মেহেরুন্নিসার স্বামী ছিলেন আলি কুলী খাঁ। আলি কুলী ছিলেন বর্ধমানের জায়গিরদার। অবশ্য বর্ধমান এর নাম তখন শরিফাবাদ। ভারতে মুঘল শাসন চলছে। দিল্লির মসনদে সদ্য বসেছেন শাহজাদা সেলিম, এখন তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীর। সম্রাটের অসংখ্য জায়গীরদারের একজন মাত্র আলি কুলী! অথচ সম্রাট জাহাঙ্গীর এর একমাত্র শত্রু যেন সামান্য জায়গীরদার ওই আলি কুলী। সম্রাটের নির্দেশ গেল বাংলার সুবেদার কুতুবউদ্দিন-এর কাছে—নিকেশ করো অবাধ্য জায়গীরকে। কেন? না বাদশাহি নজরানা না দেওয়া, হিসেবের গড়মিল এবং এমন নানা অভিযোগ। আড়ালে রইল অন্য অভিসন্ধি।

বর্ধমানের আলমগঞ্জ-এর পীর বাহারাম-এর মাজার
কিন্তু একজন জায়গীরদার কে শাস্তি দিতে এত হাই-প্রোফাইল তোড়জোড় কেন? ইতিহাসের পরতে পরতে থাকে নানা কাহিনী, উপ-কাহিনী। ইতিহাসের বড় ঘটনায় যা স্থান পায়না। অথচ বড় ঘটনার পেছনে থাকে ছোট ছোট ঘটনার মিশেল। যেমন এই আলি কুলী খাঁর মত সাধারনের কথা।

তখনকার শরিফাবাদ, আজকের বর্ধমানের আলমগঞ্জ-এর পীর বাহারাম-এর মাজারে শায়িত রয়েছে আলি কুলী খাঁ ও কুতুবউদ্দিন-এর সমাধি। পাশাপাশি দুই প্রতিদ্বন্দ্বী যেন একে অপরকে বলছে— আমরা কেউ কারো শত্রু নই, বাদশাহি অহমিকার শিকার আমরা। এসো, আল্লা রসুলের কাছে আশ্রয় নিই।

আলি কুলী খাঁ অপরিচিত হলেও, শের আফগানের কথা আমরা অনেকেই জানি। যাত্রা পালার দৌলতে গ্রাম বাংলায় শের আফগান পরিচিত এক নায়ক চরিত্র। অসহায় প্রেমিক, বিবি মেহেরুন্নিসার প্রেম ও ভালবাসাকে ইজ্জত দিতে গিয়ে যিনি ভারতের সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতেও পিছপা হননি। সম্রাটের লালসা থেকে মেহেরুন্নিসাকে রক্ষা করতে যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, বশ্যতা মেনে বিবিকে সম্রাটের হাতে তুলে দেননি শের আফগান। আলি কুলী খাঁ’ই ছিলেন শের আফগান।

পারস্যে জন্মেছিলেন আলি কুলী। তখনকার আদত অনুযায়ী আলি কুলী ভাগ্যান্বেষনে চলে আসেন মূলতান। সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী আলি কুলী সহজেই চাকরি পান মুঘল সৈন্যবাহিনীতে। এরপর লাহোরে চাকরি করতে এসে নজরে পড়েন সম্রাট আকবরের। আকবর-এর স্নেহে সম্রাটের উত্তরাধিকারী শাহজাদা সেলিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় আলি কুলীর। একদিন শিকারে গিয়ে বাঘের মুখ থেকে শাহজাদা সেলিমকে রক্ষা করেন আলি কুলী। সেই থেকে তার নাম হয় শের আফগান। পারসিক ভাষায় আফগান শব্দের অর্থ রক্ষাকারী। অর্থাৎ যুবরাজ কে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন বলেই সম্রাট আকবর তাঁকে এই শিরোপা দেন।

ইতিমধ্যে দুই বন্ধুর জীবনে এল এক নারী—মেহেরুন্নিসা (১৫৭৭-১৬৪৫)। মেহেরুন্নিসার পিতা মির্জা গিয়াস বেগ ছিলেন আকবরের দরবারের দেওয়ান। অভিজাত মহলে নিত্য আসা যাওয়া ছিল তার। আর মেহেরুন্নিসার ছিল অপার সৌন্দর্য, শরীরি আকর্ষণ। তার বহ্নিশিখার মত আবেদন টলিয়ে দেয় যুবরাজ সেলিমের মন। খানদানে মেলেনা বলে আকবর তড়িঘড়ি আলি কুলীর সঙ্গে মেহেরুন্নিসার বিবাহ দিতে উদ্যোগ নেন। বিয়ের পর যুবরাজ সেলিমের থেকে মেহেরুন্নিসাকে দূরে রাখার জন্য আকবর আলি কুলী-কে দিল্লী থেকে হাজার মাইল দূরের পথ বাংলার প্রত্যন্ত এলাকা শরিফাবাদের জায়গিরদার করে পাঠান। দূরে নির্বাসিত হলেও সেলিমের মন থেকে মুছে যাননি মেহেরুন্নিসা।

এর পরের কাহিনী আমাদের জানা। এক করুণ পরিনতি হয় শের আফগানের। সম্রাট জাহাঙ্গীর এর সৎভাই কুতুবউদ্দিন-এর সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ দেন শের আফগান। মেহেরুন্নিসাকে দিল্লী নিয়ে গিয়ে মুঘল হারেমে রাখা হয়। ১৬১১ সালে জাহাঙ্গীর মেহেরুন্নিসাকে বিবাহ করেন। এইভাবে ইতিহাসের এক পর্বের অবসান ঘটে। শুরু হয় অন্য এক ইতিহাস। নূরমহল (প্রাসাদের আলো) থেকে নূরজাহান (জগতের আলো) নামে পরিচিতি পেলেও মেহেরুন্নিসা কী ভুলতে পেরেছিলেন তার স্বামী শের আফগানকে? বোধহয় নয়।কারণ দিল্লীর পরবর্তী ঘটনাক্রম দেখায় মেহেরুন্নিসা তার বাবা মির্জা গিয়াস বেগ, ভাই আসফ খাঁ, জাহাঙ্গিরের পুত্র শাহজাদা খুররম কে নিয়ে একটি ‘চক্র’ বা দল গঠন করেন। নূরজাহান চক্র নামে পরিচিত এই দল জাহাঙ্গীর কে তাদের হাতের পুতুলে পরিনত করেছিল।
শের আফগান শরিফাবাদের আলমগঞ্জে অবহেলায়, অনাদরে কবরে শায়িত। পাশাপাশি কবরে কুতুবউদ্দিন ও শের আফগান। কোথাও কি হেরে গিয়েও ভালবাসার যুদ্ধে শের আফগান একসময়কার বন্ধু, সম্রাট জাহাঙ্গীর কে হারিয়ে দিলেন!

এখন শরিফাবাদ বললে অনেকেই অবাক হন। কিন্তু বর্ধমানের আলমগঞ্জ চিনলেও সেখানে শের আফগানের সমাধি কোথায় বললে অনেকে অবাক চোখে তাকান। কে তিনি, কেন তার খোঁজ দরকার ইত্যাদি। ইতিহাস বিস্মৃত জাতি আমরা হয়তো অন্য কিছু সন্দেহজনক ব্যাপার ভেবে নি। তাই শের আফগানের সমাধি খুঁজে নিতে সামান্য অসুবিধা হতেই পারে। কার্জন গেট থেকে বি সি রোড ধরে রাজবাটী গিয়ে পীর বাহারাম এর মাজার বললেই আপনি পৌঁছে যাবেন শের আফগানের সমাধিতে। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের বাইপাস দিয়েও ঢুকে পড়া যায় পীর বাহারামের মাজারে। শান্ত, নির্জন পরিবেশের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে কখন হয়তো আমরা চলে যেতে পারি ইতিহাসের সেই ছোট ঘটনায়, এক নারী যার কেন্দ্রে, শাহি লালসার বিরুদ্ধে চোখের জল আর তীব্র ঘৃনা যার জীবনকে তাড়িত করেছিল। হয়তো দিল্লীর উৎকট ঐশ্বর্য থেকে শরিফাবাদে ফেলে আসা স্বামীর সমাধি তাকে বেশী কষ্ট দিত, কে আর মনে রেখেছে সেসব৷