সময়টা দেশের স্বাধীনতার বছর, একই সঙ্গে দেশভাগ। পরাধীনতার হীনতা থেকে রেহাই মিললেও টুকরো হল দেশ, তারই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রক্তাত্ত হল স্বাধীন দেশের মাটি। এমন এক ভয়ংকর সময়ে পাকিস্তানের একটি শিখ পরিবারের জীবনে নেমে এল চরম অন্ধকার। ওই পরিবারের একটি ছেলের বয়স তখন মাত্র ১২ বছর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই কিশোরটির চোখের সামনেই মেরে ফেলা হল তার বাবা-মা এমনকি তার চেয়েও বয়সে ছোট ভাই-বোনদের। মারা যাওয়ার আগে ছেলেটির বাবা শেষবার চিৎকার করে বলে উঠেছিলেন, ‘ভাগ যা বেটা ভাগ যা!’
ঠিক তার পরমুহুর্তেই মৃত্যুর হাত থেকে জীবন বাঁচাতে ছেলেটি যে দৌড়তে শুরু করল, সে দৌড় যেন আর তার থামে না। বাস্তবিকই সেই দৌড় থেকে তাঁকে আর থামানো যায়নি।লোকালয় থেকে প্রান্তর, সবুজ থেকে রুক্ষ, নগর থেকে গ্রাম পিছনে ফেলে ছেলেটি ছুটেই চলল। তাকে পিছন থেকে তখনও যেন তাড়া করে চলেছে দাঙ্গাবাজরা। আর সে শুনছে তার বাবার চিৎকার- ভাগ বেটা ভাগ।

যদিও ছেলেটি দৌড়চ্ছে আরও ছোটবেলে থেকে। সে যে গ্রামে থাকত, সেখান থেকে তার ইস্কুল ছিল দশ কিলোমিটার দূরে। পুরো পথটাই সে প্রতিদিন ছুটতে ছুটতে যেত। ভাই-বোন মিলে তারা সংখ্যায় ছিল পনেরো জন। দেশ ভাগ হওয়ার আগেই কয়েকজন নানা কাজে এদিকে চলে এসেছিল, বাকিরা মারা যায় দাঙ্গায়। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য প্রায়শই ভেসে উঠত তার চোখের সামনে। তাই সে ঠিক করেছিল ডাকাত হবে। তার এক দাদা যে আগেই এদেশে এসেছিল, ভাইকে বুঝিয়েছিল তার চেয়ে সেনাবাহিনিতে যোগ দাও। সৈনিক হয়ে যুদ্ধ করে যাদি মৃত্যুও হয় তবু একই সঙ্গে প্রতিশোধ নেওয়া হবে আর অমরও হওয়া যাবে।
হ্যাঁ, গল্পটা সেই মিলখা সিংয়ের। এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জেতা, অলিম্পিকে ইতিহাস তৈরি করা ভারতের কিংবদন্তি অ্যাথলেট মিলখা সিং। যে ছেলেটি মাত্র বারোতেই সব হারিয়েছিল। ঘর ছিল না। খাওয়াও জুটত না রোজ। ছোটখাটো অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছিল দু-এক বার। ব্যর্থতার অতলে তলিয়ে গিয়েও আবার ভেসে ওঠা। যেন অদম্য লড়াই তাঁকে ব্যর্থতার অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসে। রাস্তার রেস্তোরাঁর বয় থেকে ভারতীয় আর্মিতে, তারপর রেসের ট্র্যাক। সব যোদ্ধাদের জীবনযুদ্ধের গল্প প্রায়শই একই খাতে বয়। কিন্তু মিলখাকে অপেক্ষা করতে হয়। কারণ সাফল্য তাঁকে ছুঁলেও ধরা দেয় না।
শুধুমাত্র দু’জন অ্যাথলেটের দৌড় দেখতে একটি স্টেডিয়ামে সাত হাজার মানুষ ভীড় জমিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন উদ্যোগী দেশের প্রধানমন্ত্রীও। প্রতিযোগীরা হলেন ভারতের মিলখা সিং আর পাকিস্তানের আবদুল খালেক। উদ্যোগী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আয়ুব খান নিজে মিলখাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এই ঘটনার বছর দুই আগে ১৯৫৮ সালের এশিয়ান গেমসে মিলখা সিং আবদুল খালেককে পিছনে রেখে সোনার পদক জিতেছিল। তাঁর সঙ্গে ফের দৌড়ের প্রতিযোগীতায় নামতে হবে কেন? মিলখা সিং-তো প্রথমবার কিছুতেই পাকিস্তান যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। তাছাড়া মিলখার হৃদয়ে তখনও মুজফফরগড়ের গোবিন্দপুরের গভীর ক্ষত দগদগে হয়ে রয়েছে। গোবিন্দপুর মানে তাঁর বসতবাটি; পরবর্তীতে যে অঞ্চল পাকিস্তানের অতর্ভূক্ত হয়।

আয়ুব খানের অনুরোধে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুও মিলখকে অনেক বোঝালেন, তাকে উদ্বুদ্ধ করলেন। শেষপর্যন্ত মিলখা পাকিস্তানে গিয়ে আবদুল খালেকের সঙ্গে প্রতিযোগীতায় নামলেন, এবারও খালেককে তিনি পিছনেই রাখলেন। পাক প্রধানমন্ত্রী আয়ুব খান তাঁর ভাষনে বললেন মিলখা দৌড়ায় না উড়ে যায়। তিনি আসলে উড়ন্ত শিখ। এরপর থেকে মিলখা পরিচিত হয়ে গেলেন উড়ন্ত শিখ নামে।
সাফল্য মিলখাকে এমনি এমনি ধরা দেয় নি। শীর্ষে পৌঁছাতে মিলখাকে অনেক ঘাম ঝড়াতে হয়েছে। একবার তো নয় বারবার ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। কিন্তু হার মানেন নি। আবার চেষ্টা করেছেন। সেনাবাহিনি ঢুকে মিলখা প্রতিদিন নিয়ম করে পাঁচ ঘন্টা একটানা অনুশীলন করতেন। দৌড়ে পাহাড়ে ওঠা, নদী থেকে স্নান সেরে ভিজে শরীরে বালির ওপর দিয়ে দৌড়, মিটার গেজ ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুট চলতেই থাকল। মিলখা ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে ভারতের হয়ে ২০০ মিতার আর ৪০০ মিটার দৌড়ে প্রতিযোগীতায় হিট পার হতে পারেন না। তবে এখানেই তাঁর সঙ্গে চার্লস জোনকিনসের আলাপ হয়। তার থেকেই জানতে পারেন কিভাবে অনুশীলন করতে হবে। দেশে ফিরে মিলখা আবার নতুন করে শুরু করলেন। এরপর ১৯৫৮ তে জাতীয় ক্রীড়ায় ২০০ ও ৪০০ মিটারে রেকর্ড। কার্ডিফ কমনওয়েলথে প্রথম ভারতিয় হিসেবে সোনার মেডেল। টোকিও এশিয়ান গেমসে সোনা। সাফল্য এবার মিলখার পিছনে ছুটতে শুরু করে।
শেষ প্যারাটায় তিনটে বানান…ঝরাতে/সেনাবাহিনী/মিটার হবে, আরেকটা তথ্য : দর্শকসংখ্যা ছিল প্রায়
৬০,০০০…সাতহাজার নয়…
লেখটা বেশ সুন্দর চলছিল। হঠাৎ যেন শেষ লাইন এসে গেল ????
অলিম্পিকে ইতিহাস তৈরি করা ভারতের কিংবদন্তি অ্যাথলেট মিলখা সিং-কে তাঁর দেশ কি সম্মান দিয়েছে? তিনি তো তাঁর
দেশকে সর্বোচ্চ সম্মান এনে দিয়েছেন, সেই মেডেল নিজের কাছেও রাখেন নি।