পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে ক’দিন বেশ হৈচৈ হল। এখন তা একটু কমেছে, কিন্তু তাদের সমস্যার কোন মৌলিক সমাধান হয়নি। হওয়ার কথাও ছিলনা, কারণ লকডাউন উঠলেও আমাদের দেশের পরিকল্পনাবিদদের ভাবনাচিন্তার এলাকায় এখনও লকডাউন জারি রয়েছে। এদিকে যা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা চমকে ওঠার মত। যে পরিযায়ী শ্রমিকরা ঘরে ফিরেছেন তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশেরই জীবিকার সব উপায় ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরনো কাজের জায়গায় তারা কবে ফিরবেন, কীভাবে ফিরবেন, আবার ফিরলেও সেখানে তাদের সবার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা আছে কিনা অনিশ্চয়তা রয়েছে সে ব্যাপারেও। এসব নিয়ে দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা কী ভাবছেন তা জানা যায়নি। আমরা দেখলাম, দু’দিন আগে নিয়ম মত একটা অভিবাসী দিবস পালিত হল। সেই দিবসে তাদের দুঃখের রাত্রি কাটার কোন ইঙ্গিত মেলেনি।
বলা হচ্ছে, কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প এদের রোজগারের একটা উপায় হতে পারে। কিন্তু পরিসংখ্যানবিদদের হিসেবে MGNREGA –র মত প্রকল্প জীবিকার সংস্থান হবে তো মাত্র ৭ শতাংশ মানুষের। তাহলে বাকিরা কি করবেন! দেশের সংবিধানের সপ্তম তপশিল অনুযায়ী রাজ্যগুলির একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া শ্রমিকদের সমস্যার সমাধানের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এব্যাপারে কী করছেন তা এখনও আমরা জানিনা। শুনলাম, অভিবাসী শ্রমিকদের দুঃখ,দুর্দশা তুলে ধরতে একটা মিউজিয়াম হয়েছে।
টিকা এসে যাচ্ছে, কোভিডের মৃত্যুমিছিল আস্তে আস্তে কমছে, কিন্তু এই অতিমারি পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজকর্মের যে অবস্থা তৈরি করে গেল সেই সঙ্কট মেটানোর কোন আন্তরিক উদ্যোগ এখনও চোখে পড়ছে না। অথচ কোভিড মোকাবিলায় ইউনিভার্সাল ডিসেন্ট ওয়ার্ক অ্যাজেন্ডা একটা স্বীকৃত পন্থা। এটা না করা গেলে শুধু টিকায় অতিমারির বিপদ কাটবে না।

দেশের ৭.৮২ কোটি অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে বেশিরভাগেরই গন্তব্যস্থল শহর। সেখানে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক নয়। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী এদের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা আছে। সরকার তা দিতেও চাইছেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের তা পাওয়ার অধিকারও আছে। কিন্তু উপযুক্ত পরিসংখ্যানের অভাবে তা এদের দেওয়া যাচ্ছেনা। সঠিক তথ্য না থাকা, ফর্ম পূরণে বিভ্রাট, সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আন্তরিকতার অভাব এর একটা বড় কারণ। এ যেন অক্ষর পরিচয়ের সময়ে ছোটবেলায় পড়া ‘দোয়াত আছে কালি নেই’ এর মত অবস্থা।
অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাওয়া; অনুন্নত জায়গা থেকে উন্নত জায়গার দিকে যাওয়া; কম রোজগার থেকে বেশি রোজগারের দিকে যাওয়াটাই পরিযায়ী হওয়ার নিয়ম। এই অবস্থাটা না বদলালে আভ্যন্তরীণ অভিবাসনের সমস্যাটা কমবে না। আরেকটা কথা মাথায় রাখতে হবে, শ্রমিকরা শুধু একাই কাজ করতে যান না, অনেকের সঙ্গে যান তাদের পরিবার। এদের একটা বড় অংশ মহিলা। এদের শিক্ষা, বিবাহ ইত্যাদি নানা সমস্যা থাকে, এরা পড়েছেন আরও বেশি মুশকিলে। অভিবাসন সঙ্কট সমাধানে এই ব্যাপারটা একেবারেই গুরুত্ব পাচ্ছেনা। সমাধান হচ্ছেনা তাদের ওপর পুলিশি নিগ্রহ, তোলাবাজি বা যৌন নিগ্রহের। কর্মস্থলে ফিরলেও কিন্তু এই সমস্যাগুলি থেকে যাচ্ছে। শুধু আইন নয়, শুধু সরকারি সিদ্ধান্ত নয়, কেন্দ্র কিংবা রাজ্যের পরস্পরের ওপর দোষ চাপানো নয়, সমস্যা সমাধানে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্কট কোন দিন মিটবে না। আবার কোন নতুন সঙ্কটের মুখে তার বিস্ফোরণ ঘটবে।