আমি আমার জীবনে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক অনেক ব্যাপারে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সবসময় যে সব সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ১০০ ভাগ সঠিক তাও যেমন ভাবতে পারি না, তবে বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত যা মানুষের কাজে লেগেছে, তা হচ্ছে, যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে বা প্রশাসনিক কোনো ফাইলের কোনো কাজ করতে গেলে আমার সবসময় যেটা মনে হয় সেটা হচ্ছে, হয়তো একপক্ষের কথা আমি শুনছি, তবে তাদেরটাও আমাকে ভাবতে হবে, যাতে অন্য পক্ষ বিচার পেতে বঞ্চিত না হয়, সেটাও ভাববো, সেক্ষেত্রে আমি সবসময় দুটো পক্ষের কথা ভাবি, কোনটা করলে উভয় পক্ষের মঙ্গল হবে, সেটা দেখে তবেই কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিতে আমি বড়ো ভালোবাসি। তার কারণ তাতে কারও বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ‘আর ভালোমন্দ’ দু-দিকে নজর রেখে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক সিদ্ধান্ত কিন্তু কার্যকরী সিদ্ধান্তও হতে পারে।
সুতরাং জীবনে চলার পথে, এ অভিজ্ঞতা কিন্তু একদিনে সঞ্চিত হয়নি। দীর্ঘদিন বছরের পর বছর কাজ করতে করতে এ অভিজ্ঞতার উপলব্ধি হয়েছে বাস্তব জীবনের বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে। আমার সবসময় মনে হয় যে, কাজ করতে করতে এবং পথ চলতে চলতে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় যেটা আমার মনে হয়েছে মানুষের কাজে লাগতে পারে, যা আমাদের ‘নব প্রজন্ম’ তাদের জীবনে সে পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে অনেক কাজের সুষ্ঠু সমাধান করতে পারে, তার জন্যই তার উদ্দেশ্যেই মনের ডাউন দ্য মেমরি লেন থেকে সঞ্চিত কিছু অভিজ্ঞতার নিরিখে এ লেখা।
যাদের অনেক আছে তাদের হয়তো এত শত ভাবতে হয় না। ভাববার আগেই তাঁরা সব কিছু পেয়ে যান সময়ের আগেই। এসব ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তাঁরা ভাগ্যবান।

কিন্তু যাদের জীবনে স্ট্র্যাগল করতে করতে, ঘষতে ঘষতে পথ চলতে হয়, তাদের কখনো হতাশ হতে নেই, বা কী হবে, বা কী করে হবে, অথবা পারবো কি পারবো না, এই দোদুল্যমান দোলাচলের মধ্যে থাকা চলবে না। তাকে তার মতো করে চিন্তাভাবনাটাকে পজিটিভ করতে হবে। মনে রাখতে হবে সবসময় যে, নেগেটিভ চিন্তাধারা আমাদের শত্রু। নেগেটিভ চিন্তাধারা কখনো কাউকে এগোতে দেয় না। পজিটিভ চিন্তাধারাকে বেছে নিয়ে একটা ক্ষুদ্র সদিচ্ছাকে আঁকড়ে ধরেই বৃহত্তর জগৎ জয় করতে হবে। কেন হবে না?
চাকুরি ভালো না হলে অথবা অনেক টাকা মাইনে না হলে সে চাকুরি ভালো না অথবা স্থায়ী চাকুরি ছাড়া অন্য কোনো চাকুরি ভালো না, তা ভাবাটা ঠিক নয়।
মানুষের জীবনটা খুব খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাতের সামনে, যদি কোনো কাজের সুযোগ আসে, তবে সে কাজটাকে নিয়ে নিতে হয়, বিশেষ করে আজকের যুগে, যখন নানারকম আর্থিক বিপর্যয়ের ফলে কর্মসংস্থানেও চলছে প্রচুর প্রতিযোগিতা, সুতরাং সামনে যদি কিছু একটা সুযোগ থাকে, কোনও কর্মসংস্থানের, তবে ভালো জায়গায় সুযোগ থাকলে তো সবাই যেতে চায়, হ্যাঁ ভালো জায়গা তো আছে। কিন্তু ভালো জায়গাতেও আজকাল চলে অনেক প্রতিযোগিতা, এমনকি কন্ট্র্যাকচুয়াল বা ক্যাজুয়াল হলেও তার বয়সসীমা ৬০ বছর করা থাকে। তবে তো তাঁর অনেকটাই স্থায়ীর মতোই হয়ে যায়। আজকাল তো আমার জানা বড়ো বড়ো রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া সব জায়গায় পেনশনও বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি উঁচু স্তরের অফিসারদেরও পেনশন ব্যবস্থা আগের মতো আর নেই। এই অবস্থাতে কাজের ব্যাপারে চোখ, ভুরু, নাক না কুচকে ‘পছন্দসই হলো না বলে করলাম না বা সন্তুষ্ট হলাম না বা ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারলাম না’ এই ভাবটা না থাকাই ভালো।

আমাদের এখানে যেমন আমরা এখন মানুষের জীবনের এত প্রতিযোগিতার বাজারেও যাদের জীবনে ক্যাসুয়াল বা কন্ট্র্যাকচুয়াল (সরকারি) কোনো ভবিষ্যতই ছিল না। যে কোনোদিন যে কোনো কারো চাকুরি চলে যেতে পারতো। তাদের জন্য আমরা ৬০ বছর করে দিয়েছি। বেতন বাড়ানো হয়েছে এবং ৬০ বছর সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর ২ লাখ টাকা হাতে পাবে। তাদের চিকিৎসার জন্য প্রাইভেট হাসপাতালে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। আর সরকারি হাসপাতালে তো চিকিৎসার সুযোগ বিনামূল্যে। সুতরাং অনেক আর্থিক সঙ্কট থাকা সত্ত্বেও এই সুযোগ যদি অন্তত তাকে জীবনে বেঁচে থাকার ভরসা দিতে পারে তার জন্যই করা হয়েছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কাজের ধরন, নিজের ধরন ধারণ, ভালো-মন্দ বাছতে গিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে অনেকে বঞ্চিত হন।
আমি রাস্তাই যখন পথ চলি আমার চোখও রাস্তার চারিদিকে থাকে। যেতে যেতে চোখের সামনে যা পড়ে তার সব কিছুতেই তীব্র নজর থাকে।
আমি অফিসে যাতায়াতের পথে প্রায়শই লক্ষ করি ১০০ দিনের কাজের জন্য কিছু মহিলা ও কয়েকজন ছেলে একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। আমার দেখতেও খুব ভালো লাগে। আর তাদের দিকে তাকিয়ে আমি ওদের শুভেচ্ছাও জানাই। ওরা হাসিমুখে কাজ করে। গৌরবের সাথে কাজ করে। ওরা যে কাজটা করে তা সদিচ্ছার সাথে যত্ন করেই করে। টাকাও খুব খারাপ পায় তা তো নয়।

তবে এই কাজই আমি অনেককে দেখি, তারা করতেই চায় না। ঘুরে ঘুরে কষ্ট করে, তবুও হাতের সামনে এ কাজটা করে না। কিন্তু যাঁরা করেন তাঁরাও তো কত সুন্দরভাবে কাজটা করেন। তার পরিবর্তে তাঁদের সংসারটাও চলে যায়। এই ১০০ দিনের ভাই-বোনদের কাজের জন্য কিন্তু আজ কলকাতা শহরতলি-সহ অন্যান্য অনেক অঞ্চলে এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা লক্ষ্য করা যায়।
আমি যখন কলকাতা কেন লন্ডন হবে না বলেছিলাম তখন সৌন্দর্যায়ন ও শৃঙ্খলাযুক্ত একটা সিস্টেমের মধ্যে কলকাতাকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। লন্ডন গড়ে উঠেছিল টেমস নদীকে ঘিরে। ওখানকার তিন-চারটে অ্যাডভান্টেজ আছে যা লন্ডনকে সুন্দর করে রেখেছে।
প্রথমত, আবহাওয়া একেবারে পরিবেশ-অনুকূল। আবহাওয়ার জন্য ওখানে দূষণ প্রায় নেই বললেই চলে।
আমাদের জলবায়ু ও আবহাওয়া কখনো রুক্ষ, কখনো গ্রীষ্মের প্রচণ্ড হুঙ্কার আর শীত সে তো খুবই সামান্য। দ্বিতীয়ত, ওখানকার জনসংখ্যা আমাদের তুলনায় অনেক অনেক কম। আমাদের কলকাতায় যা লোকসংখ্যা আছে তা পৃথিবীতে অনেক সম্পূর্ণ দেশের নেই। আমাদের এত জনসংখ্যা যে লন্ডন কনজেস্টেড নয় আমাদের এখানকার মতো।
তৃতীয়ত, লন্ডনে স্পেস খুব বেশি। আমাদের তো এখানে পুরোটাই হয় ভর্তি অথবা দীর্ঘদিন ধরেই দখলমুক্ত জায়গা খুবই কম। স্পেস বেশি থাকলে অনেক কিছু ভেবে চিন্তে সুন্দর করে, পরিকল্পনা করে করা যায়। জায়গা উপযুক্ত না পাওয়া গেলে বা কনজেশন বেশি থাকলে ভালো জিনিসও অনেক সময় দেখতে খারাপ লাগে।

চতুর্থত কলকাতা প্ল্যানড সিটি নয়। পুরোনো দিনের শহর। পরিকল্পনা করে যেমন নূতন শহর করা যায় ‘একটা দিশা দিয়ে একটা সুপরিকল্পিত’ ভাবনা-চিন্তা দিয়ে, তা কখনোই একটা পুরাতন শহরে সব ভেঙেচুরে দিয়ে আমাদের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হয় না।
দীর্ঘদিন ধরে কত মানুষের বসবাস, ব্যবসা, দোকান, হকার, বেকার, সাকার—সবাইকে নিয়েই এই সরকার। পরিবার যে প্রত্যেকটা ছোটোখাটো ব্যাপারে নজর রাখতে গিয়ে ও নজর দিতে গিয়ে জোরজবরদস্তি করার দিকে আমাদের ইচ্ছা কম থাকে। ফলে যা আছে তার মধ্যেই কিছুটা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে অ্যাডজাস্ট করে যা করার সেটা আমরা করতে পারি। ফলে কলকাতার যানজট, জনসংখ্যা, প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের পদার্পণ বিভিন্ন জেলা-শহর থেকে বিভিন্ন কাজে আসা হকার সমস্যা ও জীবন জীবিকার মধ্যে লক্ষ মানুষের রুজি-রোজগার এগুলো অতি বড়ো সমস্যা।
কিন্তু তা সত্ত্বেও মাত্র ৫-৬ বছরে কলকাতার ড্রেনেজ সিস্টেম, রাস্তাঘাট, আলো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যায়ন অনেকটাই করা হয়েছে। আর শহর পরিষ্কার রাখতে আমাদের সবারই নজর রাখা উচিত, অপ্রয়োজনে নোংরা করার প্রবণতা থেকে দূরে থাকার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের পালন করতে হবে। অনেক সময় আমি লক্ষ করে দেখেছি যে, বরাবরই ‘জ্ঞান’ দেওয়ার প্রবণতা আমাদের একটু বেশি, নিজে কিছু করে দেখানোর থেকে। ফলে অপরকে জ্ঞান দেবার আগে নিজেরা যদি নিজেদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করি তাতে কিন্তু আরও ৫ জন সেটা দেখে আবার নিজেদের খারাপ অভ্যাস বদলে ভালো অভ্যাসে নিয়ে যেতে পারেন, যাতে সমাজ অনেক লাভবান হয়।

আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, একশো দিনের কাজে কর্মীবন্ধুরা কীভাবে কলকাতাকে পরিচ্ছন্ন করে রেখেছে।
অনেকে হয়তো বাইরে থেকে ভাবেন যে শুধুমাত্র কলকাতা কর্পোরেশন একাই কলকাতায় এই কাজটা করে। অনেকটাই পরিকল্পনা করে, একসাথে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ১০টি দফতর মিলে কো-অর্ডিনেশন করে কলকাতা কর্পোরেশনকে নোডাল এজেন্সি করে কিন্তু কাজটা করানো হচ্ছে।
রাস্তা নিয়ে ভাবুন। কলকাতায় বা গ্রামের দিকে কত রাস্তা। কিন্তু সব রাস্তা কখনোই একটা এজেন্সির অধীনে নয়। ফলে বিভিন্ন এজেন্সি, বিভিন্ন রাস্তা। কোনওটা ন্যাশানাল হাইওয়ে, কোনোটা পিডব্লিউডি তো কোনওটা কেএমডিএ। কোনোটা কর্পোরেশন তো কোনোটা মিউনিসিপ্যালিটি, কোনোটা জেলা পরিষদের তো কোনোটা পঞ্চায়েত সমিতির, কোনোটা ইরিগেশনের তো কোনোটা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি। ফলে এই সবগুলো এজেন্সিকে একসঙ্গে করে তবেই উন্নয়ন করতে হয়। অনেক রাস্তায় তো আবার বাঁদিকটা কর্পোরেশনের তো ডানদিকটা পিডব্লিউডির। ফলে, একজনকে যদি তার কাজটা করতে বলা হয় আর অপরজনকে না বলা হয় তবে কিন্তু কোনো কাজই সম্পূর্ণ হবে না, থেকে যাবে অসম্পূর্ণ, ফলে, এই সব কাজগুলো থেকে যে ধারণা বা শিক্ষা নেবার যা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে তা হচ্ছে যে কোনো কাজ করতে গেলে তা ‘জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে, জীবনের গভীরতা দিয়ে করলে তবেই কাজটা দ্রুত ও সম্পূর্ণ হবে।

শুধু নির্দেশ দিলেই কাজ হয় না, কাজটার দিকে নজর রেখে মনিটরিং করতে হয় ও প্রয়োজনে কোথায় কী দুর্বলতা আছে সে দিকেও লক্ষ্য রাখতে হয়।
মানুষকে ভালোবেসে কাজ করিয়ে নেওয়া ও মানুষকে ভালোবাসলেও কিন্তু অনেক কাজ একটা অল্প সময়ে ও অল্প খরচাতে হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে নিজেকেও একটু যারা কাজ করেছেন তাদের সাথে কখনো সখনো হাতে হাতে মিলিয়ে কাজ করলে তার ভালো ফল পাওয়া যায়। ‘কর্মবন্ধু’দের আপন করে কাজ করতে দেওয়া ও কাজ করিয়ে নেওয়াটাও বড়ো ব্যাপার।
জীবনের যে কোনো বড়ো সাফল্য নির্ভর করে ছোটো ছোটো সাফল্যের ওপর। তাই বড়োদের ওপর সাফল্যের জন্য সর্বত্র নির্ভর না করেও ছোটো ছোটোদের ওপরে নির্ভর করেও কিন্তু অনেক ভালো কাজ করা যায়।
কাজের সাফল্য কিন্তু সব সময় সফলতা নিয়ে আসে তৃণমূল স্তরে কাজটা কীভাবে সফল হচ্ছে তার ওপর। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজেকে উদ্যোগী করে গড়ে তোলাও সফলতার বড়ো সোপান। কথায় কথায় অপরের ঘাড়ে বন্দুক না রেখে নিজেকে নিজের কাজে নির্ভরশীল করে তুলতে হবে।

নিজেকে যতটা বেশি কাজে ব্যস্ত রাখা যাবে সেটা কিন্তু শরীরের পক্ষেও ভালো। শুধুমাত্র বুদ্ধি খরচ করলে ও মেধা থেকে যা ফল মেলে, সেই মেধা আরও ভালো হতো যদি শারীরিক পরিশ্রমও তার থেকে কিছুটা কাজে লাগানো যায়। শারীরিক পরিশ্রম বা হাঁটাচলা আমাদের শারীরিক দিক থেকে যেমন কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে, তেমনই তো বুদ্ধির বিকাশেও কত কাজে লাগে।
হাঁটাচলা, ব্যায়াম, খেলাধুলো আবার শরীরের যন্ত্রাংশগুলোকে যেমন ভালো রাখে, মন ভালো রাখে তেমনই টেনশন ফ্রি রাখতে অনেক সাহায্য করে। মানসিক দূষণ হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো দূষণ। তাই মন ভালো থাকলে যে কাজ ভালোভাবে হতে পারে, মন ভালো না থাকলে বা ঠিকমতো ঘুম না হলে আমরা একটু খিটখিটে আচরণ করি কারণ, শরীর স্বাভাবিক ব্যাপারটা নিতে পারে না বলেই। তাই মেন্টাল পলিউশন ইজ আ বিগ বিগ পলিউশন। সেটা থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করতে গেলে মেন্টাল রিলাক্সেশনের প্রয়োজন। আর সেটা হতে পারে হাঁটাটা রোজ একটু রুটিন করে করলে। গান শোনা, ছবি আঁকা, আড্ডা মারা, শিশুদের সাথে সময় কাটানো তাতেও মেন্টাল রিলাক্সেশন হয়। সমস্যা তো থাকবেই, সমস্যাটা সবসময় যদি নিত্যদিনের কাজের অঙ্গ হিসেবে থাকে, তবে সেটাকে রুটিন হিসেবে, কাজের মধ্যে ধরে ধরে নিয়েই কাজ করতে হবে।
আর কোনো কাজের কথা মনে আসলেই সেটা ‘মনের ভাণ্ডার’ ভারী না করে একটা কাগজে বা ডাইরিতে বা মোবাইলেও নোট করে রাখলেই হবে। সময় মতো কাজটা করে ফেলতে হবে। কাজ ফেলে রাখা যাবে না। আমাকে অনেক কাজ করতে হয়। তার মধ্যে কোনো কাজ আমার মাথায় আসলেই আমি সেটা লিখে চোখের সামনেই রেখে দিই। যাতে বেরোবার আগে চোখে পড়ে, সেরকম জায়গায় রেখে দিই যাতে অফিসে বেরোনোর আগে সেটা আমার নজরে পড়ে। আর কাজটা যাতে সময়ে করে ফেলতে পারি।

আমি কাজ ফেলে রাখার বিপক্ষে। সময়ের আগে কাজ করাটা এবং সময়ের আগে সভাস্থলে পৌঁছানোটা আমার নিজের দায়িত্বপালনের একটা অঙ্গ হিসেবে মনে করি। রাতের বেলায় বিছানায় শুয়ে কোনো কাজের কথা হঠাৎ করে মনে পড়ে গেলেই, আমি সেটা যাতে ভুলে না যাই, তার জন্য মনে করে নোট করে রাখি, তাতে মনটাও হালকা হয়, আর কাজটাও ভুলি না, করে ফেলি। আর একটা কথা আমার মনে হয়, পথ চলতে চলতে অনেকে অনেক সময় নিয়ে একটা কথা বলে। যারা খুব কর্মব্যস্ত তাদের প্রত্যেকটা সেকেন্ড মেপে কাজ করতে হয়। ফলে যাদের এক সেকেন্ড বোঝার, তারা সহজেই বুঝে যায়। যেটা করার মতো কাজ হয় সেটা আমি করেও দিই। মেঘ না চাইতে জলের মতোই। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমার মনে হয় যে কোনো সমস্যা বলতে আর শুনতে যা সময় লাগে তার থেকে বেটার পদ্ধতি হচ্ছে তার সমস্যাটা একটা কাগজে লিপিবদ্ধ করে নিয়ে আসা।
ফলে একই কাজে বেশি সময় নষ্ট না করে ওই লিপিবদ্ধ কাগজটা থাকলেই যেটা হবার সেটা হবে। যেটা হওয়া সম্ভব নয় সেটা তো সত্যিই আইনত না করা গেলে দুঃখ লাগে। কিন্তু আমাদের সবাইকেই তো আবার আইনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কাজ করতে হয়। ফলে সময়ে সময়মতো কাজ করা যেমন জীবনের বড়ো ‘স্যাটিসফেকশন’ তেমনই আবার সময়ের মূল্য নির্ধারণ করাটাও বড়ো ব্যাপার।
দিন শুরু হবার আগে সকালটায় আমাদের সকলেরই একটু তাড়াহুড়ো থাকে, কারণ কাজ শুরু করতে হয়। সে বাড়ির কাজই হোক বা অফিসের কাজই হোক। ফলে প্রতিটা সেকেন্ড তখন ম্যাটার করে। কাজ হয়ে গেলে তখন যতটা হেলেদুলে সময় বেশি করে দিয়ে আড্ডার ছলে কাজটা করে। সেটা কিন্তু আমরা কাজ শুরু করার সময় করতে পারি না।

পলে সকালে আমাকে তো ফোনের এসএমএস-এর উত্তর দিতে গিয়েও ভাবতে হয় যে কতটা সময় যাচ্ছে। চা খাবার সময় ৫ মিনিট, স্নান করার জন্য ১৫ মিনিট, ট্রেড মিল করার টাইম সবটাই সময় মেপে করে তবে কাজে আবার সময়মতো বেরিয়ে আফিসে বা প্রোগ্রামে যেতে হয়।
ডেইলি রুটিন ও কাজ তো সময় মেপেই সামলাতে হয়। ফলে নেক্সট ডে-তে কী প্রোগ্রাম আছে তা দেখেই রেগুলার টাইম টেবিল করে নিতে হয়।
ইয়ারলি কী কী কাজ যা আমাদের করতেই হয় একেবারে রুটিনের মতো করে, তার জন্য আমার একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যালেন্ডার করা থাকে। প্রশাসনিক কাজের যেমন সারা বছরের একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যালেন্ডার থাকে তেমনই সারা বছর ধরে কোনো কোনো প্রোগ্রামগুলো আমাকে করতেই হবে তার জন্য আমার একটা নিজস্ব অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যালেন্ডার থাকে। ফলে সারা বছরের নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট কর্মসূচিগুলো আমার লিপিবদ্ধই থাকে। এটা সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এটা না থাকলে আবার হাজার রকমের মিটিং সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে আবার এটা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতেও সাহায্য করে।

(ঋণ স্বীকার— ‘আমার নব প্রজন্ম’। মমতা ব্যানার্জীর ‘আমার নব প্রজন্ম’ দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের অংশ বিশেষ আমরা তুলে ধরলাম।—সম্পাদক)
সংগ্রমী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত