বেশ ভালোই জমায়েত হয়েছিল কংগ্রেসের সমাবেশে। কংগ্রেস কোনো দিনই ক্যাডারভিত্তিক দল নয়, কথায় কথায় জমায়েত করা তাদের ধাতে নেই। তার ওপরে নানা ভোটে হেরে হেরে ক্ষীণবল। তাছাড়া রয়েছে দলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বিদ্রোহ, অশান্তি, দলত্যাগ। এসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত রবিবার (৪ আগস্ট ২০২২) যে দিল্লির রামলীলা ময়দান ভিড়ে উপচে পড়ল, সেটা সাম্প্রতিক রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ঘটনাই বটে।
কী বললেন রাহুল?
সংক্ষিপ্ত, যাকে বলে ‘বুলেট পয়েন্ট’ আকারে রাহুলের বক্তৃতার প্রধান বিষয়গুলোর দিকে চোখ রাখা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, —
রাহুল ভারত জোড়ো যাত্রার কথাও বলেছেন, যা ৭ সেপ্টেম্বর জম্মু-কাশ্মীর থেকে শুরু হতে চলেছে। কংগ্রেসের ডাকে রামলীলা ময়দানের এই জনসভা আয়োজিত হয়েছিল প্রধানত জিনিসপত্রের দাম বাড়ার প্রতিবাদে। রীতিমতো ফিরিস্তি দিয়ে রাহুল দেখিয়েছেন, মূল্যবৃদ্ধি কী ভয়ানক চেহারা নিয়েছে। সে বিষয়ে রাহুলের বিস্তারিত বক্তব্যে না গিয়ে আমরা একটু খতিয়ে দেখতে চাই, এই অসহ্য পরিস্থিতিতেও বিজেপি কীভাবে মিথ্যাচার করে চলেছে।

সংসদে বিজেপির জেনেশুনে মিথ্যচার
সংসদের বাদল অধিবেশনে জিনিসপত্রের দরদাম বাড়া নিয়ে এক প্রস্ত বিতর্ক হয়েছিল। যদিও তর্ক-বিতর্কে হাল আমলের কেন্দ্রীয় সরকারের তেমন গা নেই, ভাবখানা এমন যেন, তোরা যে যা বলিস ভাই – আমরা কেয়ার করি থোড়াই। এর আগেও বারবার অতি গুরুত্বপূর্ণ আইন সংসদে আলোচনা ছাড়াই, স্রেফ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাশ করানো হয়েছে। কোনো প্রতিবাদে কান দেওয়া হয়নি। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনাতেও যে সুপরামর্শ কেন্দ্র কানে নেবে, তেমন আশা ছিল না মোটেই। তবে মিথ্যে প্রচারের মঞ্চ হিসেবে যে ভাবে সংসদকে ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে শিউরে উঠতে হয়।
চলতি মাসের শুরু দিকের ঘটনা। সংসদে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনার সময় বলতে উঠেছিলেন বিজেপি সাংসদ রাধা মোহন দাস আগরওয়াল। তেমন পরিচিত না হলেও এই আগরওয়াল মশাইকে বিজেপি দায়িত্ব দিয়েছিল অসত্য ভাষণের। সময়ও বরাদ্দ হয়েছিল যথেষ্ট। রাজ্যসভায় তিনি একগুচ্ছ কাগজ থেকে নানা তথ্য পড়তে থাকেন। তাঁর বক্তব্য বিষয় ছিল চলতি বছরের জুন মাসে মূল্যবৃদ্ধির রাজ্যওয়ারি তথ্য। কোথা থেকে সেসব সংখ্যা তিনি পেলেন, তা না বলে তিনি কেবল সংখ্যার পরে সংখ্যা পড়ে যান। শেষে তিনি ঘোষণা করলেন, তাঁর ওইসব তথ্য থেকে পরিষ্কার, অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেই দরদাম বৃদ্ধি হচ্ছে সবথেকে চড়া হারে। সত্যিই কি তাই? বিজেপির মিথ্যার ঝুলি ফর্দাফাঁই করতে এবারে সাংবাদিকের কলমই হয়ে উঠছে তরবারির থেকে ধারালো।
দাম বাড়ছে সব জিনিসের, কেবল মানুষের দাম কমছে
চলতি ক্যালেন্ডার বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে গড় মূল্যবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৯ শতাংশ। দরদাম কোন রাজ্যে কতটা বেড়েছে? একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম এ বিষয়ে রাজ্য ভিত্তিক তথ্য জোগাড় করেছে। কী দেখা যাচ্ছে সেখানে?
জানুয়ারি থেকে জুলাই, এই সাত মাসে সারা দেশে গড় খুচরো দাম বৃদ্ধি ৬.৭৯ শতাংশ।
রাজ্যগুলির মধ্যে সবথেকে ওপরে তেলেঙ্গানা, সে রাজ্যে খুচরো দাম বেড়েছে ৮.৩২ শতাংশ হারে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দাম বৃদ্ধি পশ্চিমবঙ্গে, ৮.০৬ শতাংশ। এর পরে সিকিম ৮.০১ শতাংশ।
মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় খুচরো দর বৃদ্ধি ৭.৭ শতাংশ, মধ্য প্রদেশে ৭,৫২ শতাংশ।
আসামে ৭.৩৭, উত্তরপ্রদেশে ৭.২৭, গুজরাট ও জম্মু-কাশ্মীরে ৭.২ শতাংশ।
জানুয়ারি থেকে জুলাই, সাত মাসে রাজস্থানে খুচরো দর বৃদ্ধি ৭.১ শতাংশ।
সবথেকে কম দাম বেড়েছে কেরালায় ৪.৮ শতাংশ হারে।
কমের দিকে এর পরে রয়েছে তামিলনাড়ুতে ৫.০১ শতাংশ।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে পাঞ্জাবে ৫.৩৫, দিল্লিতে ৫.৫৬ ও কর্ণাটকে মূল্যবৃদ্ধি ৫.৮৪ শতাংশ।
মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে কয়েকটি রাজ্য। অন্ধ্র প্রদেশ ও ঝাড়খণ্ডে দাম বেড়েছে ৬.৯ শতাংশ হারে।
বিহারে ৬.০৭, ছত্তিসগড়ে ৬.৪, উত্তরাখণ্ডে ৬.৫ এবং ওড়িশায় খুচরো দামবৃদ্ধি ৬.৬ শতাংশ।

এই হিসেবে এটা পরিষ্কার, জাতীয় গড়ের থেকে বেশি হারে, এমনকী ৭ শতাংশের উপর খুচরো দাম বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুলি বিজেপি শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত এলাকায়, যেমন উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, জম্মু-কাশ্মীরে। অ-বিজেপি শাসিত যে-সব রাজ্যে চড়া হারে দাম বেড়েছে, তার মধ্যে রয়েছে তেলেঙ্গানা, পশ্চিমবঙ্গ, রাজস্থান প্রভৃতি। অথচ রাধা মোহন দাস আগরওয়াল দিব্য বলে দিলেন, দাম বেশি বাড়ছে কেবল অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যে। বিজেপি সাংসদের মিথ্যাচার যে এতটা ন্যক্কারজনক হতে পারে, ভাবাই যায় না।
দাম বৃদ্ধির বিপদ মাথা চাড়া দিয়েছে মোদি সরকারের ব্যর্থতাতেই
জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির সব বড়বড় দাবি যখন বাতাসে মিলিয়ে যায়, দেখা দেয় দারুণ মূল্যবৃদ্ধি। ২০১৯ সালে এ দেশে খুচরো দরদাম বৃদ্ধি হয়েছিল ৩.৭৩ শতাংশ হারে। ২০২০-তে ওই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬.৬২ শতাংশ। এদিকে লক-ডাউনের ধাক্কায় কোটি কোটি মানুষ কর্মহীন হন, আয় কমে গেলে চাহিদাও কমে যায়। চাহিদা কমায় ২০২১ সালে দাম বাড়ার হার কিছুটা কমে হয় ৫.১৩ শতাংশ। তারপরই ধারাবাহিক ভাবে বাড়তে থাকে জিনিসপত্রের দরদাম।
চলতি বছরের (২০২২) জানুয়ারিতে খুচরো দাম বৃদ্ধির হার ছিল ৬.০১ শতাংশ, পাইকারি মূল্যবৃদ্ধি ছিল ১২.৯৬ শতাংশ। ফেব্রুয়ারিতে ওই দুই হার আরও বেড়ে হয়েছিল ৬.০৭ ও ১৩.১১ শতাংশ। এপ্রিলে ৭.৭৯ ও ১৫.১০ শতাংশ। মে মাসে খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ছিল ৭.০৪ শতাংশ, পাইকারি দাম বাড়ে ১৫.৮৮ শতাংশ। জুনে খুচরো দাম বেড়েছে ৭.০১ শতাংশ ও পাইকারি দাম বৃদ্ধি ১৫.১৮ শতাংশ। ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাবার পরে টনক নড়ে মোদি সরকারের। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রেপো রেট বাড়াতে শুরু করে। মে মাসে ৪০ বেসিস পয়েন্ট বা ০.৪০ শতাংশ, ৮ জুন ২০২২-এ ৫০ বেসিস পয়েন্ট বা ০.৫০ শতাংশ। জুলাইতেও দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি। চলতি বছরের জুলাইতে খুচরো দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৬.৭১ শতাংশ হারে, ওই মাসে পাইকারি দাম বেড়েছে ১৩.৯৩ শতাংশ হারে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পদক্ষেপে দরদাম নিয়ন্ত্রণে আসার কোনো লক্ষণ না দেখানোয় আবার ৫ আগস্ট ২০২২-এ ৫০ বেসিস পয়েন্ট বা ০.৫০ শতাংশ বাড়ানো হয় রেপো রেট। ওই হার ৪ থেকে বেড়ে হয় ৫.৪০ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি রুখতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তিন দফায় রেপো রেট বাড়িয়েছে ১৪০ বেসিস পয়েন্ট বা ১.৪০ শতাংশ। এর ধাক্কায় ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণে সুদ ক্রমাগতই বাড়ছে। সাধারণ মধ্যবিত্ত বা গরিব মানুষও ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেন। তাদের গুণতে হচ্ছে অনেকটাই বাড়তি সুদ।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, বারবার রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রেপো রেট বাড়ালেও বাড়ছে না ব্যাঙ্ক জমার সুদ। স্থায়ী আমানতে যেটুকু সুদ মিলছে তা মূল্যবৃদ্ধির হারের থেকে অনেকটাই কম। দরদাম বৃদ্ধিতে এমনিতেই নাজেহাল আমজনতা। তার উপর সুদ নির্ভর মানুষ, বিশেষ করে প্রবীণ নাগরিকরা পড়েছেন বিরাট সমস্যায়। প্রশ্ন উঠছে, কোন কারণে আটকে যাচ্ছে আমানতের সুদ বৃদ্ধি?
দাম কমাতে পদক্ষেপ করতে হবে কেন্দ্রকেই
দেশে মূল্যবৃদ্ধির জন্য প্রধানত দায়ী কেন্দ্রই। মূল যে কারণগুলিতে এ দেশে দাম বাড়ছে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান বিষয় হলো পেট্রোল ডিজেল রান্নার গ্যাসের দাম বাড়া। জ্বালানিতে ভরতুকি প্রায় তুলেই দিয়েছে কেন্দ্র। ডিজেলের দাম বাড়ায় বেড়েছে পরিবহণের খরচ, সেই চাপটা পড়ছে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।
কিছু আগেই প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম দারুণ ভাবে বাড়িয়েছে কেন্দ্র। বারবার রেপো রেট বেড়ে যাওয়ায় ঋণের খরচ বেড়েছে, বেড়েছে উৎপাদনের খরচ। সেই চাপও এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপরে।
ডলারের তুলনায় টাকার দাম ক্রমাগত পড়ে যাওয়ায় খরচ বাড়ছে আমদানির। সে কারণেও বাড়ছে জিনিসের দাম।
এরকম আরও নানা দিক তুলে ধরা যায়। এসবই কেন্দ্রের বিষয়। এছাড়া রয়েছে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি, যার ফলে জোগান শৃঙ্খলে চাপ পড়ছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নানা অসুবিধার সৃছ্টি হয়েছে।

রাজ্যগুলির কিছুই করণীয় নেই, তা অবশ্য নয়। কালোবাজারি, মজুতদারি রুখতে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সরকার নিয়ন্ত্রিত দামে কিছুদিন সবজি সহ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রির ব্যবস্থা করলে দাম কমতে পারে। অতীতে এমন পদক্ষেপ বারবার এ রাজ্যে নেওয়া হয়েছে। সুফল বাংলা-র স্টলে পাওয়া যায় সবজি সহ কৃষিজাত ভোগ্যপণ্যও। আশা করা যায়, এবার বড় আকারে এমন আরও পদক্ষেপ দেখা যাবে রাজ্যস্তরেও।
তবে কেন্দ্রকেই এগিয়ে আসতে হবে, কেননা সেটাই মূল ব্যাপার। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুনে দেশের জিডিপি বৃদ্ধি ১৩.৫ শতাংশ। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অনুমান ছিল, এই বৃদ্ধি হবে ১৬.২ শতাংশ হারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই পূর্বাভাস এভাবে ব্যর্থ হওয়ায় সারা বছরের পূর্বাভাসও সংকটে পড়েছে। জিডিপি-র সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায়, দেশে সামগ্রিক উৎপাদন কী হারে বাড়ছে বা কমছে। এক বছর আগের সময়পর্বের সঙ্গে তুলনা করে এই বৃদ্ধির অঙ্ক ঠিক করা হয়। গত বছর, অর্থাৎ ২০২১ সালের এই তিন মাসে উৎপাদন নীচু স্তরে ছিল, তখনও কোভিড লকডাউনের জের চলেছে। তখনই দেশে বৃদ্ধি হয়েছিল ২০.১ শতাংশ হারে। সেটা আবার হিসেব করা হয়েছিল ২০২০ সালের ওই তিন মাসের হিসেবে, যখন ভারতের জাতীয় উৎপাদন ২৩.৮ শতাংশ সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। তলানিতে থাকা ভিতের ওপর চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মাত্র ১৩.৫ শতাংশ বৃদ্ধি যথেষ্ট চিন্তার। বোঝাই যাচ্ছে, কেন দেশে কর্মহীনতা আকাশ ছুঁয়েছে। এই তো প্রতিবাদের সময়। কংগ্রেসের ভারত জোড়ো যাত্রা কী পারবে মানুষের মুখে প্রতিবাদের ভাষা জোগাতে?