পদ্মাসন, মুক্ত পদ্মাসন না বীরাসন বা সুখাসন—ধ্যানাসনটা ঠিক কেমন হওয়া উচিত সেটা বড় কথা নয়, আসল লক্ষ্যটা হলো মনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতেও মনকে শান্ত রাখা। মাথা ঠান্ডা রেখে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করা। দীপান্বিতা-দীপাবলির মতো ঘন অন্ধকারের বুক চিরে সংযম আর ভালোবাসার আলোয় আলোকিত করে তোলা মনকে। সেই সঙ্গে ইতিবাচক চিন্তাধারায় ভরিয়ে তোলা নিজেকে। মন বলতে ঠিক কী বোঝায় তা নিয়ে অবশ্যই মতভেদ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। মনোবিদ্যাতেও এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। তবে আসল কথাটা হলো দেহ আর মনের ঘনিষ্ঠ সংযোগ। দেহ এবং মনের সুস্থতা অবশ্যই নির্ভরশীল যে বিষয়টার ওপরে। আর এই বিষয়টাকেই অনেকটা নিশ্চিত করে তোলে ধ্যান বা মেডিটেশন। মনের সঠিক সংজ্ঞা বা অবস্থান নিয়ে যাঁরা অন্ধকারে তাঁদের অনেকেই মনের কথা বলতে গিয়ে হাত দিয়ে স্পর্শ করেন নিজেদের বুক। ভাবখানা এমন, যেন হৃদযন্ত্রের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে অবুঝ মন। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বিজ্ঞান আর আধ্মাতিকতাবাদের মধ্যে যাঁরা সেতুবন্ধনে উদ্যোগী তাঁদের মতে, “Mind is the faculty by virtue of which we are able to be conscious and aware of ourselves. Consciousness and awareness of self and others are the basic characteristics of mind…”
শরীরকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্ক, কোন্ট্রোলরুমের মতো মস্তিষ্ককেও তেমনি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে এই মনেরই। আবার এই মনকে নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি হাতে পেতে হলে নিয়মিত অভ্যাস করতে হবে ধ্যান বা মেডিটেশন। গভীর একাগ্রতার অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে মনের দরজা বন্ধ রাখতে হবে কিছুক্ষণের জন্য। বিচ্ছিন্ন করতে হবে বহির্জগতকে। ডুব দিতে হবে মনের গভীরে। বিসর্জন দিতে হবে অবচেতনে লুকিয়ে থাকা ইচ্ছে, আবেগ, রাগ, দুঃখ, ঈর্ষাকে। এই ভাবেই একটা বিন্দুতে যেন ক্রমশ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে শরীরবিদ্যা, মনোবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং অবশ্যই গোটা জীবনদর্শন।
চিকিৎসকদের চোখে
কথা হচ্ছিল বিশিষ্ট স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাঁর ভাষায়, মেডিটেশন বা ধ্যান আসলে চিন্তাহীন একাগ্রতা। মানুষের মনে আর দেহে এর প্রভাব নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে বিশ্বজুড়ে। চলছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। অনেক কিছুই এখনও দাঁড়িয়ে আছে জানা-অজানার সীমান্তে। তবে অবসাদ, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, ভয় থেকে মানব-মনকে মুক্ত করতে ধ্যানের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। সঠিক পদ্ধতিতে নিয়মিত ধ্যান করতে পারলে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব উচ্চ রক্তচাপকে। মুক্তি মেলে মাইগ্রেইন বা মাথাধরা থেকেও। শিথিলকরণের এই অনুশীলন আনে মনের প্রশান্তি, ধৈর্য, বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। দেয় পরিস্থিতি মোকাবিলার শিক্ষা আর সঠিক দিশা। নিয়ন্ত্রিত করে উত্তেজনা আর রাগকেও। নিশ্চিত করে সুস্থ বিচারবুদ্ধি। বৃদ্ধি পায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। গবেষণা চলছে। তাই এখনই উপসংহার টানা যাচ্ছে না। তবে যতটুকু জানা যাচ্ছে তা বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে, সেরিব্রাম বা গুরুমস্তিষ্কের ফ্রন্টাল আর টেম্পোরাল লোবের ওপরে ঠিক কতোটা প্রভাব বিস্তার করে এই ধ্যান। অবশ্য এটা বাস্তব যে নিয়মিত মেডিটেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে বিভিন্ন হর্মোনের ক্ষরণের ক্ষেত্রেও। নিয়ন্ত্রিত করে এর কর্মতৎপরতকে। নিয়ম মেনে অন্তত আট সপ্তাহ ধ্যান করতে পারলে দেহ আর মনে এর ইতিবাচক প্রভাবটা অনুভূত হতে পারে কিছুটা।
অন্যদিকে ধ্যানের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সায়নদীপ ঘোষ জোর দিয়েছেন রিল্যাক্সেশন থেরাপির ওপরেই। তাঁর কথায়, রিল্যাক্সেশন থেরাপির অঙ্গ হিসেবে সারা বিশ্বে এখন স্বীকৃত এই ধ্যান। মানসিক উদ্বেগ আর অবসাদ দূর করে চিন্তাধারাকে সঠিক পথে চালিত করতে ধ্যানের ইতিবাচক প্রভাব এখন পরীক্ষিত সত্য। আর মন অবসাদ-উদ্বেগ-দুশ্চিন্তামুক্ত হলে, তরতাজা হলে, আনন্দে ভরে উঠলে স্বাভাবিকভাবেই তার সুফল ভোগ করে শারীরিক ক্রিয়াকলাপ। সেই পথ ধরেই আসে সুস্থ জীবনধারা।
বিজ্ঞান ও আধ্মাতিকতাবাদ
ধ্যানের তাৎপর্যের প্রশ্নে এখন বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা দিচ্ছে আধ্মাতিকতাবাদও। ধ্যান তথা একাগ্রতা মানবমস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলির নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে কীভাবর, কেমন করে অন্তক্ষরা গ্রন্থিগুলিরও কাজকর্মের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে, ছন্দ আনে শ্বাস-প্রশ্বাসে, রক্ত সঞ্চালনে—সেই বিশ্লেষণও এখন মিলছে আধ্মাতিকতার প্রচারকদের কাছ থেকে। মনের এবং দেহের সুস্থতার জন্য চিকিৎসাশাস্ত্রেও মেডিটেশন বা রাজযোগ ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে উঠছে বলে দাবি করেছে একটি আন্তর্জাতিক আধ্মাত্মিক প্রতিষ্ঠান। বলা হয়েছে, হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস, পেপটিক আলসার বা ব্রঙ্কিয়াল অ্যাসমার মতো যে সব অসুখের অন্যতম প্রধান কারণ মানসিক চাপ বা উদ্বেগ—যা থেকে জন্ম নিতে পারে আরও জটিল শারীরিক সমস্যা, সেখানে শুধুমাত্র ওষুধ প্রয়োগই সব সময় যথেষ্ট নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে কিন্তু সমস্যা সমাধানের পথ এই রাজযোগ বা ধ্যানই। নিয়ম করে কিছুটা সময় বের করে ডুব দিতে হবে মনের গভীরে। ভঙ্গীমা যাই হোক না কেন। মস্তিষ্কের আলফা, বিটা, থিটা এবং ডেল্টা তরঙ্গের ক্ষেত্রেও ধ্যানের ইতিবাচক প্রভাব এখন রীতিমতো গবেষণার বিষয়। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গের প্রকৃতি জানার চেষ্টা চলছে ই ই জির মাধ্যমে। আসলে মস্তিষ্ক তথা স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মন এবং দেহের যে ইন্দ্রীয়-অনুভূতির বন্ধন, তার থেকে মনকে মুক্ত করার অনুশীলনই হলো ধ্যান। মন শান্ত হলে, ভয়মুক্ত হলে, একাগ্রতা বাড়লে স্বাভাবিক ছন্দেই উন্নত হয়ে ওঠে মানুষের চিন্তাধারা, বিচারবুদ্ধি, স্মৃতিশক্তি। ক্ষমতা বাড়ে প্রতিকূলতার মোকাবিলা করার। দূরে সরে যায় অমূলক ভয়। সাহস জোগায় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার। ফলে শরীরের কাছ থেকেও আশা করা যায় ইতিবাচক সাড়া—যার প্রভাব মস্তিষ্ক, ফুসফুস কিংবা হৃদযন্ত্রে পড়তে বাধ্য। হাইপোথ্যালামাসের কল্যাণে সম্ভবত একইভাবে প্রভাবিত হয় পিটুইটারি, থাইরয়েড আর অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ডও। গতিশীল হয়ে ওঠে পরিপাক এবং বিপাক-ক্রিয়া। রোগ সরে যায় দূরে। তাই রোগমুক্তির জন্য শুধু রোগীরাই নন, সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আজকাল নিয়মিত ধ্যানাসনে বসছেন বহু চিকিৎসকও। সঙ্গে প্রাণায়ামও। গভীর শ্বাস প্রশ্বাস অভ্যাসের পাশাপাশি ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ। রোগ-বাতিক বা হাইপোকোনড্রিয়াসিস থেকেও মুক্তি পেতে অনবদ্য এই একাগ্রতার অনুশীলন।
অন্তরের সৌন্দর্য
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ধ্যানের মাধ্যমেই জেগে ওঠে মানুষের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য। কী সেই ‘ইনার বিউটি’? প্রেম, ভালোবাসা, বিশ্বাস, আনন্দ, সাহসিকতা, সততা, কর্তব্যপরায়ণতা, আত্মবিশ্বাস, নম্রতা, মিষ্টত্ব, ক্লান্তিহীনতা, নিয়মানুবর্তিতা, সহনশীলতা, নমনীয়তা, স্বাস্থ্যসচেতনতা, স্থিতিশীলতা, দয়া, আনুগত্য, ধৈর্য, শুদ্ধতা, সরলতা, বন্ধুত্ব-সুসম্পর্কের ইচ্ছে, জ্ঞান, শ্রদ্ধাবোধ, কৃতজ্ঞতাবোধ—সব মিলিয়ে একটা আদর্শ ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করে ধ্যান।
এবং ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট
শিক্ষা এবং রাজনীতির জগতে, সরকারে কিংবা কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডেও এখন মেডিটেশনের যুগ। পরীক্ষায় সাফল্য, নেতৃত্বে সাফল্য, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি কিংবা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট—মুশকিল আসানের পথ দেখাচ্ছে এই মেডিটেশনই। পৃথিবীর বহু উন্নত দেশে ম্যানেজমেন্ট ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হয় মেডিটেশনের। কোম্পানি পরিচালনার দক্ষতা অর্জনে কীভাবে সাহায্য করে এই একাগ্রতার অনুশীলন, হাতে-কলমে বুঝিয়ে দেওয়া হয় তা। আর আমাদের দেশেও তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রের কর্মীদের মধ্যে মেডিটেশনের প্রতি আগ্রহ বেড়েই চলেছে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। মেডিটেশন ক্যাম্প জায়গা করে নিচ্ছে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টেও। চিকিৎসক-মহলেও তো এখন ধ্যানের প্রতি আকর্ষণ বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও জোরদার করে তুলতে বহু ডাক্তারই এখন ধ্যান করছেন নিয়মিত। রোগ-মহামারীর বিরুদ্ধে কঠিন সংগ্রামে শক্তি জোগাচ্ছে এই ধ্যানই।
তন্ত্রপীঠের ভাবনায়
কী ভাবছেন তন্ত্রপীঠ তারাপীঠের পূজারীরা? মন্দির কমিটির সভাপতি তারাময় মুখোপাধ্যায়ের মতে, “তন্ত্র-মন্ত্র, শাস্ত্রমতে পুজো-অর্চনা যাই হোক না কেন আসল কথাটা হলো মনপ্রাণ দিয়ে মাকে ডাকা। আর তা আসলে ধ্যানেরই নামান্তর। বশিষ্ঠমুনি, সাধক বামাখ্যাপা সেটাই করেছিলেন। ধ্যানের মধ্যে দিয়েই মাতৃ-সাধনা। আজকের পুরোহিতরাও সেই পথের পথিক। দিনের শুরুতে আধঘন্টা ধ্যানের মধ্যে দিয়ে মনকে শান্ত আর পবিত্র করে নিই আমি। তারপরে পুজো-আর্চার পালা।”
নেই কোনও সীমারেখা আসলে মেডিটেশনের কোনও ভৌগলিক সীমারেখা নেই, কোনও ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক গণ্ডিও নেই। নাস্তিক-আস্তিকে ভেদাভেদও অর্থহীন। সেই কারণেই আত্মিক উন্নতির লক্ষ্যে, ইচ্ছেশক্তির পথ ধরে নানা নামে, নানা ভঙ্গীমায় এখন দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠছে একাগ্রতার এই অনুশীলন।
????????