“এই নাও, তোমার ছবির নেগেটিভ আর কন্ট্রাক্ট সিট! বাড়িতে গিয়ে ট্রাঙ্কের ভেতরে গুঁজে রেখে দিও!”
— জ্যোতিষ’দা বেশ কড়া ভাবেই বলে ওঠেন!
সাদা কালো ফটোগ্রাফির স্বর্ণযুগে এই কলকাতায় কাজ করার জন্য স্টুডিও ছিল একাধিক। এদের মধ্যে শুধু হাতে গোনা তিন চারটি স্টুডিও ছিল, যারা উচ্চমানের ফিল্ম ডেভেলপ ও প্রিন্ট করতেন। বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল, রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডের চিত্রবাণী ও ভবানীপুরে রমেশ মিত্র রোডে ছিল ‘ইমেজ ফটোগ্রাফারর্স।’ যা কিনা জ্যোতিষ চক্রবর্তী বা জ্যোতিষ’দার স্টুডিও নামে বিখ্যাত ছিল।
অন্য অনেকের মতো আমার কাছেও ঐ স্থানটা ছিল, ফটোগ্রাফির ‘মক্কা’! আজও যে কিছু অল্প বিস্তর ছবি তোলার চেষ্টা করে চলেছি, তাতে জ্যোতিষ’দার বকাঝকারও কিছুটা অবদান ছিল।
সাদা কালো ছবির জন্য আমার ওখানে যাতায়াত শুরু হয়েছিল প্রায় ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে। আমার মতো হোঁচট খাওয়া পাবলিক ছাড়াও দেশ বিদেশের তাবড় আলোকচিত্রীদের আসা যাওয়া ছিল এই স্টুডিও’তে।
সাদা কালো ছবির ডেভেলপমেন্ট ও প্রিন্টের জন্য জ্যোতিষ’ দার নাম বিদেশও পৌঁছে গিয়েছিল।

এছাড়া নিজেও খুব গুণী ফটোগ্রাফার ছিলেন।
কলকাতায় থাকাকালীন, ফ্রান্সের বিখ্যাত আলোকচিত্রী ‘কাঁর্তিয়ে ব্রেঁসো’ নিজের পোট্রের্ট তোলার পারমিশন ভারতে একমাত্র এই জ্যোতিষ’দাকেই দিয়েছিলেন।
জ্যোতিষদার এই স্টুডিওতে প্রায় রোজই বিভিন্ন গুণী লোকজনের সান্ধ্য আড্ডা বসতো। সুদর্শন আভিনেতা বসন্ত চৌধুরী, ভাস্কর শর্বরী রায়চৌধুরী, কালেক্টর পরিমল রায়, উৎপলেন্দু চক্রবর্তীদের মাঝেমধ্যেই এই আড্ডায় দেখা যেত। রাশভারি চেহারা ও শৌখিন মিলিটারি গোঁফের অধিকারী জ্যোতিষ’দা এই আড্ডায় শুনতেনই বেশি। ব্ল্যাক কফি সহযোগে চলতো সেই জমজমাট আড্ডা। অবাক হয়ে শুধু দেখে যেতাম!
কয়েক বছর পরে, আমি আবার কর্মসূত্রে চলে যাই তখনকার ‘বোম্বাইতে।’ কেন জানিনা, সেই সিনেমায় দেখা “ঝক্কাস” মুম্বাইয়ের চাকচিক্য আমার আবার সহ্য হলো না!
আসলে, বাপুজি কেক আর ডের্কাস লেনের চিত্তবাবুর ঘুগনী পাউরুটিতে জীবনটাকে বেঁধে রাখলে যা হয় আর কি! কিছুদিন কাজ করার পরে, মুম্বাইয়ে ভি টি স্টেশনের কাছে সেই বিখ্যাত সংবাদসংস্থার অফিস থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
তবে ঐ অফিসেই আমি মাঝে মধ্যে ভগবানের দর্শন পেতাম — হ্যাঁ, তিনি হলেন বিখ্যাত কার্টুনিষ্ট আর. কে. লক্ষ্মণ।
১৯৯১ সাল নাগাদ ফিরে এলাম, কাঠ বেকার হয়ে।

এক সময়ে সমালোচনা ও শত অভিযোগে বিদ্ধ করা – এই কলকাতা শহরেই বুকেই! — আসক্তি আর কাকে বলে!
তবে ঠিকই করেছিলাম, ছবি যদি তুলতেই হয়, তুলবো স্বাধীন ভাবে, সেটা নিজের মতো করেই! ছাই-পাশ যাই হোক না কেন! আর সেই সময় থেকেই কলকাতার ওপরে কিছু ছবির সিরিজ তোলার ব্যামোও মাথায় চেপে বসেছিল!
কিছুদিন বাদে একটি অত্যন্ত ছোট বিজ্ঞাপন অফিসে যোগ দিলাম বিজ্ঞাপনচিত্রী হিসেবে। গণেশ এভিনিউ-র চারমাথার কাছে পুরনো একটি বিল্ডিংয়ের ৪ তলায় দুটি ঘর ভাড়া নিয়ে ছিল সেই অফিস।
ঐ সংস্থার অবস্থা ছিল অনেকটা- ‘আজ আছি কাল নেই’ টাইপের। – পয়সা কম, তবে হাতে সময় ও স্বাধীনতা ছিল। ফিল্ম কেনা, হাত খরচা আর মাঝেমধ্যে সান্ধ্য ‘বুড়ো সাধুর সঙ্গী’ হবার পয়সা উঠে আসতো। আমি ওতেই খুশি! বাড়িতে হাঁড়ি চড়তো বাবার পেনশনের ক’টা টাকায়। আর আমি এদিকে ‘কালচার’ করে ফাটিয়ে দিচ্ছি! সেই সময়ে বাড়িতে যা হাব-ভাব করতাম, অসহায় মা ভাবতো, ক’দিন বাদেই ছেলে বোধহয় টাকার বস্তা মাথায় নিয়ে ঢুকলো বলে!
এর মধ্যেই আবার অনেক দিন বাদে বাংলায় ঝিমিয়ে থাকা তৎকালীন প্রধান বিরোধী পক্ষ কংগ্রেস পার্টি কিছুটা যেন গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে! তবে সবাই নয়! কলকাতায় কংগ্রেস পার্টির ভেতর একজন যুব নেত্রীর উত্থান হতে শুরু করেছে। তাঁর নাম মমতা ব্যানার্জি। সেই নেত্রীর কিছু আন্দোলন ও তৎপরতা তৎকালীন বামফ্রন্ট তো বটেই, কংগ্রেসেরও কিছু ‘নক্ষত্র’ টাইপ নেতার কাছেও খুবই অপছন্দের ছিল। ভাত ঘুমে, কানের পাশে মশা উড়তে থাকলে যা হয় আর কি!
কিন্তু এই না’ছোড় নেত্রীর জন্যই সরকার এবং বিরোধী – এই দুটো পক্ষের মধ্যে আড়ালে থাকা ‘মিলিজুলি’টা আর আড়াল করে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না।
এই নেত্রীই ভোট ঠিকভাবে করার জন্য voter photo identity card-এর দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। সেই সময় আবার ইলেকশন কমিশনার হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন মিঃ টি এন শেষন! ইলেকশন কমিশনারের পদটি যে এতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আমরা সেটা জানতে পারলাম।

এখন তো বকলেস’এর ছড়াছড়ি!
পরবর্তী সময়ে এই যুবনেত্রী মমতা ব্যানার্জির হাত ধরে সেই আন্দোলন চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সেই voter photo identity card-এর দাবিতে, উনি ১৯৯৩ সালের ২১ শে জুলাই সরকারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ভবন রাইটার্স বিল্ডিং অবরোধের ডাক দিলেন। সেই সময়ে কংগ্রেস দলের অল্প বয়সী সমর্থকেরা আবার মমতা ব্যানার্জির দিকেই ঝুঁকে ছিলেন।
১৯৯৩ সালের ২১ শে জুলাই, সকালে বাড়ি থেকে কাজে বের হবার আগেই ব্যাগে ক্যামেরাটা ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম। যদি কিছু লোকজন, ভীড়ের ছবি তুলতে পারি – নিজের সংগ্রহে থাকবে – এই ভেবে।
লোকাল ট্রেন চেপে হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ট্রেনেও প্রচন্ড ভীড়। ট্রেন থেকে নামার পরে দেখলাম যুব কংগ্রেসের ঝান্ডা হাতে নিয়ে স্টেশন চত্বরে লোকজন গিজগিজ করছে। তখন বেলা ১০ টার মতো হবে। হাওড়ার ব্রীজ-এও গাড়ি ঘোড়া চলাচল সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ! শুধু কালো মাথার স্রোত! আমিও উপায় না দেখে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে হেঁটেই অফিসের দিকে পা বাড়ালাম।
পুরো রাস্তাটা হেঁটে গলদঘর্ম হয়ে কর্মক্ষেত্রে পৌঁছলাম। – দেখলাম লোকজন কাজকর্ম ফেলে রেখে চারতলার জানলা দিয়ে নীচের রাস্তায় উঁকিঝুঁকি মারতেই ব্যস্ত। বুঝলাম আজ কাজকর্ম মোটামুটি লাটে!
আমিও দেখলাম শ্যামবাজারের দিক থেকে বিশাল মিছিল খাদি ভবনের পাশ দিয়ে ধর্মতলার দিকে এগিয়ে চলেছে। বেশ কিছুটা সময় যেতেই “লাঠি চার্জ হচ্ছে, কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ছে, বোম মেরেছে,” – এমন বিভিন্ন ধরণের খবর ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই সময়ে তো আর মুঠোফোনের যুগ ছিল না। তবুও সত্যি-মিথ্যে খবর লোকমুখে যেন হাওয়ার থেকেও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়তো! হটাৎই দেখলাম, ধর্মতলার দিক থেকে পুলিশের তাড়া খেয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে লোকজন দিগভ্রান্ত হয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে। দু-একটা কাঁদানে গ্যাসের সেল ফাটানোর শব্দও কানে ভেসে এলো। এর মধ্যেই ওপর থেকে আমরা দেখতে পেলাম, একটা টানা রিক্সার মধ্যে একটি ছেলের মাথা চেপে ধরে বসে আছে আরেক জন। সেই ছেলেটির সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। রিক্সাওয়ালা জোরে দৌড়ে চলেছে মেডিকেল কলেজের দিকে। — এবার আমি আর পারলাম না। কিছুটা উত্তেজনা নিয়েই অফিসে বলে বেড়িয়ে এলাম। এমনিতেই আজকে কাজকর্মের দফারফা!

হাঁটা লাগালাম ধর্মতলার দিকে। ওখানেও একটা বড় জনসমাগম হয়েছে। খেলার মাঠে অনেক সময়, চার-ছয় বা গোল হলে, দূর থেকে একরকম সমবেত আওয়াজ ভেসে আসে। মাঝেমধ্যে সেই রকমেরই শব্দ যেন শুনতে পাচ্ছিলাম মেয়ো রোড আর ধর্মতলার দিক থেকে। যত এগোতে থাকি চোখে পড়ে চারদিকে লোকজনের লক্ষ্যহীন ছোটাছুটি। রাস্তার দোকানের সাটার সব ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের তাড়া, টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া, চোখ জ্বালা, হোঁচট খেয়ে রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়া – সে এক লন্ডভন্ড কারবার। সে সব থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে, মেট্রো সিনেমা হলের পাশ দিয়ে ধর্মতলার বাস গুমটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
দু-চারজন প্রেস ফটোগ্রাফারও ছিলেন ওখানে। কাঁদানেগ্যাসে চোখ জ্বলছে সবারই। একজন সরবৎ বিক্রেতা বালতি করে জল পৌঁছে দিলেন। পুলিশ ও আমরা বাকী সবাই রুমাল ভিজিয়ে চোখে চাপা দিয়েও ঐ যন্ত্রণা সহ্য করা যাচ্ছে না যেন! জুটেও যায়! এর মধ্যেই সোডার বোতল ছোঁড়া, চিৎকার, ইট বৃষ্টি, টায়ার পোড়ানো – শুরু হয়ে গিয়েছে। একজন পুলিশকর্মীর মাথাও ফেটে গেল! চারদিকেই এই হই-হল্লাগুলো একটা ব্যাপক আকার ধারন করে চলেছে। কান পাতা দায়! এর মধ্যেই হটাৎই, দুম দুম করে গুলির আওয়াজ শোনা গেল। নিমেষে সব চিৎকার, হল্লা – স্তব্ধ! মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তারপরে শতগুণ বেশি জোরে চিৎকার, আক্ষেপ শুরু হয়ে গেল, – এই গুলি চালাচ্ছে, গুলি চালাচ্ছে! পাশে দাঁড়ানো সাংবাদিকদের মধ্যে এক জন বলে ওঠেন, ‘এই রে, পুলিশ ফায়ারিং করা শুরু করে দিয়েছে! চলুন, চলুন এখানে থাকাটা ঠিক হবে না।’ ওর কথাটা শেষ হবার আগেই আবার সেই দুম দুম – গুলির শব্দ। আগের চেয়ে কিছুটা বেশিই। সহসা চোখে পড়ল খানিক দূরে দাঁড়ানো পুলিশদের একটা গ্রুপ থেকে আবার গুলি চালানো শুরু হয়ে গেল। হটাৎই চিৎকার শুনতে পেলাম – “এই বডি পড়েছে! বডি পড়েছে!” পিয়ারলেস হোটেলের কাছে, কিছুটা দূরের জটলার দিকে তাকিয়ে আমি হতভম্ব হয়ে যাই! একজন যুবক মাটিতে পড়ে ছটফট করছে, আর পরমূহুর্তেই একটা গুলির শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই সাদা প্যান্ট শার্ট পরা একটি যুবক, গাছ থেকে আম পড়ার মতো, ঝুপ করে রাস্তায় লুটিয়ে পড়লো! দেহটা কিছুটা নড়েই স্থির হয়ে গেল। দেখলাম যুবকের প্রাণহীন দেহের বুকের জামা ভেদ করে, রক্তের ধারা বেরিয়ে আসছে। চারপাশ থেকে হা হুতাশ ভেসে আসতে থাকল। এর মধ্যেই আহত যুবকটিকে একদল ছেলে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে ভীড়ের মধ্যে ভেতরে ঢুকে গেল।

এই গুলি চালাবার জন্য দেখতে পেলাম, পুলিশদের নিজেদের মধ্যেই ঝামেলা, তর্কাতর্কি শুরু হয়ে গেল।
এবার দেখলাম সেই পড়ে থাকা যুবকের মৃতদেহ পুলিশ টেনে নিয়ে এসে একটা ভ্যানের দরজার কাছে রাখল।
সব মিলিয়ে প্রায় ২ ঘন্টার মতো ওখানে ছিলাম। – এক রকম ভেবে এসেছিলাম! আর চোখের সামনে যে সব দৃশ্যের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা ছিল আমার কল্পনারও অতীত। হ্যাঁ, ছবি কিছু তুলেছিলাম বটে। তবে কোনও রকমের চিন্তা ভাবনা ছাড়াই! কি ফোকাস, কি কম্পোজিশন! – কোনও কিছুই তখন মাথায় নেই। আর হবেই বা কী ভাবে! আমি নিজেও তো ঐ চরম উত্তেজনায় প্রায় স্থবির হয়ে গিয়েছিলাম!
এবার মনে হল, এই পরিস্থিতি থেকে কোনরকমে বেড়িয়ে আসতে হবে। শরীর’টাও ভালো লাগছে না, গা’টাও গোলাতে শুরু করে দিয়েছে। এর মধ্যেই একজন ফটোগ্রাফার তো ঐ গুলিবিদ্ধ যুবকের দেহ দেখে বমি করাই শুরু করে দিলেন। ওঁকে ধরাধরি করে পাশে বসিয়ে গলায়, চোখে-মুখে জল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। রাস্তার হকার ও দু-একজন পুলিশের সাহায্যেই সেটা হলো।
এর মধ্যেই ভীড় পাতলা হতে শুরু করে দিয়ছে। আমিও হাঁটতে থাকলাম পার্ক স্ট্রিটের দিকে। চোখে পড়ল মেট্রো সিনেমা হলের কাছ থেকে ওদিকে গ্র্যান্ড হোটেল পর্যন্ত যেন এক প্রকার ঝড় বয়ে যাবার চিহ্ন। এদিক সেদিকে জ্বলছে টায়ার, মোটর বাইক, গাড়ি কোথাও বা কাঠের স্টল। সারা রাস্তায় ছড়িয়ে আছে বোতল ভাঙ্গা, ইট পাথরের টুকরো। সে এক লণ্ডভণ্ড অবস্থা। এতোদিনের চেনা রাজপথ আজ বড়ই অচেনা!
রাস্তার ওপরে ইতিউতি লোকজনের জটলা। যানবাহনের কোনও দেখা নেই – সব উধাও। এদিক-সেদিক থেকে আরো অনেকের মৃত্যুর সংবাদ ভেসে আসতে থাকে। গলাটা ক্রমশঃ যেন শুকিয়ে আসছে। ঠিক করলাম, হেঁটেই ভবানীপুরে জ্যোতিষ’দার স্টুডিতে যাবো। ওখানে কিছুটা সময়ও কাটানো যাবে। আর আজকের তোলা ফিল্মের রোলটা ডেভেলপ করা আর কন্ট্রাক্ট সিট’টা করতে দেওয়া যাবে। পরে একদিন এসে নিয়ে যাবো!
যেতে যেতে ঐ গুলিবিদ্ধ যুবকটির মুখটা বার বার ভেসে উঠতে লাগল। ওঁর বাড়ির মা, বাবা, পরিজন তো জানলেনও না – আজ সন্তানের কী চরম পরিণতি হয়েছে!
বিকেল পড়ে এসেছে। ডার্করুম থেকে বেরিয়ে আমাকে দেখেই জ্যোতিষদা বলে উঠলেন, ‘একি, এরকম ঝোড়ো কাকের মতো চেহারা কেন?’ সব শুনে, একপ্রকার ধমক দিয়ে উঠলেন- ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে, ঐ সব ঝামেলায় কেউ যায়? প্রেসের লোকদের উপায় নেই, যেতেই হবে! তাই বলে তুমি?’
ওনার দুই সহকারী, ভানু ও শ্যামদাও ছিলেন তখন। ওঁরাও এটা সেটা প্রশ্ন করতে লাগলেন। ওখান থেকে বেরিয়ে ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হলো।
পরের দিন সংবাদপত্রে সবিস্তারে এই খবর প্রকাশিত হলো। অনেক লোকজন আহত হয়েছে। আর গুলিতে মৃত ১৩ জন। আমার দেখা সেই হতভাগ্য যুবকটিও এর মধ্যে একজন।
দু-তিন দিন পরে জ্যোতিষ’দার স্টুডিওতে গেলাম। স্টুডিওর কাঁচের দরজা ঠেলে ঢোকবার পরেই দেখলাম সারা পশ্চিমবঙ্গের মতো এখানকার আড্ডাতেও সেই আগের দিনের পুলিশের গুলিতে মৃত্যু নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। – পক্ষে আর বিপক্ষে!
জ্যোতিষদা ডার্করুম থেকে বেরিয়ে এসে বলে ওঠেন ‘ও তুমি এসেছো!’ আমি বলে উঠি ‘জ্যোতিষদা ছবিগুলো কিছু কী এসেছে, ফোকাস ঠিক ছিল?’ উনি আমার কথার কোন উত্তরই দিলেন না। একদম ঠান্ডা! হাত মুছে ওঁনার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসলেন। কিছুটা ঝুঁকে কাউন্টারের ড্রয়ার থেকে কয়েকটা খাম বের করে বাছাই করতে লাগলেন। আমার অস্বস্তি হতে লাগল। উনি কোন কথাই বলছেন না! তাহলে যা ভেবেছিলাম সেটাই হয়েছে – কোন ছবিই ঠিক আসেনি!
এবার আমার নাম লেখা নির্দিষ্ট ব্রাউন রঙের খামটি বার করলেন। কাউন্টারের ওপরে খামটি রেখে দিয়ে বলেন, “এই নাও, তোমার ছবির নেগেটিভ আর কন্ট্রাক্ট সিট! বাড়িতে গিয়ে ট্রাঙ্কের ভেতরে গুঁজে রেখে দিও!”

জ্যোতিষ ‘দা এটাও বলেন, ছবি সব ঠিকই আছে।
ছবিগুলো দেখে নিয়ে আমিও জ্যোতিষদার কথায় সায় দিলাম। পাশ থেকে সহকারী শ্যামদা বলে ওঠেন, ‘আরে বিজয়, কোনও পেপার হাউজে দিয়ে দাও না ছবিগুলো, ভালোই তো এসেছে!’ জ্যোতিষদা শ্যামদার দিকে কিছুটা বিরক্তির সঙ্গে তাকিয়ে বলে ওঠেন, ‘তা পেপারে এই ছবি ছাপা হলে, ওর কী উদ্ধার হবে শুনি? আর ওর নাম দিয়ে যদি এই ছবি ছাপা হয়, ওকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে ভেবেছিস? এই বুদ্ধি নিয়ে তুই এখানে কাজ করিস?’
এর পরে আমার দিকে তাকিয়ে উনি বলেন ‘কোথাও এই ছবি দেবে না, বলে দিলাম! ভবিষ্যতে যদি কখন সময় সুযোগ আসে, তখন দিতে পারো। একটা ডকুমেন্টস হয়ে থাকবে!’
আড্ডায় বসে থাকা বাকিরাও জ্যোতিষদার কথায় সায় দিল, না না, এসব ছবি এখন ছাপার কোন দরকার নেই! কেন নিজের বিপদ ডেকে আনবে শুধু শুধু। জ্যোতিষদার কথায় সায় দিয়ে আমি ওখান থেকে বেরিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম।
কালের প্রবাহে সেই ‘Image Photographers’ এর স্টুডিও আজ বন্ধ। জ্যোতিষ’দাও এই জগতের মায়া ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন অনেক দিন আগেই।
এখনও মাঝেমধ্যেই বাড়িতে বসে যখন ওনার যত্ন নিয়ে করা প্রিন্ট, নেগেটিভের ওয়ালেট গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করে থাকি, মনে হয় এই বোধহয় পাশ থেকে বলে উঠবেন গম্ভীর গলায় – “কি বিজয়, কফি চলবে তো?”
১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই আমার তোলা কিছু ছবি আজ শেয়ার করলাম!
পুনশ্চঃ
আজও আমি ভাবি – আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে অনেকেই বামপন্থী মানসিকতায় বিশ্বাসী। ভারতে একমাত্র এই রাজনৈতিক দলটির মধ্যেই অধিক শিক্ষিত লোকজন-এর দেখা পাওয়া যায়। হ্যাঁ, আজও! — তবুও আজকের দিনে বামপন্থীদের এই বিপন্নতা কীসের জন্য? — আমার কাছে এর উত্তর অধরাই!
ধন্যবাদ।
বিজয় চৌধুরী, ১৮-০৭-২০২১
বেশ লাগল। খুব আন্তরিক লেখা।