মীরা কাজে যাবে না বলে হীরেণকে খুশি করে কিন্তু ধারকর্জ করতে বেরোয়। লেখকের ভাষায় “চরম বিদ্রোহ বুকে নিয়ে মীরা রাস্তায় নামে।” বিয়ে-না-করা পুষ্পার ফুলের মতো জীবন তার সান্নিধ্যে মীরা এবার যাবে, যেখানে আকাশ এখনো অভিমানে নীল হয়ে আছে, যে নিঃসঙ্গ ঘরের ছায়ায় ভালোবাসা মৃতবৎসার মতো পড়ে আছে, সেখানেই সে হাত পাতবে অথবা অমরেশের কাছে। গিয়ে দেখে ভোমরা-সেও টাকা চাইছে এসেছে। অভাব না হলে আসে, ভোমরা ইচ্ছে করছে একটু ড্রিঙ্ক করতে। পিঙ্গল চোখ, প্রশন্ত কাঁধ কোঁকড়ানো চুল, অমরেশ হাসে ভোমরা ভালবাসার কথা বলে। মীরা তো মদ-টদ খেতে টাকা চাইছে না, চাইছে প্রয়োজনে। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী দক্ষ চলচ্চিত্রকারের মত এবার চলে যান হীরেণের ঘরে বিপদবরণ এসেছে। মালতীকে চোখ দিয়ে নাক দিয়ে শোঁকে। সরবে জানায় ইনটেলেক্চ্যুয়াল ছবি আর আধুনিক কবিতা সে বোঝে না। মজুমদারও গলা বাড়ায় দরজায়। খাওয়া- ঘুম- খেলা মেজরিটি তো তাই চায়। বিপদকে বসিয়ে হীরেণ মজুমদারের ঘরে যায়। বিশদ জানে ওসব ইনেটেলেকচ্যুয়াল ছবি না কচুপোড়া-নিশ্চয়ই ল্যাংটো মেয়ের ছবি এঁকে রেখেছে শালা। এসব ছবি দেখে তাঁর মাথা ধরে। অনেক আকর্ষক “আধুনিক ঝি মালতী। মালতীকে বকশিস দিতে চায়-না থাক, ওতে মশায়ের দুদিনের বাজার খরচ চলবে। কিসের এত অহঙ্কার মালতীরা। কেউটে সাপ। বিপদ উষ্ণ হয়ে ওঠে, মালতীর প্রত্যখ্যানে অপমানিত। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী চলচ্চিত্রের পদ্ধতি গ্রহণ করেন। বলেন “এবার ও-ঘরে উঁকি দেওয়া যাক। একাই বোঝাতে চায় আটিস্টকে “একজন খারাপ হয়েচে বলে কি আপনি অ্যাবনর্মাল থাকবেন কেন। চাকরিতে ফিরে যান?” বেদনাবোধ থেকে ছবি এঁকেছেন, কিন্তু এখন কপর্দক শুন্য। ছবি বিক্রি হয় না। মজুমদার হীরেণের কাছে টাকা ধার চায়। হীরেণের স্ত্রীই তো টাকা ধার করে হীরেণকে রক্ষা করছে। হীরেণ আবার ঘরে ফিরে আসছে। বিপদ বসে বিপদ মজুমদারের ওপর খাপ্পা। সব শালাই মডার্ন-গর্দভটাকে বলো মালতীর রুপখানা তুলির টানে ফুটিয়ে তুলুক। “ঝি চাকর মালতী মেথর ধাঙড় রিকশাওয়ালাদের আমরা এড়িয়ে চলছি, দূরে সরিয়ে রাখছি, তাই আর্টেরও উন্নতি নেই। নেচার ফুটছে না, আড়ষ্টতা থেকে যাচ্ছে শিল্পে সাহিত্যে সংগীতে।” বিপদ সাবধান করে হীরেণকে ব্যাটাকে এক পয়সা যেন ধার না দেয়।
উপন্যাসটির নবম অধ্যায় বিশেষ গুরত্বপূর্ণ। এ অধ্যায় অমরেশের সঙ্গে মীরার মিথস্ক্রিয়া। এই উপন্যাসে একদিক থেকে মেয়েদের মধ্যে মালতী পজিটিভ চরিত্র আর পুরষদের মধ্যে অনেকটা অমরেশ। ভোমরার স্বপ্ন সংহারের, মীরার সেবার। কী ট্র্যাজেডি মানুষের জীবনে? সুইসাইড শব্দটি এই আলাপে আসে যেন আচমকা। অমরেশ বলে, বিয়ে জিনিসটার ওপর অশ্রদ্ধা দিন দিন বাড়ছে। বিয়ে ও প্রেম সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। ভোমরার কথা ঘুরে ফিরে আসে, যদিও অমরেশ এর মধ্যেই জানায় বিয়ের পর মীরা ঢের সুন্দর হয়েছে। অমরেশ মীরাকে টাকার দরকার হলে চুপ করে থাকতে বারণ করে। ভোমরা সাত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে গেল কেন? মীরা উত্তর দেয়-বিয়ে খারাপ না। জীবনটা নষ্ট হলো তো। অমরেশ বলে, আমি ভাবতেই পারি না কেন সাধ করে মানুষ ভালোবাসার পাখির পায়ে শিকল পরায়, সোনার শিকল রাতারাতি শিকল হয়ে যাচ্ছে তোমাদের।” অমরেশ-মীরা বাইরে যায়।
নাটকের পর্দা উঠছে যেন “গঙ্গার ধারে। নির্জন জায়গা। অপরাহ্ন। চলচ্চিত্রের ছবি একটি জাপানি জাহাজ ভেসে গেল সামনে দিয়ে। কমলা-রং ও অজস্র চিকরি-কাটা ছায়ায় ভরা এমন অদ্ভুত সুন্দর বিকেল অনেকদিন দেখেনি তারা। ঘাসফুলটির মতো ছোট্ট শাদা একটি প্রজাপতি মীরার মাথায় উড়লো কতক্ষণ, নেচে নেচে ঘুরলো।” কি করবে মীরা অমরেশ বলে দিক। ভোমরার দুঃখ চোখে দেখা যায়। অমরেশ অবাক চোখে প্রজাপতির নৃত্য দেখে ভারি সুন্দর জায়গা। অমরেশ ভাবতেই পারে না বিয়ের বছরটি না পুরতে ভাঙনের গান শুরু যে কি করে হয়। মীরা ভোমরার অবস্খা পর্যন্ত যেতে চায় না। তার স্বামী ঘরে বসে সব পাচ্ছে। অথচ মীরা যখন ঘরে ফেরে দেখে তার মুখ অন্ধকার, চোখে প্রশ্নর প্রখর বিদ্যুৎ। অমরেশ বোঝায়। আবার বলে ভোমরার থেকে মীরার অবস্খা আরও জটিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মীরা বিয়ে করে আমার কী সর্বনাশ হলো। কেন আমি বিয়ে করতে গেলাম, অমরেশ। মীরা পরামর্শ চায়। অমরেশ যন্ডাগুন্ডা মার্কা ছেলে। রেস খেলে, মদ খায়, নো ম্যারেজ ক্রীড মেনে নিয়ে মেয়েদের পিছু ছোটে। কিন্তু হীরেণের মতে মার্জিত রুচি সম্পন্ন মানুষ। মীরা প্রশস্ত কাঁধে অমরেশ একটু পেছনে হেলানো। “সূর্যের শেষ রশ্মি পড়ছে ওর পিঙ্গল চোখে। বাঘের চোখের মতো লাগছিলো অমরেশের সবুজ হরিদ্রাভ ঈষৎ রক্তিম চোখ। কিন্তু সেই চোখে হিংসার জ্বালা ছিলো না।” মীরার মনে পড়লো একটু আগে এক হোটেলে অমরেশ বীয়ার খাচ্ছিল “ সোনালী হরিদ্রাভ পানীয়ের মাথায় রক্তের ছিটার মতো লক্ষ-লক্ষ ফেনার রং ঘুরপাক খাচ্ছিলো। এই সংলাপে “সুইসাইড শব্দটি আবার আসে। মীরা আলাদা হতে চায়। অমরেশ তার জীবনদর্শন ব্যক্ত করে ভালোবাসা। ভাল মীরা, কিন্তু বিয়ে জিনিসটাই বাজে। তবেঅমরেশ মীরাকে অপেক্ষা করতে বলে, হীরেণের সুস্থ হওয়া পর্যন্ত। এককালে অমরেশ মীরাকেভালোবেসেছিল, ভোমরাও তাকে আকর্ষণ করেছিল। সে মীরাকে টাকা দেয় এই মীরা বলুক হীরেণের ধার-কর্য বস্খু করছ্যে স্বামীর স্বাস্খ্যর জন্য স্ত্রী একটু মিথ্যাচারিতার ছাড়পত্র ‘আধুনিক’ সমাজ দেয়। মীরা মীরা গঙগার উপরে তাকিয়ে দেখে কালো চিমনির পিছনে কান্তের মতো রুপালী চাঁদ। ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে। বস্খু হীরেণের ঘর থেকে অমরেশ তাকে এখানে এনেছে। অমরেশ পরামর্শদেয়, চাকরি করা খারাপ না, অনেক মেয়েই করছে, তবে হীরেণ যখন চায় না, তার মনে যখন এতে সন্দেহ তখন এখন থাক। অমরেশ উপমায় কথা বলে।।সিংহ অসুস্থ সুস্থ হয়ে সোনার হরিণকে।কি করে রাখে তার শেষ পরীক্ষাটা হয়ে যাক। অমরেশের গরম নিশ্বাস মীরার কানে গালে চুলে অধরে ওষ্ঠে। যেন ছোট্ট একটা ঝড় বয়ে গেল মীরার সমস্তর সত্তার ওপর দিয়ে -। অমরেশ চেকে টাকা দেয়। কত? এলোমেলো হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জোনাকি পোকাগুলো নেচে নেচে ঘুরছিলো। রেডরোডের আলোর ফুলকির সঙ্গে আড়াআড়ি করে ওরা মাঠের অন্ধকার বিদূরণের চেষ্টা করছিলো কি: মীরার শেষ সিদ্ধান্ত, বিয়ে না করলে মানুষের মন কত ভালো থাকে, তাই ভাবচি। অর্থাৎ অমরেশের মন অমরেশ মীরার গালে চুম্বন করে। দূরে চৌরঙ্গির লাল, বেগুনি, সবুজ আলোর ঢেউগুলি থরথর করে কাঁপছিলো। এ যেন মীরাই। তবে বিয়ে করলে অমরেশ কেমন হতো? বিবাহিত জীবন সম্পর্কে অনভিজ্ঞ, যেন অসহায়, নিশ্চয়ই অমরেশ স্বামী হলে তার সন্তান প্রীতির ঠেলায় অ্যাদ্দিনে মীরার স্বাস্খ্য থাকত না। বস্তুতঃ অমরেশ যে মীরাকে মুক্তি দেয় তা এ আবেগঘন ভালোবাসার, বিবাহ এই ভালোবাসাকে নানাভাবে মারে? জীবনের প্রখর দুপরে মীরার এই চূড়ান্ত ভাবনায় দাঁড়ায়।
উপন্যাসটির উন্মোচনের শীর্ষবিন্দু এই অধ্যায়, এরপর ক্রিয়ার ক্রমশ নীচের দিকে আসা। ফিরতে দেরি হচ্ছে, হীরেণ কি বলতে পারে, হীরেণ কি করছে তার এই ভাবনাই আঁকা হয়। বাস্তব সংলাপ নয়। হীরেণ নির্লজ্জ হলে মীরাও জিহবা চোখা করবে। হীরেণ ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিসমেন্ট পড়বে। পড়বে, উঠবে-বলবে, মুখ খুলবে। অমরেশ সম্পর্কে হীরেণ কটূক্তি করবে। রাত এগারোটাতে মীরা ধর্মতলা স্ট্রীটে। এই ভবিষ্যতে, নিকট ভবিষ্যতে বাড়ি ফিরলে কি হবে, এটা ভাবার অর্থ বর্তমানের সম্পর্ক মনের দিক থেকে প্রায় ছিন্ন। আর আত্মমগ্ন মীরা এক আকস্মিকের সম্মুখীন-বাসে একজন পকেটমার সন্দেহে ধরা পড়ে। সে আর কেউ নয়, আটিস্ট মজুমদার। সিআইডি মীরার স্বামীর নাম, বাড়ির নম্বর জানলো- কারণ সে বলেছে এক ‘আমি চিনি। আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। অতি সৎজন ও আটিস্ট’, দুজনে বাস থেকে নামে, একটু জ্যোৎস্না, একটু বিজলী আলো, ফুরফুরে হাওয়া ও কৃষ্ণচূড়ার ঝিলমিলে ছায়াভরা নির্জন পেভমেন্টের পটভূমিকায় দুজনে দাঁড়িয়ে। আবার মীরা ভাবে, হীরেণ কি বলবে, সে কি বলবে। মীরা ও মজুমদার চায়ের দোকানে ঢোকে। মজুমদার জানায় তার এক মডেল ছিল। যখন আঁকলো তখন দেখা গেল প্রত্যেকটি রেখা তাকে বিড করেছে। আটিস্ট মীরা কষ্ট সহিষ্ণুতার কথা বলে। বাসে বিপন্ন অবস্খায় সে মীরার রূপ দেখে ছিল, রূপের মন্দিরে জ্বলছে ত্যাগ তিতিক্ষা আর সংযম। ইউ আর বিউটি অব বিউটিজ। একটা সুন্দর শিহরণ মীরার কাঁধ বেয়ে। কিন্তু মীরার বলতে ইচ্ছে করছে, মিথ্যে, এসবের মূল্য কেউ দেয়নি, মডেল হিসাবে কতদূর কাজে লাগবো? কিন্তু বলতে পারে না। এর মধ্যে বিপদবরণ আসে রেশনের পাওয়া উদবৃত্ত চিনি দোকানে বিক্রয় করতে। আটিস্ট মৃগাঙ্গ মজুমদারকে আক্রমণ করে কথার ছুরিতে। মীরা সম্পর্কেও দোকনের মালিক বন্ধু নিরাপদর কাছে কটাক্ষকরতে ছাড়ে না। এখানেও বিপদবরণ আর্ট সম্পর্কে তার মতামত সরবে প্রকাশ করে। মালতীর প্রসঙ্গ তোলে।
আজ মীরা ঘরে ফিরে দেখে অন্যদিনের মতো হীরেণ বসে অপেক্ষা করছে না। অন্যদিন “এই ইনটেলেকচুয়্যাল মনের ভাব গোপন করে, মীরাও বাইরের জীবনে যা ঘটে অক্লেশে তা গোপন রাখে। আজ দেখে ঘুমের ওষুধ খেয়ে হীরেণ ঘুমোচ্ছে। হীরেণ জেগে থাকলে নগ্ন দেহে আয়নায় দাঁড়ানো তার পক্ষে অসম্ভব হতো, ঘুমন্ত হীরেণের জায়গায় টেবিলে ঘুমের ওষুধের শিশিটা সেই কাজ করছে। অমরেশের চেকটা নেবে, না ফিরিয়ে দেবে? ফিরিয়ে দিলে অমরেশ শকড হবে, মীরা তা চায় না। পেয়ে নয়, ত্যাগ করে অমরেশের সুখ। মীরা স্বামী নিয়ে সুখে থাকুক অমরেশ এটা দেখেই তৃপ্ত। কোনো পুরষ এভাবে কি তৃপ্ত থাকতে পারে? অমরেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না মীরা। টাকা ফেরত দিলে অমরেশ ভাববে, মীরার পাতিব্রত্যই প্রকট। হীরেণ তোমার পাতিব্রত্যের কোন দামই দেয় না।
এর পরের পরিচ্ছেদে, ভারি মনেরম সকাল। হীরেণ -মীরার সম্পর্কের মায়া। এই সকালেই মালতীর কাছে টাকা চায় তারা-কর্জা এক ধার করা অস্তিত্ব তাদের-বাড়ির কাজের লোকের দেওয়াটাকায় হীরেণই বাজার করতে চায়। ঘরে বসেই পাঁচটাকা ধার পাওয়া গেল। হীরেণ কতদিন পরে বাজারে যায়। যেন দুজনের মধ্যে সম্পর্কের কুয়াশা এ সকালে কাটতে চায়। কিন্তু কাটে না। অমরেশ চায় হীরেণের কথা শুনে মীরা বাড়িতেই থাক- স্বামীকে ফাঁকি দেয়া ভালোবাসায় অমরেশের আস্খা কম। সে অপেক্ষা করবে। মীরার ইনটেলেকচুয়্যাল মনের বিশ্লেষণীতে দুই পুরষ চরিত্র এক হয়ে গেল। ঈর্ষা, সন্দেহ, হীনতায় হীরেণ তেমনি অর্থ, উদারতা ও অতিমানবীয় ত্যাগের দাঁড়িপাল্লায় প্রেমকে ওজন করতে চায় অমরেশ। রক্তমাংসের মীরার দুয়ারে কাছে অনুপস্থিত। হীরেণ বাজারে যায়। বাইরে হেমন্তের আচর্য সুন্দর রৌদ্রে প্রজাপতি ঘুরে ঘুরে নেচে আইভিলতার সঙ্গে প্রেম করছে যেন। মৃগাঙ্ক মীরার ঘরে। মীরা মৃগাঙ্কের ঘরে-মৃগাঙ্ক স্তুতি করতে থাকে মীরার। মীরার চোখে রং, মৃগাঙ্কর চোখেও। বলদৃপ্ত কঠিন বাহু বাড়িয়ে মীরাকে আকর্ষণ করে মৃগাঙ্ক। পাশের ঘরে শব্দ। রক্তের নদীতে হীরেণ ঢলে পড়েছে। রেজার ও রক্ত আর তার পাশে একটা খবরের কাগজ তাতে গতরাতের বাসের ঘটনা, এক নারীর নিজের স্বামী বলে বাঁচানোর চেষ্টা তারা পাশাপাশি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। বিপদবরণ ওই কাগজ হীরেণকে দিয়েছে, মালতী দেখেছে। মীরা ঠান্ডা মাথায়, কাগজটা পোড়াতে বলল মালতীকে। অমরেশের চেক, খবরের কাগজ, রেস্টুরেন্টের খবর বিপদবরণ, সব ঈর্ষায় জজরিত হীরেণকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে গেল। মৃগাঙ্ক মনে করে, হীরেণ অনেক দিনেক দিন ধরেই ভুগছে। সব চেপে যান। মীরা-মৃগাঙ্ককেই তার নিকটতম ভাবে। খুঁজতে থাকে হীরেণের মেডিকেল রিপোর্টগুলো।
শেষ ঘটনার আগে মীরা আটিস্ট মৃগাঙ্কর কাছে। শিল্পী বলেছিল, সে ভুলে পুরনো ছবি, মুছে ফেলেছে সেই মডেল। ভোমরার মত স্ত্রীর আঘাত কাটিয়ে সে আজ মীরার মধ্যে নতুন মডেল পেয়ে গেছে। ভোমরাই যে মৃগাঙ্কর স্ত্রী উপন্যাসে এটি আর একটি আকস্মিক সমাপতন মীরা বলেছিল, অনন্ত রূপময় ব্রঘ্নাণ্ডে আপনি শুধু একটি রূপের ধ্যান নিয়ে শিল্প হতে চেয়েছিলেন। পুরষ হিসাবে আপনি দুর্বল, শিল্পী অনেক বড়ো। ভোমরাকে নিয়ে আপনি আমাকে ঠাট্টা করছেন। কেন করবো না, প্রত্যেক নারীই হিংসা করবে আপনাকে আপনার এই অবস্খা দেখলে। সহস্র রক্তচক্ষু যার, তার শুধ একটি জায়গায় দৃষ্টি রেখে পুড়ে মরে যেতে দেখা কোনো মেয়েই সহ্য করতে পারে না। মীরা যত্ন করে মৃগাঙ্ককে খাইয়েছে। মৃগাঙ্কর কথায় মীরা পরিতৃপ্তির গাঢ় নিশ্বাস ফেলে। অমরেশ কলেজে হীরেণের অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল- কেন ওকে না বলে অমরেশের চেক সে এনেছে একটা অপরাধ। অথচ চেকটা হীরেণেরই চিকিৎসার জন্য। বিনা দোষে এত বড় শান্তি মীরাকে দেবার অধিকার হীরেণের নেই। মৃগাঙ্কই তো দেখেছে হীরেনের জন্য মীরা কি করেছে।
আমরা আমাদের মত করে ‘মীরার দুপর’ পড়লাম। এ পড়ার সঙ্গে স্বয়ং ওপন্যাসিকের গড়ার গরমিল থাকতেই পারে। উপন্যাসটি সামায়িকতার নানা চিহ্ন বহন করছে। কিন্তু এ চিহ্নগুলি আপতিক, আমাদের গূঢ এমন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় ‘মীরার দুপুর’ যা আজ সমান প্রাসঙ্গিক। মীরা-হীরেণ, মীরা-অমরেশ, মীরা-মৃগাঙ্ক, ত্রিমাত্রিক সংলাপের মধ্য দিয়ে একদিকে বিবাহ, এই প্রতিষ্ঠানটি সস্পর্কে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে আবার একটি মেয়ে দয়া নয়, সাহায্য নয় নিজের রক্তমাংসের মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চেয়েছে, অসুস্থ স্বামীকে বাঁচাতে চেয়েছে, বারবার এক ধার -কর্যর মধ্য দিয়ে যে, ধার করা অস্তিত্ব থেকে রক্ষা পেতে চেয়েছে, স্বাধীন জীবিকায় মুক্তি চেয়েছে, এটাই তার বুদ্ধিজীবী স্বামীর কাছে ক্রাইম বলে মনে হয়েছে। সামনে যেমন দেখেছে ভোমরার উচ্চাকাঙক্ষা ধবংস হয়ে যাওয়া তেমনি বাড়ির কাজের লোক মালতীর দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় ও বাঁচা। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী যেন দেখিয়ে দেন এ লেখাপড়া না জানা নিম্নবর্গের মালতী এমন আত্মমর্যাদায় বিপদকে প্রত্যাখ্যান করে, স্বামীর সন্দেহবাতিককে পায়ে দলে দিয়ে আবার নতুন পুরষের সঙ্গে বাঁচে-বিয়ে নয়, লিভইন বা টুগেদার। সেও মরণোম্মুখ স্বামীকেই বাঁচাতে চেয়েছিল। মধ্যবিত্ত যে মৃত্যুপথযাত্রী, সেই ১৯৫০ এর দশকেই জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী বুঝেছিলেন।
উপন্যাসটিতে একাধিক চরিত্রের মুখ দিয়ে লেখকের বীক্ষা ধরা পড়েছে-এমনকি বিপদবরণের মত ব্যক্তির শিল্প নিয়ে মন্তবেও। শিল্পকে যে সাধারণ মানুষ ও চারদিকের বাস্তব নিয়েই বাচতে হয়। উকিল একদিকে নির্বোধ অথচ চতুর-বিপদবরণের মুখেই শোনা যায়। অমরেশ, মীরা, মৃগাঙ্ক-সবাই এক অর্থে রিল্যায়েবল ন্যারেটর। এরা মিলেমিশে একটা বহুস্বর সিম্ফনি উপন্যাসটিতে বাজে। আর এক একজন পাঠক তো উপন্যাস এক একরকম পড়ে। ‘মীরার দুপর’ পড়তে পড়তে কেন জানি শেক্সপীয়রকে মনে পড়ে। এ উপন্যাসের বড়ো উপাদান সন্দেহ ও ঈর্ষা। শেক্সপীয়রে এই ভালোবাসার পাত্রীকেই হত্যা করে, এখানে ঈর্ষায় আসে আত্মহনন। অথচ ঈর্ষার সঙ্গত কারণে কারণ ছিল না-মীরা তার সর্বস্ব দিয়ে তার মর্যাদাকে বিপন্ন করে হীরেণকে বাঁচাতে চেয়েছিল, ধার-কর্জর চোরাবালির ওপর দাঁড়িয়ে। এমনকি কলেজ জীবনে যে অমরেশকে প্রত্যাখ্যান করে হীরেণকে বিয়ে করেছিল, তার কাছে যেতেও দ্বিধা করেনি যদিও সে আত্মসচেতন মানুষ। অন্যদিকে আত্মহননের যে ভয়ঙ্কর ঘটনা ও দৃশ্য পাঠক দেখে তার মূলে বিপদবরণ-সে-ই হীরেণকে খবরের কাগজ দিয়েছে, রাতের ঘটনা বলেছে। তার কোন উদ্দেশ্য ছিলনা। মোটিভলেস মোটিভহান্টিং -এ সে এই অনুঘটকের কাজ করে। কিংবা রক্তাক্ত হীরেণকে পড়ে থাকতে দেখে মীরা প্রথমে বিচলিত হলেও যে স্থিরতা, শীতল আচরণ দেখায় তাতেও শেক্সপীয়রের নারীকেই মনে পড়ায়। জীবন যে চলন্ত ছায়া, মীরা কি এটা বুঝেছিলেন, এখন তার সঙগী মৃগাঙ্ক।
‘মীরার দুপর’ যখন প্রকাশিত হয় তখন বাংলা উপন্যাসের আবহে জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী এক নতুন গল্প বলেছিলেন। আজও, ষাট বছর পরেও, এ গল্প বাংলা উপন্যাসের জগতে তার নতুনত্ব হারায়নি। মোটা গল্পের দিক থেকে উপন্যাসটি সকল স্বামীর সন্দেহ-ঈর্ষা একটি নারীর জীবনে কি বিড়ম্বনা আনে, তাকে পাল্টে দেয়, অবশেষে ঈর্ষা-সংশয়ের জালে স্বামী আত্মহত্যা করে। কিন্তু লেখকের দৃষ্টিকোণ এ-গল্পকে একাধিক ব্যক্তির চিন্তার সংঘাতে এ গল্পকে করে তোলে সামাজিক নানা জিজ্ঞাসার দর্পণ। হীরেণ-অমরেশ-মৃগাঙ্ক, কেউই একরৈখিক নয়, এমন কি বিপদবরণও নয়। মধ্যবিত্ত অস্তিত্বের জট তাদের মনের গহণে ব্যক্তিক ইতিহাসে। আর তারা উপদেশগত ভাবে পরস্পরের থেকে ভিন্ন-এক মধ্যবিত্ত বৃত্তেই কত রকম কতো জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী দেখিয়েছেন। এ গল্প মূলত চরিত্রগুলির মনের গল্প। আর গল্পের কেন্দ্রবিন্দু মীরা- এ মধ্যবিত্ত সত্তার মনের উদঘাটন সে যেমন করে, তেমনি নিজেও উদঘাটিত হয়। উপন্যাসের শুরুর মীরা আর শেষের মীরা এক নয়- শেষের মীরার আমাদের মধ্যবিত্ত অস্তিত্ব সম্পর্কেই একটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন, সংলাপে-ভাবনায় এক অনন্য নারী, বাংলা উপন্যাসের জগতে।