জগদ্ধাত্রী পুজো মানেই চন্দননগর, এ কথা বলা বাহুল্য। অভিনব আলোকসজ্জা, মণ্ডপসজ্জা ও প্রতিমার উচ্চতার অভিনবত্বে সেজে উঠেছে ঐতিহ্যপূর্ণ শহর এককালীন ফরাসি ঔপনিবেশিক কেন্দ্র চন্দননগর। আনুমানিক ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পুজো করা হচ্ছে চাউলপট্টির জাগ্রত জগদ্ধাত্রী ‘আদি মা’-কে। সবেকিয়ানার সঙ্গে ঐতিহ্যের মিশেলে ভদ্রেশ্বরের তেঁতুলতলা বারোয়ারী জগদ্ধাত্রী পুজো এবছর ২৩১ তম বর্ষে পদার্পণ করলো।
বঙ্গদেশে শ্রী শ্রী জগদ্ধাত্রী পূজার প্রবর্তন সম্পর্কে দুটি ভিন্নমতের প্রচলন আছে। একটি গুরুর আজ্ঞায় বা স্বপ্নাদেশে কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র সর্বপ্রথম মৃন্ময়ী প্রতিমা গঠন করে জগদ্ধাত্রী পূজা করেন আর দ্বিতীয় মতে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের প্রপৌত্র গিরিশচন্দ্রের সময় চন্দননগরের চন্দ্রচুড় তর্কচূড়ামনি নামক এক নৈয়ায়িক ব্রাহ্মণ পন্ডিত কতৃক পূজা পদ্ধতি এবং বিধিবদ্ধ বাংলাদেশে প্রসারিত হয়।
চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পূজার আরম্ভকাল বা প্রতিষ্ঠার আদিকথার সঠিক কোন বিবরণ জানতে পারা যায় না। তবে কথিত আছে কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র চন্দননগরে তৎকালীন ফরাসি বণিকদের দেওয়ান শ্রীইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী মহাশয়ের কাছে প্রায়ই চন্দননগরে আসতেন। অনেকেই মনে করেন যে এই সংযোগ সূত্র থেকেই জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন হয়। চন্দননগরের চাউল ব্যবসায়ীরা কৃষ্ণনগরের অনুকরণে এই পূজা আরম্ভ করেছিলেন।

সর্বপ্রথম যে স্থানে শ্রী শ্রী জগদ্ধাত্রী প্রতিমা নির্মাণ করে পূজা আরম্ভ হয়েছিল সেই জায়গাটি চাউলপট্টি বা নীচেপটি নামে প্রসিদ্ধ। এখানকার পূজোটি কত বছর পুরনো সে সম্বন্ধে সঠিক করে কেউ কিছু বলতে পারেন না তবে অনেকেই অনুমান করেন যে লক্ষীগঞ্জ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বা তার অল্প পরেই এর প্রতিষ্ঠা হয়। এই পুজো আজ অব্দি চলে আসছে এবং পুরুষানুক্রমে নাকি চৌধুরী পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যের নামে এই পুজোর সংকল্প হয়।
চন্দননগরে ফরাসিদের ডান হাত ছিলেন বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। চাল, পাট, আখ, গুড়ের এক বিশাল ব্যবসা চালাতেন তিনি সেই আমলে। ফরাসি ভাষাতেও বেশ চৌখস ছিলেন। বাৎসরিক ১২,০০০ টাকায় বিনিময়ে চন্দননগরের ইজাড়া নিয়েছিলেন। নৌকা করে মন মন চাল পাঠাতেন দূর দূরান্তে। দুর্গাপূজোর চারদিন কিভাবে কাজের মধ্যে কেটে যেত টের পাওয়া যেত না। মনে সর্বদা একটা দুঃখ থাকতো এত আয়োজনে মায়ের বাৎসরিক পুজো অথচ মায়ের কাছে যাওয়ার এতটুকু সময় হয়ে উঠছে না।চাউলপট্টির ব্যবসায়ীরাও তার কাছে দরবার করলেন এই কষ্ট নিবারণের জন্য। উপায় খুঁজতে গিয়ে তাঁর মন অশান্ত হলো। একরাতে ইন্দ্রনারায়ণ তার তৈরি নন্দদুলাল মন্দিরে বিগ্রহের সামনে সারারাত বসে কাটালেন। ভোরের দিকে ক্লান্তিতে যখন তার চোখ জুড়ে এসেছে স্বপ্নে দেখা দিলেন সিংহের ওপর আসীন চতুর্ভুজা এক জ্যোতির্ময়ী দেবীমূর্তি। তাঁর রৌদ্রজ্জ্বল গায়ের আলোয় চারিদিক আলোকিত হয়ে উঠেছে। আনন্দে আত্মহারা ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী পাঠালেন সবাইকে। দুর্গাপুজোর ঠিক একমাস পরে তার বাড়িতে মহাসমারোহে শুরু হলো মায়ের আরেক রূপ জগধাত্রীর আরাধনা।

কিন্তু সুখের দিন স্থায়ী হলো না। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডও ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধের ফলে চন্দননগরের জলপথ ও স্থলপথে সাঁড়াশি আক্রমণ জানায় লর্ড ক্লাইভ। ব্যাপক লুটপাট চলে চন্দননগরে। শোনা যায় কেবল ইন্দ্রনারায়ণের বাড়ি লুঠ করে প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা নিয়ে যায় ইংরেজ। ক্লাইভের গোলায় ধূলিসাৎ হয়ে যায় ইন্দ্রনারায়ণের প্রাসাদ ও নন্দদুলাল মন্দির। নিরাশ্রয় হলেন দেবীও। এই পরিস্থিতিতে ইন্দ্রনাথের বাড়ির পুজো চাউলপট্টিতে নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। শুরু হলো চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পূজা। এখানকার জগদ্ধাত্রীকে বলা হয় আদিমা। ভক্তরা ভালোবেসে ডাকেন বুড়িমা বলে। তবে এ গল্প নিয়েও যথেষ্ট মতানৈক্য রয়েছে ।
অন্য একটি মতে, কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির বিশ্বস্ত কর্মচারী দাতারাম সুর আনুমানিক ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে বা তারপরে চন্দননগর সংলগ্ন গৌরহাটিতে স্বগৃহে তাঁর দুই বিধবা কন্যাকে নিয়ে প্রথম জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন। ৩০ বছর পর্যন্ত ধরে এই পুজো চললেও, দাতারাম সুরের অবর্তমানে পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম দাঁড়ায়। তখন স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে পুজো স্থানান্তরিত হয় বিশালক্ষীতলায়। পরে শ্রীরামপুরের জমিদার গোস্বামীরা ভদ্রেশ্বরের তেঁতুলতলায় গঙ্গার ঘাটের কাছে কয়েক বিঘা জমি দান করেন। সেই থেকেই এখানে পুজো হচ্ছে।

চাউলপট্টির আদি মায়ের পুজো হয় শাস্ত্র মতে, নিষ্ঠাসহকারে। দেবী রূপে তিনি ত্রিনয়নী, চতুর্ভূজা (চার হাতে শঙ্খ, চক্র ধনুক ও বাণ রয়েছে), সিংহবাহিনী। গলায় নাগযজ্ঞোপবীত। তাঁর বাহন সিংহ দাঁড়িয়ে থাকে হাতির উপর। দেবীর গাত্রবর্ণ উদীয়মান সূর্যের। দুর্গা দশমীর দিন কাঠামো পুজা হয়। এবছর চুঁচুড়া, চন্দননগর, হুগলী-সহ আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভক্তদের মানত করা ১৮৯টি বেনারসি, ২৫টি তাঁতের শাড়ি ও কোটি টাকার উপর মূল্যের গয়নায় সুসজ্জিত করা হয়েছে দেবীকে। সপ্তমীর দিন সাতটি বিশাল বারকোষে দেবীর নৈবেদ্যের আয়োজন করা হয়। নবমীর দিন মাকে ১০৮টি রক্ত পদ্ম নিবেদন করার প্রথা আছে।

আজ ৪ অগ্রহায়ণ, ২১ নভেম্বর–মহানবমী। ভোর-রাত দুটো থেকেই ভক্তদের মানত দন্ডি কাটা শুরু হয়ে গেছে। এবছর ৬৫৩টি বলি হাওয়ার কথা। ছাগবলির সঙ্গে আখ, চালকুমড়ো বলিও হয়। বুড়ি মায়ের পুজোর একটি বৈশিষ্ট্য হল গয়না পরানো থেকে শুরু করে নৈবেদ্য সাজানো, প্রতিমা বরণ করে নিরঞ্জন সবই করেন কমিটির পুরুষ সদস্যরা। দশমীর পরের দিন প্রায় ২২ ফুটের মায়ের বিসর্জন হয় নিজস্ব ঘাটে। ভক্তরা দেবীর মূর্তিকে কাঁধে তুলে নিয়ে আসেন ঘাট অবধি। অসংখ্য ভক্তদের ভিড়ে তিলধারণের জায়গা থাকে না। প্রতিমা জলে পড়ার পর পরের পূর্ণিমা পর্যন্ত ভাসমান কাঠামো ঘাটেই বাঁধা থাকে। বিসর্জনের পর মায়ের গায়ে বেনারসি গুলি রেখে দেওয়া হয় বিভিন্ন দরিদ্র পরিবারের বিয়ে উপলক্ষে কাজে লাগানোর জন্য। শোলার ভিতরের নরম সাদা শাঁসটুকু ব্যবহার করে মায়ের গহনা তৈরি করা হয়।
দেবীর বিদায়ের সময় কমিটির পুরুষ সদস্যরা মহিলাদের মত শাড়ি ও সিঁদুর পরে মাকে বরণ করে। এইরকম অদ্ভুত প্রথার শুরু কবে থেকে হয়েছে তা সঠিক জানা নেই তবে অনেকেই মনে করেন দাতারাম সুরের বিধবা কন্যাদের স্মরণে এই রীতি। আবার অন্য মতে, সেই সময় ফরাসি ও ইংরেজরা এই পূজা দেখতে আসতেন। বাড়ির মেয়েরা তাদের সামনে বেরোবেন না বলে পুজোর যাবতীয় কাজ পুরুষরাই করতেন। সেই থেকেই এই প্রথার জন্ম।

ভক্তাধীন ভগবান। অনন্যচিত্ত ভক্তের কারনেই তাঁর আবির্ভাব – লীলাপ্রকাশ। সেকালই হোক বা আধুনিককাল – জীবকে উদ্ধার করাই মা জগদ্ধাত্রী সংকল্প। এই জগত তাঁরই শক্তির প্রকাশ। ভক্তদের অফুরন্ত বিশ্বাস গৌড়হাটি তেঁতুলতলা জগদ্ধাত্রী মা জাগ্রত। বিপদে-আপদে-সম্পদে ভক্তের ডাকে মা সাড়া দেন। এই বিশ্বাস অটুট থাকুক। সকলেই ভালো থাকুক। জয় মা জগদ্ধাত্রী।।
তথ্য সূত্র : হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ – সুধীর কুমার মিত্র, চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী – চন্দননগর হেরিটেজ প্রকাশন, ও নিজস্ব ছবি সৌজন্য-ফেসবুকে গৌড়হাটি তেঁতুলতলা জগদ্ধাত্রী পুজো কমিটি।
খব সুন্দর লেখা।
থ্যাঙ্ক ইউ ????
লেখাটি খুবই ভালো হয়েছে ।
থ্যাঙ্ক ইউ