কতটা পথ পেরলে তবে নজরে পড়া যাবে— না, বলাটা ভুল হলো, পথে পড়ে কতজনের মৃত্যু হলে নজরে পড়া যাবে। পরিযায়ী শ্রমিকদের মনে এই প্রশ্ন জেগেছিল কিনা জানিনা। তবে লকডাউনের সময় পথদুর্ঘটনায়, ট্রেনের চাকায় ছিন্নভিন্ন হয়ে, যোজন যোজন পথ হাঁটার ক্লান্তিতে, অনটনে বহু পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যুতে তারা মানুষের নজরে পড়ে ছিলেন। এবার তাঁরা সরকারের নজরে পড়লেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের দুরবস্থার ছবি দেখে যখন আমাদের লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছিল তখন জানা গিয়েছিল তাঁদের সংখ্যা নিয়ে কেন্দ্র রাজ্য কোনও সরকারের কাছেই নির্দিষ্ট তথ্য নেই। অথচ পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজ, কাজের জায়গায় বাসস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নাকি সরকারের অনেক আইন রয়েছে। আর সেই সব আইন তিন দশকের পুরনো।
গত মার্চ, এপ্রিল মাসে যখন পরিযায়ী শ্রমিকরা অবর্ণনীয় অবস্থায় পড়েছিলেন, তখন গোটা পর্বে অদৃশ্য ছিল কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রক ও তার ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী। সুখের কথা অবশেষে তাঁরা দৃশ্যমান হয়েছেন। পরিযায়ী শ্রমিক এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের জন্য তথ্য ভান্ডার গড়তে চেয়ে বিভিন্ন মন্ত্রকের সাহায্য চেয়েছে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রক। মন্ত্রকের আশা আগামী বছরের মে-জুন মাসের মধ্যে এই কাজ শেষ করা যাবে। শ্রমমন্ত্রক জানিয়েছে, ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প, এক দেশ এক রেশন কার্ড, এমপ্লয়িজ স্টেট ইনসিওরেন্স কর্পোরেশন এবং এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশনে যে তথ্য রয়েছে তা থেকেই তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা হবে। অর্থাৎ হাত বাড়ালেই যে তথ্য পাওয়া যেত, তার জন্য পথেঘাটে পড়ে লাশ হতে হলো শ্রমিকদের।

বাজার অর্থনীতিতে এক নতুনশ্রেণীর কর্মী তৈরি হয়েছে যাদের বলা হচ্ছে ‘গিগ ওয়ার্কার’। শ্রম-অর্থনীতিতে এই শব্দবন্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবদান। আমেরিকায় স্বল্প মেয়াদের চুক্তিতে বিভিন্ন পরিষেবা ক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের বলা হচ্ছে ‘গিগ ওয়ার্কার’। আমাদের দেশে স্যুইগি, জোম্যাটো প্রভৃতি সংস্থায় যাঁরা বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দেন তাঁরা এই পর্যায়ে পরেন। শ্রমমন্ত্রকের তথ্য ভান্ডারে দেশের ‘গিগ ওয়ার্কার’দেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তথ্যভান্ডার তৈরি হলে সরকার বাহাদুরের জানা থাকবে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কতজন শ্রমিক কোথায় কাজ করেন। পরিযায়ী শ্রমিকরা কোন রাজ্য থেকে কতজন কোথায় কাজ করতে যাচ্ছেন তার পরিসংখ্যান ও থাকবে। প্রশ্ন হলো—এতে কি তাঁরা যে আইনি অধিকার পাওয়ার কথা তা পাবেন? তাঁরা কি সামাজিক সুরক্ষা এবং কাজের সম্মানজনক পরিবেশ পাবেন? এর কোনও উত্তর নেই।
দেশ জুড়ে লকডাউন শুরু হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তার মাঝে পড়েন পরিযায়ী শ্রমিকরা। সেই সময় কেন্দ্র-রাজ্য সরকার যেমন হাত গুটিয়ে বসেছিল তেমনই নিশ্চুপ ছিলেন মালিকরাও। যে রাজ্য থেকে এই শ্রমিকরা বিভিন্ন রাজ্যে কাজে গিয়েছিলেন, সেই রাজ্য সরকারগুলিও দায় ঝেড়ে ফেলেছিল। এই অবস্থায় মাইলের পর মাইল হেঁটে ভিটেতে ফিরতে গিয়ে কি অবস্থা হয়েছিল অসহায় মানুষগুলোর তা আমরা দেখেছি। কাজ হারিয়ে অন্ন জোগাড় করতে না পেরে, কর্মক্ষেত্রে বাসস্থানের ভাড়া দিতে না পেরেই তাঁরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছিলেন। অথচ ১৯৭৯ সালের আন্তরাজ্য পরিযায়ী কর্মী আইন বলছে যাঁরা এই শ্রমিকদের কাজে নিয়োগ করবেন সেই সব সংস্থার নিবন্ধিত হওয়া আবশ্যিক। পাশাপাশি যে সমস্ত ঠিকাদার শ্রমিকদের যোগান দেবেন তাদেরও লাইসেন্স থাকা বাধ্যতা মূলক। বাস্তব পরিস্থিতি বলছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই আইন মানা হয় না। এই আইনের যদি বাস্তব প্রয়োগ হতো তাহলে মালিকপক্ষ এবং ঠিকাদাররা মুখ ফিরিয়ে বসে থাকতে পারতেন না। এমনকি আইন মানা হলে আজ এই তথ্য ভান্ডার গঠনের প্রয়োজন পড়তো না। সেক্ষেত্রে কেন্দ্র-রাজ্য দুই সরকারের কাছেই নির্দিষ্ট তথ্য থাকতো। এবং সদিচ্ছা থাকলে হয়তো ওই বিপন্ন পরিযায়ী শ্রমিকদের পথে-ঘাটে পড়ে মরতে হতো না। বিলম্ব হলেও অবশেষে বোধোদয় হয়েছে কেন্দ্রের। তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে শুধুমাত্র তথ্যভান্ডার তৈরি করে দায়িত্ব ঝেড়ে ফেললে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন হবে না।