১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে জুন উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ের জন্ম। তাঁর পিতা রবার্ট উইলিয়াম ইয়োয়ার্ড ছিলেন ইহুদি। মা রুক্মিণী ছিলেন ভারতীয়। বিয়ের পর রুক্মিণীর নাম হয়েছিল ভিক্টোরিয়া। আর এঁদের একমাত্র কন্যার নাম রাখা হয়েছিল অ্যাঞ্জেলিনা।
ভিক্টোরিয়া ও রবার্টের সংসার বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। উভয়ের ভিতর ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর, ভিক্টোরিয়া খুরশিদ নামক একজন মুসলমান যুবকের সাথে বারাণসী শহরে আসেন। এখানেই উভয়েই মা ও মেয়ে ধর্মান্তরিত হন ইসলাম ধর্মে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর ভিক্টোরিয়ার নাম হয় মালকাজান (বড়) এবং অ্যাঞ্জেলিনার নাম হয় গহরজান। উল্লেখ্য, এই সময় আরও কয়েজন বাইজির নাম মালকাজান ছিল। এঁরা হলেন— আগ্রার মালকাজান, মুলক্ পুখরাজের মালকাজান, চুলবুলির মালকাজান। এদের ভিতরে বেনরাসের মালকাজান ছিলেন বয়সে বড়। তাই তিনি নিজের নাম রেখেছিলেন বড় মালকাজান। মালকাজান ভাল গান গাইতে পারতেন। লিখতেন উর্দু কবিতাও। এ বার শুরু হয় তাঁর সঙ্গীতের তালিম। কিছু বছরের মধ্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঈজিদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কিন্তু এ সবের পাশাপাশি মালকা সর্বদা তৎপর থাকতেন গহরের তালিমের ব্যাপারে। ইতিমধ্যেই তিনি বিখ্যাত বেচু মিশ্রের কাছে গহরের তালিমের ব্যবস্থা করেছিলেন। চার বছর বারাণসীতে থাকার পরে খুরশিদ, মালকা ও গহর চলে আসেন কলকাতায়। শুরু হল নতুন এক অধ্যায়। তাঁদের ঠিকানা হয় কলকাতা শহরের কলুটোলা অঞ্চলে।
ইতিমধ্যেই দেশের রাজা-মহারাজাদের দরবারে মালকাজানের ডাক পড়তে শুরু করে। ঠিক এমনই এক সময় মালকা নিমন্ত্রণ পেয়েছিলেন মেটিয়াবুরুজের নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের দরবার থেকে।

সেখানেই কত্থকের প্রবাদপ্রতিম গুরু বিন্দাদিন মহারাজ মায়ের সাথে গহরকে দেখে বুঝতে পেরেছিলেন তার প্রতিভা। শুরু হয় গহরের নাচের তালিম। এর পাশাপাশি চলতে তাকে গহরের গানের তালিমও। গহর বাংলা গান শিখেছিলেন বামাচরণ ভট্টাচার্যের কাছে। রমেশচন্দ্র দাস বাবাজির কাছে কীর্তন। শ্রীজান বাঈয়ের কাছে ধ্রুপদ-ধামার এবং মিসেস ডি’সিলভার কাছে কিছু ইংরেজি গানও শিখেছিলেন। তাঁর অন্যান্য গুরুদের মধ্যে ছিলেন রামকুমার মিশ্র, গ্বালিয়রের ভাইয়া গণপত রাও সাহেব প্রমুখ।গহরজান হিন্দি, বাংলা, উর্দু, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, সংস্কৃত ইত্যাদি ভাষায় সমান দক্ষতায় গান করতে পারতেন। তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য মেহেফিল ছিল দ্বারভাঙার মহারাজা লক্ষণেশ্বর সিংহের দরবারে। এরপর থেকেই গহরজানের নাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের নানা প্রান্তে।
১৯০১ সালে কলকাতায় আসে গ্রামোফোন ও টাইপরাইটার লিমিটেড। উদ্দেশ্য, এ দেশের শিল্পীদের গান রেকর্ড করে বাণিজ্য করা। সেই থেকেই শুরু হয় এ দেশে রেকর্ডের প্রচলন। প্রথম যুগের শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম গহরজান। কোম্পানির রেকর্ডিস্ট হিসেবে এসেছিলেন গেইসবার্গ সাহেব। রেকর্ডিং-এর সময় গহরজানকে দেখে অবাক হয়েছিলেন তিনি। রেকর্ডিং-এর প্রথম দিনই গেইসবার্গ বুঝেছিলেন এই শিল্পী হয়ে উঠবেন এ দেশের ‘গ্রামোফোন সেলিব্রিটি’। এমন আত্মবিশ্বাস এবং স্বতঃস্ফূর্ততা তিনি অন্য কোনও শিল্পীর মধ্যে লক্ষ করেননি। ১৯০২ থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী। আর সেই যুগে প্রতিটি রেকর্ডিং সেশনের জন্য তিনি নিতেন তিন হাজার টাকা!
সে সময় গহর থাকতেন নাখোদা মসজিদের পাশেই এক প্রাসাদসম বাড়িতে। নাম রেখেছিলেন ‘গহর বিল্ডিং’। তাঁর বিলাসী জীবনযাপনের কথা সে যুগে লোকের মুখে মুখে ফিরত। শোনা যায় পোষা বেড়ালের বিয়েতে তিনি খরচ করে ছিলেন কুড়ি হাজার টাকা।
ইতিহাসে কান পাতলে আজও শোনা যায় এ শহরে গহরজানের বহু মেহফিলের স্মৃতি। জোড়াসাঁকোর মল্লিকবাড়ির এক অনুষ্ঠানে চমক দিয়েছিলেন গহর। আসরে ছিলেন বাঙালি, পঞ্জাবি, মাড়োয়াড়ি ও সাহেব অতিথিরা। গৃহকর্তাকে গহর অনুরোধ করলেন অতিথিদের ভাষা অনুযায়ী আলাদা আলাদা ভাগে বসাতে। এমন কথা শুনে গৃহকর্তা তো একে বারে হতবাক! তবে শিল্পীর অনুরোধ ফেলার নয়। তাই তিনি অতিথিদের আলাদা আলাদা দলে বসতে বললেন। বহুমূল্য অলঙ্কারে সুসজ্জিত গহর আসর থেকে প্রাঙ্গণে নেমে এলেন। যে দিকে সাহেবরা বসেছিলেন সেখানে গিয়ে একটা কুর্নিশ করে একটা ইংরেজি গান ধরলেন। এর পরেই পঞ্জাবি শ্রোতাদের সামনে গিয়ে ধরলেন একটি পঞ্জাবি গান। মাড়োয়াড়ি শ্রোতাদের সামনে গিয়ে ধরলেন একটি হিন্দি দাদরা ও ঠুমরি। সব শেষে বাঙালি শ্রোতাদের সামনে গিয়ে শুনিয়েছিলেন একাধিক বাংলা গান। সে দিন সকল শ্রোতাই মুগ্ধ হয়েছিলেন গহরের এই অভিনব পরিবেশনায়। এমনটাই ছিলেন গহরজান। তেমনই ইতিহাস হয়ে আছে স্টার থিয়েটারে গহরজানের নানা অনুষ্ঠান।

তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য রাস্তায় ভিড় জমে যেত। এমনকী, দেশলাইয়ের বাক্সে থাকত তাঁর ছবি। সে যুগে পাওয়া যেত গহরজানের ছবিওয়ালা রঙিন পোস্টকার্ড। তাঁর গাওয়া বাংলা গানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘ফাঁকি দিয়ে প্রাণের পাখি’, ‘আজ কেন বঁধু’, ‘নিমেষেরই দেখা যদি’। আর মাইলস্টোন বলতে মূলতানী, মালকোষ, কিংবা ভূপালি রাগের খেয়ালগুলি। তবে হিন্দি গানগুলির মধ্যে ‘আনবান জিয়া মে লাগি’, ‘নহক লায়ে গবানবা’ আজও উল্লেখযোগ্য।
তাকে বলা হত ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের সম্রাজ্ঞী। অথচ মাঝে মধ্যেই আসরে তিনি গাইতেন লঘু চালের সাধারণ গান। আসলে খেয়াল, ধ্রুপদ কিংবা ধামার যে সকল শ্রোতার মন ছুঁতে পারবে না তা তিনি বুঝতে পারতেন। তাই শ্রোতার মন বুঝে আসরে গান গাইতেন।
তার ব্যক্তিগত জীবন কেটেছিল নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে। ভালবেসে বার বার পেয়েছিলেন আঘাত। এক দিকে, দেশ জোড়া খ্যাতি, অর্থ, মান সম্মান। অন্য দিকে, সব কিছুর অলিন্দে ব্যক্তিগত জীবনে নিসঙ্গতা এবং একাকীত্ব। তাঁর ম্যানেজার পেশওয়ারি যুবক আব্বাস এক সময় খুব ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলেন। শোনা যায়, পরে সেই আব্বাসই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। তাঁর কারণেই গহর হারিয়ে ছিলেন প্রভূত ধনসম্পত্তি। চলেছিল দীর্ঘ মামলা মকদ্দমাও।
১৯২৮ সালে মাসিক ৫০০ টাকা বেতনে মহীশূর দরবারে সভাগায়িকা নিযুক্ত হয়েছিলেন গহরজান। তাঁর প্রিয় কলকাতা ছেড়ে চির কালের মতো পাড়ি দিয়েছিলেন গহরজান। দু-বছর পরে, ১৭ জানুয়ারি ১৯৩০ সালে মহীশূরে তাঁর মৃত্যু হয়।
তিনি রয়ে গেলেন একটা ‘মিথ’ হয়ে। গানের শেষে আজও তাঁর রেকর্ডে শোনা যায় সেই ঘোষণা ‘মাই নেম ইজ গহরজান’।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, অনুবাদক ও কবি। লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।