“নবীন বাগ্দী শীতকালে গুড় প্রস্তুত করিবার জন্য শতাধিক খেজুরগাছ ‘কাটিত’। গৃহস্থ প্রত্যেক গাছের খাজানা স্বরূপ দুই সের খেজুর গুড় পাইত। সেই দুই সের গুড় দিয়া সে কার্ত্তিক মাস হইতে ফাল্গুনের শেষ পর্যন্ত রস লইত। তিন দিন রস গ্রহণের পর তিন দিন গাছকে বিশ্রাম বা ‘জিরেন’ দেওয়া হইত। চতুর্থ দিন যে রস সঞ্চিত হইত, তাহাই ‘জিরেন কাটে’র রস। সেই রস অতি মধুর। খেজুরের চারা-গাছের রস অপেক্ষা পরিণত বয়স্ক বৃক্ষের রস অনেক অধিক মিষ্ট; তাহার পরিমাণও অধিক হইত। কোন কোন সতেজ গাছে এক রাত্রিতে প্রায় এক ঠিলি রস সঞ্চিত হইত। নবীন শীতকালে বেলা প্রায় তিনটার সময় গাছ বাঁধিতে আসিত। একগাছা মোটা দড়ি মালার মত তাহার দুই কাঁধে ঝুলিত; মনে হইত, তাহার উভয় স্কন্ধ বেষ্টন করিয়া একটা ‘দাঁড়াস’ (ঢোঁড়া) সাপ ঝুলিতেছে। সে মালকোঁচা আঁটিয়া কাপড় পরিত এবং অর্দ্ধহস্ত বিস্তৃত লোমাবৃত ছাগচৰ্ম্ম কোমর-বন্ধের মত কোমরে জড়াইত: তাহাতে আবদ্ধ চৰ্ম্মনিৰ্ম্মিত একটি থলি তাহার পশ্চাতে ঝুলিত। সেই থলির ভিতর বক্রমুখ তীক্ষ্ণধার কাটারী ও দুই চারিটি কঞ্চির নলি থাকিত। কঞ্চি চিরিয়া পাঁচ ছয় ইঞ্চি দীর্ঘ এক একটি নলি প্রস্তুত করা হইত। উক্ত থলির সঙ্গে কাষ্ঠনিৰ্ম্মিত একটা বাঁকা ‘হুক’ থাকিত নবীন খেজুরগাছে যে বিলি বাঁধিত, সেই বিলির গলার দড়ি সেই হুকে বাধাইয়া সে গাছে উঠিত কিন্তু গাছে উঠিবার সময় দুই হাত লম্বা একটি বংশদণ্ড তৎসংলগ্ন দীর্ঘরজ্জু তাহার সঙ্গে থাকিত। তাহার পর কাঁধে যে মোটা দড়ি থকিত, তাহা কাঁধে লইয়াই সে গাছে উঠিত; তাহার পর দুই হাত দীর্ঘ বংশদণ্ডটি গাছের সঙ্গে আড় করিয়া বাঁধিয়া তাহার দুইপাশে দুই পা রাখিয়া দাঁড়াইত, এবং সেই মোটা দড়ি দিয়া গাছের সঙ্গে শরীর আবদ্ধ করিত; সেই সময় সে পশ্চাতে ঈষৎ হেলিয়া পড়িত ও সেই ভাবে দাঁড়াইয়া ঠোঙ্গা হইতে কাটারী বাহির করিয়া গাছের হুক অপসারিত করিত। কিছুকাল চাঁচিবার পর স্থূল ‘চোঁচা’ অপসারিত হইলে ক্ষতস্থানে বিন্দু বিন্দু রস দেখা যাইত। তখন সে বাঁশের নলিটি ঢালু করিয়া তাহাতে বিধাইয়া দিত। অতঃপর চামড়ার ঠোঙ্গাসংলগ্ন আংটা হইতে মাটীর ঠিলি খুলিয়া লইয়া রজ্জুদ্বারা তাহা নলির নীচে ঝুলাইয়া দিত। নলি দিয়া রস গড়াইয়া বিন্দু বিন্দু করিয়া তাহা সারারাত্রি সেই ঠিলিতে সঞ্চিত হইত। ঠিলিটি নলির মুখ হইতে কোন কারণে সরিয়া যাইতে পারে, এই আশঙ্কায় সে খেজুর গাছের পশ্চাদ্বর্তী শাখা টানিয়া সম্মুখে আনিয়া তাহা চিড়িয়া তদ্দ্বারা ঠিলির গলা গাছের সঙ্গে বাঁধিয়া রাখিত। তাহার ঠোঙ্গায় কখন কখন চাকা চাকা করিয়া কাটা মানকচু থকিত। সে তাহা কোন কোন ঠিলির ভিতর ফেলিয়া রাখিত। সন্ধ্যার পর গ্রামের দুষ্ট ছেলেরা কোন খেজুর গাছে উঠিয়া রস চুরি করিত; কিন্তু ঠিলিতে মানকচু থাকিলে কেহ সেই রস চুরি করিত না। মানকচু-সিক্ত রস পানের অযোগ্য। তাহা পান করিলে গলা কুকুট্ করে।
নবীন রাত্রিশেষে অন্ধকার থাকিতেই খেজুর গাছ হইতে ঠিলি খুলিয়া লইয়া যাইত। একখানি বাঁশের বাঁকের দুই ধারে রসপূর্ণ ঠিলিগুলি ঝুলাইয়া লইয়া সে তাহার ‘বাইনে’ উপস্থিত হইত। সে ঠিলি সংগ্রহের জন্য গাছে উঠিবার সময় তাহার ‘ইউনিফর্ম’ সঙ্গে রাখিত না কেবল গাছ কাটিবার বা চেঁচিবার সময় ঐ সকল সরঞ্জাম সঙ্গে রাখিবার প্রয়োজন হইত। সে বাঁকের দুই দিকে দশ বারোটা ঠিলি ঝুলাইয়া লইতে পারিত। রস-সংগ্রহের জন্য এই সময় তাহাকে দুই একটি এপ্রেন্টিস বা সহকারী রাখিতে হইত তাহরাও ঠিলি পাড়িয়া বাইনে লইয়া আসিত, পারিশ্রমিক স্বরূপ কিছু কিছু গুড় পাইত। তাহারা নানাভাবে নবীনকে সাহায্য করিত।
আমরা তখন বালকমাত্র নবীনের বাইনের টাটকা গুড়ের লোভ সংবরণ করিতে পারিতাম না। বেলা আটটা না বাজিতেই আমরা পাড়ার একপাল ছেলে শীতবস্ত্রে সব্বাঙ্গ আচ্ছাদিত করিয়া নবীনের বাইনে উপস্থিত হইতাম। তখনও সুলভ মূল্যের ‘ব্যাপার’ বা আলোয়ানের প্রচলন হয় নাই; ফরাসী ছিটের ‘দোলাই’ ভিন্ন আমাদের অন্য কোন শীতবস্ত্র ছিল না।

নবীন একখানি জীর্ণ অনুচ্চ খড়ের ঘরে বাস করিত। তাহার ঘরে মাটীর প্রাচীর ছিল না।
প্রাচীরের পরিবর্তে চারিদিকে কঞ্চির বেড়া, তাহার উপর গোবর-মিশ্রিত মাটীর প্রলেপ। এই কুটীরের এক পাশের চাল-সংলগ্ন একখানি পর-চালা। সেই ‘পরচালা’খানি তাহার ‘ঢেঁকিশালা’ বা ‘ঢিসকেল’। সে চাষী গৃহস্থ দুই এক বিঘা জমী চষিত, তাহাতে যে ধান পাইত, তাহা হইতে চাউল প্রস্তুত করিবার জন্য তাহার বাড়ীতে ঢেঁকি না রাখিলে চলিত না।। তাহার আঙ্গিনাখানি ধূলাবর্জিত পরিচ্ছন্ন। তাহারই এক প্রান্তে উনন, সেই উননে ধান সিদ্ধ হইত: রন্ধনের কাজও চলিত। আঙ্গিনার এক পাশে বাঁশের খুঁটিতে শিমের ‘টাল’। তাহার শিমগাছে প্রচুর শিম ফলিত। অদূরে একটি পেঁপে গাছ, কয়েকটা লঙ্কা-মরিচের গাছ, এক ঝাড় বাঁশ, একটা কাঁটালগাছ। তাহার বাড়ীর চারিদিকে জামাল-কোটার বেড়া। সেই বেড়া ঘেঁসিয়া তাহার গুড়ের ‘বাইন’।
গুড় প্রস্তুতের স্থানটির নাম বাইন। একটি বড় গর্ত খুঁড়িয়া রস জ্বাল দেওয়ার জন্য সেই ‘বাইনে’ উনন করা হইয়াছিল। বাইনের চারিদিকে বাঁশের খুঁটি, তাহার উপর খর্জুর-পত্রের আচ্ছাদন। উননের একপাশে রসের ঠিলিগুলি শ্রেণীবদ্ধভাবে সাজাইয়া রাখা হইত। নবীন উননে একখানি বৃহৎ মাটীর ‘খোলা’ চাপাইয়া তাহাতে সকল ঠিলির রস ঢালিয়া দিত তাহার পর শুষ্ক আস্যাওড়া, ভাঁট, কালকাশিন্দা প্রভৃতি আগাছা দ্বারা রস জ্বাল দিত। এই গুল্মগুলি সে নানা স্থান হইতে কাটিয়া আনিয়া শুকাইয়া বাইনে সঞ্চিত রাখিত। রস অগ্নির উত্তাপে ঈষৎ ঘন ও লোহিতাভ হইলে তাহাকে ‘তাতরসা’ বলা হইত। পল্লীরমণীদের অনেকে ঘটী আনিয়া নবীনের নিকট হইতে সেই রস চাহিয়া লইয়া যাইত। উহা দ্বারা উৎকৃষ্ট পায়স হয়। শীতকালে অনেকেই রসের পায়স রাঁধিত।
দুই ঘণ্টার মধ্যে খোলার রস ঘন গুড়ে পরিণত হইত। গুড় ঘন হইলে নবীন খোলা নামাইয়া তাহার ভিতর গুড়ের ‘বীজ’ দিত। ঐ ‘বীজ’ শুষ্ক গুড় ভিন্ন অনা কিছুই নহে।
খেজুর-শাখার দণ্ড দ্বারা সেই শুষ্ক গুড় খোলার গায়ে মাড়িয়া খোলার গুড়ের সহিত তাহা মিশ্রিত করিলে খোলার গুড় বেশ ঘন হইত। তখন নবীন ঠিলিগুলির মুখ একখানি ময়লা কাপড় দিয়া ঢাকিয়া এক এক হাতা গুড় ঠিলির মুখের কাপড়ের উপরে ঢালিয়া দিত, কয়েক মিনিটের মধ্যে তাহা জমিয়া শক্ত হইত। বাতাসার আকার-বিশিষ্ট সেই গুড় ‘সরাগুড়’ বা ‘গুড়মুচি’ নামে প্রসিদ্ধ। নবীনের গুড় জ্বাল দেওয়া শেষ হইলে সে আমাদের পাতা আনিতে বলিত। আমরা জামাল-কোটার পাতা সংগ্রহ করিয়া তাহাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইতাম। সে প্রত্যেক পাতায় অল্প-পরিমাণ গুড় দান করিত। আমরা পরম তৃপ্তির সহিত তাহা লেহন করিতে করিতে বাড়ী ফিরিতাম। নবীন তাহার ‘সরাগুড়’গুলি ‘কুলোয়’ বা ডালায় তুলিয়া রাখিয়া রস সংগ্রহের ঠিলিগুলি সেই উননের চারিদিকে উপুড় করিয়া সাজাইয়া রাখিত। ঠিলিগুলি এইভাবে তাতাইয়া লইলে সঞ্চিত রস ভাল থকে। নবীন সরাগুড়গুলি কুলোয় সাজাইয়া লইয়া বাজারে বিক্রয় করিতে যাইত। প্রত্যেকখানির মূল্য এক পয়সা। তাহার গুড় ফরসা হইত, স্বাদও ভাল হইত। এ জন্য তাহার ‘সরাগুড়’গুলি শীঘ্রই বিক্রয় হইত। কোন কোন ‘গাছী’ গুড় জ্বাল দেওয়ার সময় তাহাতে সোডা মিশাইয়া গুড় ফরসা করিত: কিন্তু তাহাতে গুড়ের স্বাদ বিকৃত হইত। নবীন গুড়ে সোডা মিশাইত না। কখন কখন মশলা-চূর্ণ মিশাইত।”
দীনেন্দ্রকুমার রায়-এর ‘সেকালের স্মৃতি’র অংশ বিশেষ