিলেন আর ব্যাখ্যা করিলেন। সেই বীরদর্পদ্যোতক পঠন-ভঙ্গী এবং ব্যাখ্যা আজিও শিষ্যের হৃদয়ে জ্বলন্ত জাগরূক রহিয়াছে”। আসলে বহুকাল ধরে পাঁচালি শোনার কান সবে মাত্র একটু আধটু ঈশ্বর গুপ্তের ছন্দ চিনছে, তখনই যদি চিরাচরিত ভাবনা ওলট পালট করে অমিত্রাক্ষরের মতো সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে তাকে সামলানো কি সহজ।